সন্ধ্যা ০৭:০৫ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

অ্যামনেস্টির ধৃষ্টতা!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আনিস আলমগীর।।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তাদের যুক্তির, বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। তারা দাবি তুলেছেন, চোরের বিচার হলে নাকি গৃহস্থেরও বিচার হতে হবে। বাংলাদেশে একটি গ্রাম্য প্রবাদ আছে—টাকা হলে বাঘের চোখ কেনাও কঠিন কিছু নয়। এখন দেখছি, টাকা হলে মানবতার শত্রু কোনও নরপশুর পক্ষে মানবাধিকার নামধারী কোনও সংগঠনের বিবৃতি আদায়ও অসম্ভব নয়। তাদের কর্মকর্তাদের কেনাও কঠিন নয়।

মুক্তরাজার অর্থনীতির যুগে সম্পদ আহরণের প্রবল আকাঙ্ক্ষার কাছে সবাই আত্মসমর্পণ করেছে—অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা সেখানে আকাশ থেকে নামা ফেরেশতা নন, তারাও মানুষ, ষড়রিপু তাদেরও তো আছে। তবে টাকা নিলেও মানুষ নাকি বুদ্ধি খরচ করে কথা বলে যেন তার উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে কেউ তার টাকা নেওয়ার বিষয়টা উপলব্ধি করতে না পারে। অ্যামনেস্টির কর্মকর্তারা দেখছি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেখেয়াল। তাই বুঝতে হবে, এখানে টাকার অংকটা অনেক বড়। ব্যাগটা বড়ই স্ফীত।

আমাদের আগে ধারণা ছিল, চামড়া ফর্সা হলে, সরাসরি বললে, সাদা চামড়ার লোক হলে তারা সৎ হয়। অনেকে আবার ধারণা করেন তারা মহান জ্ঞানীও হন। তাই দেখবেন বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাদা চামড়াকে নিয়োগ দিয়ে বড়ই আত্মতৃপ্তি নিয়োগদাতাদের। বাস্তবে এখন সে ধারণার কোনও কারণ নেই। তিন লাখ ডলার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিটি আমেরিকান শিশু জন্ম নেয় এখন। ব্রিটেনও প্রায় ফতুর। স্কটল্যান্ড তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে শিক্ষা ব্যবসা বা মাস্টারি করে খেতে হবে ব্রিটেনকে। পশ্চিমা বিশ্বে এখন জার্মানি ও ফ্রান্সের অবস্থা কিছুটা ভালো। আর কারও অবস্থা উল্লেখ্যযোগ্য নয়।

আমাদের দেশে মধ্যপ্রাচ্যের লোকেরা এক সময় ভিক্ষা করতে আসত। ইরানিরা তসবি, চশমা, সুরমা ফেরি করত এবং রেললাইনের দ্বারে তাবু খাটিয়ে থাকত। এখন তারা আমাদের ভিক্ষা দেয়। চাকরি দেয়। আল্লাহ ভিখারিকে বাদশাহ বানান, বাদশাহকে ভিখারি করেন। আল্লাহ এখন মুখ তুলে দেখেছেন এশিয়ার দিকে। এ শতক হবে এশিয়ার শতক। পশ্চিমারা গুনে-গুনে ঘুষ নেওয়া আরম্ভ করেছে। বিশ্ব ব্যবস্থায় তারা অচিরেই আধিপত্য হারাবে।

এ সব কথা বলছিলাম, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনানের বিবৃতি প্রসঙ্গে। গত ২৭ অক্টোবর ২০১৫ এক বিৃতিতে তারা বাংলাদেশের দুই মানবতাবিরোধী অপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মুজাহিদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখানে ক্ষান্ত দেয়নি এই সংগঠনটি। বলেছে, ‘(১৯৭১ সালে) মুক্তিযোদ্ধারাও এমন সব গুরুতর অপরাধ করেছে কিন্তু সেগুলোর কোনওটারই তদন্ত হয়নি বা তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।’ [Serious crimes were also committed by the pro-independence forces, but no one has been investigated or brought to justice for them.] সোজা অর্থে তাদের বিবৃতির সারাংশ করলে দাঁড়ায়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে বিচার প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দিতে চায়। তাদের চোখে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাকামীরাও অপরাধ করেছে এবং তাদের অপরাধেরও তদন্ত এবং বিচার হওয়া উচিত। তারা আরও মনে করে, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই সাকা চৌধুরী বা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং অন্যদের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লন্ডনস্থ কার্যালয়ে এখন যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে ডেবোরা হেইম, মোহাম্মদ বেগ ও ইয়াসমিন হুসাইন বিশ্বের মুসলিম টেরোরিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে অভিযোগ রয়েছে। ডেবোরা হেইম সম্পর্কে অভিযোগ আছে যে, তিনি নিজেই আগে একজন টেরোরিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন। সম্ভবত তাদের মাধ্যমে তিনি জামায়াতে ইসলামীর অর্থে জামায়াত-বিএনপির লবিস্ট ফার্ম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে এমন এক বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে উপস্থিত হতে উৎসাহিত করছেন। অভিযোগ আছে—অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অনুদান আদায়ে তাদের  হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

