সকাল ১০:৫৫ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

যথেষ্ট!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

নাদীম কাদির।।
আমি কাঁদছি। আমি শোকগ্রস্ত। আমি বিক্ষুব্ধ। আমি আমার বন্ধুকে হারিয়েছি আর বাংলাদেশ হারিয়েছে এক মুক্তচিন্তক, প্রগতিশীল ও উদার সন্তানকে। যদি আল দক্ষিণ এশিয়া আল-কায়েদার দাবি সত্য হয় তাহলে এতে তার কোনও অপরাধ নেই, অপরাধ আমাদের শান্তিপূর্ণ ধর্মের নামে কুৎসিত মুখোশধারীদের।
জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপন তার ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটের কার্যালয়ে অজ্ঞাত আততায়ীদের হাতে নিহত হয়েছেন। তবে সব ইঙ্গিত দেখে এটা স্পষ্ট যে সব হত্যাকাণ্ডেরই উৎস এক।
এটা সত্য যে ব্লগারদের নিয়ে বিতর্ক রয়েছে যে তারা কারও কারও ধর্মীয় অনুভূতিকে আহত করেছেন, যা তাদের করা উচিত নয়। বাংলাদেশের আইনেও যে কোনও ধর্মকে আঘাত করে এমন মন্তব্য করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
কিন্তু দীপন ও অন্যান্য প্রকাশকরা তো কেবল সাদাকালো অক্ষরের বই ছেপেছেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। তা কেমন করে অপরাধ হয়? যুদ্ধ নিয়ে লেখা অথবা আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছুটা সমালোচনা করে লেখা বই প্রকাশ করা কি অপরাধ?
ইসলাম ভালোবাসা ও শান্তির ধর্ম। যেভাবে দীপন ও অন্যান্যদের হত্যা করা হয়েছে তা সমর্থন করে না ইসলাম।
ঘটনাটি স্পষ্ট- এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আল্লাহর ইচ্ছায় হতভাগ্য দীপন বাদে বাকিরা বেঁচে গিয়েছে।
আমার বন্ধু টেলিভিশন সংবাদ প্রযোজক রফিকুল ইসলাম রাউলি ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমাকে দীপনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আজিজ সুপার মার্কেটে দীপনের কার্যালয়ে আমাদের দেখা হয়। দীপন বলেছিল সে আমার ৩৬ বছরের অনুসন্ধানে বাবার কবর খুঁজে পাওয়া এবং দেশের স্বাধীনতায় আমার বাবার অজানা অবদানের ওপর একটি বই প্রকাশ করতে আগ্রহী।  
শুনে আমি পুলকিত হয়েছিলাম। আমি তার কাছে স্বীকার করেছি, আমি ভীষণ অলস। উপরন্তু বাংলা ভাষায় আমার দখল কম, আমি লেখকও নই বরং একজন সাংবাদিক মাত্র।
ভীষণ মার্জিত ও ভদ্র দীপন খুব কোমলভাবে বললেন, ‘নাদিম ভাই, আপনার নোটগুলোই আমাকে দিন। এই বইটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। আপনি যদি না লেখেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের একটি অজানা অধ্যায় পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।’
এরপর তিনি আমাকে নিজের প্রকাশনীর প্রকাশিতব্য বইয়ের একটি তালিকা দেন যে বইগুলো ২০১৫ সালের বাংলা একাডেমির বইমেলায় প্রকাশ হবে।
আমি সম্মত হই। তবে আমি তাকে যা দিয়েছিলাম তাকে ঠিক পাণ্ডুলিপি বলা চলে না। সেসব ছিল কিছু ছবির সঙ্গে আমার লেখা কিছু নোট। তিনি সেসব পড়ে কিছু কিছু অংশে খানিক বিশদ করে লেখার অনুরোধ করেন। 
এর মধ্যে একটি অংশে সাংসদ ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলামের একটি সাক্ষাৎকার ছিল। মেজর রফিক তার ব্যস্ততার মাঝে আমাকে সময় দিলে তাদের গুলশান অ্যাপার্টমেন্টে আমি সাক্ষাৎকার নিই এবং মেজর রফিক ও মিসেস রফিকের সঙ্গে একটি ছবি তুলি।
দীপন বইটি সম্পাদনা করেন ও এর লেআউট তৈরি করেন। বইটির নাম দেওয়া হয় ‘মুক্তিযুদ্ধ: অজানা অধ্যায়’। বইমেলায় বইটির বিক্রি দেখে দীপন খুব সন্তুষ্ট হন। তখন আমি তাকে বললাম যে এই কৃতিত্ব পুরোটাই তার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বই ছাপা হওয়ার পর উনি আমাকে ভরপেট খাওয়ালেন, যেখানে আমারই তাকে খাওয়ানোর কথা! তিনি কোনমতেই তাতে রাজি হননি, বারবার আমার প্রতি তার সম্মান ও পছন্দের কথা জানাতে থাকেন।
