বিকাল ০৪:৪৭ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯  

শুধু কথা নয়, কাজ করুন, জনগণকে আশ্বস্ত করুন

প্রকাশিত:

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা॥

সমাজ প্রগতির কথা বলার গতিকে স্তব্ধ করে দিতে লাগাতার খুনের দীর্ঘ মৃত্যুমিছিলে সবশেষ নাম ফয়সাল আরেফিন দীপন। যারা সংবেদনশীল তারা স্তম্ভিত। যারা সবকিছুতেই রাজনীতি দেখেন তারা কূট তর্কে ব্যস্ত।

যা হয়, তা হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে তরুণরা ফেটে পড়ছে। যারা একটু পরিণত বয়সের তারা হতাশ। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সঠিক তদন্ত ও বিচারের দাবির পাশাপাশি এসেছে সেক্যুলার লেখকদের নিরাপত্তার দাবি। বাংলাদেশের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, যেন আরেক একাত্তর উপস্থিত তাদের সামনে, যখন প্রতিক্রিয়াশীল খুনিচক্র তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে একের পর এক খুন করেছিল।

মানুষের ভাবনাটা, বিশেষ করে হালুয়া রুটির ভাগাভাগিতে না গিয়ে যারা দেশটাকে নিয়ে ভাবেন, তাদের কাছে প্রশ্ন আজ এ কি শুধু মৃত্যুরই মিছিল, নাকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ? অবশ্যই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ যুদ্ধ। প্রশ্ন উঠে তাহলে রাষ্ট্র এত নীরব আর নির্লিপ্ত কেন? লেখার জবাবকে যারা পাল্টা লেখায় দিতে পারে না, সেই খুনি গোষ্ঠী চাপাতি হাতে নিয়েছে-যারা দীর্ঘ সময় রগ কাটার প্রশিক্ষণ পেয়েছে। শান্তিপ্রিয় কলমপ্রিয়দের যারা এমন নৃসংশভাবে হত্যা করতে পারে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের কি কোনও কোমল দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে? কিন্তু মনে হচ্ছে কোথায় যেন একটা প্রশ্রয় আছে।

আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান আর আফগানিস্তান অনেক আগেই যুক্তিহীন খুনি দলের দখলে গেছে। ভারতেও ইদানীং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে বাংলাদেশের মানুষকে কখনও ধর্ম দিয়ে কাউকে বিবেচনা করতে দেখা যায়নি, যারা মানবিকতা দিয়েই জনম জনম ধরে বিবেচনা করে আসছে, সেই মাটিতে আজ আবার রক্তের হোলি খেলা। যে খেলাটা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ স্বাধীনের পরপরই।

হয়নি, বরং নতুন করে শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হতে না হতেই। যে বিচার জনগণের রায়ে নির্ধারিত, সেই বিচারে কোনও সময়ক্ষেপণ, কোনও শৈথিল্য যেমন মানুষ দেখতে চায় না, তেমনি চাচ্ছে না এর বিরোধী শক্তি আর তার দোসরদের সাথে কোনও খেলাখেলি হোক।

রাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিভিন্ন দল ও আদর্শের দ্বন্দ্ব আছে, প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু খুনির দল আজ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে এক অস্তিত্ব সংকটে নিক্ষেপ করেছে। যারা রাজনৈতিক কারণে দেশে বিদেশ বসে এসব কাজকে সমর্থন দিচ্ছেন তারা ভাবতেও পারছেন না, এরা তাদেরও ছাড়বে না।

এক দলের হাতে কলম, মাথায় বিবেক আর যুক্তি, আরেক দলের হাতে চাপাতি, অস্ত্র আর মাথায় খুনের চিন্তা। এমন দোটানায় সমাজের প্রগতি চাওয়া মানুষের বৃহত্তর ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এরা বহু ধারা আর মতে বিভক্ত। ফলে আততায়ীরা ভাবতে শুরু করেছে রাষ্ট্র তাদের কাছে হেরে যাচ্ছে। যাদের হত্যা করা হচ্ছে তারা সরাসরি কোনও দল করতেন না, কিন্তু তালিকাটি দেখলে বোঝা যায় স্বাধীনতার বিরুদ্ধবাদীদের কাছে এরা স্বাধীনতাপন্থী কর্মীদের চেয়েও কত বড় আতঙ্ক। তারা জানে হালুয়া রুটি, লাইসেন্স পারমিটের জন্য যারা রাজনীতি করে, জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে যারা অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে তাদের ভোল পাল্টাতে সময় লাগবে না। পাল্টাবে না শুধু এরা।

এই হত্যাকাণ্ডলো জঙ্গিরাই চালাচ্ছে, নাকি কোনও রাজনৈতিক শক্তি করছে এ নিয়ে রাজনীতির সময় নেই। সেক্যুলার বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা দিতে চাইলে জননিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। অবিচার বা বিচারহীনতার ধারণা একবার জনমনে স্থায়ী হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকট ত্বরান্বিত হতে বাধ্য। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের অস্তিত্ব ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। জাতির জনকের হত্যার সাথে সাথে বাংলাদেশ হাঁটল পৃথিবীর বিপজ্জনক দর্শন পাকিস্তানের পথে (পাকিস্তান কোনও রাষ্ট্র নয়, একটি খুনি দর্শন)। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, অথচ দেশ শাসনের নামে জিয়াউর রহমান দেশে পাকাপোক্ত করেছেন স্বাধীনতাবিরোধী দর্শন আর শক্তিকে, যা অব্যহাত রেখেছেন আরেক সামরিক শাসক এরশাদ। যে জাতি স্বাধীনতার জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করলো, তার সব ত্যাগকে অবজ্ঞা করে, সেক্যুলার মুক্তচিন্তার পরিবেশকে ছুড়ে ফেলে দিল এরা। বাংলাদেশের মানুষ আবার সেক্যুলার দলকে ক্ষমতায় এনেছে, কিন্তু তারাও পুরোপুরি সেপথে নেই, হয়তো বাস্তব কারণেই পুরোপুরি সেপথে হাঁটতে পারছে না।

কেমন বাংলাদেশ আমরা চাই- এমন প্রশ্নের উত্তর একটাই, মুক্তচিন্তার বাংলাদেশ চাই। আর যারা এখন দেশ চালাচ্ছেন তাদের কাছে চাওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বিচারে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যায় না। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বিদেশি খুন, চেকপোস্টে পুলিশ খুন, হোসনি দালানে বোমা হামলা এবং সর্বশেষ প্রকাশক খুনের ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যাই দাবি করুন না কেন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দেশবাসী ভীত। সংঘবদ্ধ সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর এই কিলিং মিশনের অগ্রযাত্রা শুধু কথার ফুলঝুরিতে থামানো যাবে না।

সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে জননিরাপত্তার প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটা প্রত্যাশা। কিন্তু সরকার তা না করলে কী হবে তা আশা করি যারা দায়িত্বে আছেন তারা ভাববেন। কিন্তু ভাবনার বিষয় যে, নিরাপত্তাহীনতার এই আতঙ্কের ঢেউ দেশের মানুষকে ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো একটি সহনশীল রাষ্ট্র, যেখানে নানা মত ও ধর্মের মানুষের মিলেমিশে বসবাসের সংস্কৃতি বিদ্যামান; সেই দেশে এই ধরনের পরিস্থিতি আর একটি দিনের জন্যও চলতে দেওয়া যায় না। যারা দায়িত্বে আছেন কথা কম বলে যদি কাজটি করেন জনগণ আশ্বস্ত হয়।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।