রাত ১০:১৯ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

নিঝুম বনের দ্বীপে...

প্রকাশিত:

ফারুখ আহমেদ।।
নিঝুম দ্বীপ প্রথম গিয়েছিলাম ২০০২ সালে। এরপর ২০০৪ সালেও আরেকবার গিয়েছিলাম। সেসব স্মৃতি আবছা। এই অক্টোবরে একদিন আবার নিঝুম দ্বীপ রওনা হলাম। সঙ্গী চিকিৎসক নাজমুল হক, রাজীব রাসেল, আব্দুল বাতিন, নাজিম অর্বাচীন, মাসুম আর নিরব অরণ্য। ঢাকা থেকে ফারহান ৪-এর যাত্রী হয়ে হাতিয়ার জাহাজঘাট তজমুদ্দি পর্যন্ত খুব আরামের ভ্রমণ। তারপর অটোরিকশায় ভাঙ্গা রাস্তার ঝাঁকুনি খেতে খেতে আমরা দেড় ঘন্টায় মোক্তার ঘাট পৌঁছলাম।

মোক্তার খাল পেরিয়ে এবার আমাদের ওপারের নিঝুম দ্বীপ যেতে হবে। যাত্রী না থাকায় ট্রলার ছাড়তে দেরি হচ্ছিলো। নিরব অরণ্যের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা মোরগার (মোরগ) মাংস দিয়ে সেই বিকেলে দুপুরের খাবার খেলাম। সঙ্গে হোটেলের লাল চালের ভাত। পেটের জ্বালা আর খাবারের স্বাদ মিলে এক অসাধারণ লাঞ্চ হলো। আমরা ট্রলারে চেপে নিঝুম দ্বীপে যখন পা রাখি তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। নিঝুম দ্বীপের সূর্যাস্ত ভীষণ সুন্দর।

মোক্তার ঘাট নিঝুম দ্বীপ খেয়া পারাপারের মূলঘাট। মোক্তার ঘাট খেয়াঘাট থেকে ট্রলারে চেপে পাঁচ মিনিটে মোক্তার খাল পার হয়ে নিঝুম দ্বীপ। ট্রলার আমাদের যেখানে নামিয়ে দিল সে যায়গার নাম বন্দরটিলা বাজার। সেখান থেকে নিঝুম দ্বীপের মূল লোকালয় নামা বাজার অল্প রাস্তা। বাইকে চেপে বিশ মিনিটে চলে যাওয়া যায়। গোধূলিবেলায় আমরা মোটর সাইকেলের যাত্রী হলাম। রাস্তা ঠিক সাপের মত এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। কাচা রাস্তা নয়, ঢালাই করা পাকা রাস্তা। দুপাশে চোখ জুড়ানো সবুজ।

দু’চোখ যতদূর যায় শুধু কেওড়া গাছ। স্থানীয়রা কেওড়া গাছকে কাঁকড়া বলে। সরু পথ দিয়ে বাইক দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে। চলন্ত অবস্থাতেই দেখলাম গাছের নিচে পড়ে আছে অজস্র কেওড়ার ফল। বাইক চালককে ফলের কথা বলতেই বাইক দাঁড় করিয়ে দৌঁড়। ফল হাতে ফিরে আসলো সে।

দুটো ফল হাতে নিয়ে কামড় দিতেই হাত ছিটকে মাটিতে পরে গেল সেগুলো। টক কাকে বলে কেওড়ার ফলে কামড় না দিলে বোঝা কঠিন। ততক্ষণে প্রায় অন্ধকার ঘনিয়ে গিয়েছিলো। অন্ধকারে বাইকের হেডলাইটের আলো পেয়ে শত শত পোকা ও মশা আক্রমন করে বসল। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমরা নামা বাজার জেলা পরিষদ ডাক বাংলো অবকাশে গিয়ে পৌঁছলাম।

সে রাতে আমরা ভ্রমণের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম একটু তাড়াতাড়িই। পরদিন সকালটা শুরু হলো দারুণভাবে। পরিকল্পনা মত সূর্যোদয় দেখার জন্য আমরা ঘুম থেকে উঠলাম ভোর পাঁচটায়, তারপর হন্টন। পথ শোভা আর ধান ক্ষেতের শিশির বিন্দু দেখতে দেখতে চলে এলাম সূর্যোদয় পাড়ায়। অবশ্য সূর্যোদয় পাড়া পৌঁছানোর আগেই সূর্য উঠে গেল! আমরা কুসুম কুসুম সূর্য দেখি মুক্তিযোদ্ধা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা বাজারে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে সূর্যোদয় পাড়ায় বেশ ভালো কিছু সময় কাটে।

