সন্ধ্যা ০৭:৩৮ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

লিটন ভাই ভালো লোক, ফুলের মালা তারই হোক!

প্রকাশিত:

হারুন উর রশীদ ।।

রবিবার সকাল থেকেই বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিশেষ করে অনলাইন এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরগরম ছিল শিশু রাজন আর রাকিব হত্যা মামলার রায় নিয়ে। আর সরব ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক। দুপুর নাগাদ রায় ঘোষণার পর তা আরও বেড়ে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বল্প সময়ে বিচার শেষ করে রায় দেন আদালত। সিলেট এবং খুলনার এই দুটি শিশু হত্যায় মোট ছয় জনের ফাঁসির আদেশ দেন দু’টি আদালত। যা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে।

কিন্তু এরইমধ্যে আরও একটি আলোচিত খবরের জন্ম হয়। আর তা হলো গাইবান্ধায় শিশু সৌরভকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সরকার দলীয় সংসদ সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন জামিনে মুক্তি পেয়ে ফুলের মালা গলায় দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

রবিবার গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের জামিন মঞ্জুর হলে কারাগারের সামনে তাকে ফুলের মালা পরিয়ে দেয় দলীয় নেতা-কর্মীরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

শুধু তাই নয়, তিনি যে গাড়িতে বসে শিশু সৌরভকে গুলি করেছেন সেই গাড়িতে চড়েই মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এ কারণে ধীরে-ধীরে সংবাদ মাধ্যমের নজর সেদিকে ঘুরে যায়। সন্ধ্যা নাগাদ রাজন-রাকিব হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় ছাপিয়ে প্রধান খবর হয়ে ওঠে-  ‘ফুলের মালা গলায় দিয়ে সংসদ সদস্য লিটনের জামিনে মুক্তি।’ আর গাঁদা ফুলের মালা গলায় সংসদ সদস্য লিটনের সেই ছবি সংবাদ মাধ্যম থেকে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ছড়িয়ে পরে মেরুন রঙয়ের গাড়ির ছবি। যারা সামনে ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর অনুসারী-ভক্তরা!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যেখানেই রাজন-রাকিব হত্যা মামলায় রায়ে ৬ জনের ফাঁসির রায়ের খবরের লিংক দেওয়া হয়েছে। সেখানেই কমেন্ট বক্সে সংসদ সদস্য লিটনের ফুলের মালা গলায় ছবি পোস্ট করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। আর রয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।

সিলেটে শিশু রাজন হত্যার রায় দিতে গিয়ে আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনের ওপর নৃশংসতা মধ্যযুগীয় বর্বরাতাকেও হার মানিয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি আধুনিক দেশ-যেখানে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিদ্যমান—সেই দেশে এ ধরনের বর্বরতা কোনওভাবেই সহ্য করা যায় না।’

বিচারক পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নেও বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর। এ হিসেবে দেশের প্রতিটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে চায় রাষ্ট্র। শিশুরা যাতে এ ধরনের নৃশংস নির্যাতনের শিকার না হয়,  এ জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে।’

যে গাড়িতে বসে সৌরভকে গুলি করেছিলেন সংসদ সদস্য লিটন কারাগার থেকে বেরিয়ে সে গাড়িতে চড়েই বাসায় ফেরেন তিনি। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন।

আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন প্রয়োজন পড়ল তা সহজেই বোঝা যায়। আর এজন্য আমার নতুন করে শিশু নির্যাতন এবং বিচারহীনতার পরিসংখ্যান দেওয়ার প্রয়োজন নাই। রায়ের একই দিনে শিশু সৌরভের পায়ে গুলি করে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি সংসদ সদস্য লিটনের ফুলের মালা গলায় দিয়ে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে গত ২ অক্টোবর সংসদ সদস্য লিটনের ছোড়া গুলিতে শিশু সৌরভ গুলিবিদ্ধ হয়। সেইদিন নয়, এর একদিন পর এমপি লিটনকে আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন সৌরভের বাবা সাজু মিয়া, আগেরদিন পুলিশ মামলা নেয়নি। এমপি লিটনকে গ্রেফতারেও পুলিশ অনেক সময় নিয়েছে। তাঁকে গাইবান্ধায় খুঁজে পায়নি পুলিশ। পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। আর পুলিশ সক্রিয় হয়েছে যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।এর আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকার উত্তরায় নিজের বোনের বাসায় বেশ নিরাপদেই ছিলেন। আর প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিত পেয়ে ১৪ অক্টোবর রাতে উত্তরার বোনের বাসা থেকে সংসদ সদস্য লিটনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২৬ দিন পর রবিবার তিনি জামিন পেলেন এই কারণে যে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে। সত্যিইতো তাঁর মতো সংসদ সদস্য ছাড়া সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আইন প্রণয়ন, দেশের মঙ্গল চিন্তা হবে কীভাবে!

