সকাল ১১:২০ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

হানিফদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক

প্রকাশিত:

প্রভাষ আমিন।।

মাহাবুব উল আলম হানিফ নিশ্চয়ই খুব আনন্দিত। রাজনীতিবিদরা সবসময় কাভারেজ চান। তারা এমন কিছু বলতে চান,যা মিডিয়া লুফে নেবে, পাবলিক খাবে। আগে যখন সৈয়দ আশরাফ নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তখন হানিফই আওয়ামী লীগের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতেন। তখন প্রতিদিন আওয়ামী লীগের কোটায় তার কাভারেজ নিশ্চিত ছিল। সৈয়দ আশরাফ নিজে সক্রিয় হয়ে যাওয়ার পর হানিফ একটু আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। সেই আড়াল থেকে বেরিয়ে আসার মোক্ষম একটি উপায় খুঁজছিলেন তিনি। পেয়েও গেলেন।

রবিবার বাংলাদেশের সকল টিভি, সকল টকশো, অনলাইন, আজকের সকল দৈনিকে হানিফের নিউজ। আর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক তো হানিফময়। তবে গণমাধ্যমের কাভারেজ দেখে হানিফ যতটা খুশি হবেন, সামাজিক মাধ্যমের কাভারেজ দেখে ততটা নাও হতে পারেন। সামাজিক মাধ্যমের তো আর কোনও সম্পাদক নেই। তাই সেখানে ক্ষুব্ধ মানুষজন তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ইচ্ছামতো। যার অনেকগুলো হানিফ সাহেবের পছন্দ নাও হতে পারে। হানিফ সম্পর্কে ফেসবুকের অনেক ভাষা কখনওই কোনও গণমাধ্যমে প্রকাশযোগ্য নয়। হানিফ সাহেবের চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধার করা হচ্ছে ফেসবুকে। তবে হানিফ সাহেব খুশি হতে পারেন এই ভেবে যে, নেতিবাচক কাভারেজও একধরনের কাভারেজই। নাম তো ফাটলো।

 

গত শনিবার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে নিজের অফিসে নৃশংসভাবে খুন হন জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপন। একজন পিতার কাঁধে সবচেয়ে ভারি তার সন্তানের লাশ। সেই ভার কাঁধে নিয়েও বিবেচনা বোধ হারাননি তার পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। পিতা হিসাবে সন্তানের লাশ সনাক্ত করে আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছিলেন ‘আমি কোনও বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।’ কিন্তু তার কথায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘প্রতিবাদহীনতার এই সময়ে বিচার না চাওয়ার চেয়ে বড় প্রতিবাদ আর  নেই।’ কিন্তু এই প্রতিবাদটুকু বোঝার মতো জ্ঞান হানিফ সাহেবদের নেই। মাহাবুব-উল আলম হানিফ সন্তান হারানোর শোকে বিহ্বল আবুল কাসেম ফজলুল হককে আক্রমণ করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাষায়।

হানিফ বলেছেন ‘হত্যাকারীদের আদর্শে বিশ্বাসী বলেই পুত্র দীপন হত্যার বিচার চাননি বাবা আবুল কাসেম ফজলুল হক।’ হানিফ বলেছেন ‘আমি অবাক হয়েছি। আমার মনে হয়,যারা এই খবরটি পড়েছে সবাই অবাক হয়েছেন। একজন পুত্রহারা পিতা সন্তানের হত্যার বিচার চান না,এটা বাংলাদেশে প্রথম। পৃথিবীতেও এমনটা আমি দেখিনি। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ওনার দলের লোকজনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান না বলেই তিনি এ ধরনের কথা বলেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। আমিও একজন বাবা। বাবা হিসেবে আমি নিজেও লজ্জিত তার বক্তব্যে।’ একজন রাজনীতিবিদ বা একজন মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারেন, হানিফ সাহেবের বক্তব্য নিজ কানে না শুনলে আমি বিশ্বাস করতাম না।

হানিফ সাহেব যে এই প্রথম এমন বেফাঁস কথা বললেন,তা নয়। তিনি প্রায়শই দল ও সরকারকে ডোবোতে পারে এমন বক্তব্য দেন। এর আগে তিনি প্রয়াত সাংবাদিক ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ এ বি এম মুসার একটি বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে তাকে অত্যন্ত নিচু ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। মাহাবুব-উল হানিফ ছিলেন কুষ্টিয়ার উপজেলা পর্যায়ের নেতা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোট করার স্বার্থে তার আসনটি ছেড়ে দিতে হয় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে। ক্ষতিপুরণ হিসেবে তিনি পান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারির পদ। আর আওয়ামী লীগে পান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ। ব্যস কুষ্টিয়ার উপজেলা থেকে সরাসরি কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে। আর সৈয়দ আশরাফের নিষ্ক্রিয়তার সুবাদে বিকল্প সাধারণ সম্পাদকের মতো দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তবে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন,দায়িত্ব শুধু পেলেই হয় না,তা পালন করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। আর সে যোগ্যতা রাতারাতি অর্জন করা যায় না। একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। খালি বলতে হয়,হানিফের মতো বেফাঁস কথা বলার লোক দলে থাকলে আওয়ামী লীগের নৌকা ডুবাতে আর বিরোধী দল লাগবে না।

