সকাল ১১:৫২ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

কোয়ালিটি নয়, কোয়ানটিটি যখন গুরুত্বপূর্ণ!

প্রকাশিত:

গোলাম মোর্তোজা ।।

আমাদের শিক্ষা, শিক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে একই সঙ্গে দু’টি আলোচনা:

এক. শিক্ষার অবস্থা খুব ভালো। পুরো জাতি শিক্ষিত হয়ে উঠছে।

দুই. পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, যাচ্ছে।

দৃশ্যমান কিছু বিষয় সামনে এনে দুই পক্ষের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছে।

বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করছে না কেউ। হালকা মেজাজে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের মতো করে শিক্ষা নিয়েও তর্ক-বিতর্ক চলছে। আজকের লেখার বিষয় শিক্ষা। এটা কোনও গবেষণা নয়। আপনি আমি প্রতিদিন যা দেখছি, যে ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি, তেমন কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি।

১. সঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি বড় সাফল্য। অতীতের সরকারগুলো যা পারেনি, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ তা পেরেছেন। এ জন্যে আমরা বহুবার তার
প্রশংসা করেছি।

২. পাসের হার বৃদ্ধি পাওয়ার আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে নূরুল ইসলাম নাহিদের সময়ে। পাসের হার বৃদ্ধির অনেক গল্প আমরা জানি। প্রিয় পাঠক আমাদের অনেকেরই আত্মীয়-পরিজন কোনও না কোনও পর্যায়ের শিক্ষকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ঢাকার একটি নামকরা কলেজের একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা বলি। ৭৫ এর মধ্যে পরীক্ষায় পাস নম্বর ২৫। শিক্ষকদের মৌখিকভাবে বলে দেওয়া হয়েছে কোনও শিক্ষার্থী ২০ পেলে তাকে ২৫ দিয়ে পাস করাতে হবে। শিক্ষকদের এও বলে দেওয়া
হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ফেল না করানোর চেষ্টা করতে হবে। এর সঙ্গে কলেজের এবং শিক্ষকের নিজের সুযোগ-সুবিধা নির্ভর করছে। ফলে যে শিক্ষার্থী ১৫ পাচ্ছে শিক্ষকরা তাকে ২০ দিচ্ছেন। ২০ অটো সিস্টেমে ২৫ অর্থাৎ পাস নম্বর হয়ে যাচ্ছে। ১০০’র মধ্যে পরীক্ষায় পাস নম্বর ৩৩। সেখানেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে হু হু করে পাসের হার বাড়ছে।

৩. খাতা দেখলে শিক্ষকরা অর্থ পান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে খাতা দেখাকে কেন্দ্র করে চলছে ‘তদবির বাণিজ্য’। যে শিক্ষক অনার্স লেভেলে ক্লাস নেন না বা নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না, তারাও অনার্সের খাতা দেখছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। যে শিক্ষক অনার্সে ক্লাস নেন না, তিনি অনার্সের খাতা দেখছেন। ১৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ২৫ বা তারও বেশি নম্বর দিয়ে পাস করাচ্ছেন। এভাবে চলছে, কোথাও কোনও সমস্যা হচ্ছে না।

৪. ঢাকার আরেকটি নামকরা স্কুলের একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন শিক্ষার্থী নকল করছে, শিক্ষক তা দেখছেন। শিক্ষক শুধু তার নকলটি নিয়ে নিতে পারবেন, শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করতে পারবেন না। এমনকি শিক্ষার্থীকে
ধমকও দিতে পারবেন না। এসব বোর্ডের নির্দেশনা। ফলে অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় নকলের প্রবণতা ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

