সকাল ১১:২৪ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

এমপি লিটন তাহলে পার পেয়ে যাবে!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

চিররঞ্জন সরকার ।।

রবিবার বিকেলে বিভিন্ন অনলাইন পত্রপত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুটি খবর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এর একটি হচ্ছে আলোচিত দুই শিশু রাজন ও রাকিব হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায়ে কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা। অপর ব্রেকিং নিউজটি হলো-গাইবান্ধায় একটি শিশুকে গুলি করে হত্যাপ্রচেষ্টার অপরাধে অভিযুক্ত সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যকে আসন্ন সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পাবার পর পরই সংসদ সদস্যের অনুসারীরা তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন।

প্রথমেই আলোচনা করা যাক শিশু রাজন ও রাকিব হত্যাকাণ্ডের রায় নিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে এই দুই হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করা হলো। রাজনের হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার রায় আসে আদালতের মাত্র ১৪ দিনের বিচার প্রক্রিয়ায়। রাকিবের হত্যাকারীদের ক্ষেত্রে সময়টা আরও কম। মাত্র ১০ দিন!  এতে অত্যন্ত ইতিবাচক দুটি দিক প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত, শিশুর প্রতি নিমর্মতার বিপক্ষে আদালত কঠোর অবস্থান ঘোষণা করলেন। দ্বিতীয়ত, দ্রুততম সময়ে বিচার করার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। একই সঙ্গে ‘আমাদের দেশে খুন বা হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না’-এই অপবাদ ঘোচানোর ক্ষেত্রে এক নজির গড়া হলো।  

এখানে আরও একটি কথা না বললেই নয়, এই ঘটনা দুটি বাংলাদেশে তীব্র জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। এই অসন্তোষ ও ক্ষোভকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারে যে উদ্যোগ নিয়েছে, এটাও নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ঘটনা। আমাদের দেশে সরকারি কর্মকাণ্ডে জনমতের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। বরং উল্টোটাই বেশি দেখা যায়। দ্রুততম সময়ে বিচারের রায় ঘোষণা নিংসন্দেহে একটি ইতিবাচক ব্যতিক্রম। 

যদিও প্রাথমিক, তারপরও শিশু রাজন ও রাকিব হত্যার দ্রুত বিচার প্রমাণ করে, সরকার চাইলে এটা সম্ভব। সরকার চাইছে কিনা কিংবা কতটা চাইছে, সেটা এক বড় ফ্যাক্টর। তবে সরকার সব ক্ষেত্রে এটা চায় বলে মনে হয় না। বিশেষ করে দলের গুরুত্বপূর্ণ কারও সংযোগ থাকলে সরকারের ‘ন্যায়ধর্ম’ কোথায় যেন হারিয়ে যায়। রাজনৈতিক বিষয় হলে, দলের কারও গভীর যোগ থাকলে, দলীয় বা গোষ্ঠী স্বার্থ থাকলে-সে ক্ষেত্রে জোরালো জনমত থাকলেও আমাদের মতো দেশে দ্রুত ও ন্যায় বিচার আর দেখা যায় না। জনমত বিভক্ত হলে এটা বোধহয় আরও কঠিন। সরকারের চাওয়া-না চাওয়াটাও তখন অন্য রকম হয়ে যায়।

দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবাই যেমন চায়, রাজন ও রাকিবের হত্যামামলার রায় দ্রুততম সময়ে কার্যকর হোক। একইসঙ্গে চায়, যে ক্ষমতাবান এমপি শিশু সৌরভকে গুলি করেছিলেন, তারও যথার্থ শাস্তি হোক। জামিন পাওয়াটা আইনের দৃষ্টিতে অধিকার হতে পারে, তবে আইনপ্রণেতা আইন ভাঙলে তার শাস্তি আরও কঠোরই হওয়া উচিত। কারণ তিনি আইন প্রণেতা, জনগণের প্রতিনিধি। আর দশজন সাধারণ মানুষের মত তিনি ‘অজ্ঞ’ নন। তিনি সচেতন। তিনি জনস্বার্থে আইন প্রণয়নে ভূমিকা পালনের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। আইন ভাঙার জন্য নয়।

