দুপুর ০৩:৫৪ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

ঝরা পাতাটুকু || ইমদাদুল হক মিলন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শব্দ পেলাম তিনবার

ঘটনা হল কী, স্টোররুমের ওদিক থেকে মৃদু একটা কাশির শব্দ যেন এলো।
আসলে কি কাশির শব্দ! নাকি মনের ভুল, কানের ভুল! কাশি কিংবা অন্য কোনও শব্দ হওয়ার কথা না। কারণ এই মুহূর্তে ফ্ল্যাটে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনও প্রাণী নেই। ফ্ল্যাটে মানুষ বলতে আমরা দুজন। আমি আর বকুল। বকুল নেই। সে গেছে বাজারে।
তার মানে ভুল শুনেছি।
আমি শুয়ে আছি আমার রুমে। দুপুর শেষ হওয়ার সময়। পৌনে চারটা বাজে। আড়াইটার দিকে বাসায় এসেছি। ছিলাম রাঙামাটিতে। দশদিন কাটিয়ে ফিরেছি। নতুন সিরিয়ালের শুটিং শুরু হয়েছে। রাঙামাটি এবং ঢাকার পটভূমি মিলিয়ে সিরিয়াল। শুরুটা রাঙামাটি থেকে। শুটিং ইউনিট নিয়ে চলে গিয়েছিলাম। দুই শিফটে কাজ করেছি। ভালই এগিয়েছে। বেশ জমজমাট গল্প। আমার অন্য সিরিয়ালগুলোর মতো এটাও পপুলার হবে। ইউনিটের সবাই কাজ করে খুশি। বিশেষ করে আর্টিস্টরা।
আমি সিরিয়ালের ডিরেক্টার কিংবা রাইটার নই। প্রডিউসার। কোম্পানির নাম ‘নির্বাচিতা’। বনানীতে অফিস। তিনজন ডিরেক্টর নিয়মিত কাজ করেন আমার হাউসে। চারজনের রাইটার্স প্যানেল আছে। তাঁরা নিয়মিত সিরিয়াল লিখছেন। ভিডিও এডিটর আছেন চারজন। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত এডিটিংয়ের কাজ করছেন দুজন, চারটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত করছেন দুজন। পিয়ন, টিবয়, এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, প্রডাকশন ম্যানেজার ইত্যাদি মিলিয়ে সতেরোজন কর্মী। প্রতিদিনই কোনও না কোনও সিরিয়ালের শুটিং হচ্ছে, লেখার কাজ চলছে, এডিটিংয়ের কাজ চলছে। আর প্রতিদিনই কোনও না কোনও চ্যানেলে সিরিয়াল আমাদের চলছেই। বছর পনেরো ধরে বিজনেসটা করছি। এই পনেরো বছরে উন্নতিও মন্দ হয়নি। বনানীর মতো জায়গায় সাড়ে তিনহাজার স্কয়ার ফিটের স্পেস কিনে অফিস করেছি। যে দামে কিনেছিলাম, মাত্র কয়েক বছরে তার দাম হয়েছে তিনগুণ। এদিক দিয়েও ভাল একটা বিজনেস হয়ে গেছে।
বিজনেসের ভাগ্য আমার খারাপ না। শুরু করেছিলাম ভিডিও ক্যাসেটের দোকান দিয়ে। সে অনেকদিন আগের কথা। আঠাশ উনত্রিশ বছর হবে। তখন ভিসিআরের যুগ। একটা পুরনো ভিসিআর ছিল দোকানে, আর কিছু ক্যাসেট। যাদের বাড়িতে ভিসিআর আছে তারা তো আর প্রতিদিন নতুন নতুন ক্যাসেট কিনে কুলাতে পারে না। আমার দোকান থেকে ক্যাসেট ভাড়া নিত। এক রাতের ভাড়া বিশ টাকা। পঞ্চাশ একশোটা ভাড়ায় চলে যেত। যাদের বাড়িতে ভিসিআর নেই তারা একরাতের জন্য ভিসিআর ভাড়া নিত, সঙ্গে দুতিনটা ক্যাসেট। রমরমা ব্যবসা।
তখন থাকি গেণ্ডারিয়াতে। বাবা মারা গেছেন। অবস্থা তেমন ভাল না আমাদের। গেণ্ডারিয়াতে পাঁচ কাঠার ওপর একতলা পুরনো জীর্ণ একটা বাড়ি। ওটুকুই সম্পদ। দুইভাই তিনবোন আমরা। বড় দুবোনের পর আমি, তারপর একবোন, সবার ছোট ভাই। বড় দুবোনের অবস্থাপন্ন ঘরে বিয়ে হয়েছে। লেখাপড়া তেমন করেনি বোনরা। বড়পা ফার্স্ট ইয়ার পর্যন্ত পড়েছে, ছোটপা ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিল। তারপরও শিক্ষিত অবস্থাপন্ন পরিবারে তাদের বিয়ে হল একটাই কারণে, আমার বোনরা খুব সুন্দরী।
বাবা চাকরি করতেন ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে। ছোট চাকরি। চাকরি করতেন খুবই মন দিয়ে কিন্তু তাঁর শরীর ঠিক ছিল না। পেটরোগা মানুষ। গ্যাস্ট্রিকে ভুগতেন। একটু ভালমন্দ খেলেই চোঁয়া ঢেকুর উঠতো, পেট ফুলে যেত। রাতে ঘুমাতে পারতেন না। এই করে করে আলসার হয়ে গেল। একরাতে করল হার্টএট্যাক। হাসপাতালে নেওয়ার সময়ই পেলাম না।
আমি তখন জগন্নাথ কলেজে মাত্র ভর্তি হয়েছি। ছোটবোন নিনা পড়ে ক্লাশ নাইনে, দিপু  সেভেনে।
বাবা বেঁচে থাকতেই বাড়ির দুটো রুম ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। সামান্য টাকা পাওয়া যায়। বাবার চাকরির ওখান থেকে কিছু টাকা পাওয়া গিয়েছিল। তাও সামান্যই। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হাজার হবে। বহুদিনের চাকরি, তারপরও বেশি টাকা আমরা পাইনি, কারণ নিজের অসুখ-বিসুখের জন্য প্রায়ই অফিস থেকে লোন নিতেন বাবা। মৃত্যুর সময়ও ভালো রকমের লোন ছিল। ওসব কেটেকুটে আর কত পাওয়া যাবে!
আমাদের সংসার চলতো টেনেটুনে। সামান্য বাড়ি ভাড়া আর বড় দুবোনের সাহায্য। বাবার টাকায় হাতই দেননি মা। ব্যাংকে রেখে দিয়েছিলেন। বিপদ আপনাদের কথা তো বলা যায় না! কখন লাগে!
আজ কেন নিজের জীবনের কথা এভাবে মনে পড়ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। দশদিন একটানা পরিশ্রম করে ফিরলাম। শুটিং জিনিসটা বেশ জটিল, ধৈর্য এবং পরিশ্রমের কাজ। আমি করি না কিছুই। আমার কাজ সঙ্গে থাকা আর যতটা সম্ভব খরচ বাঁচাবার চেষ্টা। তারপরও টায়ার্ড হয়ে যাই।
বিজনেসে নেমেই একটা জিনিস আমি শিখেছিলাম, লাভটা শুরুতেই করে ফেলতে হবে। প্রডাকশন কস্ট যত কমাতে পারব লাভের অংক ততো বাড়বে। এই কারণে চারদিকে তীক্ষ্ন চোখ রাখি আমি। একটা পয়সা যেন অপচয় না হয়, পাঁচটা মিনিট যেন নষ্ট না হয়। এই করেই ক্লান্ত হই। ইভিনিং শিফট শেষ হওয়ার পর মনে হয়, আগামীকালকের মর্নিং শিফট টাইমলি শুরু হবে তো? টেনশনে রাতে ভালো ঘুম হয় না। এজন্য ঢাকার বাইরের শুটিং শেষ করে ঢাকায় ফিরেই এক দুদিন লম্বা ঘুম দেই। আজও সেই আশায়ই শুয়েছি, কিন্তু ঘুম আসছে না। ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ছে!
