সন্ধ্যা ০৭:০৫ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

নিরাপত্তা আছে, নিরাপত্তা বোধ নেই

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম॥

একের পর এক হত্যাকাণ্ড, বোমা বিস্ফোরণ, হাতবোমা উদ্ধারের ঘটনায় রাজধানীর মানুষ আতঙ্কিত। স্বজনরা কাজে বের হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে খোঁজ দিচ্ছেন বা নিচ্ছেন। এদেশে এই তটস্থ ভাব বহুবার আগেও এসেছে। কিন্তু আপনার কাছে যখন ‘তথ্য থাকবে না’ তখন আতঙ্ক, ভীতি নিয়ে নিজের সাবধান হতে হবে। তাহলে যারা নিহত হলেন, তারা কি অসাবধানী ছিলেন? কী-ই-বা সাবধান হওয়া যেত?

এসব প্রশ্ন মিলিয়েই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও মানুষের মনে নিরাপত্তা বোধ কাজ করছে না। এটা বাস্তবতা।

সাধারণ মানুষ, চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থী তরুণদের মধ্যে এ ধরনের অনাস্থার জায়গা আসার আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা মনে করছেন গোয়েন্দা, পুলিশ ও প্রশাসনের চোখের সামনে সন্ত্রাসীরা যেভাবে একের পর এক ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে, তাতে তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ শূন্যের কোঠায়। পরিস্থিতি বোঝার জন্য বিশেষ কাজ ছাড়া পরিবারের সদস্যরা বাসা থেকে বের না হওয়া অথবা বাসায় থাকাকালীন দারোয়ানদের বাড়তি সতর্ক হতে বলে নিজেদের মতো করে সতর্ক থাকতে চেষ্টা করছেন। নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা উঠলেও জনমনে প্রশ্ন, বাসাতেও তারা নিজেদের নিরাপদ ভাববেন কীভাবে?

একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের কিন্তু তার চেয়েও বড় দায়িত্ব জনমনে নিরাপত্তা বোধ তৈরি করা। সরকার পুলিশের ফোর্সদের দিয়ে সব জায়গায় নিরাপদ করার চেষ্টা করছেন, একইসঙ্গে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটলেও যখন বিচারের মুখোমুখি করতে পারছেন না তখনই জনমনে যে শঙ্কা দানা বাঁধবে সেটাই নিরাপত্তাবোধহীনতা। এখানে একবার ঢুকলে বের হয়ে আসার রাস্তা সহজ না। তখন মানুষ গুজবে কান দেয় বেশি। তখন মানুষ নিজের মতো করে একা একা বাঁচতে গিয়ে আরও বিপদে পড়ে।

কদিন আগে কথা হয় মেসবাহুর রহমান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। আগে কাজ শেষ করে রাত ৯টার দিকে মতিঝিলের অফিস ত্যাগ করলেও গত দুইদিন তিনি আগে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের অফিস থেকেই বলে দেওয়া হয়েছে, যদি সম্ভব হয় কলিগরা যেন একা চলাফেরা না করেন।  

সোমবার ও মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বিপনী বিতানগুলোতে সন্ধ্যার পর দেখা গেছে একেবারেই জনশূন্য। পান্থপথের বসুন্ধরার সামনে আড্ডাবাজদের, সময় কাটাতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ভিড় করা মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কমেছে। মার্কেটের বাইরে থাকা তরুণদেরকে একটু অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের সঙ্গে কথা বলি। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা মার্কেটের ভেতরে সন্ধ্যার পর মাঝে মধ্যে আড্ডা দেই, আজ বাইরেই দাড়িয়ে বন্ধুরা সময় কাটাচ্ছি। পাশের আরেক বন্ধু বললেন, আসলে বাসা থেকে বেশি ভিড় এভয়েড করতে বলেছে। বাবা-মা খুব চিন্তায় থাকে। একটু পরপর খালি ফোন করে জানতে চায় কোথায় আছি, কখন ফিরব?

যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ এর গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রকাশিত এক সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও এগিয়ে বাংলাদেশ।

এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। অথচ সন্ত্রাসীদের চাপাতির আঘাতে আহত আহমেদুর রশীদ টুটুলের স্ত্রী শামীম রুণার স্ত্রী বলছেন, আমি আর দেশে থাকতে চাই না। সপরিবারে বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে সরকারের কাছে আবেদনও জানিয়েছেন তিনি। কেবল রুণা নন, দেশে থাকতে চান না আরও অনেকেই। যারা কিনা জানেন না কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, যারা মনে করেন রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে চায়, কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না।

মানুষের ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ যখন তৈরি হয় তখন সেটা থেকে বের হয়ে আসার যে উপশমগুলো আছে তারমধ্যে একটি হচ্ছে- তার বোধের জায়গাটাতে কাউন্সিলিং। আর সেটা কোনও চিকিৎসার মধ্য দিয়ে হবে না। এটা রাষ্ট্রকে করতে হবে। এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য যে ষড়যন্ত্রকারীরা চিহ্নিত তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

এই নিরাপত্তাহীনতার মনোভাব তৈরি কফিনে শেষ পেরেক মারার পথে আছে, যখন দেশে একের পর এক ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যার ঘটনার পর এবার টার্গেট পুলিশ। এই টার্গেটের কারণ হিসেবে পুলিশের মনোবল ভাঙার প্রচেষ্টা। কেন ভাঙবে মনোবল? এতে দেশকে অস্থিতিশীল হিসেবে প্রমাণ সহজ হবে। সবার আগে দরকার পরিস্থিতিটাকে অস্বীকার না করে স্বীকার করে নেওয়া। আইএস আছে কি নেই সেই তর্কে জড়িয়ে যখন কিনা আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না সেই সুযোগে অনেকগুলো প্রাণ হারিয়ে ফেলতে হয়েছে। ফলে এখন দরকার দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করা, দেশের এই অস্থিতিশীলতায় আসলে কার লাভ আর কার ক্ষতি।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।