সন্ধ্যা ০৭:১৪ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

দীপনের বাবার কাছে খোলা চিঠি

প্রকাশিত:

আহসান কবির॥

শ্রদ্ধেয়,
আবুল কাশেম ফজলুল হক স্যার,

আপনাকে স্যালুট!

পৃথিবীর সবচেয়ে ওজনদার দুঃখটা বুকে নিয়ে অনেকক্ষণ আপনাকে কাঁদতে দেখিনি। বরং শুনেছি, সেই অবিনাশী উচ্চারণ—‘আমি বিচার চাই না!’ মনে হয়েছে, যেন কেউ আমাকে সেই কবিতাটা বলছে, ‘আজ আমি কারও বিচার চাইতে আসিনি!’ মনে পড়েছে, রবীন্দ্রনাথকেও—‘আমি যে দেখেছি, প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে/বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে!’

আপনার প্রিয়তম পুত্র ফয়সাল আরেফিন দীপনকে পৃথক পালঙ্কে (শেষ শয্যাকে এভাবে লিখেছিলেন কবি আবুল হাসান, দীপনের খুব প্রিয় কবিদের একজন) শুইয়ে দেওয়ার সময়ে আপনাকে প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। আপনার কান্না দেখে মনে হচ্ছিল, আল্লাহর আরশ কাঁপছে। কান্নার পরেও শুনেছি, আপনার অবিচল উচ্চারণ, আইনের প্রতি আমার এখনও শ্রদ্ধা আছে, তবে ভরসা নেই! আমি একা, আমার কোনও দল নেই, তবে বিশ্বাস হারাইনি!

স্যার আপনাকে দেখে আমার মতো অনেকে বিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। মনে হয়েছে, আমি আমার হারানো বাবার মুখটা দেখছি। যেন তিনি সুনীল গাঙ্গুলীর মতো বলছেন, দেখিস, একদিন আমরাও! অবশ্য সুনীল গাঙ্গুলী আরও লিখেছিলেন, বাবা এখন অন্ধ! আমাদের দেখা হয়নি কিছুই! সেই লাঠি লজেন্স, সেই রয়েল গুলি, সেই রাশ উৎসব, কেউ আর আমায় ফিরিয়ে দেবে না!

স্যার কোনও কান্নাতেই আর ফিরবে না দীপন। ওর সঙ্গে আমার ষোলো বছরের পথচলা কেউ আর আমায় ফিরিয়ে দেবে না। ফিরিয়ে দেবে না বই মেলা থেকে প্রায় প্রতিদিন ছোট্ট সাদা গাড়িতে করে আমাকে দীপনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া কিংবা মেলা শেষ হলে নাজলা, নয়ন, দীপন, জলি আর পিয়ালকে নিয়ে আমার দেওয়া সেই রাশ উৎসব!  ফিরিয়ে দেবে না রাত করে মাওয়া ঘাটে যাওয়া আর জ্যান্ত ইলিশ ধরার পর ঘাটের হোটেলে সেটা ফ্রাই করে খাওয়া। আমাকে কখনও আপনার কাছে কিংবা জলির কাছে আর মিথ্যে বলতে হবে না যে, দীপন আমাকে সঙ্গে নিয়ে আমার বইয়ের কাজ করছে! আপনি সন্দেহমূলকভাবে আর কখনও জানতে চাইবেন না, তোমরা কি মাঝরাতে গাড়িতে বসে বইয়ের কাজ করো? প্রুফ দেখো?

স্যার, দীপনের আজীবন বন্ধু অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের পর সে বলেছিল, যুক্তি খণ্ডানোর চেয়ে খুন করা সহজ! শেষমেষ দীপনকে খুব সহজেই খুন করা গেছে! কেউ যদি ধর্মের নামে কাউকে খুন করে পরজনমে সে কি খুব সহজেই বেহেশতে যায়? বিধাতার ইশারা ছাড়া নাকি গাছের পাতাও নড়ে না? তাহলে বিধাতা ইশারা করুন, দোহাই আপনি ইশারা করুন। সহজেই খুন হয়ে যাই কিংবা দীপনকে যারা কুপিয়ে মেরেছে, তাদের বাংলা বা হিন্দি ফিল্মের বাস্তবতার মতো প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করে ফেলি। বিধাতা দীপনের খুনিদের খুন করার পর আমাকে যদি নরকে যেতে হয়, আমি সেখানেও যেতে রাজি! বিধাতা আপনি কি একবার ইশারা করবেন?