সৌরভ ২৪ দিন চিকিৎসা নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে । তবে এখনও সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। সে এখনও তার স্কুলে যেতে পারে না। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। অন্যের সহায়তায় হাঁটতে হয়। তার একটি পা আর স্বাভাবিক হবে কীনা তা নিয়ে চিকিৎসকরা সংশয়ে আছেন।

কিন্তু এই সংশয় এখন আরও বড় হয়ে উঠেছে ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে। প্রশ্ন উঠেছে সৌরভের গরিব পরিবার আদৌ বিচার পাবে কী না। কারণ, এমপি লিটন জেলে থাকতেই তার লোকজন সৌরভের পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। দিয়েছে নানা রকম চাপ। সেসব খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এবার এমপি লিটন জামিনে মুক্ত। আমি ঢাকায় বসেই আঁচ করতে পারছি চাপটি কেমন হবে। সৌরভের পরিবার সেই চাপ সামলাতে পারবে তো? পুলিশ কি এখন নতুন করে শিশুবান্ধব হবে? তারা কি এমপির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেবে?

সিলেটে শিশু রাজন এবং খুলানায় শিশু রাকিবকে যারা হত্যা করেছে তাদের কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই। থাকলেও তারা একজন সরকারি দলের এমপির মতো ক্ষমতাধর নয়। তাই হয়তো ১৭ এবং ১৪ কার্যদিবসে বিচারকাজ শেষ হয়েছে। বা ধরে নিচ্ছি আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। কিন্তু  শিশু সৌরভের জন্য আইন কি একই গতিতে চলছে? চললে এর মধ্যে তো নিদেনপক্ষে চার্জশিট হয়ে যাওয়ার কথা। তবে বলে রাখি এখানে আইন গতি না পাওয়ার আলামত স্পষ্ট। একটি উদাহরণ দিই। এমপি লিটন যে গাড়িতে বসে সৌরভকে গুলি করেছে এখনও সেই গাড়ি পুলিশ আলামত হিসেবে জব্দ করেনি। রবিবার জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি সেই গাড়িতে করেই বাড়ি ফিরছেন।

এমপি লিটনকে যারা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছেন তারা ঠিক কাজটিই করেছেন। কারণ তারা জানেন এমপি ক্ষমতাধর। তাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। আর একজন নিম্নবর্গীয় সৌরভকে গুলি করে কী এমন অপরাধ করেছেন? পা গেছে, মরেনিতো। আর মরলেই বা কী? তারা জানে একজন এমপির হাত অনেক লম্বা। তাকে কিছু করা যায় না। আর তিনি যদি হন সরকারি দলের তবে তো কথাই নেই! তাইতো ফুলের মালা তাকেই দিয়েছে। আমিও বলতে চাই ক্ষমতা থাকলে তার কোনও দোষ থাকে না। তার অন্যায় বিচেনায় নেওয়া যায় না- ফুলের মালাতো তারই প্রাপ্য! যেন, ‘লিটন ভাই ভালো লোক, ফুলের মালা তারই হোক!’

আর সিলেটে রাজন হত্যা মামলার বিচারক যে বললেন, ‘বাংলাদেশের মতো একটি আধুনিক দেশ-যেখানে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিদ্যমান-সেই দেশে এ ধরনের বর্বরতা কোনওভাবেই সহ্য করা যায় না।’ - এই বাক্যটি আপাতত দূরে সরিয়ে রাখলাম।

 

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।