সন্ধ্যা ০৬:১২ ; রবিবার ;  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬  

ব্লগার-প্রকাশক হত্যা: উদয় হোক শুভবুদ্ধির

প্রকাশিত:

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী॥

ধর্মবাদীদের পদচারণায় ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের অবস্থা উত্তপ্ত। তালেবানের উত্থান শুধু পাকিস্তানে আর আফগানিস্তানে হয়নি, ভারতেও হিন্দু তালেবানের আবির্ভাব হয়েছে। বাংলাদেশে এক একটি হত্যার পর এক এক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে দায় স্বীকার করা হচ্ছে। বিদেশি নাগরিক হত্যা, চেকপোস্টে পুলিশ হত্যার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতি জড়িত থাকার খুবই আশঙ্কা আছে, তবে ব্লগার হত্যার ঘটনা যে ধর্মবাদীদের নিখুঁত কাজ, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ব্লগার-প্রকাশক হত্যার পেছনে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি আছে বলে আমার মনে হয় না।

সর্বশেষ ধর্মবাদীরা হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করেছে বইয়ের প্রকাশককে। ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক জাগৃতি প্রকাশনার মালিক ফয়সল আরেফিন দীপন এবং শুদ্ধস্বর প্রকাশনার মালিক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলকে তারা আক্রমণ করেছে তাদের স্ব-স্ব অফিসে। দীপন আজিজ সুপার মার্কেটের অফিসে একা ছিল। ধর্মবাদীরা তাকে অফিসে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করে নিরাপদে পালিয়ে গেছে। দরজা বন্ধ করে। আর লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের অফিসে টুটুল একা ছিল না। তারা একত্রে বসেছিল তিনজন। টুটুলের পাশাপাশি তার দুই বন্ধু তারেক ও রণদীপমকেও কুপিয়ে ছিল ধর্মবাদীরা। কিন্তু নিঃশেষ করতে পারেনি। তারা এখন হাসপাতালে, আশঙ্কামুক্ত।

দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে শোকে কাতর হওয়ার পরও তিনি বলেছেন যে, ‘আমি বিচার চাই না। হত্যাকারীদের শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই।’ তিনি আরও বলেছেন, এসব হত্যাকাণ্ড নিছক ধর্মীয় বিশ্বাস নয়। এর পেছনে আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই জড়িত।

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক একজন রাজনৈতিক বিষয়ের বিশ্লেষক ও কলাম লেখক। তিনি নিজেও ছেলে হত্যার পর নিজের জীবন নিয়ে আশঙ্কায় আছেন বলে খবরে দেখলাম। হয়তো কোনও এক সময় তিনি শোক কাটিয়ে উঠতে পারলে তার লেখায় আমরা তার অনুভূতি বিস্তারিত জানতে পারবো। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ পুত্রহারা শোকার্ত পিতাকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে কথাবার্তা বলেছেন। হানিফের কথা কাশেম সাহেবের কাছে হত্যাকারীর ছুরির আঘাতের চেয়েও বড় হওয়ার কথা। কারণ হানিফ পিতাকে পুত্রের হত্যাকারীদের রাজনীতির সমর্থক বানাতে চেয়েছেন। আমরা তার কথার নিন্দা করি এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে আহ্বান জানাবো এসব অবিবেচক লোককে দলের উচ্চপদ থেকে অপসারণের জন্য। কাণ্ডজ্ঞানহীন লোক দিয়ে পদ পূরণ করার চেয়ে পদ শূন্য থাকাই ভাল। সব কলাম লেখক, বুদ্ধিজীবী আওয়ামী লীগের ঢোল বাজাবে তা তো হয় না। অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক কখনও কখনও আওয়ামী লীগ সরকারের মৃদুমন্দ সমালোচনা করতেন। এজন্য হানিফ তাকে মৌলবাদী বানানোর চেষ্টা করবেন কেন! বৈচিত্র্যের মাঝেইতো সোন্দর্য।

ধর্মবাদীরা এখন অস্ত্র নিয়ে নেমেছে। চাপাতি নিয়ে নেমেছে। না হয় ইসলামের গৌরব রবি যখন মধ্যগগণে তখনও বহু বিষয়ে মতভিন্নতা নিয়ে তর্ক হয়েছে। মোতাজিলা সম্প্রদায় এবং আশারিয়া সম্প্রদায় সুদীর্ঘ এক শতাব্দীব্যাপী ইসলাম ধর্মের বিষয়ে বহু তর্কের অবতারণা করেছে। মোতাজিলারা মুক্তচিন্তার পক্ষের লোক। তাদের নেতা ছিলেন ইবনে রুশদ। তখন কিন্তু গলাকাটার সংস্কৃতির প্রচরণ ছিল না। চাপাতি দিয়ে  হত্যা ছিল না। মুতাজিলারা বলেছিল কোরআন সৃষ্ট। কিন্তু মদিনার মুহাদ্দেসরা প্রতিবাদ করে বলেছিলেন কোরআন সৃষ্ট নয়, কোরআন ও আল্লাহ অভিন্ন। আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর ক্ষমতায় থাকাকালে মুতাজিলাদের মতামতের সঙ্গে একমত ছিলেন। খলিফা মদিনার মুহাদ্দেসদের বাগদাদে ডাকালেন তাদের যুক্তি প্রমাণ হাজির করার জন্য। মদিনার মুহাদ্দেসদের পক্ষে মুহাদ্দেস আবদুল আজিজ বাগদাদ গেলেন।

