রাত ০৮:৫৪ ; মঙ্গলবার ;  ১৬ অক্টোবর, ২০১৮  

মিয়ানমারে নির্বাচন: গণতন্ত্রে উত্তরণ নাকি সামরিক মঞ্চে গণতন্ত্রের রঙ্গনাটক

প্রকাশিত:

মাহফুজ রাহমান॥

কেউ কেউ তাকে সম্বোধন করেন ‘দ্য লেডি’। অনেকেই বলেন ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’। সবকিছু ছাপিয়ে তাকে এখন ‘এশিয়ার ম্যান্ডেলা’ বলা হয়। জীবনের সোনালী সময়টুকু বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছেন মিয়ানমারের মানুষের মুক্তির জন্য। সংগ্রাম করেছেন সেনাশাসক উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়। তিনি অং সান সু চি। আগামীকাল রবিবার  মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিশ্ব গণমাধ্যমে তিনি সবচেয়ে আলোচিত নাম।

সু চি'র বাবা অং সান ছিলেন সাবেক বার্মার স্বাধীনতার নায়ক। তার জন্মের মাত্র দুই বছর পরই (মিয়ানমারের স্বাধীনতা লাভের বছরে) আততায়ীর গুলিতে মারা যান অং সান। ষাটের দশকের গোড়ায় ভারত ও নেপালে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন তার মা খিন কি। সেই সুবাদে ভারতে পড়তে আসেন সু চি। দেশে ফেরেন দীর্ঘসময় পর ১৯৮৮ সালে। এসেছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী মাকে শেষবারের মতো দেখতে। ওটাই তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। জড়িয়ে পড়েন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। গঠন করেন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ এবং বৌদ্ধ উপলব্ধিকে সঙ্গী করে পথচলা শুরু সু চি'র। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে সু চি'র দল এএলডি। এরপরই শুরু হয় বন্দি জীবন।  দীর্ঘ ২২ বছর পর ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর মুক্তি লাভ করেন সু চি। এর বছরখানেক পর মিয়ানমারের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের উপ-নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার দল ৪৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪৩টিতে জয় লাভ করে। সু চি’র মতে ওটা কেবল পরিবর্তনের শুরু।

স্বপ্ন পূরণের পথে

অবশেষে মিয়ানমার মুক্ত করার স্বপ্ন পূরণের পথে সু চি। মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার ৬৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে রবিবার। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত হওয়ার পর থেকে রাজতান্ত্রিক একনায়ক আর সামরিক শাসকরা দেশ পরিচালনা করে আসছেন। কয়েক দশকের জান্তা শাসনের পর এবারই প্রথম পূর্ণ গণতন্ত্রায়নের সুযোগ ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু জান্তার ছত্রছায়ায় সামরিক মঞ্চের এ নির্বাচনে কতটা বেসামরিকীকরণ সম্ভব—তা এক বড় প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের কাছে। মিয়ানমারে ১৯৭০ ও ১৯৮০’র দশকে সামরিক শাসক নি উইনের বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি চারটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু এসব নির্বাচন ছিল হাস্যকর। আর ভোটের ফলাফলে বিপুল বিজয় পেয়েছে ক্ষমতাসীনরাই।

১৯৯০ সালের নির্বাচনে সু চি'র এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ফল মেনে নেয়নি তৎকালীন সেনা সরকার। এনএলডির বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আবারও কেন নির্বাচন দিলেন প্রেসিডেন্ট থিয়েন সেইন? সেটা নিয়ে শঙ্কিত  বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। তারা মনে করছেন সামরিক বাহিনী সমর্থিত দল ইউনাইটেড সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) আসলে একটি আন্তর্জাতিক বৈধতা চায়। আর সেটা নিশ্চিত করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। তবে সু চি কিন্তু বলছেন, জয়ের পথ দেখে ফেলেছেন তিনি। গত শুক্রবার এক জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন, 'আমি শতভাগ নিশ্চিত নির্বাচনে জয়ী হবে এনএলডি। দ্য টাইম হ্যাজ কাম টু ফুলফিল আওয়ার ডেসটিনি'।

মিয়ানমারের পার্লামেন্ট

মিয়ানমারের পার্লামেন্ট দু’কক্ষ বিশিষ্ট ( উচ্চ কক্ষ ও নিম্ন কক্ষ)। এছাড়াও বিভিন্ন রাজ্য এবং আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। রবিবারের নির্বাচনে ৯১টি দলের ছয় হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে নির্বাচনে প্রধান দুটি দল হচ্ছে ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি এবং বিরোধী দল এনএলডি। নির্বাচনে মোট বৈধ ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি।

