বিকাল ০৫:১৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯  

খাদের কিনারায় মোদি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী।।

ইংরেজ রাজত্বের সময় জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রতিবাদে স্যার উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর কেন জানি না দীর্ঘ ১৭ দিনব্যাপী কোনও প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা টাউন হলে প্রতিবাদ সভাও করেছিলেন। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করার আহবান জানিয়েছিলেন কিন্তু দেশবন্ধু সভাপতিত্ব করতে সম্মত হননি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের ডাকা প্রতিবাদ সভায় নিজেই সভাপতিত্ব করেন, নিজেই বক্তৃতা করেন। আসলে জ্ঞানীজনেরা জাতির বাতিঘর। অন্ধকার দেখলে তারাই জাতিকে আলো দেখান। গত দু’মাসে ভারতে ৪০ জন বুদ্ধিজীবী ভারতে সরকারের দেওয়া খেতাব ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সর্বশেষ এ ঘোষণা দিলেন অরুন্ধতী রায়। তারাও বলেছেন যে ভারত বাঘঘোনার বাঁকে এসে উপস্থিত হচ্ছে যদি ফেরানো না যায় তবে বিনাশের অন্ধকার এসে উপস্থিত হবে। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীও একই কথা বলেছেন বারবার।

২০১৪ সালে ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে নরেন্দ্র দামোধর দাস মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি ছিলেন গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ২০০২ সালে গুজরাট রাজ্যে যে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় তাতে দুই হাজার নিরীহ মুসলমান প্রাণ হারান। গুজরাটের দাঙ্গায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নরেন্দ্র মোদি নিজেই। মোদি কৈশোর থেকেই আরএসএস-এর ক্যাডার। তার রাজনীতির হাতেখড়ি রাষ্ট্রীর স্বয়ংসেবক সংঘের হাতে। গত লোকসভা নির্বাচনে মোদিকে জিতিয়ে আনার জন্য টাটা, আম্বানিরা ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছিলেন। মূলত নরেন্দ্র মোদি ছিলেন ভারতীয় বড় শিল্পপতিদের চয়েস করা প্রার্থী।

আগাগোড়া নরেন্দ্র মোদিকে তার দলবলসহ জিতিয়ে আনার বিষয়টা মনিটরিং করে ছিলেন মুকেশ আম্বানি। তারা চেয়েছিলেন ভারতের শিল্পায়নে তাদের পরিকল্পনা তারা মোদিকে দিয়ে বাস্তবায়িত করবেন।মুকেশ আম্বানি ইনফোটেলের মালিক।এটা একটা টিভি কনসোর্টিয়াম।২৭টি টিভি চ্যানেল রয়েছে ইনফোটেলের, পুরো লোকসভা নির্বাচনটা ২৭টি টিভি চ্যানেলের এক তরফা প্রচার করে ভারতের ৮০ কোটি ভোটারকে হিপনোটাইজ করে ফেলার চেষ্টা করেছিল, সফলকামও হয়েছে।

২৮৪টি আসন পেয়ে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকারও গঠন করেছেন। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসল মুখ লুকিয়ে রাখলেন। তিনি এখন মুখোশ ধারণ করেছেন। আরএসএস এজেন্ডা বাস্তবায়নে পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। মোদি রইলেন নির্লিপ্ত। ঘরওয়াপসী, গোমাংস, হিন্দুস্তানের সবলোক হিন্দু- এমন সব কাণ্ডকারখানার আওয়াজ তুললেন আরএসএস আর বহুত্ববাদী ভারতের অস্তিত্বে ধাক্কা লাগলো। যে সব বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদ করলো তাদের অনেককে গুপ্তঘাতকের গুলির আঘাতে প্রাণ দিতে হলো। কোনও রাজনীতিবিদ এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ করার আগেই দেশটির ৪০ জন বুদ্ধিজীবী তাদের সরকার প্রদত্ত খেতাব ত্যাগ করে ভারতজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে ছিলেন।

