সকাল ১১:২৮ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

অপরিকল্পিত নগরী মানুষকে স্বার্থপর করে তুলছে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আমিনুল ইসলাম সুজন।।

৮ নভেম্বর, বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস ২০১৫। পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার আহ্বানকে বিশ্বব্যাপী জোরালো করতে এই দিবসটি গুরুত্বসহ সমগ্র পৃথিবীতে উদযাপিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘হাউজিং রিজেনারেশন: স্ট্রেংদেনিং কমিউনিটি’। বাংলায়, ‘আবাসন পুনর্গঠন: সমাজ সুদৃঢ়করণ’।

মানুষ আদিকাল থেকেই সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে আসছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়নের প্রভাবে ‘মানুষ সামাজিক জীব’—এ ধারণা বিলুপ্ত প্রায়। নগর জীবনে তথাকথিত ফ্ল্যাটবন্দি জীবন মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা ও নেশাগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। পরস্পরের প্রতি মানুষের সৌজন্য, সহানুভূতি ও আন্তরিকতা কমেছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, হিংস্রতা ও স্বার্থপরতা বেড়েছে। অপরিকল্পিত নগরী নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির জন্য দায়ী। যে শহর যত বেশি অপরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্ন, সেই শহর তত বেশি অপরাধপ্রবণ। এ কারণে ইউরোপের শহরগুলোর চাইতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অপরাধ বেশি বলে মনে করা হয়। তাই বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসে এ বছরের প্রতিপাদ্য খুবই তাৎপর্যময় বলে মনে করা হচ্ছে।

অনেকের কাছে, ম্যারাডোনা-মেসির দেশ হিসাবে পরিচিত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আজেন্টিনা। দেশটির বুয়েনস্ আয়রেস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি অধ্যাপক কার্লোস পাওলেরার প্রস্তাব অনুসারে ১৯৩৫ সালে শহর বিষয়ক কংগ্রেসে ৮ নভেম্বরকে ‘বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস’ হিসাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছিল। তবে নানা কারণে ১৪ বছর পর, ১৯৪৯ সালে এই দিবসটির আনুষ্ঠানিক ও বৈশ্বিক উদযাপন শুরু হয়। তিনিই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ১৯১৬ সালে আর্জেন্টিনায় নগর পরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি প্যারিস শহরের পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করেন এবং বুয়েনস্ আয়রেস-এর বসতি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ১৯২৯-৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি বুয়েনস্ আয়রেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আরবানিজম-বিষয়ক চেয়ায়’-এর দায়িত্ব পালন করেন।

এরমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়, এতে হিরোশিমা, নাগাসাকিসহ এশিয়া, ইউরোপের অনেক শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। অনেক শহর মারাত্মকভাবে কিংবা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা জোরালো হয়ে ওঠে। আর এই প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে তিনি বুয়েনস্ আয়রেস বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নগর পরিকল্পনাবিষয়ক একটি স্বতন্ত্র বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার লেখা পড়ানো হয়। অনেক শহর পরিকল্পনায় তার ভূমিকা থাকায় সেসব শহরে তার বিশেষ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। এর মধ্যে পাশ্ববর্তী দেশ ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর টিজুকা এলাকায় ১৯৮৬ সালে তার মনুমেন্ট স্থাপন করা হয়। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কার্লোস পাওলেরা গত শতকের শুরুর দিকেই অনুধাবন করেছিলেন আগামী দিনের পৃথিবী হবে শহরকেন্দ্রিক এবং এজন্য পরিকল্পিতভাবে শহর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