স্যার, আসলে কার ইশারায়  জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে চাপাতির নিচে জীবন দিতে হয়েছে দীপনকে? স্যার, যখন আপনি বললেন, বিচার চাইবেন না, হত্যাকারীদের প্রতি কোনও অভিযোগ নেই, বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর একের পর এক ইশারাজনিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে বিবেচনায় নিয়ে অভিমানাহত কণ্ঠে আপনি যখন ঘোষণা দিলেন, তখন তো পুরো জাতিরই লজ্জায় ডুবে যাওয়ার কথা! স্যার, আপনি হয়তো বুঝতে পারেননি, এই রাষ্ট্র বা সরকার যারা যখন নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তারা লজ্জা নামের বিষয়টা ভুলে গিয়েই ক্ষমতায় বসে! আপনার কথার ভেতর তাই ভিন্ন অর্থ খুঁজে পায় শাসক দলের কেউ কেউ! সারাদেশে নিন্দার ঝড় উঠলে শুধু ক্ষমা চেয়ে তারা আবার মুখ লুকায়!

স্যার, সত্যি সত্যি কি আপনি বিচার চাইবেন না?  ইতিহাস আমার চেয়ে আপনি ঢের ভালো জানেন। লিবিয়ার জাতির পিতা খ্যাত ওমর মোখতার কয়েক দশক যুদ্ধ করেছেন ইতালীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, কখনো বশ্যতা স্বীকার করেননি। শেষযুদ্ধে যখন তিনি বন্দি হন, তখনও তাকে বশ্যতা স্বীকার করতে বলা হয়েছিল। তার চোখের সামনে তার ছেলেকে হত্যা করা হলেও তিনি ইতালিয়ান আগ্রাসন মেনে নেননি। হাজারো মানুষের সামনে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে ওমর মোখতারকে বলা  হয়েছিল—এখনও সময় আছে, আপনি শুধু বশ্যতা স্বীকার করুন। ওমর মোখতার উত্তর দিয়েছিলেন, আমার এক ছেলেকে হত্যা করেছেন, কিন্তু তার একটা শিশু সন্তান রয়েছে। যদি তাকেও হত্যা করেন, তাহলে আমার মতো লাখ-লাখ ওমর মোক্তার এসে দাঁড়াবে জীবন দিতে। লিবিয়া একদিন স্বাধীন হবেই। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি স্যার, এখনই যদি বিচার না পাই, যদিও বিচারের দেরির কারণে হত্যাকারীরাই প্রশ্রয় পায়, দশ বিশ বছর লাগুক, তবু যেন বিচার দেখে মরতে পারি!  দীপনের বিচার যেন তামাদি না হয়!

স্যার আমাকে তামাদি হতে না দিতেই যেন এসেছিল দীপন। ২০০০ সালের কোনও একদিন এসে বলেছিল, আপনার রম্য লেখাগুলো আমাকে দিন। আপনার প্রথম গদ্য বইটা আমিই বের করে দেই। আমি হয়তো একটু গর্ব নিয়েই বলেছিলাম, বইটা দিয়ে দিয়েছি। একজন জনপ্রিয় লেখক ও প্রকাশক বইটি ছাপবেন! দীপন উত্তর দিয়েছিল, ভাই মিশুকের পেছনে (এক ধরনের ছোট বাহন যা ইদানিং আর চোখে পড়ে না) লেখা থাকে, আমি ছোট, দয়া করে আমাকে মারবেন না। আপনি আগামী মেলাতে আমার কথা মনে রাইখেন, মিশুক ভাইবা মাইর দিয়েন না। পরের মেলাতেও দীপনকে ভুলে গিয়েছিলাম! দ্বিতীয় রম্য বই বের হওয়ার কথা ছিল আরেক প্রকাশনী থেকে। বই মেলার দশদিন অতিবাহিত হওয়ার পর সেই প্রকাশক আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন! বলেছিলেন, এমন রাজনৈতিক রম্য ছাপলে মানুষ এসে তার (ওই প্রকাশকের) বইয়ের স্টল পুড়িয়ে দিয়ে যাবে! অনেকদিন পরে বই মেলাতে সেদিনই আমার দীপনের সঙ্গে  দেখা হয়েছিল। সে ওই প্রকাশকের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি ও প্রচ্ছদ নিয়ে মাত্র চারদিনের ভেতর নিজের জাগৃতি প্রকাশনী থেকে বইটি মেলাতে এনেছিল। সেটি ছিল ২০০১ সাল এবং বইটার নাম ছিল ‘আলপিন ঝালপিন’। সেদিন থেকেই কেমন কেমন করে যেন আমি জাগৃতির হয়ে গেলাম, ২০১৫ সাল পর্যন্ত দীপন আমার ১৬টা বই বের করেছে পরম মমতায়! এরপর জাগৃতির স্টল থেকে আমার বই নিয়ে যাওয়া, হুমকি দেওয়া, এমন বই প্রকাশ না করার শর্তসহ আরও অনেক কিছু আমার জন্য দীপনকে সহ্য করতে হয়েছে! তবু সে আমার কোনও লেখা তামাদি হতে দেয়নি! বলত, ভাই আপনার জন্য বুকের ভেতর একটা নিশূন্য অঞ্চল আছে! ধ্রুব এষের লেখা এবং কনক আদিত্যের গাওয়া একটা গান থেকে দীপন নিশূন্য অঞ্চল শব্দটা নিয়েছিল! জানি না চাপাতি দিয়ে ঘাতকরা তার বুকের নিশূন্য অঞ্চলটা ঝাঁঝড়া করে দিতে পেরেছে কি না!