অনেকে না জেনেই বলেন, বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমায় সবাইকে মাফ করে দিয়েছেন, তাহলে আবার বিচার কেন! কিন্তু এটা সত্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সাধারণ ক্ষমা করেছিলেন কিন্তু হত্যাকারীরা সাধারণ ক্ষমার মধ্যে ছিলেন না। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করার জন্য গ্রেফতারকৃত সবাইকে মুক্তি দেওয়ার পরও সাড়ে নয় হাজার কোলাবোরেটর হত্যাকারী ও ‍অগ্নি সংযোগকারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় মুক্তি পাননি। তাদের বিচার হওয়ার কথা ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আজ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন তখন সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন ওই কোলারোরেটদের বিচারের প্রক্রিয়ায়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জিয়াউর রহমান এই সাড়ে নয় হাজার লোককে মুক্তি দিয়েছিলেন।

সাড়ে নয় হাজার যুদ্ধাপরাধীর ব্যাপারে জাতি সব সময় সোচ্চার ছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে এ বিষয়ে আন্দোলনও হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই দাবী পূরণে আওয়ামী লীগ তার নবম সংসদ নির্বাচনে তার মেনিফোস্টোতে ম্যান্ডেট চেয়ে বসেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসন পেয়ে জিতেছে। জোটগতভঅবে তাদের আসন সংখ্যা আরও বেশি। সুতরাং মানবতাবিরোধীদের যে বিচার তা আওয়ামী লীগ বা কারও খেয়াল-খুশি নয়, এতে ১৬ কোটি জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে। এর বিচার আয়োজন করতে আওয়ামী লীগ নৈতিকভাবে বাধ্য ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনানের বোঝা উচিত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ ২১ বছরে বহু মানবতাবিরোধী অপরাধী নেতা হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, সে জন্য কি তারা মানবতাবিরোধী অপরাধীর দায় থেকে মাফ পেয়ে যাবে? যেই প্রেক্ষাপটে তারা নেতা হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কেউ এসে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হননি, তাই বাঙালিদের ভালো কপাল ছিল। বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান যদি পাকিস্তানের সীমানা সংলগ্ন হতো, তাহলে ওই ২১ বছরে তারা বাংলাদেশের সীমানা মুছে দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করে ফেলত।

যুগে যুগে স্বাধীনতার সংগ্রাম বা যুদ্ধ দেশে-দেশে হয়েছে। যুদ্ধ করে মুক্ত যেসব দেশ হয়েছে, তার মধ্যে আমেরিকা অন্যতম। কিন্তু আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কোনও নাগরিক কোনও বাহিনী গঠন করে বা অন্য কোনওভাবে ব্রিটেনকে সাহায্য করতে যায়নি। যদি আমেরিকার কোনও লোক ব্রিটেনকে সাহায্য করত, তাহলে তাদেরও বিচার হতো।

ভিয়েতনামের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনীকে যেসব ভিয়েতনামি সাহায্য করেছিল, তাদের একজনকেও হো চি মিন বাহিনী জীবিত রাখেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের সরকার যখন জার্মানির আক্রমণে ব্রিটেনে পালিয়ে যায়, তখন ফ্রান্সের কিছু লোক জার্মানির সমর্থনে একটা সরকার গঠন করেছিল। ফ্রান্স মুক্ত হলে এই সরকারেরও বিচার হয়েছিল, জার্মান শক্তির কোলাবোরেটর হিসেবে কাজ করার অপরাধে।  

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মুক্তিযোদ্ধাদের বিচরের কথা বলেছে। যারা আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ধরে তাদের বিচার চাওয়া হাস্যকর। কোনও আইনে পড়ে না। মুক্তিযোদ্ধারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে এবং সফল হয়েছে। তাদের পক্ষের ৩০ লাখ লোকও প্রাণ হারিয়েছে। তারা তো বিরুদ্ধ শক্তির বিচার করবেই। বিচার হয় পরাজিত আক্রমণকারীর। পাকিস্তানি বাহিনী তার দোসরদের নিয়ে বাঙালিদের আক্রমণ করেছিল। সুতরাং পরাজিত শক্তি হিসেবে এবং ৩০ লাখ লোকের হত্যাকারী হিসেবে তাদের বিচার অবধারিত। যারা এই বিচারের বিরোধিতা করে, তারা মানবতাহীন নরপশু, ওদের মানবাধিকার সংগঠনে মানায় না।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।