কোনও কোনও দিন এমন হয়, পিছনে ফেলে আসা জীবনের কথা খুব মনে পড়ে। বয়স চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে শুরু হয় ব্যাপারটা। আমার তো সাতচল্লিশ।
আমার বন্ধু কামালদের বাড়ি গেণ্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডে। আমাদের বাড়ির মতো চিপাগলির ভিতর বাড়ি না, রোডের ওপর। রাস্তার পুবপাশে বাড়ি, পশ্চিম পাশে ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’ নামে বহু বছরের পুরনো একটা পাঠাগার। কামালের বড়ভাই ডাক্তার, মেজোভাই টুকটাক ব্যবসার চেষ্টা করছেন। বিএ পাস করার পর আর পড়াশোনা করেননি। নাম আবু নাসের। হঠাৎ তাঁর মাথায় এলো ভিসিআর, ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা করবেন। গেটের একপাশ খালি পড়ে আছে গ্যারেজ। গাড়ি কেনা হয়নি। গ্যারেজটাকে দোকান বানিয়ে ফেললেন। পুরনো একটা ভিসিআর কিনলেন, শখানেক ক্যাসেট কিনলেন। দোকানের নাম দিলেন ‘নাসের ভিডিও’। মহা উৎসাহে শুরু করলেন। গেণ্ডারিয়া এলাকায় প্রথম ওরকম দোকান। ভালোই চলতে লাগল। প্রায়ই তিনি ক্যাসেট কিনতে স্টেডিয়ামে মার্কেটে চলে যান। কামাল কলেজ শেষ করে ফিরেছে। কামালকে বসিয়ে রেখে গেলেন দোকানে। আমিও গিয়ে কামালের সঙ্গে বসে থাকি। নাসের ভাইয়ের দোকান চালাই।
খুবই সহজ ধরনের ব্যবসা। এই ব্যবসা করতে কিছু লাগে না। মাথা ঘামাবারও দরকার নেই। দোকান খুলে বসে থাকলেই হল। ঝামেলা একটাই, সময় মতো ক্যাসেট ফিরিয়ে আনা, ভিসিআর ভাড়ায় গেলে ফিরিয়ে আনা। কখনও কখনও কারও কারও বাড়িতে গিয়ে তাড়া দিতে হয়। চেনা পরিচিতরা কেউ কেউ বাকি রাখে। সেই পয়সা উঠানোও একটু ঝামেলার।
ব্যবসা করতে গেলে এইটুকু ঝামেলা তো পোহাতেই হবে। নাসের ভাইয়ের হয়ে আমি এবং কামাল এই কাজগুলো করি।
নাসের ভাইয়ের স্বভাব হচ্ছে কোনও কিছুই বেশিদিন ভালো লাগে না তার। এই ব্যবসাও মাস সাত আটেক পর আর ভালো লাগল না। তার এক বন্ধু লোক নিয়ে যাচ্ছে জাপানে। টোকিওতে নিয়ে চাকরি-বাকরি দিয়ে সেটেল করে দেবে। টাকাও বেশি না। ষাট না সত্তর হাজার যেন।
নাসের ভাই জাপানে চলে যাওয়ার মিশনে নামলেন। দোকান বিক্রি করে টাকা যা পাবেন সেই টাকার সঙ্গে বাড়ির টাকা। দোকান বিক্রির জন্য পাগল  হয়ে গেলেন নাসের ভাই। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হাজার হলেই বিক্রি করে দেবেন।
এই দোকান নিয়ে আমার একটা স্বপ্ন শুরু হল। ব্যবসাটা আমি বুঝে গেছি। দোকানটা নিতে পারলে কাজ হয়ে যাবে। আমি নিতে চাইলে নাসের ভাই হয়তো টাকাও কিছু কমিয়ে দেবেন।
মাকে বললাম, বড় দুবোনকে বললাম। সবাই এক বাক্যে না করল। না না, এই বয়সে এসব ভাবা যাবে না। যত কষ্টই হোক, পড়াশোনা করতে হবে। বিকালবেলা একটা দুটো টিউশনি করতে পারলে ভালো। পড়ালেখা শেষ করে চাকরিতে ঢুকবে। সহজ সুন্দর জীবন। আমাদের ফ্যামিলিতে কেউ কখনও ব্যবসা করেনি। ব্যবসা সবার হয় না। তাছাড়া কলেজ করে দোকান আমি চালাবোইবা কীভাবে?
প্ল্যান আমি করেই রেখেছি।
আমাদের ওই নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে বাড়তি একজন মানুষ ছিল। ছোটচাচার ছেলে বাসার। চাচা থাকেন গ্রামে। গরিব গৃহস্থ মানুষ। বাসার তাঁর বড় ছেলে। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াবার পর চাচা আর বাসারকে পড়াতে পারছিলেন না। পড়াশোনায় ভালোও না সে। একবারও সব সাবজেক্টে পাস করতে পারে না। ঢাকায় এসে বাসারকে আমার মায়ের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন চাচা। মা যেন তাঁর মেয়ের জামাইদেরকে বলে বাসারকে কোথাও কাজে লাগিয়ে দেয়।
মা তাঁকে আস্বস্থ করলেন ঠিকই কিন্তু বাসারের ব্যাপারে জামাইদেরকে কিছু বললেন না। বাসার আমাদের বাড়িতেই থাকে। বাজার-ঘাট আর সংসারের টুকটাক কাজ করে। পড়ালেখা করতেই চায় না। তবু মা তাকে একটা নাইট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। দিনেরবেলা বাড়ির কাজ, সন্ধ্যার পর স্কুল। খুবই নিরীহ সৎ টাইপের ছেলে বাসার। প্ল্যান করেছি বাসারকে দিয়ে দোকানটা চালাবো। সকালবেলা, কলেজে যাওয়ার আগে দোকান খুলব। বাসারকে বসিয়ে দেব। কলেজ থেকে ফিরে আমি গিয়ে বসব দোকানে। সন্ধ্যাবেলা বাসার চলে যাবে নাইট স্কুলে।
তারপরও মা বোনরা রাজি হয় না। আমি ঘ্যান ঘ্যান করতেই থাকি, মা বোনরা মানা করতেই থাকে।
ছোট দুলাভাইর কাছে আমার কিছুটা প্রশ্রয় ছিল। গিয়ে ধরলাম তাঁকে। দুলাভাই ব্যবসায়ী মানুষ। ইসলামপুরে বিশাল কাপড়ের ব্যবসা। সব শুনে আমার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, লাভটা তোকে প্রথমেই করতে হবে। দেখ পঁচিশ তিরিশ হাজারে দোকানটা কিনতে পারিস কিনা। টাকা আমি দেব। তোর আইডিয়াটা আমার ভাল লেগেছে।
ত্রিশ হাজারে নাসের ভাইকে রাজি করিয়ে ফেললাম। শুরু হল আমার ব্যবসায়ী জীবন। প্ল্যান মতোই বাসারকে নিয়ে শুরু করলাম। দোকান ভাড়া চারশো টাকা, ইলেকট্রিক বিল এক দেড়শো। খরচ বলতে ওটুকুই। দোকানের নাম বদলে দিলাম। আগে ‘সীমান্ত গ্রন্থাগারে’ মাঝে মাঝে বই পড়তে যেতাম। প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটা বই আছে ওখানে। নামটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। ‘নির্বাচিতা’। দোকানের নাম দিলাম ‘নির্বাচিতা’।
কয়েকদিনের মধ্যেই ভালো জমে গেল দোকান। কিছু টাকা জমে আর নতুন নতুন ক্যাসেট কিনি। একটা পুরনো ভিসিআর তো ছিলই, তিনমাসের মাথায় আরেকটা কিনে ফেললাম। এক দেড়শো ক্যাসেট ছিল দোকানে, বছর ঘুরতে না ঘুরতে সাত আটশো হয়ে গেল। সব খরচ বাদ দিয়ে পাঁচ সাত হাজার টাকা থাকে মাসে। ছোট দুলাভাইর টাকাটা শোধ করে দিলাম। ...
