সকাল ১১:২৪ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

লড়াইটা সংস্কৃতিরও

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ।।

নেদারল্যান্ডস থেকে দেশে ফিরে বরাবরের মতো এবারও গণভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও তিনি তার সফর নিয়েই বলতে চেয়েছেন, কিন্তু সাংবাদিকরা তৈরিই ছিলেন দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করবেন বলে।

এবং এমন এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘একটি গ্রুপ নেমেছে গুপ্তহত্যায়। তারা চেষ্টা করছে বাংলাদেশে আইএস আছে সেটা প্রমাণ করার। যদি তা করতে পারে তাহলে বাংলাদেশে কী ঘটতে পারে তা একবার ভেবে দেখবেন? সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান- সেসব দেশে যা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশেও সেই অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়।’ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যা ও হামলার পেছনে আইএস আছে-এমন স্বীকারোক্তি দিতে ‘প্রচণ্ড চাপ’ আসছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশে একটি জঙ্গি খেলা খেলতে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহটা হঠাৎ করেই খুব দৃশ্যমান। ঠিক এসময়েই কিছু কিছু পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি নাগরিক বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন। গোয়েন্দারা বলছেন ভ্রমণের নামে গত তিন মাসে এসব পাকিস্তানি নাগরিক বাংলাদেশে এসেছেন। তাদের অনেকে মাসে ৪ থেকে ৫ বার যাতায়াত করেছেন। গোয়েন্দারা এও বলছেন যে অতীতে এতো পাকিস্তানি নাগরিক ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশে আসেনি।

কোনও দেশে পাকিস্তানি নাগরিক থাকার অর্থ হলো বাড়তি সতর্কতা। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে একসময় পাকিস্তানিদের যাতায়াত অবাধ ছিল তা এখন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সেখানে বাস করা পাকিস্তানিদের রাখা হয় কড়া নজরদারিতে। বিশ্বের জন্য এমন বিপজ্জনক একটি দেশের এতো নাগরিক হঠাৎ করে বাংলাদেশে ভ্রমণ বাড়িয়ে দিল কেন?  

গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, এসব পাকিস্তানি নাগরিক আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। পাকিস্তানি নাগরিকরা বিমান থেকে বাংলাদেশে নেমে ইমিগ্রেশনে অবতরণপত্রে বাংলাদেশে অবস্থানের যেসব ঠিকানা দেয় সেখানে তাদের পাওয়া যায় না। অন্যদিকে গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, বোমা বানানো, নাশকতা করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়াসহ নানা বিষয়ে এরা পারদর্শী। আর এই গ্রুপটি জাল মুদ্রার ব্যবসা করে লভ্যাংশ দিচ্ছে জঙ্গিদের।

এক ভয়ঙ্কর খবর। দেশে বৈধভাবে পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছে ৮ হাজার ৯৪২ জন। কিন্তু অবৈধভাবে বসবাস করছেন বৈধ নাগরিকের প্রায় ৮ থেকে ১০ গুণ।কিভাবে এরা এলো, কিভাবে এরা থাকে? এতোদিন পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন কেন এদের নজরে রাখেনি বা রাখতে পারেনি? বোঝাই যাচ্ছে এতো সংখ্যক পাকিস্তানিদের আগমনের পর তারা কোথায় যায় তার যথাযথ তথ্য আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে নেই। তাহলে দেশের নিরাপত্তা আসবে কিভাবে?

সিরিয়াসহ উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের আল কায়দা ও আইসিস নিয়ে খেলাটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে রাশিয়ার সিরিয়ায় আক্রমণের পর। তবে কি এখন লক্ষ্য এই জঙ্গি খেলাটা দক্ষিণ এশিয়ায় নিয়ে আসা? পাকিস্তান আর আফগানিস্তানতো আছেই, রইলো বাংলাদেশ যেখানে একটি বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী আছে। ধীরে-ধীরে এই জঙ্গি তৎপরতা ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত। এতে রাশিয়া একটা নিয়মিত জঙ্গি আতঙ্কে থাকবে, তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য এ অঞ্চলের গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদ। মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র আর বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজার এখন পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে, এরপরের লক্ষ্য প্রাকৃতিক গ্যাস? আর অস্ত্রের ব্যবসাতো আছেই।

বিদেশিদের সতর্কতা জারির পরপরই দুজন বিদেশি নাগরিক হত্যা, একের পর এক লেখক-ব্লগার-প্রকাশক হত্যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির যোগসূত্র মেলানো যায়। তারা দেশি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে একটা পরিকল্পিত চেষ্টা করছে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর উপস্থিতি প্রমাণ করার জন্য। উদ্দেশ্য দেশকে একটা দীর্ঘস্থায়ী ভাবমূর্তি সঙ্কটে ফেলা।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে এসব বিদেশির ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সম্প্রতি চার পাকিস্তানিকে আটক করছে যাদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ জেএমবি’র সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে, আছে সরাসরি সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগও।

শুধু পাকিস্তানি নয়, অবৈধভাবে বাস করছে অন্য অনেক দেশের নাগরিক। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে জানা গেছে, দেশে অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। রয়েছে অফ্রিকা মহাদেশের ১৭ হাজার বৈধ ও অবৈধ নাগরিক। এদের মধ্যে মধ্যে প্রায় ৯ হাজার নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ছয় বছর ধরে এসব বিদেশি বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসে আর ফিরে যায়নি।

বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের অবৈধভাবে অবস্থান যেকোনও বিবেচনায় উদ্বেগজনক। মাদক ও সোনা চোরাচালান, জাল টাকা তৈরি ও বিপণন, অবৈধ অস্ত্র ও ভিওআইপি ব্যবসা এবং জালিয়াতির সঙ্গে বিদেশিদের ব্যাপকহারে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। যারা এমন সব কাজ করতে পারে তারা সহজেই অর্থলোভে জড়িয়ে যেতে পারে জঙ্গি তৎপরতায়। ভয়টা সেখানেই।

সর্বশেষ দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর না করা পর্যন্ত অজানা নাশকতা ঘটার শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না গোয়েন্দারা। এর পাশাপাশি আছে রাজনীতির সমীকরণ।

দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতার সবচেয়ে বড় মহড়া প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে।  রাজশাহীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় প্রশাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। আফগানিস্তান ফেরত বাংলাভাইয়ের মূল টার্গেট ছিল দেশে ইসলামী বিপ্লব ঘটাতে জঙ্গিবাহিনী তৈরি করা। তখন গণমাধ্যমে বাংলাভাইকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি মানুষ জানতে পারে। তবে তখনকার সরকার পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেছিলেন, বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।

বর্তমান সরকার শুরু থেকেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আছে। জঙ্গিরা যাতে দেশের কোথাও ঘাঁটি গাড়তে না পারে তার দিকে নজর আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দাবি করে এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড আরও বাড়ানোর। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নটিও বিশেষভাবে প্রয়োজন।

প্রয়োজনে বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনী গড়ে তোলার এখনই সময়। কারণ আমরা জানি একটি আন্তর্জাতিক চক্র এ দেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যা চলছে তা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে।

দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে অগ্রসর হতে হবে। শুধু সরকারের একার পক্ষে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভবও নয়। সমাজকে এগিয়ে আনতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার প্রক্রিয়া শুরু হোক এখনই। শুরু হোক এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যে সংস্কৃতি মোকাবেলা করবে অন্ধকার জন্ম নেওয়া খুন খারাবির সংস্কৃতিকে। লড়াইটা শুধু রাজনীতির নয়, সংস্কৃতিরও।

লেখক: পরিচালক, বার্তা; একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।