গ্রামবাসীর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ডেরায় ফিরলাম যখন, তখন সকাল ৮টা বাজে প্রায়। অল্প কিছুক্ষণ পরই আবার বের হলাম। এবার আমাদের গন্তব্য হরিণ দেখা। যাবো চর ওসমান, চর কমলা ও চর কবিরা। এখানে একটি তথ্য দিয়ে রাখি। নিঝুম দ্বীপের গ্রামগুলোর নাম খুব সুন্দর। মুক্তিযোদ্ধা, সূর্যোদয়, ছায়াবিথী, গুচ্ছগ্রাম, হাজীগ্রাম, মদিনা, বান্ধাখালি, ধানসিড়ি, আগমনি ইত্যাদি।

ঝকঝকে আবহাওয়ার সকাল। অবকাশ থেকে বের হওয়ার সময় এক ঝাঁক হাঁস দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। নামা বাজারের পূর্ব নির্ধারিত হোটেলে নাস্তা খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। সারাদিনের জন্য ট্রলার ভাড়া করা। ট্রলারে চড়ে বসতেই ট্রলার ছোট্ট খাল থেকে কয়েক মিনিটে আমাদের বিশাল মেঘনা নদীতে নিয়ে ফেললো। নাজিম অর্বাচিনের চোখে মুখে বিস্ময়। সেই বিস্ময় নিয়ে সে বলল, এ যদি নদী হয় তবে সিলেটেরগুলো ড্রেন!

আমরা চলছি তো চলছি। আকাশে মেঘ নেই, রোদেও তেজ নেই। আছে প্রবল বাতাস। সেই বাতাস গায়ে মেখে ইলিশ ধরা দেখতে দেখতে চলে এলাম চর কবিরাতে। কবিরার চরে ছোট ছোট কাঁকড়ার ছোটাছুটি। অবশ্য পাখি না দেখে নাজমুল স্যার হতাশ। নিস্তব্ধ কবিরার তীরে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। আবার পেছন ফিরে তাকালাম। এখানে গাছপালা কেমন যেন মলিন।

চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কেওড়াসহ বিভিন্ন গাছগাছালির বেহাল অবস্থা দেখে বেশিদূর যেতে ইচ্ছা করলো না। এখানে নদী তীরের গাছগুলো থেকে মাটি বা বালি সরে শিকড় বের হয়ে আছে। কিছু কিছু গাছ দেখে মনে হবে গাছগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যখন শুনলাম এখানে হরিণ নেই, তখন আর চর কবিরাতে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে হলো না। আমরা আবার ট্রলারের যাত্রী হলাম। ছুটে চললাম কমলার চরে।

অল্প কিছুক্ষণে কমলার খালে প্রবেশের মধ্য দিয়ে আমাদের কমলার চর যাত্রা শেষ হল। এখানে রাখাল গরুর পাল নিয়ে বিরাট মাঠে বসে আছে। আর মধ্যখানে মুগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি কেওড়া গাছ। আমরা কেওড়া গাছের ছায়ায় শেষ রসদ পিঠা ও কেওড়া ফল খেয়ে কেওড়ার বনে প্রবেশ করলাম।

গভীর বনে হাঁটছি। সামনে কি বোঝা যাচ্ছে না। লম্বা সব কেওড়া গাছের জন্য আকাশও দেখা যাচ্ছে না। এটা অবশ্য ভালোই হলো আমাদের জন্য। কারণ আমাদের সংগ্রহের পানি ফুরিয়ে এসেছে। রোদ পড়লে গরম লাগত, তৃষ্ণার্ত হতাম। হাঁটছি আর খুঁজছি হরিণ। পাশ থেকে নাজিম বলল ‘বড় আশা নিয়ে এসেছি জঙ্গলে হরিণ দেখবো বলে!’ কেওড়ার ফল খেতে খেতে পাশ থেকে রাসেলের প্রশ্ন আমরা কি নিরাশ হব? বাতিন নির্লিপ্ত! আমরা নিরাশ হয়েছিলাম সত্যি সত্যিই। নিঝুম দ্বীপের কমলার চর বা বন অংশে কেওড়া গাছ, হরিণের পায়ের ছাপ, কিছু হরিণের ফসিল ছাড়া হরিণ আমাদের চোখে পড়েনি।