আবার কি একটু শব্দ হল স্টোররুমের দিকে? কাশির শব্দ না, কেমন একটা খসখসে শব্দ। কেউ যেন একটু নড়াচড়া করল। অতিমৃদু, অতি সাবধানী শব্দ যেন। বকুল এখনও ফেরেনি। শব্দ আসবে কোত্থেকে?
আমার মন বা কানের এরকম ভুল হচ্ছে কেন আজ? একা এত বড় ফ্ল্যাটে আছি বলে কি এমন হচ্ছে? তাই বা কেন হবে? একা এই ফ্ল্যাটে বহুদিন বহুরাত আমি কাটিয়েছি। কোনওদিন তো এমন হয়নি! আজ কি স্মৃতির ভেতর ডুবে গেছি বলে এমন হচ্ছে? ফেলে আসা জীবনের ভেতর ডুবে গেছি বলে এমন হচ্ছে?
শব্দের কথা ভুলে আবার ডুব দিই স্মৃতির অতলে।
জগন্নাথ কলেজে বাংলা সাহিত্যে এমএ পড়তে পড়তে আমি মোটামুটি ভালো ব্যবসায়ী। নিনার বিয়ে হয়ে গেছে। সে চলে গেছে আমেরিকায়। দিপু ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এপলাই করল। ওরও হয়ে গেল।
আমি ততোদিনে আর একটা ব্যবসা খুলে বসেছি। বিয়ে বাড়িতে ভিডিও করার চল শুরু হয়েছে। দুটো ভিডিও ক্যামেরা কিনে ফেললাম। কনট্র্যাক্টে নিলাম দুজন ক্যামেরাম্যান। পুরানা পল্টনে দুরুমের একটা অফিস নিয়েছি। বিয়ের ক্যাসেট এডিট করার জন্য এডিটিং প্যানেল বসিয়েছি। বাসার তখনও আমার সঙ্গে। এসএসসি পাস সে করতে পারেনি, তবে আমার ব্যবসাটা পুরোপুরি সামলাতে পারছে। এই ব্যবসায়ও ভালোই করলাম। টাকা পয়সা ভালো জমছে। সংসারের চেহারা ঘুরে গেছে। মগবাজারে সুন্দর একটা ফ্ল্যাটে এসে উঠেছি। আমার সঙ্গে শুধু মা। গেণ্ডারিয়ার বাড়িটা ওভাবেই আছে। আগে দুটো রুম ভাড়া দেওয়া ছিল, এখন পুরো বাড়ি।
মা তখস শয্যাশায়ী। নানান রোগে কাবু। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে আমার। মা তো তাগিদ দিচ্ছেনই, বোনরাও দিচ্ছে সমানে। বিয়ে কর, বিয়ে কর।
বিয়ের কথা আমিও ভাবছি। মোটামুটি গোছানো হয়েছে জীবন। এখন বিয়ে করা যায়। বোন আর বোন জামাইরা ভেবেছিল আমার পছন্দের কেউ আছে। ওই নিয়ে একদিন কথাও বলল। মা’র কানে গেল। মা বললেন, পছন্দ থাকলে মেয়ের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা কর।
আমার কাউকে পছন্দ ছিল না। আসলে কারও দিকে তাকাবার সময়ও আমার ছিল না। আমি ছিলাম ব্যবসা নিয়ে, লেখাপড়া নিয়ে।
বোন দুলাভাইরা মেয়ে দেখা শুরু করল। তিন চারজন দেখার পর পছন্দ হল লিলিকে। ভালো পরিবার। দুভাইয়ের এক বোন। ভাইরা থাকে টরেন্টোতে। লিলি সবার ছোট। ছাত্রী তেমন ভাল না। পাস কোর্সে বিএ পাস করেছে। এখন বিয়ের জন্য অপেক্ষা। মা বাবারও তাড়া আছে। কারণ লিলির ভাইয়ারা মা বাবার জন্য এপলাই করেছেন। তাঁরা ইমিগ্রান্ট হয়ে কানাডায় চলে যাবেন। তাঁরা গিয়ে লিলির জন্য এপলাই করলে লিলিও বছর কয়েক পর চলে যেতে পারবে। লিলির স্বামী হিসেবে আমার জন্যও কানাডার মতো দেশের দরজা খুলে যাবে।
বিদেশের ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহ নেই। আমি আমার দেশেই ভালো আছি। তবে লিলিকে আমার পছন্দ হল। শ্যামল বরণ মিষ্টি চেহারার মেয়ে, সুন্দর ফিগার, ব্যক্তিত্বময়ী।
আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর লিলির প্রধান সমস্যা চোখে পড়ল, সে একদমই হাসে না। অলওয়েজ গম্ভীর। সব কথায় আদেশের সুর আর খুবই সন্দেহপ্রবণ। তবে কথা বলে সুন্দর করে। উচ্চারণ সুন্দর। লিলির যে জিনিসটা আমার সবচাইতে ভালো লাগে তা হল শাড়ি পরার ভঙ্গি। খুবই সুন্দর করে শাড়িটা সে পরে। হালকা রংয়ের শাড়ি বেশি পছন্দ। তাকে মানায়ও খুব।
লিলির সঙ্গে জীবনটা ভালোই শুরু হয়েছিল। ততোদিনে আরেকটা ব্যবসার দিকে আমি যাচ্ছি। তেমন নতুন কিছু না, একই ব্যবসার অন্য আরেকটা দিক। টিভি চ্যানেলের জন্য নাটক টেলিফিল্ম সিরিয়াল এসব তৈরির কাজ। উত্তরায় একটা তিনতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে শুটিং হাউস করলাম। এই বাড়িতে আমার প্রডাকশনের কাজ তো হবেই, যেদিন আমাদের শুটিং থাকবে না সেদিন অন্য প্রডাকশনকে ভাড়া দেব। এক শিফটের ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। শুটিং হাউসের মাসিক ভাড়া আশি হাজার। গ্যাস ইলেকট্রিক আর তিনজন কেয়ারটেকারের বেতন ইত্যাদি মিলিয়ে একলাখ পনেরো বিশ হাজার টাকা মাসে খরচ। বাড়ির তিনমাসের এডভান্স, ফার্নিচার পর্দা ইত্যাদি মিলিয়ে লাখ দশেক টাকা ইনভেস্ট। মাসে বিশ পঁচিশ দিন কাজ হলে দুআড়াই লাখ টাকা আসবে। খরচা বাদ দিয়ে ভালো টাকাই থাকবে। তার ওপর নিজস্ব শুটিং হাউস, আমার নিজের প্রডাকশনের কাজ চলবে স্মুথলি।
মা বললেন, বউর ভাগ্যে আরও উন্নতি হবে তোর। বলার পর বেশিদিন বাঁচলেন না। সাতমাস পর মারা গেলেন। সংসারে আমি আর লিলি।
শয্যাশায়ী মায়ের দেশাশোনা করত বকুল। রাজবাড়ির বিনোদপুর গ্রাম থেকে আসা স্বামী পরিত্যাক্তা মহিলা। স্বামী তাকে ত্যাগ করেছিল বন্ধ্যা বলে। তখন তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। স্বাস্থ্যবতী, কর্মঠ মহিলা। ভালো রান্না করে। শরীরে আলস্য বলে কিছু নেই। একা আমাদের সংসার সামলায়। একটি অসাধারণ গুণ হল, মুখে টু’শব্দটি নেই। ওদিকে লিলি তাদের বাড়ি থেকে একটা কাজের মেয়ে নিয়ে এসেছে। নাম জুলেখা। খুবই পাকনা টাইপের মেয়ে। বারো তেরো বছর বয়স, কথা শুনলে মনে হয় আমাদের চেয়েও বড়। দুনিয়ার সব জানে। আমাকে ডাকতো দুলাভাই। একদিন বলল, বাচ্চা নেন না ক্যান দুলাভাই? বিয়ার পর এতদিন কেউ দেরি করে? শুনে আমি হতভম্ব।
কিছুদিন পর লিলি কনসিপ করল।