মিয়ানমারের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ এমিওথা হালতাউয়ে (হাউজ অব ন্যাশনালিস্ট) আসন রয়েছে ২২৪টি। এর মধ্যে ৫৬টি আসন সংরক্ষিত সামরিক বাহিনীর জন্য। আবার ৪৪০ আসনের নিম্নকক্ষ পিথু হালতাউয়ে (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত ১১০টি আসন।

নির্বাচনে সু চি'র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন প্রে‌‌‌সিডেন্ট ও সাবেক জেনারেল থিয়েন সেইন। মিয়ানমারের গণতন্ত্র উত্তরণের যাত্রা শুরু হয়েছে তার হাত ধরেই। তার সরকার গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। তিনি নিজেকে এখনও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেননি। এমনকী তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অভিলাসও স্পষ্ট নয়। ভয়ের বিষয়টি এখানেই।

সকল হিসেবে নিকেশ ভন্ডুল করে গণতন্ত্রের যাত্রা রোধ করতে পারেন দেশটির সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিং অং লায়িং। দেশটির পার্লামেন্টে যে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত রয়েছে সে আসনগুলোতে নিয়োগ দেন তিনি। ধারণা করা হয় মিয়ানমারে পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের দিকে এগুবে কি না তার অনেকটাই নির্ভর করবে মিং অং লায়িং এর ওপর।

 

রোহিঙ্গা ইস্যু

সেনাশাসন থেকে বের হয়ে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসার এ পদক্ষেপে দেশটির একটি বৃহৎ অংশকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। ৫০ লাখ মুসলিম বসবাস করছে মিয়ানমারে। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ। নির্বাচনে কোনও দল মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। এছাড়া মুসলিম ভোটারদেরকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে তারা যেন ভোটকেন্দ্রে না যান।  ফলে মুসলিম রোহিঙ্গাদের মাঝে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহের চেয়ে আতঙ্কই বেশি! নির্বাচনের পর ক্ষমতায় পরিবর্তন এলেও রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন কমবে এমন ভরসা তারা পাচ্ছেন না।

প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না সু চি

তার দল জিতলেও প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না সু চি। মিয়ানমারের সংবিধানের ৪৩৬ ধারা অনুযায়ী, দেশটির সংবিধানে কোনও পরিবর্তন আনতে চাইলে তার ওপর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সেনাবাহিনীর। আর ৫৯ (চ) ধারা অনুযায়ী, স্বামী কিংবা সন্তান অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। যদি এনএলডি সরকার গঠন করে তবুও শিগগিরই সংবিধান সংশোধনেরও কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ একটি সংবিধান পরিবর্তনে সেনাবাহিনীর ভেটো প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে। তারা ভেটো দিলে সংবিধান সংশোধনের যে কোনও উদ্যোগ আটকে যাবে।

তবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সম্প্রতি সু চি সাংবাদিকদের বলেন,'সংবিধান বলে, প্রেসিডেন্টের ওপরে কেউ হতে পারে না। কিন্তু আমি প্রেসিডেন্টের ওপরে থাকবো।'

সুষ্ঠু হবে নির্বাচন?

সবকিছু ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে তো? নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে এনএলডি সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হয়েছেন। বৌদ্ধ মন্দিরকেন্দ্রিক উগ্রপন্থীরা সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা মুসলমানদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বারণ করছেন, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এমনকি মুসলমানদের কল্যাণে যাতে কোনও প্রার্থী নির্বাচনী ইশতেহার প্রচার না করতে পারেন, সে ব্যাপারেও প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান, সেখানকার নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে।

তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, ভোট প্রদানের সীমিত সুযোগ সত্ত্বেও মনে করা হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠুই হবে। বিরোধী দলের ফলাফলও বেশ ভালো হবে। মোট কথা, পঁচিশ বছর পর অনুষ্ঠেয় মিয়নামারের নির্বাচন অনুষ্ঠানে কিছু সঙ্কট মোকাবেলা করতে হলেও নিরপেক্ষই হতে পারে নির্বাচন।

জান্তা সরকার মিয়ানমারে পূর্ণ গণতন্ত্র দিবে নাকি আবারও কোনও অজুহাতে তাকে বন্দি করবে তা দেখার অপেক্ষায় আছে বিশ্ব। রবিবারের পরই বোঝা যাবে, নির্বাচন কতটা বেসামরিক গণতন্ত্রে উত্তরণের হয়েছে, নাকি সামরিক মঞ্চে গণতন্ত্রের রঙ্গনাটক হয়েছে! তথ্য সূত্র- বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স।

/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।