রাত ১১:৪৮ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ জুলাই, ২০১৯  

বিএনপি ঘিরে পরিকল্পনা সফল হলে মধ্যবর্তী নির্বাচন!

প্রকাশিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট।।

প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে কোণঠাসা করতে অাবারও সক্রিয় হয়েছে অাওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকার। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘বিএনপি ভাঙা’র যে তৎপরতা করা হয়েছিল, সেটি অারও নিপুণ গতিতে এগিয়ে চলছে। বিএনপিকে কাবু করতে এই মুহূর্তে দুটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। এ দুটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সাপেক্ষেই আগামী বছরের শেষ বা ২০১৭ সালের শুরুতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তা-ভাবনা অনেকটা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো হচ্ছে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর যে প্রয়াসটি বিগত ছয় মাস অাগে ছিল, সেটি এখন নতুনভাবে চালু করে প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ অন্তত ১৫০ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলোর রায় ঘোষণা করে তাদের নির্বাচনে অযোগ্য করা। এই দুটি পরিকল্পনার একটিও বাস্তবায়ন সম্ভব হলে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করবে সরকার। প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার বিএনপিকে কেন্দ্র করে দুটো পরিকল্পনা বহু আগেই হাতে নিয়েছিল। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ষড়যন্ত্র করে তারা।

বিএনপি নেতা আযম খান মনে করেন, ম্যাডাম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ অন্তত ১৫০-২০০ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্বাচনে যারা নিশ্চিতভাবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হবেন, তাদের নামে মামলা করে এবং এই মামলাগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদেরকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। এই ষড়যন্ত্র থেকেই অন্যায়ভাবে একের পর এক মামলা দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সরকারের ভেতরে অনেক দিন আগে থেকে বিএনপিকে খণ্ড-বিখণ্ড করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। যদিও তারা সফল হতে পারেনি। এমনকি ভবিষ্যতেও সফলতা পাবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আহমেদ আযম খান।

ভাঙন ধরানোর চেষ্টা আবার শুরু

চলতি বছরের মাঝামাঝি বিএনপি অভিযোগ করেছিল, তাদের দল ভাঙতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। যদিও ওই সময় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

গত রোজার ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হচ্ছে বিএনপি। সেজন্য একে শেষ করতে তারা (সরকার) উঠে পড়ে লেগেছে।’ ওই সময় মোহাম্মদ নাসিম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, ‘সরকার কেন বিএনপিকে ভাঙতে যাবে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করবে কেন? ওবায়দুল কাদের জানান, বিএনপি যদি কখনও ভাঙে বা ভাঙনের সুর বাজে, সেটির জন্য দলের নেতাদের অন্তর্কলহই দায়ী।

যদিও সম্প্রতি বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরী রাজনীতি থেকে অবসর নিলে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, তার মতো অনেকেই বিএনপি ছাড়বে।

 

প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাটির সূত্র দাবি করে, বিএনপিকে ভাঙার উপরেই নির্ভর করছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা। কোনও না কোনওভাবে বিএনপিতে চিড় ধরানো গেলেই সরকার নির্বাচনে যাবে। এ লক্ষ্যে ফের তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে সূত্রটির দাবি, তৎপরতা সব সময়ই চলেছে। এক্ষেত্রে দল থেকে বের করে আনা না গেলেও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের তুষ্ট করে এ পদ্ধতি চলমান রয়েছে। তুষ্ট করার ক্ষেত্রে কাউকে ভয়-ভীতি, অর্থ, ব্যবসার লোভ দেখিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন তার গুলশানের বাড়ি রক্ষায় গণমাধ্যমে এবং দলে নিজের অনুপস্থিতি ধারাবাহিক করে রেখেছেন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ এক নেতার মাধ্যমে মামলা নিশ্চল রাখার শর্তে সব সময় ঘরে বসেই সময় কাটাচ্ছেন স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য। ব্যবসা ঠিক রাখতে যুবদলের শীর্ষ এক নেতা নিজেকে কৌশলে ব্যস্ত রেখেছেন। এমনকি তিনি কয়েকবার গ্রেফতার হলেও থানায় উৎকোচ দিয়ে আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন।

গোয়েন্দা সূত্রটি মনে করে, কোনওভাবে বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে কেন্দ্র করে নামকাওয়াস্তে পাল্টা বিএনপি গঠন করতে চায় সরকার। এ কারণে নতুন করে জিয়াউর রহমানের আপন ভাই আহমেদ কামালকে সক্রিয় করা হয়েছে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলেও বুধবার তিনি জিয়া পরিবারের জন্য মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে।