বিয়ের কিছুদিন পরই লিলির মাথায় ঢুকেছিল, নাটক সিনেমার লোকরা ভালো হয় না। প্রডিউসার ডিরেক্টর রাইটারদের সঙ্গে উঠতি নায়িকাদের নানা প্রকারের লটর-পটর থাকে। অমুক অভিনেতার সঙ্গে তমুক অভিনেত্রীর, অমুক প্রডিউসারের কেপট হয়ে আছে তমুক নায়িকা ইত্যাদি।
আমাদের কাজের জগৎ নিয়ে এ এক প্রচলিত ধারণা। ধারণাটা যে মিথ্যা বা অযৌক্তিক তাও না। হ্যাঁ আছে, অভিনেতা অভিনেত্রীদের মধ্যে নানা প্রকারের সম্পর্ক আছে। প্রডিউসার ডিরেক্টররাও কম যান না। তাঁদেরও আছে। আউটডোর শুটিংয়ে গিয়ে অমুকে চলে যাচ্ছেন তমুকের রুমে। যার সঙ্গে যার ভাব সে তার প্রডাকশনে অবিরাম চান্স পাচ্ছে। কোনও কোনও স্ক্রিপ্ট রাইটারের ক্ষেত্রেও ঘটছে এসব। অভিনেত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাকে মাথায় রেখেই ক্যারেক্টার তৈরি করছেন। সবই ঠিক আছে। এই জগতের এও এক ধারা। ওপেন সিক্রেট। কিন্তু এর বাইরেও তো কেউ কেউ আছেন। যেমন আমি। আমি ওসবের মধ্যে নেই। আমার একমাত্র নেশা বিজনেস, টাকা কামানো। ঘরে সুন্দরী স্ত্রী আছে, তাকে নিয়েই আমি খুশি। স্ত্রী আসার আগে চোখের সামনে দেখেছি অনেক। অভিজ্ঞতাও কম না। অভিনয়ে আসা অনেক নতুন মেয়ে নানারকম কায়দায় ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছে। আমি গা বাঁচিয়ে চলেছি। এই অর্থে আমাকে যদি কেউ সাধুপুরুষ বলে, আমি মেনে নেব। সত্যি আমি সাধুপুরুষ। হাঁস স্বভাবের। পানিতে থেকেও গায়ে পানি লাগতে দেইনি।
তবে থাকে না, কোনও কোনও অভিনেত্রীর প্রতি একটু বেশি নজর বা তার অভিনয় বেশি পছন্দের, এমন একজন আমার ছিল। তার নাম জয়ী। আমার নাটক দিয়েই অভিনয় জগতে আসা মেয়েটির। দেখতে যেমন সুন্দর, অভিনয়ও তেমন। জয়ীর ভক্ত হয়ে উঠলাম আমি। একের পর এক কাজ দিতে লাগলাম। প্রডাকশনের সবাই আমাকে জানে। এই নিয়ে তাদের কারও কোনও মাথা ব্যথা নেই। কোনও স্ক্যান্ডালও কোথাও ছড়ালো না, কিন্তু লিলির মনে ঢুকল সন্দেহ। কেন জয়ী আমার বেশির ভাগ প্রডাকশনের নায়িকা? নিশ্চয় ডাল মে কুচ কালা হায়।
জয়ীকে নিয়ে টুকটাক কথা বলে লিলি। তাকে এত কাজ দিচ্ছি কেন? অন্য অনেক নায়িকা আছে, প্রমিজিং অনেক অ্যাকট্রেস আছে তাদেরকে কেন নিচ্ছি না ইত্যাদি।
শুরু হয়েছিল ছোট ভাবে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা বড় হতে লাগল। কথা কাটাকাটি মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাটি শুরু হয়ে গেল। জয়ীর সঙ্গে আমার যে একটা অনৈতিক সম্পর্ক আছে, এতে তার কোনও সন্দেহ নেই। হাতেনাতে আমাকে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগল সে। উঁচু পেট নিয়ে আমার অফিসে যাতায়াত শুরু করল। সঙ্গে জুলেখা। শুটিং থাকলে শুটিং হাউসে গিয়ে বসে থাকে। সঙ্গে জুলেখা। আউটডোর শুটিংয়ে যাওয়া আমার নিষিদ্ধ হল।
প্রডাকশনের লোকজন প্রথম প্রথম অবাক হয়েছিল। পরে গোপনে হাসাহাসি শুরু করল। দুএকটি পত্রিকার বিনোদনপাতায় এই নিয়ে মুখরোচক সংবাদ ছাপা হল। জয়ী বেচারি লজ্জা পেয়ে আমার হাউসের কাজ ছেড়ে দিতে চাইল। আমার মধ্যে তখন ভালো রকমের একটা ক্রোধ জন্মেছে। যেখানে আমার কোনও অন্যায় নেই, শুধুমাত্র স্ত্রীর সন্দেহের কারণে প্রমিজিং একজন নায়িকাকে কাজ দেব না, তা হতে পারে না। লিলি লিলির মতো চলুক। আমি তাকে ইগনোর করব।
সেভাবেই চলছি। আমার মেয়ে জন্মালো। অংশি। লিলি আমার ওইটুকু মেয়ে নিয়ে অফিসে চলে আসে, শুটিং হাউসে চলে যায়। আমার ফোন এলে সন্দেহের চোখে তাকায়। কোনও কোনও সময় মোবাইল কেড়ে নিয়ে কথা শোনে। নারীকণ্ঠ পেলে আর রক্ষা নেই। তুলকালাম হয়ে যায়। দিন যত যায় লিলি ততো ক্রেজি হয়। তার আচরণে বকুল তো অবাকই, জুলেখা পর্যন্ত বিরক্ত। একী কাণ্ড শুরু করেছে লিলি? মা বাবা চলে গেছেন কানাডায়। তাঁদের ফোন করে যত রকম খারাপ কথা আমাকে নিয়ে বলা যায়, বলে। চরিত্রহীন, লোচ্চা বদমাস যা যা বলা সম্ভব, বলে। কান্নাকাটি করে। আমার শান্তির জীবনে নেমে আসে চূড়ান্ত অশান্তি। কাজে মন বসে না। হিসাব কিতাবে গড়মিল হয়, তাকিয়েও দেখি না।
এই অশান্তির জীবনে একমাত্র শান্তি আমার মেয়ে, অংশি। মেয়ের মুখের দিকে তাকালে আমি সব ভুলে যাই। মেয়েকে বুকে নিলে বুক জুড়িয়ে যায়। এমন অনেকদিন বা রাত গেছে, লিলির মুখে গালাগালের তুবড়ি ছুটেছে, পারলে আমাকে মারে, এই অবস্থায় নিজের ক্রোধ সামলাতে আমি বুকে জড়িয়েছি আমার অংশিকে। তারপর দেখি লিলির গালাগাল, চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই আমার কানে আসে না। কিছুই আমার গায়ে লাগে না। ...
আরে, পরিষ্কার কাশির শব্দ পেলাম! হ্যাঁ, স্টোররুম থেকে এল। না না এবার আর ভুল শুনিনি। স্পষ্ট শুনেছি। কেউ কাশি দিয়েছে।
কিন্তু কে কাশি দেবে? বকুল তো এখনও ফেরেনি! আমি এবার আউটডোরে যাওয়ার আগে বকুল বলেছিল সে তাদের বাড়িতে যাবে। বাড়ি মানে বাবার বাড়ি। সেখানে তার দুভাই আছে। ভাইদের ছেলেমেয়ে, নাতি নাতনীরা আছে। অনেকদিন যাওয়া হয় না। আমি যেহেতু আউটডোরে থাকবো এই ফাঁকে বকুল কয়েকদিন বাড়িতে থেকে আসবে। আমি যেদিন আসবো তার আগের দিন চলে আসবে।
সেভাবেই এসেছে বকুল।
আজ দুপুরে ফিরে বকুলকে আমি বাজারে পাঠিয়েছি। ফ্রিজে তেমন কিছু নেই। বাজারে যাওয়ার আগে বকুলকে একটু চিন্তিত, একটু অন্যমনস্ক দেখলাম। কিছু যেন বলতে চাইল আমাকে। বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি, টায়ার্ডও লাগছিল খুব। বকুলকে বাজারে পাঠিয়েই শুয়ে পড়েছি। তার দিকে আর মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
কিন্তু কাশলো কে?