স্যার, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে তবু দিন যাবে। ঘুরে ফিরে বইমেলা আসবে। নিশূন্য অঞ্চলের ভালোবাসা নিয়ে দীপন এসে বলবে না, এবার কয়টা বই দেবেন? রোজা এলে সারাদিন রোজা রেখে দীপন আমাকে নিয়ে ইফতারি করতে বসবে না। আমাকে বসিয়ে রেখে নামাজ পড়বে না! বইমেলায় ধুলো উড়বেই, বসন্ত এলে মেয়েরা বাসন্তি রংয়ের পোশাক আর ফুল দিয়ে নিজেদের সাজাবেই।  দীপন শুধু থাকবে না!

রিদমা হয়তো কিছুদিন মাঝরাতে তার বাবা দীপনের জন্য প্রতীক্ষায় থাকবে, বাবা আর ফিরবে না জেনে এক সময়ে ছোট্ট্ মেয়েটা তার চোখের পানি মুছে ফেলতে বাধ্য হবে। আজিজ মার্কেটের এক কোণে দীপনের স্মৃতিবাহী সেই সাদা গাড়িটা আর পড়ে থাকবে না, কেউ না কেউ সেটা পৌঁছে দিয়ে আসবে স্যারের কাছে। স্যারের মুখের দিকে আমরা কেউ তাকাতে পারব না। রিদাতের জেএসসি পরীক্ষা শেষ হবে একদিন, হয়তো আশা-জাগানিয়া রেজাল্টও বের হবে। শুধু দীপন জানবে না! দীপনের স্ত্রী রাজিয়া জলির দুঃখের জায়গাটা  কেউ স্পর্শ করতে পারব না!

স্যার, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী দুঃখটা বয়ে বেড়ানোর পরেও আপনাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে! বলা হচ্ছে, দীপন হত্যার ব্যাপারটা নিয়ে আপনি যেন বাড়াবাড়ি না করেন। কারা আপনাকে হুমকি দেয়? তারা কি এ দেশের নাগরিক? দেশে কি আইনশৃঙ্খলা বলতে আসলেও কিছু নেই? যারা হত্যা করেছে, যারা হুমকি দিচ্ছে, এই দেশটা কি শুধু তাদের? স্যার, এ কারণেই কি আপনি বিচার চান না?

স্যার, খুব কান্না পাচ্ছে। পাঁচদিন চেষ্টা করেও আমি কিছু লিখতে পারছি না। আজিজ মার্কেটের নিচতলায় জাগৃতির শো রুমটার কথা মনে পড়ছে। আমার বইগুলোর কাভার এখনও সেখানে সাজানো রয়েছে। রুমভর্তি দীপনের স্মৃতি। শুধু দীপন সেখানে নেই!

স্যার, দীপন যেখানে গেছে, সেখানে কি চেতনার আজিজ মার্কেট আছে? সেখানে কি প্রতি বছর শীত চলে গেলে বসন্ত আসে? শাহবাগ কিংবা ঢাকা ভার্সিটির মতো তারুণ্যের মেলা জমে? প্রতি বছর বইমেলা হয়? দীপন কি একা একা জাগৃতিকে সেখানে নিয়ে গেছে? আমার পরের বইটা কি সেখান থেকে বের হবে?

স্যার, আমি এই প্রশ্নটার উত্তর চাই! আমি ধর্মান্ধ নই, আবার ইসলামবিরোধীও নই। যদি আমাকেও দীপনের পরিণতি বরণ করতে হয়, তবে আমি হাসিমুখে দীপনের কাছে চলে যাব। বলব,  দীপন নতুন বইটার পাণ্ডুলিপি আত্মার ভেতর বয়ে নিয়ে এসেছি। বইটা এই মেলাতে বের করিস!

লেখক: সাহিত্যিক রম্য লেখক

ইমেইল: theahsankabir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।