৫. ওপরের দু’জন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেকের হয়তো দ্বিমত থাকবে। কেউ কেউ পুরো বিষয়টি অস্বীকার করতে চাইবেন। চাইতেই পারেন। শিক্ষামন্ত্রী তো পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেই টিকে আছেন। প্রিয় পাঠক আপনারা যারা অস্বীকার করতে চাইছেন, তাদের কাছে অনুরোধ করি, আপনাদের আত্মীয় বা বন্ধু শিক্ষকদের কাছ থেকে বিষয়টি একটু জেনে নেওয়ার চেষ্টা করে তারপর অস্বীকার বা দ্বিমত করেন। নিশ্চিত করে জানি, যা লিখলাম তার চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর সত্য আপনি জানতে পারবেন।
৬. প্রতিবছর নিয়ম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় গড়ে প্রায় ৯০% শিক্ষার্থী ফেল করছে। প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রায় সব শিক্ষকই কথা বললেন। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন অধিক হারের নির্দেশনা দিয়ে পাস করানোর কুফল বিষয়ে। সরকার যখন এর বিপক্ষে, অধিক হারে পাস করানোর পক্ষে অবস্থান নিল, বদলে গেল অধিকাংশ শিক্ষকের অবস্থান। তখন তারা বলতে শুরু করলেন, না, মানে... ভর্তি পরীক্ষায় তো সবাই সুযোগ পায় না... পাস-ফেলের ব্যাপার না... মানে... আমতা আমতা করতে শুরু করলেন।

মূল বিষয় হলো, ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ সবাই পায় না- এ কথা সত্য। এ কথাও সত্য যে, এখানে পাস-ফেলের বিষয় আছে। ভর্তি পরীক্ষায়ও একটি নির্দিষ্ট নম্বর না পেলে, তাকে ফেল বলা হয়। এসএসসি, এইচএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর পাচ্ছে না। বিষয়টি প্রথমদিকে স্বীকার করলেও আমাদের দলদাস শিক্ষকরা এখন আর তা স্বীকার করতে চাইছেন না। নানা কুযুক্তি দিয়ে সরকারের শিক্ষা ধ্বংসের ভুল নীতি সমর্থন করছেন।

৭. পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ‘প্রশ্ন ফাঁস হয় নাই’ অস্বীকার করাটাও শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ নিয়মে পরিণত করেছেন। তার কথা কেউ বিশ্বাস করছে না, তারপরও
তিনি ভাঙা রেকর্ড ঘ্যাড় ঘ্যাড় করে বাজিয়ে চলেছেন।

৮. সর্বশেষ মেডিক্যাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভয়াবহ ঘটনাটিও সরকার চাপা দিয়ে দিল। প্রথমে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল ‘অস্বীকার’ করে। তারপর চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল শিক্ষার্থীদের ‘নির্যাতন’ করে। সর্বশেষ চাপা দিল ‘প্রতারণা’ করে। কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পাঠালো শিক্ষকদের দলীয় সংগঠন বিএমএ’কে। বিএমএ’র সরকার সমর্থক নেতারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসলেন এবং বলে দিলেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় নাই। কোনও তথ্য যাচাই-বাছাই এবং তদন্ত ছাড়া। আলোচনায় বসার আগে শিক্ষার্থীরা বুঝতেই পারেননি, ঝানু রাজনৈতিক ডাক্তাররা তাদের সঙ্গে কত বড় প্রতারণা করতে যাচ্ছেন। এমনকি বুঝতে পারেননি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকা লেখক গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদদের মতো ভালো মানুষেরাও।

৯. ইউনেস্কো সংখ্যার ভিত্তিতে আমাদের উচ্চশিক্ষার প্রশংসা করছে। সরকারের চাওয়াও তাই ছিল। সরকারের কাছে কোয়ালিটি নয়, কোয়ানটিটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকার বা নীতি নির্ধারকদের কারও সন্তান বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেন না।

সুতরাং বাংলা মাধ্যমের এই শিক্ষা ধ্বংস হলে তাদের কিছু যায় আসে না। উল্টো সংখ্যা বাড়াতে পারলে প্রশংসা পাওয়া যায়। তাদের সন্তানদের জন্যে ইংরেজি মাধ্যম এবং বিদেশের অবারিত দ্বার তো খোলা আছেই।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।