না, এবার আর না দেখে উপায় নেই।


কিশোরীর নাম কাজল

স্টোররুম কিচেনের পাশে। মোটামুটি ভালো সাইজেরই রুম। রাখার মতো তেমন কিছু নেই দেখে বকুল থাকে রুমটায়। এদিকে একটা বাথরুমও আছে। খাট চৌকি কিচ্ছু নেই। বকুল মেঝেতে বিছানা করে শোয়। বহুদিন আগেই খাট কিনে দিতে চেয়েছি। সে রাজি হয়নি। তার নাকি মেঝেতে শুতেই ভালো লাগে। সারাজীবনের অভ্যাস।
রুমের দরজা বন্ধ। ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলেই থতমত খেয়ে গেলাম। বকুলের বিছানায় কাঁথা গায়ে দিয়ে একটা মেয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে। বিছানার পাশে পানির বোতল, একটা প্লেটে দুটুকরো পাউরুটি আর একটুখানি চিনি। দরজা খুলতে দেখে সে চোখ তুলে তাকাল। তারপর ভয়ার্ত ভঙ্গিতে উঠে বসল। ডাগর চোখ দুটো লালচে হয়ে আছে, মাথার চুল এলোমেলো, মুমূর্ষু চেহারা। শ্যামলা রংয়ের মিষ্টি মুখ মেয়েটির। চৌদ্দ পনেরো বছর বয়স হবে। রোগা পাতলা গড়ন।
তুমি কে?
মেয়ে কথা বলল না। কাশির দমক এলো। মলিন ওড়না মুখে চেপে কাশি আটকাবার চেষ্টা করল।
কথা বলছো না কেন? কে তুমি?
মেয়ে প্রাণপণ চেষ্টায় কাশি আটকাতে চাইছে। পারছে না। কাশির দমকে দিশেহারা। আমি গেছি বিরক্ত হয়ে। কে এই মেয়ে? নিশ্চয় বকুলের সঙ্গে এসেছে। কিন্তু আমাকে না বলে, আমার পারমিশন না নিয়ে মেয়েটিকে আমার ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে কেন সে? হয়তো বকুলের আত্মীয়। অসুস্থ দেখে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছে। তাহোক, আমার পারমিশন নেবে না? আমাকে জানাবে না? বকুলের মোবাইল আছে। মোবাইলে আমাকে জানালেই পারতো?
এসময় বকুল এসে ঢুকল। দুহাতে তিন চারটা শপিংব্যাগ। আমাকে স্টোররুমের দরজায় দেখে যা বোঝার বুঝে গেছে। একবার আমার দিকে তাকিয়ে শপিংব্যাগগুলো কিচেনের ফ্লোরে নামিয়ে রাখল।
বকুলকে আমি ডাকি বুয়া। গম্ভীর গলায় ডাকলাম, বুয়া।
জি।
ঘটনা বলো আমাকে। মেয়েটা কে? আমাকে না বলে তুমি তাকে ফ্ল্যাটে এনে ঢুকিয়েছো কেন?
রুমে যান। আইসা বলতেছি।
না এখানেই বলো।
মেয়েটি তখন প্রচণ্ড কাঁশছে। বকুল গিয়ে তাকে ধরল। পানির বোতল তুলে বলল, পানি খা মা, পানি খা। ভয় পাইছ না। আমি আছি। সাহেব তোরে কিছু বলবো না।
মেয়েটি এক ঢোক পানি খেয়ে কাতর চোখে আমার দিকে তাকাল।
বকুল তার কপালে গালে হাত দিয়ে দেখল। জ্বর পুড়াপুড়ি কমে নাই। এখনও জ্বর আছে। তয় কইম্মা যাইবো। তুই ভয় পাইছ না। শো, শুইয়া পড়।
খুবই বিরক্ত হয়ে ডাইনিংস্পেসের দিকে এলাম। রাগ বিরক্তির সময় আমার পায়চারি করার স্বভাব। পায়চারি করতে লাগলাম। খানিকপর বকুল এসে অপরাধীর ভঙ্গিতে দাঁড়াল।
বলো, ঘটনা কী? মেয়েটা কে?
বকুল মাথা নিচু করে বলল, আমার আপন কেউ না। আমগো বিনোদপুরের মাইয়া। নাম কাজল।
তোমার আপন কেউ না তো তাকে এখানে নিয়ে এসেছ কেন?
আমি ইচ্ছা কইরা আনি নাই সাহেব। ঘটনা হইল, কাজল অনাথ এতিম। জন্মের আগেই বাপ মরছে। মা মরল কাজলের সাত বচ্ছর বয়সে। কাজলরে লইয়া ওর মায় থাকতো সিরাজ মাস্টারের বাড়িতে। মাস্টার ওরে ইশকুলে পড়াইতো। মাস্টার মারা গেছে নয় দশ মাস আগে। তারপর মাস্টারের ছেলে মেয়েরা কাজলরে আর রাখতে চায় না। উঠতি বয়সি মাইয়া, গ্রামের শয়তান পোলাপান লাগছে পিছনে। কাজল আর ইশকুলেও যাইতে পারে না। বাড়ির বাইরে যাইতে পারে না। সুযোগ পাইলে গুণ্ডা বদমাইশরা কাজলরে তুইলা লইয়া যাইবো...
গ্রামে লোকজন নেই? তারা এসব দেখে না? তুমি কেন এর মধ্যে গিয়ে  জড়িয়েছো? আমার ফ্ল্যাটে এনে তুললে, আমাকে জানাবে না?
আগে আমার কথা শোনেন। বললাম তো আমি ইচ্ছা কইরা আনি নাই। গ্রামের লোকজন কেউ কাজলের পক্ষে নাই। গুণ্ডাগুলি মাতবর সরদারগো পোলাপান। তাগো বিরুদ্ধে কথা বলবার সাহস নাই কেউর। সিরাজ মাস্টারের ছেলেরা ভয় পাইয়া কাজলরে বাড়ি থিকা বাইর কইরা দিছে। কাজল আইসা আশ্রয় নিছে আমগো বাড়িতে। আমার ভাইরাও ওরে লইয়া ভয় পাইছে। তারাও আশ্রয় দিতে চায় না। কাজল খুব ভালো মাইয়া। বদচরিত্রের হইলে গুণ্ডাগুলির লগে খাতির দিয়া ভালোই থাকতে পারতো। তেমুন মাইয়া না কাজল। আমি বাড়িত যাওয়ার পর আমারে ধইরা কান্নাকাটি করলো। খালা, আমারে তোমার লগে লইয়া যাও। কোনও বাড়িতে কামে লাগাইয়া দেও। তাও নিজের ইজ্জত লইয়া বাঁচি আমি। গ্রামে থাকলে ওরা সবাই মিলা আমারে ছিঁড়া খাইবো।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, আর সঙ্গে সঙ্গে তুমি তাকে নিয়ে এলে? তুমি আমার সঙ্গে আছো বহুবছর। জানো না এইসব উটকো ঝামেলা আমি পছন্দ করি না। আমার বাড়ির বুয়া হয়ে তুমি কাজের মেয়ে এনে অন্যবাড়িতে দেবে, ক’দিন পর সেই মেয়ে বাড়ির ড্রাইভার দারোয়ানের সঙ্গে লটর-পটর শুরু করবে, দুর্নামটা হবে কার?