তবে আধুনিককালে বাসযোগ্য শহরের ধারণাকে যারা প্রতিষ্ঠিত করেন তাদের মধ্যে বিশ্বখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ, রয়েল ড্যানিশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর নগর পরিকল্পনা বিষয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. ইয়ান গেল অন্যতম। পরিকল্পিত নগরীর ধারণা দক্ষিণ আমেরিকায় শুরু হলেও মূলত তারই নেতৃত্বে অত্যন্ত সফলভাবে ইউরোপে এর বিস্তার ঘটে। যে কারণে বসবাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে ইউরোপ এগিয়ে থাকে। অধ্যাপক ইয়ান গেল শুধু নিজ শহর কোপেনহেগেন (ডেনমার্কের রাজধানী) এর পরিকল্পনাই করেননি, সত্তর দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত তার কর্মকাণ্ড অস্ট্রেলিয়ার সিডনি-মেলবোর্ন-এডিলেড ও পার্থ, নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড-ওয়েলিংটন-ক্রাইস্টচার্চ ও হবার্ট, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কসহ পৃথিবীর অনেক বড় বড় শহরে দৃশ্যমান।

সিডনি, নিউ ইয়র্কসহ বেশ কয়েকটি শহরে তার পরিকল্পনায় নির্মিত, পুনঃনির্মিত পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। নিউ ইয়র্ক এর মত ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জনজীবনকে প্রাণ দিয়েছেন অধ্যাপক ইয়ান গেল। পথচারীবান্ধব শহর গড়ে তোলার পাশাপাশি তার পরিকল্পনায় ২০০৭ সালে গড়ে ওঠে বহুল জনপ্রিয় টাইমস স্কয়ার। মানুষের জীবন মান উন্নয়নে অধ্যাপক গেল-এর পরিকল্পনায় ২০০৪ সালে লন্ডন শহরকে পথচারীবান্ধব শহর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সর্বসাধারণের জন্য ব্যবহার উপযোগী করে জনসমাগমস্থল পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইয়ান গেলকে এখন পৃথিবীব্যাপী অনুসরণ করা হয়। তার লেখা বিভিন্ন গ্রন্থও পৃথিবীর প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নগর পরিকল্পনা বিভাগের আবশ্যিক পাঠ্য। তার লেখা গ্রন্থ ‘লাইফ বিটুইন বিল্ডিংস’ ৩০টিরও অধিক ভাষায় অনুবাদ, ভাবানুবাদ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলাম। তিনি যখন ২০০৯ সালে তার গন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ হয়েছিল।

ওই সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলোচনায় অধ্যাপক ইয়ান গেল বলেছিলেন, ‘একটি শহর তখনই প্রাণবন্ত হবে, যখন শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী, গর্ভবতী নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব লিঙ্গের মানুষ সহজে, স্বাচ্ছন্দ্যে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত হেঁটে ও বেশি দূরত্বের যাতায়াত গণপরিবহনে করতে পারবে, শারীরিক ও মানসিক বিনোদনের সুযোগ পাবে।’

এ বিবেচনায় ঢাকা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় ঢাকার অবস্থা খুবই শোচনীয়। পৃথিবীর মধ্যে বায়ু ও শব্দ দূষণ এবং যানজটের দিক থেকে ঢাকা শীর্ষস্থানীয়। গর্ভবতী নারী বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চলাচলই শুধু নয়, সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষেও যাতায়াত দুর্বিষহ ও বিরক্তিকর।

ছোট-ছোট ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার) নিয়ন্ত্রণের কোনও পরিকল্পনা না থাকায় এসব গাড়ির অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট যানজটে নগরবাসীর জীবন অতীষ্ট। অপরিকিল্পভাবে উড়াল সড়ক (ফ্লাইওভার) নির্মাণ করে বরং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শহরকে ইট-বালু-সিমেন্টের জঞ্জালে পরিণত করা হয়েছে। একাধিক উড়াল সড়ক নির্মাণ করে শহরটাকে ধ্বংস করা হয়েছে। উড়াল সড়কের তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর কোনওরূপ উপকারিতা নাই। উড়াল সড়ক ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সুবিধাজনক হলেও গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা খুবই কম। উড়াল সড়ক নির্মাণ করে পৃথিবীর কোন শহরেই যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস কিংবা নিকটবর্তী থাইল্যান্ডের ব্যাংক ও ভারতের দিল্লি এর বড় উদাহরণ। বরং উড়াল সড়কের প্রভাবে যাতায়াত ব্যয় ও সংকট বৃদ্ধি পায়, যা সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়।