মাতাল অবস্থায় একটি শিশুকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হয়েও তিনি কীভাবে জামিন পান? সংসদ সদস্য হলেই কি তার সাত খুন মাপ? তিনি সংসদের বিগত অধিবেশনে তিনি কত দিন যোগ দিয়েছেন, জাতির কল্যাণে সংসদে বা সংসদের বাইরে তার কী ভূমিকা ছিল-এসব বিষয় কি তার জামিনের সময় বিবেচনা করা হয়েছিল? 

একজন শিশুকে গুলি করে হত্যা করতে উদ্যত-এমন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যারা গলায় ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছেন, তার নামে স্লোগান দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছেন, তাদের মানবিক মূল্যবোধও আজ ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কতটা ‘হায়েনা স্বভাবের’ হলে একটা শিশুকে গুলি করে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছেন, (যে শিশুটির মৃত্যুও হতে পারত) তার নামে জয়ধ্বনি দেওয়া যায়! আমরা কি ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের কাছে নিজেদের বিবেক-বিচার-মনুষ্যত্ব সব কিছু বিসর্জন দেব? ঘৃণ্য বা খারাপ কাজের জন্য কাউকে দুয়ো দেব না? একজন ‘খুনী’ হলেও স্রেফ ‘আমার দলের নেতা’ এই কারণে তাকে মাথায় তুলে নাচবো? আমরা এই অধঃপতন ঠেকাব কোন আইন দিয়ে? আর মাননীয় এমপি বাহাদুরের আক্কেলও বলিহারি! এমন একটা গুরুতর অভিযোগের পর কোথায় তিনি অনুশোচনায় দগ্ধ হবেন, মাথা নিচু করে সবার করুণা ও সহানুভূতি খুঁজবেন, তার বিন্দু-বিসর্গ না করে জামিন পেয়ে তিনি দাঁত কেলিয়ে হেসেছেন! চোখের চামড়ার কতটা অভাব হলে এমন দাঁত কেলিয়ে হাসা যায়? আমাদের দুর্ভাগ্য যে পিতামহরা অনেক আগে বিদায় নিয়েছেন! যে দাঁত অনেক অনেক আগেই খড়ম দিয়ে ভেঙে দেওয়া উচিত ছিল, যে গলায় পাদুকা মালা কিংবা ফাঁসির দড়ি পড়ার কথা ছিল, সেখানে শোভা পেয়েছে ফুলের মালা! পিতামহরা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এমন কাণ্ড ঘটত না! এই লজ্জা আমরা রাখি কোথায়?

রাজন ও রাকিবের হত্যাকারীদের যেমন ফাঁসির আদেশ হয়েছে, দেশবাসী চায় অন্যান্য শিশু খুন বা হত্যাপ্রচেষ্টার মামলাগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। ক্ষমতাসীন দলের যে ক্যাডাররা এক অনাগত সন্তানকে মায়ের গর্ভে লাথি দিয়ে মেরে ফেলল, তার দুঃখিনী মায়ের চোখে সারাজীবনের জন্য ব্যথার অশ্রু তুলে দিল, তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

দেশের সচেতন মানুষমাত্রই চায়, দেশের সব শিশু, সব নাগরিক সবাই তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচুক। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে মযার্দাবান হোক। শিশুদের প্রতি এই নির্মমতার যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতি, সেই আধিপত্যবাদী রাজনীতিরও মৃত্যু ঘটুক।

এ জন্য সবাইকে সোচ্চার এবং সজাগ হতে হবে। নাগরিকদের সতর্ক, সচেতন সোচ্চার ভূমিকাই কেবল পারে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ন্যায়নুগ হতে বাধ্য করতে।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।