বকুল কাতর গলায় বলল, সাহেব আমি আবারও বলতাছি, কাজলরে আমি আনি নাই।
তাহলে কি সে হাওয়ায় ভেসে এল?
ঘটনা আগে শোনেন।
শোনার কিছু নেই। আমি তোমার ওপর খুবই বিরক্ত হয়েছি। এই মেয়েকে এখনই আমার ফ্ল্যাট থেকে বিদায় করো।
বকুল গম্ভীর গলায় বলল, আমার কথা আপনের শুনতে হইব।
বকুলের এরকম স্বর আমি কখনও শুনিনি। একটু থতমত খেলাম। মুখে কথা জুটল না।
বকুল বলল, আমি নানা রকমভাবে কাজলরে বুঝাইছি, আমি তোরে নিতে পারুম না। কাজল কান্নাকাটি করছে। আমি ওরে বললাম, তয় ঢাকায় গিয়া আমার সাহেবরে বইলা দেখি তোর কোনও ব্যবস্থা করতে পারি কিনা। কাজল কান্দে আর কয়, কিন্তু আমি থাকুম কই? কেউ তো আমারে আশ্রয় দিব না। আমি আমার দুই ভাইরে বললাম, তোমরা কাজলরে রাখো। তারা রাজি হইল না। মাইয়াটার জন্য আমার খুব মায়া লাগছে। কিন্তু করার নাই কিছু। বাসে চড়ছি, দেখি ওড়না দিয়া মুখ ঢাইকা কাজল বইসা রইছে। ঢাকায় আইসা নিজেরে বাচাইবো। কার কাছে যাইবো, কে ওরে আশ্রয় দিব, কোন বাড়িতে কাম লইব কিছুই জানে না। বাসে চইড়া বসছে। শরিল পুইড়া যাইতাছে জ্বরে। নিজেরে কেমনে বাঁচাইবো ওই  চিন্তায় দিশাহারা। জ্বর আইসা পড়ছে।
আমার মন ততোক্ষণে একটু নরম হয়েছে। কথা না বলে পায়চারি করছি।
বকুল বলল, আমিও তো মানুষ সাহেব। আমারও তো দয়ামায়া আছে। এত কিছুর পর মাইয়াটারে আমি রাস্তায় ফালাইয়া আসতে পারি নাই। আপনে রাগ করবেন জাইনাও লগে লইয়া আইছি। বাজারে যাওয়ার আগে আপনেরে বলতে চাইছি, বলতে পারি নাই। তয় জ্বর ভালো হইলে ওরে আমি বিদায় কইরা দিমু। আপনের কোনও ঝামেলা হইব না।
স্টোররুম থেকে কাজলের কাশির শব্দ আসছে। বকুল ধীর পায়ে হেঁটে সেদিকে চলে গেল।  


মায়াবতী বকুল

কাজলের কপালে হাত দিয়ে বকুল বলল, এখন কেমন লাগতেছে, মা?
বুক পর্যন্ত কাঁথায় ঢেকে রেখেছে কাজল। চোখ বন্ধ। বকুলের স্পর্শে চোখ মেলে তাকাল। কাঁথা সরিয়ে উঠে বসল। বিছানার পাশে রাখা ওড়না নিয়ে গোছগাছ করতে যাবে, কাশি উঠল। খুক খুক করে কাশতে লাগল।
বকুল তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, এখন জ্বর নাই। তয় কাশিটাই কমতাছে না। এই পর্যন্ত তিনবার অষুধ দিছি। জ্বর কাশি দুইটাই কমার কথা। পাউরুটি তো খাইলি না, এখন এই যে নরম ভাত আনছি। মুরগির ঝোল দিয়া খা। তারপর অষুধ খা। দেখবি বিয়ানবেলা জ্বর কাশি কোনওটাই নাই।
কাজল খবরের ট্রের দিকে তাকাল। একটা প্লেটে ভাত, দু’টুকরো মুরগির মাংস আর ঝোল ঢেলে নিয়ে এসেছে বকুল। একটু লবণ আছে পাশে, এক টুকরো লেবু আছে। পানির বোতল তো বিছানার পাশে কাল বিকেল থেকেই আছে।
বকুল বলল, হাত দিয়া খাইতে পারবি, না আমি খাওয়াইয়া দিমু?
কাজলের চোখের লালচে ভাব কমেছে। ডাগর মায়াবী চোখ দুটো এখন ছলছল করছে। সেই চোখে বকুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথা বলল না।
বকুল বলল, চাইয়া রইলি ক্যান? ক কী করবি?
বকুলের কথার ধার দিয়েও গেল না কাজল। ধীর শান্ত গলায় বলল, সাহেব তোমার লগে অনেক রাগারাগি করছে, না খালা?
বকুল একটু থতমত খেল। না তেমুন রাগারাগি করে নাই। তয় তার ব্যবহারে আমি অবাক হইছি।
ক্যান?
সে এই পদের মানুষ না। তারে না বইলা কিছু করলে বিরক্ত হয়, কিন্তু খারাপ ব্যবহার করে না। ভুলটা আমারই হইছে। আমি তারে মোবাইলে তোর কথা জানাইয়া দিলেই পারতাম। বাজারে যাওয়ার আগে বইলা দিলেও পারতাম।
দোষ তোমার না খালা, আমার। আমার কপালের। কপালের দোষেই আমার এই দশা। আমার কোনও কিছুই ঠিকমতন হয় না।
একটু উদাস হল কাজল। বিষণ্ন মুখ আরেকটু যেন বিষণ্ন হল। বাপ কারে কয়, জন্মাইয়া দেখি নাই। বাপের আদর কেমন, বুঝি নাই। মা সারাটা জীবন ঝিয়ের কাজ করল মাস্টার সাবের বাড়িতে। সারাদিন কাজ কইরা রাত্রে আমারে বুকে জড়াইয়া ঘুমাইতো। আমারে লইয়া কত স্বপ্ন আছিল মা’র। মাস্টার সাবে আমারে লেখাপড়া শিখাইতাছে, আইএ বিএ পাস কইরা আমি মাস্টার সাবের মতন মাস্টার হমু। জীবন বদলাইয়া যাইবো আমার। আমিও এই স্বপ্ন দেখতাম। মন দিয়া লেখাপড়া করতাম। এই অবস্থায় মা’র লগে ঘুমাইয়া রইছি, বিয়ানবেলা মায় আর উঠল না। ঘুমের ভিতর মইরা গেছে। এমুন মরণও মানুষের হয়? তখন আমার অবস্থাটা কী হইতে পারে, কও? দুনিয়াতে কেউ নাই। মা বাবা ভাইবোন, কেউ না। এমন কি কোনও আত্মীয় স্বজন। মা’র মুখে শুনছি, আমরা পদ্মাচরের মানুষ। নদীতে সেই চর ডুইবা গেছে। চরের মানুষ যে যেদিকে পারে চইলা গেছে। আমার মা বাপ নদীর এইপারে চইলা আসলো। সিরাজ মাস্টারের বাড়িতে আশ্রয় নিল। বাবায় কাম করে মাস্টার সাবের ক্ষেতখোলায়, মায় হইল বাড়ির ঝি। জন্মের আগে গেল বাপ, জন্মের সাত বচ্ছর পর মায়! আমার মতন মানুষ কি দুনিয়াতে আর কেউ আছে, যার কোনওখানে কেউ নাই? মাস্টার সাবে বাইচা থাকতে ভালোই আছিলাম আমি। ক্লাস এইটে উঠছি। মাস্টার সাবে আমারে পড়াইতেন। আদরও করতেন। তারও স্বপ্ন আছিল কোনও রকমে যদি ম্যাট্রিক পাসটা আমারে করাইয়া রাইখা যাইতে পারেন, তয় আমার একটা গতি হইব। বিয়াশাদিও হইয়া যাইতে পারে। আর নাইলে প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি পামু, বাড়ি বাড়ি গিয়া গ্রামের ছোট ছোট পোলাপানরে পড়াইয়াও কিছু টাকা পামু। নিজে খাইয়া পইরা বাঁচতে পারুম।
কাজল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কপালের দোষ, সেইটাও হইল না। মাস্টার সাবেও মইরা গেলেন। তার ছেলেমেয়েরা খারাপ না, ভালোই। মাস্টার সাবের বউরে আমি ডাকতাম আম্মা। সেই মানুষটা বাঁইচা থাকলেও এই দশা আমার হইত না। আমারে তিনায় নিজের মাইয়াগো মতন আগলাইয়া রাখতেন। তিনায় মরলেন মাস্টার সাবের দুই বচ্ছর আগে। ছেলেরা বিয়াশাদি করছে, বউরা আসছে বাড়িতে, আবিয়াত মাইয়া আছে একটা, অবস্থা তেমন ভালোও না তাগো, এই অবস্থায় আমারে তারা রাখবো কেন? তাও রাখতো যদি মাতবর সরদারগো পোলাপান আমার পিছনে না লাগতো।
একটানা কথা বলে একটু যেন ক্লান্ত হয়েছে কাজল। দুতিনবার কাশলো, হাঁপাতে লাগল। বোতলে মুখ লাগিয়ে এক ঢোক পানি খেল।
বকুল বলল, ভাত খা। খাইয়া অষুদ খা। তারবাদে শুনুমনে তোর কথা।
আর কী কথা আমার? সব তো বললামই।
না, একটা ঘটনা আমি পুরাপুরি জানি না। কোন পোলাটা লাগছে তোর পিছনে?