বাগদাদের খলিফার প্রাসাদের সামনে বিরাট সভা হল। সভায় খলিফা আল মনসুর স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। মোতাজিলারা তাদের সব যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করলেন। তারপর প্রতিপক্ষ আবদুল আজিজকে তার বক্তব্য পেশের আহ্বান জানালেন খলিফা। খলিফাকে উদ্দেশ্য করে মুহাদ্দেস আবদুল আজিজ বললেন, খলিফা ও তার বুদ্ধি-প্রজ্ঞা এক কি-না? খলিফা তার জবাবে বললেন, হ্যাঁ, অভিন্ন। তখন আবদুল আজিজ বললেন, কোরআন আল্লাহর বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং আল্লাহ ও কোরআন এক ও অভিন্ন। সে কারণে এটি সৃষ্ট হতে পারে না। সেদিনই খলিফা আল মনসুর ও মোতাজিলারা এক বাক্যে তাদের ভুল স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এটাকেই ঐতিহাসিক খলকে কোরআনের বিতর্ক বলে। কেউ কারও মুণ্ডুপাত করেননি। কেউ ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দিতে হয়। অন্যের বক্তব্য শুনতে হয়। এই উপমহাদেশ থেকে মনে হয় সে সংস্কৃতি বিদায় নিচ্ছে। আর তাই যদি হয় তবে অন্ধকার নেমে আসতে বাধ্য। অজ্ঞানপ্রসূত কোনকিছু বা অসত্য কিছু ইসলাম নয়। ইসলাম নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো খুবই বেদনাদায়ক।

এদিকে হিন্দু জাগরণের নামে ভারতেও এক অসুর শক্তির আবির্ভাব হয়েছে। এই শক্তির প্রতিবাদের অপরাধে ধর্মবাদীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে সমাজকর্মী নরেদ্র দাভোলকর। বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী গোবিন্দ পানসারে, গবেষক এবং লেখক এম এম কলবুর্গি। তাদের অপরাধ তারা গোড়ামি এবং যুক্তিহীন ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিন্দুত্বে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন, প্রাচীনযুগে ভারতে শৈল্যবিদ্যার উন্নতি হয়েছিল চূড়ান্তভাবে, আর তাই প্রাচীন শৈল্যবিদরা গনেশের মাথায় হাতির মুণ্ডু স্থাপন করতে পেরেছিলেন। যে দেশের কবি, অর্থনীতিবিদ জ্ঞানের চূড়ান্ত বিকাশমান ধারার কারণে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর এ কথা কি শোভা পায়! এ ধর্মন্ধতা পরিহারের উপায় কী!

কোনও দেশেই রাজনীতিবিদরা জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন না। তাই বলে প্রতিবাদের স্বর থেমে থাকবে তাও হয় না। ব্যক্তিগত থেকে সমবেত-এর দিকে আগায় যে কোনও প্রতিবাদ। সুতরাং প্রতিবাদের ভাষা ও পথ মুষ্টিমেয়কে বেছে নিতে হবে। তাই বলে ফেসবুক, টুইটারে মুষ্টিমেয় ক’জন স্ট্যাটাস দিলে হবে না। সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ করে সবার শুভবুদ্ধির জাগরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ভারতে ইংরেজ রাজত্বের সময় মাওলানারা যখন ইংরেজি শিক্ষা হারাম বলে ফতোয়া দিয়ে ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়কে আল্লাহর ভয় দেখিয়ে পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছিলেন তখন স্যার সৈয়দ আহমেদ আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে মাওলানাদের সেই কালো পাহাড় ভেদ করে, মুসলমানদের দুর্দশা গুচিয়ে তাদেরকে আধুনিককালের লোকদের সঙ্গে সহজে মেশার সামর্থদানের সাধনা করেছিলেন। ঠিক সে রকম আজকেও কিছু মহৎ লোককে স্যার সৈয়দ আহমদের মতো এগিয়ে এসে মুসলমানদেরকে ধর্মান্ধতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্য হাল ধরতে হবে। তাদেরকে পরমত সহিষ্ণুতা শেখাতে হবে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।