আমরা প্রায় ১২ কিলোমিটারের মত জঙ্গলার পথে চলে হরিণ না পেয়ে যখন ফিরে আসি তখন সূর্য মাথার ওপর থেকে অনেক পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আবার কমলার খালে ট্রলারের যাত্রী হলাম। হরিণ না দেখলেও বুনো কুকুর, শেয়াল দেখেছি জঙ্গলে।হরিণের পায়ের ছাপ দেখে সে কী শিহরণ আমাদের! হতাশ নাজমুল স্যারের দেয়া সান্ত্বনা- ‘প্রকৃতির কাছে কিছু চাইতে হয় না, প্রকৃতি এমনিই দেয়। যখন দেয় হাত ভরে দেয়। হরিণ পাওনি, তবু অনেক প্রাপ্তি।’ স্যারের কথা শুনতে শুনতে পেয়ে যাই একটা ইলিশের নাও। জাল থেকে সবে ইলিশ খুলছে। সে অবস্থায় এক হালি গ্রেড ইলিশ (৮০০ গ্রাম বা তার বেশী ওজনের ইলিশকে গ্রেড ইলিশ বলে) কিনে নেই ১২০০ টাকায়। আমাদের নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে ইলিশ ধরা দেখা ও টাটকা ইলিশ ভাজা খাওয়াও জীবনের অনেক ঘটনার অন্যতম এক স্মরনীয় ঘটনা!

প্রয়োজনীয় তথ্য

নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে হাতিয়া চলে যান। লঞ্চ ফারহান ২ ও ৩ প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় ছাড়ে। হাতিয়ার তজমুদ্দি ভোর পাঁচটায় নেমে অটো রিকসা বা মোটরবাইকে চেপে দেড় ঘন্টায় চলে আসুন মোল্লার ঘাট। মোল্লার ঘাট থেকে ট্রলারে বন্দরটিলা ৫ মিনিটের পথ। সেখান থেকে ১৫ বা ২০ মিনিটে নামার বাজার। চাইলে তজমুদ্দি বা হাতিয়া জাহাজ ঘাট থেকে সরাসরি ট্রলারে নামা বাজার চলে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে নদীতে জোয়ার থাকলে সময় লাগবে দুই থেকে তিন ঘন্টা। ট্রলার ভাড়া নেবে রিজার্ভ চার হাজার টাকা। গরমের দিন হলে ট্রলার ভ্রমণ খুব কষ্টদায়ক, শীত হলে আরাম। এখানে খাবারের মান যেমন তেমন হলেও টাটকা মাছ ও দেশি মুরগির স্বাদ পাবেন। থাকার হোটেল আক্ষরিক অর্থে একটি। আছে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো অবকাশ ও বন বিভাগের বিশ্রামাগার। আর আছে এলাকার লোকেদের নিজস্ব কিছু আবাসিক ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বলতে সোলার আর জেনারেটর। জেনারেটর দেবে শুধু পানি তোলার জন্য। সুতরাং এসব সুবিধা অসুবিধার কথা ভেবে আর থাকার ব্যবস্থা করে তবেই নিঝুম দ্বীপের যাত্রী হবেন। চাইলে নোয়াখালি হয়ে বাসেও নিঝুম দ্বীপ যেতে পারেন। গ্রীষ্ম বর্ষার চেয়ে শীতকালই নিঝুম দ্বীপ বেড়ানোর মোক্ষম সময়। তবে যখন বা যেভাবেই যান না কেন, হাতিয়ায় মহিষের দধি খেতে ভুলবেন না!

নামা বাজার থেকে সোজা পথে ছোট্ট একটি সেতু পেরিয়ে আরো সামনে গেলে নিঝুম দ্বীপ সৈকতের দেখা মেলে। নিঝুম দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন চষে ফেরার সময় একবার হলেও সূর্যাস্ত দেখতে সৈকতে যাবেন।


ছবি: লেখক

/এনএ/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।