হামেদ সরদারের পোলা লালু। ওর লগে আছে সাত্তার মেম্বারের পোলা বজলু, লতিফ মাতবরের পোলা মন্টু। খুব বদপোলা ওরা। গ্রামের দুই তিনটা মাইয়ার সর্বনাশ করছে। মাইয়াগুলিরে জোরজার কইরা কাজ হাসিল করছে। মোবাইলে ভিডিও করছে। মাইয়াগুলি মুখ খুলতে পারে না ভয়ে। ওরা ডাকলেই যাইতে হয়। আমারে পাইলেও একই কাজ করবো। দেশ গ্রামের সবাই ওগো ভয় পায়। ওগো ভয়ে কেউ মুখ খুলবো না। কেউ আমার পাশে দাঁড়াইবো না। থানায় জানাইলেও কাম হইব না। ওগো টাকা আছে। টাকা দিয়া সব সামলাইবো।
চোখে পানি এল কাজলের। গাল বেয়ে নামলো কান্না। কাঁদতে কাঁদতে বলল, যে সব মাইয়ার বাপ ভাই আছে তারাই কেউরে রক্ষা করতে পারে না ওগো হাত থিকা, আর আমি তো অসহায় একজন। কেউ নাই আমার। আমারে কে বাঁচাইবো? গোপনে ভয় দেখাইয়া গেছে মাস্টার সাবের দুই পোলায়। আমারে যেন বাড়িতে আশ্রয় না দেয়...
কাজল হু হু করে কাঁদতে লাগল। এই বাড়ি ওই বাড়ি কত বাড়িতে গেছি, কেউ আমারে আশ্রয় দেয় না। তোমগো বাড়িতে গেছি, তুমি না থাকলে তোমার ভাইরাও আমারে আশ্রয় দিত না। আমি  রাস্তায় বাইর হইতে পারি না, স্কুলে যাইতে পারি না, এইটা মানুষের জীবন? কও, তুমি কও খালা?
বকুল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে কাজলের দিকে।
কাজল বলল, একবার মনে হইছে, রাজি হইয়া যাই ওগো কথায়। ওরা যা চায় সেইটাই করি। তাইলে কোনও অসুবিধা হইব না। ভালোই থাকতে পারুম গ্রামে। তারপর মনে হইল, ওইটা তো কোনও মানুষের জীবন না। মাস্টার সাবে আমারে শিখাইছিলেন, মানুষের বাঁইচা থাকতে হয় মানুষ হিসাবে। যদি বাচি মানুষ হিসাবে বাচুম, নাইলে মইরা যামু। তয় বাঁচার চেষ্টাটাও আমি করুম। এইজন্য বাসে চড়ছিলাম। তোমার লগে ঢাকায় আইছি। জ্বর না হইলে বিপদে তোমারে ফালাইতাম না খালা। আমার জন্য সাহেব তোমার লগে খারাপ ব্যবহার করছেন, এইটা আমি হইতে দিতাম না। বাস থিকা নাইমা কোনওদিকে চইলা যাইতাম। ব্যবস্থা কিছু না কিছু একটা হইতই। এতবড় দুনিয়ায় মানুষ কি কেউ নাই? কেউ কি আমারে একটু আশ্রয় দিব না, আমার পাশে দাঁড়াইবো না?
কাজলের কথায় বকুলের চোখেও পানি এল। আঁচলে চোখ মুছে কাজলের মাথাটা সে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমি সাহেবরে বুঝামুনে। দেখি তারে বুঝাইয়া আমার কাছে তোরে রাখতে পারি কিনা। সেইটা না পারলেও কোনও না কোনও ব্যবস্থা আমি তোর জন্য করুম। তুই কান্দিস না মা, কান্দিস না।
বকুলকে দুহাতে জড়িয়ে আকুল করা কান্নায় কাঁদতে কাঁদতে কাজল বলল, আমার জীবনটা এমুন হইল ক্যান খালা? কী দোষ করছি আমি?
বকুল কথা বলতে পারল না। উথাল পাথাল কান্নায় তারও তখন চোখ ভাসছে।

মানুষ হয়ে ওঠা

বকুল আমার সঙ্গে আছে আজ কত বছর? চৌদ্দ পনেরো বছর হবে না? হ্যাঁ, তা হবে। এই এতগুলো বছরে তার সঙ্গে এমন ব্যবহার কি আমি কখনও করেছি? না, করিনি। আজ কেন করলাম? কী এমন অন্যায় সে করেছে? নিজেদের গ্রামের একটা অসহায় মেয়েকে আমার ফ্ল্যাটে এনে তুলেছে, এটা কি কোনও অন্যায়? মেয়েটা অসুস্থ। তাকে জায়গা দেওয়াটা কি কোনও অন্যায়? এতদিন ধরে আমার সঙ্গে আছে, এইটুকু অধিকার কি এতদিনে তার জন্মায়নি যে সে তার পরিচিত, অসহায় একটি মেয়েকে এভাবে আমার ফ্ল্যাটে নিয়ে আসতে পারে? ছি ছি, কী অমানুষের মতো ব্যবহার তার সঙ্গে আমি করলাম? কাজল মেয়েটিই বা আমাকে কী ভাবল? গ্রামের যে ছেলেগুলো তার পিছনে লেগেছে, যাদের ভয়ে সে এভাবে চলে এসেছে, একটু অন্য রকমভাবে আমিও তো চলে গেছি সেই অমানুষগুলোর দলে। ওদের সঙ্গে আমার আর ব্যবধান রইল কি!
লিলি চলে যাওয়ার পর মায়ের মতো করে আমাকে আগলে রেখেছে বকুল। কোনও লোভে পড়ে আমার সঙ্গে সে আছে তা ভাববার কারণ নেই। বেতন পায় পাঁচহাজার টাকা। কাজের বুয়া হিসেবে তার যে যোগ্যতা, চাইলে আট দশহাজার টাকা বেতনে যে কোনও বাড়িতে সে থাকতে পারে। কেন সে তাহলে আমার এখানে পড়ে আছে? আছে একটাই কারণে, আমার প্রতি তার একটা মায়া জন্মেছে। সেই মায়া টাকা দিয়ে পাওয়া যায় না।
এই মানুষটার সঙ্গে আমি এমন ব্যবহার করলাম?
এখন অনেক রাত। আমার ঘুম আসছে না। ভারি একটা অনুশোচনা হচ্ছে। এ আমি কী করলাম? কেন করলাম?