এর আগেও বিগত নির্বাচনের আগে আসল বিএনপি গঠন করেছিলেন কামরুল হাসান নাসিম। তার দাবি, তিনি বিএনপির মধ্যকার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ফেরত আনার জন্য কাজ করছেন। তার মতে, নতুন কাউকে ধরে যারা নতুন কিছু করতে চাইছেন- সেই প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়বে।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আহমেদ আযম খান মনে করেন, বিএনপির কোন নেতাকে তুষ্ট করে রাখা হয়েছে- এমন খবর তার কাছে নেই। পাশাপাশি সরকার বিএনপির কাউকে ব্যবসা দিচ্ছে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- বিএনপির লোকজন দিনে দিনে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হচ্ছে। এরপরও কাউকে হয়তো ম্যানেজ করে বিএনপিতে স্যাবোটাজ করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে এসব কিছু ম্যাডাম খালেদার নেতৃত্বে দূর হয়ে যাবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে.জে. মাহবুবুর রহমান বলেন, তিনি বিএনপিকে ভাঙার মতো কোনও কারণ দেখেন না। তবে তিনি মনে করেন, সরকার বিএনপিকে ভাঙার জন্য এ ধরনের প্রপাগান্ডা চালাতে পারে। মানসিকভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যে সরকার এসব করবে।

খালেদা-তারেকসহ শীর্ষনেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য করার চিন্তা

দলীয়সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৫, তারেকের বিরুদ্ধে ১৭ এবং তারেকের স্ত্রী জোবায়দার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খালেদা জিয়ার একটা ছাড়া বাকি সবগুলো নিষ্পত্তি। দুটি মামলা পেনডিং আছে যেটির রায় হয়েছিল, সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে লিভ টু অাপিল করেছেন খালেদা জিয়া। তারেক রহমানকে যে মামলায় খালাস দেওয়া হয়েছে, একটি মামলায় অাপিল করা হয়েছে। এছাড়া জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত অায় বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের একটি মামলার বিচারকাজ শুরু হবে। কোর্ট বদলের ফলে যেটি স্থগিত ছিল, সেটি এখন শুরু হবে।

গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, খালেদা জিয়া দেশে ফিরলেই রায়গুলো পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের মনোভাবের ওপর। তবে বিএনপিনেতা সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান মনে করেন, চাইলেই তো আর সাজা দেওয়া সম্ভব না।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন দাবি করেন, এসব মামলা আদালতে টিকবে না। কারণ একই মামলা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নামেও ছিল। তিনি মুক্ত হলে খালেদা জিয়া কেন হবেন না?' যতই মামলা দেওয়া হোক না কেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খালেদা জিয়া সংগ্রাম করে যাবেন। খালেদা জিয়া ও বিএনপির ওপর রাজনৈতিকভাবে চাপ তৈরির জন্যই এসব মামলা।

সূত্রমতে, যেকোনও উপায়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ সক্রিয় ও নির্ভরযোগ্য নেতাদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে নির্বাচনে অযোগ্য করা হবে। এক্ষেত্রে পুরো বিএনপিতেই হতাশা নেমে আসবে। ইতোমধ্যে মঙ্গলবার আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দলটির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, কারাগারে প্রেরণের কারণে মির্জা ফখরুলের কিছু হলে দায় সরকারকে নিতে হবে।

দুই কৌশলে সাফল্য এলেই মধ্যবর্তী নির্বাচন!

বিএনপিকে কেন্দ্র করে দুই কৌশলের কোনও একটিতে সাফল্য আসলেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিনক্ষণ জানাবে সরকার। এ নিয়ে গোয়েন্দারা মনে করছেন, সরকারকে একটি নির্বাচন দিতেই হবে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ধারাবাহিক রাখতে হলে ফেয়ার ইলেকশানে যেতেই হবে সরকারকে। এ ধরনের চাপ পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বরাবরই ছিল, এখনও সেটি আছে। তবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের সূত্র ধরে এ চাপ পাশ কাটিয়ে বর্তমান কার্যক্রম আরও দুবছর এগিয়ে নিতে চায় সরকার।

সূত্রের দাবি, সরকারের সবচেয়ে সাফল্য অর্জিত হয়েছে একটি প্রভাবশালী বাহিনীকে নিজেদের করায়ত্বে নিয়ে আসায়। রাজনৈতিক মহলে এতদিন ওই বাহিনী সম্পর্কে আওয়ামী লীগ বিরোধী মনোভাবের বিষয়টি থাকলেও এখন সেটি একেবারেই নেই। এ কারণে স্বয়ং খালেদা জিয়া লন্ডনের ঘরোয়া সভায় ফের বিডিআর বিদ্রোহের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। এতে করে তিনি আবারও ওই বাহিনীতে বিষয়টিকে সামনে আনতে চান।

সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের তৎপরতা অাগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক। এটি পরিষ্কার হয়েছে যে, সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে লন্ডনে খালেদা জিয়ার সমাবেশ ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে গত সপ্তাহে খালেদা জিয়া একটি হোটেলেই আলোচনা সভা করেন।

সূত্রের দাবি, পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিশালী একটি দেশ বিএনপিকে পাশে টানলেও উপমহাদেশীয় অঞ্চলে ভারতকে ডিঙিয়ে কোনও কিছু করা অনেকটা অসম্ভব। এ কারণে ভারতের তুষ্টতা অর্জন করেই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাবে পশ্চিমাদেশগুলো।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার মন্তব্য জানতে চাইলেও তারা কোনও মন্তব্য করেননি।

/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।