হানিফ বরং আবুল কাসেম ফজলুল হকের কাছে শিখতে পারেন। কিভাবে সন্তান হারানোর পরও দৃঢ়তার সাথে বিবেচনা বোধ থেকে কথা বলতে হয়। মর্গ থেকে সন্তানের লাশ গ্রহণ করে সন্তান হত্যাকারীদের বিচার না চাওয়া প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন,ক্ষোভ থেকে তিনি ওই বক্তব্য দেননি, বলেছেন নিজের বিবেচনাবোধ থেকেই। তিনি বলেন, কেবল আইনের বিচারে একের পর এক হামলা বা হত্যার সমাধান হবে না, এ সঙ্কট থেকে বাঁচতে আদর্শগত,রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। দেশের ভেতর যদি শুভ বুদ্ধির উদয় হয় তাহলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। বিচার দিয়ে আইন আদালত দিয়ে আমরা শাস্তি দিতে পারি একজনকে। কিন্তু জাতীয় উন্নতি দরকার। আমি শুভ বুদ্ধির জাগরণ চাই। সমাজে, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে।’

আরেকটা ব্যাপার নিয়ে আমরা রীতিমত বিভ্রান্ত। বাংলাদেশে জঙ্গি আছে নাকি নেই? এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। ব্লগার খুন হলে শুনি জঙ্গীরা এই কাজ করেছে। কিন্তু বিদেশি খুন হলে শুনি দেশে আইএস নেই। সুবিধামতো আমরা নিজেদের খোলস পাল্টে নেই। কিন্তু আমরা যতই অস্বীকার করি,যে নামেই হোক বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ছিল এবং আছে। সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা,শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা,রমনা বটমূলে বোমা হামলা,উদীচির সমাবেশে বোমা হামলা,গির্জায় হামলা,বিচারক হত্যা,বাংলা ভাইয়ের তাণ্ডব- বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। বর্তমান সরকার জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে তৎপর বলে,ইদানিং প্রকাশ্যে তাদের দেখা যায় না বটে। কিন্তু বারবার ঘোষণা দিয়ে,তালিকা করে মক্তমনা ব্লগারদের হত্যা করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে তারা এখনও কম শক্তিশালী নয়। জেএমবি,হুজি,হিযবুত তাহরীর,আল কায়েদা,আইএস বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম- যে নামেই হোক তারা তাদের লক্ষ্যে অবিচল। আমার ধারণা বাংলাদেশে জঙ্গি গোষ্ঠী একটাই। বিভিন্ন সময় তারা পুলিশী আক্রমণ থেকে বাঁচতে খোলস পাল্টায় বা বিভিন্ন নাম ধারণ করে। কিন্তু আমি বারবার অবাক হই, এই ভাবে জঙ্গিরা একের পর এক মুক্তমনা লেখকদের হত্যা করবে,আর সরকার তাদের কারও টিকিটিও ছুতে পারবে না,এটা হতে পারে না।

তালিকা দিয়ে একের পর এক ব্লগার হত্যা- আমাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতার চরম উদাহরণ। হত্যাকারীরা মিশন শেষ করে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে,এটা হতে পারে না। তাহলে গোয়েন্দারা আছে কেন? আগে তো পারছেই না, পরেও তো তারা কাউকে ধরতে পারছে না। তাহলে এই জঙ্গিরা কোথায় থাকে? মুখে জিরো টলারেন্স বললে হবে না,বাস্তবে তার প্রয়োগ থাকতে হবে। নইলে সরকারের জঙ্গিবিরোধী তৎপরতার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

যে নামেই হোক,সবগুলো জঙ্গি সংগঠনের একটাই উদ্দেশ্য- বাংলাদেশে অন্ধকার সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের আসলে এখন পেছনে তাকানোর সময় নেই। মেধাবী তরুণ প্রজন্ম,পরিশ্রমী নারীরা, গ্রামের কৃষকরা, প্রবাসে থাকা শ্রমিকরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বেই উন্নয়নের উদাহরণ। অনেক সামাজিক সূচকে আমরা অনেকের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। রাজনীতিবিদরা বারবার আমাদের অগ্রগতিকে পেছন দিক দিয়ে টেনে ধরেন।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই। খালি প্রয়োজন রাজনীতিবিদদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া। আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

লেখক:  অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।