কেন’র জবাব পেতে সময় লাগল না। লিলির জন্য ব্যবহারটা আজ আমার এমন হয়েছে। তার কথা ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই মেজাজ বিষিয়ে উঠেছিল। গোপন রাগে ভরে গিয়েছিল মন। সেই রাগ গিয়ে পড়েছে বকুলের ওপর।
শেষ পর্যন্ত লিলি আমার সঙ্গে থাকেনি। আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে আমার অংশিকে। সব মিলিয়ে ছ বছরের কিছু কম সময় আমরা একসঙ্গে ছিলাম। লিলি ততোদিনে কানাডার ইমিগ্রান্ট। আমার মেয়ে নিয়ে সে চলে গেল। চার বছরের মেয়েটির বয়স এখন তেরো বছর। প্রায়ই আমাকে ফোন করে। বদলেছে অনেক। ফোন তুলেই বলে, হাই ড্যাড! কিন্তু ভালোবাসাটা আমার জন্য পুরোপুরি আছে। ছোট বয়সের স্মৃতি মনে আছে। আমাকে মিসও করে খুব। অংশির জন্যই আমি আর দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবতে পারিনি। প্রায়ই ফোন করে সে আমাকে বলে, ড্যাড, তুমি কিন্তু আর বিয়ে করো না।
একবার তো এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। বছর দেড়েক আগের কথা। বড়পা’র বাড়িতে আমার ডাক পড়েছে। গিয়ে দেখি ছোটপা আর ছোট দুলাভাইও আছেন। কী ব্যাপার? বড় দুলাভাই আমার জন্য মেয়ে দেখেছেন। অবিবাহিত মেয়ে। মেয়ে ডাক্তার। তার ছবিও দেখানো হল। দেখতে ভালোই। বয়স ছত্রিশ। এই বয়সে বেশির ভাগ মেয়েই মুটিয়ে যায়। এও একটু মুটিয়েছে। তবে সব মিলিয়ে মন্দ না। আমি রাজি হব হব করছি, ঠিক তখনই মোবাইল বাজল। ফোন ধরে দেখি অংশি। হাই হ্যালো না করে একটা কথাই আমার মেয়ে বলল, তুমি কিন্তু বিয়ে করো না, ড্যাডি।
আমি হতভম্ব। এ কী করে সম্ভব? যেই মুহূর্তে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেব ঠিক সেই মুহূর্তে মেয়ের ফোন!
না, বিয়ে এই জীবনে আমি আর করব না। আমার মেয়ে যা চায় না, তা আমি করব না। কথাটা কাউকে বলিনি। আপা দুলাভাইকে বললাম, পরে জানাচ্ছি। দু তিনদিন পর জানিয়ে দিলাম, বিয়ে আমি করব না। আমার জন্য চেষ্টা করার দরকার নেই।
আমাদের ডিভোর্স হওয়ার চার বছর পর এক বাঙালি ভদ্রলোককে বিয়ে করেছে লিলি। সেই ঘরেও একটা মেয়ে হয়েছে। স্বামীর গ্রোসারি শপের ব্যবসা। লিলি একটা দোকান চালায়। অংশির সঙ্গে রোজই ফোনে কথা হয়। মাসে এক দুবার দেখা হয়।
অংশি এখন সেভেন গ্রেডে পড়ে। হোস্টেলে থাকে। আমি প্রতিমাসে তাকে দেড়হাজার ডলার করে পাঠাই। অংশি তার মাকেও বলেছিল, বিয়ে করো না মা। লিলি তার মেয়ের কথা রাখেনি।
আহা রে আমার মেয়েটি। মা বাবা কাউকেই সে হারাতে চায়নি।
অংশির কথা ভেবে আমি একটু দিশেহারা হলাম। মনে হল, আচ্ছা কাজলের জায়গায় যদি আমার মেয়েটা হত, তাহলে আমি কী করতাম? মেয়েটির পাশে দাঁড়াতাম না? যে মেয়ের কথায় একাকী জীবন কাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেই মেয়ের বিপদে কি তাকে আমি বিপদমুক্ত করার চেষ্টা করতাম না? এখন এই যে আমার মেয়েটি কেনাডায়, এই মুহূর্তে যদি তার কোনও রকমের কোনও বিপদ হয়, আমি কি সব ফেলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াব না? প্রয়োজনে আমার সব সম্পদ বিক্রি করেও কি তাকে আমি বিপদমুক্ত করার চেষ্টা করব না?
কাজলের ব্যাপারে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। এতক্ষণ ঘুম আসছিল না। কিন্তু সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর দেখি মন মাথা এত হালকা হয়েছে, দ্রুত ডুবে গেলাম গভীর ঘুমে।  

 


ঝরা পাতাটুকু

বুয়া।
বকুল দাঁড়িয়ে আছে কিচেনের দরজায়। অনেক রাতে ঘুমিয়েছি বলে আমার আজ ঘুম ভেঙেছে বেলা করে। উঠে দেখি বকুল নাশতা সাজিয়ে রেখেছে টেবিলে। ফ্রেশ হয়ে নাশতা করতে বসেছি। সিদ্ধান্তের কথাটা বকুলকে জানাবার জন্য ডাকলাম তাকে। সে সাড়া দিল না। আমি মুখ ঘুরিয়ে বুকলের দিকে তাকালাম।
বকুলের চোখ দুটো ফোলা, মুখটা গম্ভীর। খুবই উদাস দেখাচ্ছে তাকে। নিশ্চয় আমার গতকালকার ব্যবহারে মন খারাপ করে আছে।
বুয়া।
এবার সাড়া দিল সে। বলেন।
নাশতা শেষ করে চায়ে চুমুক দিয়েছি। বললাম, আমি খুব দুঃখিত বকুল। খুুবই খারাপ ব্যবহার করেছি তোমার সঙ্গে। এই আমার উচিত হয়নি। কিছু মনে করো না।
বকুল কথা বলল না।
কাজলের শরীর এখন কেমন? জ্বর ছেড়েছে?
বকুল কথা বলল না।
চায়ে বড় করে চুমুক দিয়ে বললাম, কাজলকে তুমি আজ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেও। মেয়েটি এক কাপড়ে চলে এসেছে। আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে রেখো। ভাল সালোয়ার কামিজ কিনে দিও। ও আমার এখানেই থাকবে। ওর দায়িত্ব আমার। আগে শরীর ভালো হোক তারপর অন্য চিন্তা করব। এখন তো বছরের শেষ সময়, এখন আর স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। জানুয়ারিতে ভর্তি করিয়ে দেব। যে স্বপ্ন দেখে মেয়েটি বড় হয়েছে সেই স্বপ্নের চেয়েও বড় জায়গায় ওকে আমি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। চলো যাই তোমার রুমে। নিজেই কাজলকে সব বলি।
বকুল উদাস গলায় বলল, সেইটার আর দরকার নাই সাহেব। কাজল চইলা গেছে।
আমি থতমত খেলাম। চলে গেছে মানে? কোথায় চলে গেছে?
তা জানি না। ফজরের নামাজ পইড়া আমি আবার শুই। ঘণ্টা দুয়েক ঘুমাই। নামাজ পড়তে উইঠা দেখি কাজল ঘুমাইতাছে। পরে কখন উইঠা যে চইলা গেল, টের পাই নাই।
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল বকুল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আপনে কালকে রাগারাগি করছেন সেইটা ওর খুব মনে লাগছিল। ভাবছে ওর জন্য আমি বিপদে পড়ছি, এইজন্য হয়তো চইলা গেছে। আমারে বিপদে ফেলতে চায় নাই। ওর জীবনটা সাহেব শুকনা পাতার মতন। গাছ থিকা ঝইরা গেছে। এখন দমকা বাতাসে কোনদিকে উইড়া যাইবো, কে জানে।
আমি ফ্যাল ফ্যাল করে বকুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

 

অলংকরণ : সঞ্জয় দে রিপন

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।