ঢাকার বড় সংকট অপরিকল্পিত উন্নয়ন। ঢাকা শহরের উন্নয়নে গত ৩০ বছরে যত ব্যয় হয়েছে, তা অকল্পনীয়। অথচ শহরকে আধুনিক, উন্নত, প্রাণবন্ত ও সবার জন্য বাস উপযোগী করতে বিপুল পরিমাণ অর্থের দরকার নেই। বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতিক, নীতি-নির্ধারকদের ঘাটতি রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক শহর। যানজট নিরসনে এ শহরে এক সময় একটি উড়াল সড়ক র্নিমাণ করা হয়েছিল। কিন্তু উড়াল সড়ক নির্মাণের পরে দেখা গেল, যানজট কমেনি বরং বেড়েছে। এছাড়া যাতায়াত-ব্যয়, দূষণ ও দুর্ভোগ বেড়েছে। ফলে নতুন নির্মিত উড়াল সড়ক তারা ভেঙে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। সেখানে মানুষের জনসমাগমস্থল গড়ে তোলা হয়েছে—যা মানুষের জীবন মান উন্নত করতে ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমান সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু আর্থিক সঙ্গতির উন্নয়ন ঘটলেই জীবন মানের উন্নয়ন ঘটবে—এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং জীবন মানের উন্নয়ন ঘটাতে প্রাণবন্ত, পরিবেশবান্ধব শহর প্রয়োজন। মানুষকে সুস্থ থাকার পরিবেশ দিতে হবে। এজন্য শহরে খেলার মাঠ, পার্কগুলো এবং ফুটপাতের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত ব্যবস্থা দরকার।

গণপরিবহনের সংখ্যা ও মান বাড়াতে হবে এবং আলাদা লেন দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর কর বৃদ্ধিসহ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি বাইসাইকেল আমদানি করমুক্ত করতে হবে। শহরের সর্বত্র ফুটপাত প্রশস্ত ও সমান্তরাল এবং সাইকেল চালানোর জন্য নিরাপদ লেন গড়ে তুলতে হবে। শহরের সব জলাশয়কে দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে। জলাশয়কেন্দ্রিক বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সব জনসমাগমস্থলে প্রতিবন্ধী নারী-শিশুসহ সবার জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার গণশৌচাগার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বাংলাদেশের শহরগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে, মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতসপ্তাহে চারদিনের সফরে নেদারল্যান্ডস ভ্রমণ করেন। এ শহরের রাজধানী হেগ পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয়, পরিবেশবান্ধব ও প্রাণবন্ত শহর। শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলয় প্রায় ৮০ভাগ যাতায়াত হয় বাইসাইকেলে। এছাড়া শহরের প্রায় ৪০ভাগ যাতায়াত বর্তমানে বাইসাইকেলে হয়। মূলত, বাই সাইকেলের জন্য নিরাপদ ও প্রশস্ত লেন থাকায় বাইসাইকেল যাতায়াত ক্রমশ বাড়ছে। এছাড়া প্রশস্ত ফুটপাত ও খুবই উন্নত মানের গণপরিবহন (বাস, ট্রাম ও ট্রেন) রয়েছে। সড়কে হাঁটলে কোনও হর্নের আওয়াজ পাওয়া যায় না। যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মাত্র গত সপ্তাহেই শহরটি ঘুরে এলেন, তাই আশা করছি, আগামী দিনে শহরের পরিকল্পনায় এর প্রতিফলন ঘটবে। অপরিকল্পিত শহর ঢাকার আগামী দিনের সব উন্নয়ন পরিকল্পিতভাবে হবে। পাশাপাশি অন্য যেসব বিভাগীয় শহর, বড় শহর ও ছোট শহর রয়েছে, সেগুলোও পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠবে।

শহর হোক মানুষের, গাড়ি বা ইট-বালু-সিমেন্টের নয়। বাংলাদেশের সব শহর পরিবেশবান্ধব, প্রাণবন্ত ও নিরাপদ হয়ে উঠবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

লেখক:  সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

aisujon@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।