এ বছরই সেপ্টেম্বর মাসে আমরা তার লন্ডন সফর নিয়ে আলোচনা করি। সে সময় একটি বইমেলা চলবে যেখানে আমার বইয়ের দ্বিতীয় ও বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করা হবে। সেটি ছিল বাংলায় লেখা আমার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমি তাকে কথা দেই যে আমি ২০১৬ সালের মধ্যে পরিমার্জনের কাজটুকু শেষ করবো, তাকে এ-ও বলি বইটি পাঠকদের হাতে আসতে আসতে ২০১৭ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
কিছুদিন আগে তিনি তার নতুন করে সাজানো অফিস ও শো-রুমের ছবি পোস্ট করেন। ছবি দেখে আমার খুব ভালো লাগলেও আমি জানতে চাই তার অফিসে কোনও কর্মচারী নেই কেন, ভেতরে আলোই বা এত কম কেন। এ প্রশ্নের কোনও উত্তর আমি পাইনি।
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে যদি তার কার্যালয়ে কিছু কর্মচারী থাকতো তাহলে আততায়ীরা তাকে এভাবে হত্যা করতে পারতো না। অনেকেই হয়তো বলবেন, আমাদের কি নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে? হ্যাঁ, যখন কেউ এমন একটি ব্যবসায় যুক্ত থাকে যা শত্রু তৈরি করতে পারে, তখন তা করাই উচিৎ। সঙ্গে রাষ্ট্রের কাছেও নিরাপত্তা দাবি করা উচিৎ। সে যা-ই হোক, এই মুহূর্তে তা আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি দীপনের সঙ্গে আমার আলাপের স্মৃতিগুলো সবাইকে বলতে চাচ্ছিলাম।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য সাধারণ আদালতে সম্পন্ন করেছেন, কোনও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও তাই। লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যতই মরাকান্না করুক আমরা সত্য ভালোই জানি।
কিন্তু আর কতদিন! এখন আমাদের এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের জন্য বিশেষ সামারি ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। সাধারণ হোক অথবা জঙ্গি- দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সমালোচকরা এ ধরনের ট্রাইব্যুনালের বিষয়ে মায়াকান্না করতে পারে, মানবাধিকারের লঙ্ঘন দাবি করতে পারে। কিন্তু সমালোচনা করতে পারলে এমন বিচার ও শাস্তি মেনে নিতে জানতে হবে।
ব্রিটেন, ইইউ অথবা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবশ্যই সমর্থন করবে। কেননা ন্যায়বিচার দাবি করে কিভাবে তা করা হবে তা বলে দেওয়া মানায় না। যারা দীপনকে হত্যা করেছে তারা তো মানবাধিকার নিয়ে মাথা ঘামায়নি, তবে আমরা কেন তাদের মানবাধিকার নিয়ে চিন্তিত হবো?
বিরোধী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহেরকে অন্যায়ভাবে সামারি মিলিটারি আদালতে বিচার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন। তখন মানবাধিকারের প্রশ্ন কোথায় ছিল?
কর্নেল তাদের ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়ে একটি পা হারিয়েছিলেন। আইন অনুযায়ী কোনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝোলানো যায় না। কিন্তু এই যোদ্ধা শত্রুতার শিকার হন। তার আত্মা শান্তি পাক।
বন্ধু দীপন, আপনার আত্মা শান্তি পাক। আমার বইয়ের প্রথম সংস্করণটি উৎসর্গ করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। কথা দিচ্ছি, দ্বিতীয় সংস্করণ আপনাকেই উৎসর্গ করবো।

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।