ভারতের কোটি কোটি বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন লোক বুদ্ধিজীবীদের খেতাব পরিত্যাগের ঘটনায় চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। এখন বিশ্বের চোখ এড়ানো আর সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বের অন্যতম সেরা রেটিং এজেন্সি “মুডিজ” ভনিতা না করে সোজাসাপটা বলে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি দলকে আয়ত্তে আনতে না পারেন তবে অচিরেই তিনি বিশ্বের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবেন। তবে সারাবিশ্বে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় গেলো তারচেয়েও বড় কথা, ভারতে কিন্তু তার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন দ্রুত নিম্নমুখী।দেড় বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী থাকলেও তার পৃষ্ঠপোষক আম্বানী/টাটাদেরকেও তিনি সন্তুষ্ট করতে পারেননি। ভারতের সাধারণ মানুষকেও কাজের কাজ কিছুই দেখাতে পারেননি।

আরএসএস এবং বিজেপির মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বীর সাভারকার এবং পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের এজেন্ডা বাস্তবায়ন।গত দেড় বছরে এ দুই উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার দেড় লাখেরও বেশি মূর্তি তুলেছে সমগ্র ভারতে বিজেপি এবং আরএসএস। অনেক জায়গায় নাথুরাম গডসে’র মূর্তিও স্থাপন করা হয়েছে। তাকে বলা হচ্ছে শহীদ নাথুরাম। সাভারকার আর দীনদয়াল হচ্ছে হিন্দুত্ববাদের তত্ত্বদাতা। সাভারকার ইউরোপে শিক্ষিত। আয়ারল্যান্ডের সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিলো। তার বই “হিন্দুত্ব” এখন বিজেপি এবং আরএসএস-এর “গীতা”। “হিন্দুত্বে” সাভারকার যে ভারত রাষ্ট্রের পরিকল্পনা পেশ করেছেন তা ইরান থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ভারতীয়দের এক পিতৃভূমি। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের “ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজম” হল এক সংকীর্ণ মতবাদ। তামাম বিশ্বে হিন্দু ছাড়া আর কিছু তার কল্পনায় আসতো না। দীনদয়াল চেয়েছিলেন ভারত হবে এক ধর্মাবলম্বী দেশ। কে বা কারা মেরে দীনদয়ালের মৃতদেহ রেললাইনের পাশে ফেলে দিয়েছিল। সাভাকারের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দেরও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। মুসলমানেরা তাকে হত্যা করেছিল।

সাম্প্রতিক বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে সম্পূর্ণ বিভাজনের পথ ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির সভাপতি অমিত সাহা বিহারে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী সুশীল মোদির জন্য ভোট চেয়েছেন। তারা বলেছেন, এবারের এ নির্বাচন হচ্ছে গো-খাদক আর গো রক্ষকের মাঝে। ভোটারেরা গো-রক্ষকদের প্রত্যাখান করেছে। বিহারের ২৭% মুসলিম ভোট। তাদেরও বোধদোয় হয়েছে। তারাও এবার বিভাজনের পথে পা বাড়ায়নি। বিজেপি পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে। আর বিজেপিকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে টানা তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন আঞ্চলিক দল জেডিইউ নেতা নীতিশ কুমার। বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব ও কংগ্রেসের সঙ্গে নীতিশ কুমারের জোট বিহার বিধানসভার দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিহারে বিজেপির এই ভরাডুবি প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য বিরাট একটি ধাক্কা। লালু প্রসাদ যাদবের দল নির্বাচনে একক বৃহত্তম হলেও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, নিতীশ কুমারই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। কিন্তু নিতীশ কুমারের হ্যাট্রিকের চেয়েও ভারতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের যেটা ভাবাচ্ছে, তা হল মাত্র দেড় বছর আগেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন যে বিজেপি জোট বিহারে বিপুল সাফল্য পেয়েছিল তারা কেন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল?

বিজেপির সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী নেতা রাম মাধব স্বীকার করে নেন, ‘এই ফল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল—কাজেই এর কারণ বিশ্লেষণ করতে সময় লাগবে। আমাদের ধারণা ছিল লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে, কিন্তু জেডিইউ জোট এতো ভাল করবে তা বিজেপি ভাবেনি, এমন কী হয়তো তারা নিজেরাও ভাবেনি।’ বিহারের নির্বাচনী ফল কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য এখনই কোনও বিপদ বয়ে আনছে না-ঠিকই, কিন্তু দেশজুড়ে প্রধানমন্ত্রীর বিপুল গ্রহণযোগ্যতার ছবি যে এতে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে তাতে কোনও সংশয় নেই।

‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’ মন্ত্র জপতে জপতে সম্ভবত মোদি খাদের কিনারায় পৌঁছেছেন। বিহারের বিধান সভায় ফলাফল তাই বলে।

 

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।