সকাল ১১:৩৩ ; শুক্রবার ;  ২৪ মে, ২০১৯  

বিভ্রান্তির অন্ধকার সরাতে হবে

প্রকাশিত:

আনিস আলমগীর ।।

বাংলা ট্রিবিউনে কয়েক মাস আগে ‘সজীব ওয়াজেদ, জাফর ইকবাল এবং স্পর্শকাতর ব্লগার ইস্যু’ শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলাম। যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম তা ছিল অভাবনীয়। এতো শেয়ার, রিপ্রিন্ট সমসাময়িককালে আমার কোনও লেখা নিয়ে হয়নি। ঢাকা ট্রিবিউনে তার ইংরেজি ভার্সন প্রকাশিত হয়েছিল। এতো প্রশংসার মধ্যেও কিছু মৌলবাদী এবং কিছু প্রগতিবাদী আমাকে এমন আক্রমণ করেছিল ব্লগার নিয়ে নতুন করে লেখার ইচ্ছেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।

কারণ আমার কাছে একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট হয়েছে তখন—এই দু’গোষ্ঠীর কিছু লোক এমন এক চরমপন্থায় চলে গেছে, লিখে এদেরকে কেউ হেদায়েত করার নেই। তারা পয়েন্ট অব নো-রিটার্নে আছে। শাফিউর রহমান ফারাবী এবং আসিফ মহিউদ্দিনের মধ্যে আমি কোনও তফাৎ খুঁজে পাই না। ওরা একই কায়দায় অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করে নিজের বাক স্বাধীনতা চায়। এদের এজেন্ডা অভিন্ন।

লেখার ইচ্ছে না থাকলেও লিখতে হচ্ছে এই কারণে যে, যারা চাপাতি দিয়ে মানুষ হত্যায় জড়িত তারা ইসলামের বিরুদ্ধে লিখছে এই অজুহাতে লেখক হত্যা করছে। আমি হত্যায় যেমন সমর্থন করি না তেমনি সীমালংঘন করে মত প্রকাশেও কখনও বিশ্বাসী না। বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করেছি ব্যাপারটা। কেউ নতুন করে ইসলামের বিরুদ্ধে লিখছে দেখলাম না। কোনও ব্লগার লিখেছে এবং তার লেখা নিয়ে নতুন কোনও বিতর্কও হয়েছে—তাও চোখে পড়েনি, শুনিনি। তাহলে হঠাৎ করে আবার কেন চাপাতি-হত্যা শুরু হলো! এবার চাপাতি পড়েছে অভিজিতের বইয়ের দুই প্রকাশকের ঘাড়ে। একইদিনে দু’জনের ওপর। একজনকে প্রাণই দিতে হয়েছে। তাহলে পরবর্তীতে কে? যারা ওই লেখা কম্পোজ করেছে তারা?

যারা চাপাতি খুনে জড়িত তারা বারবার অভিযোগ করছেন নবী করিম (স.) এর বিরুদ্ধে লিখেছে ব্লগাররা। এরা প্রকাশ করেছেন। নবী করিম (স.) যখন দুনিয়াতে ছিলেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই হুজুরপাক (স.) এর বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র করেছে এবং মা আয়শা সিদ্দিকা (র.) বিরুদ্ধে কলঙ্কজনক কথাবার্তা ছড়িয়েছিল। উবাইকে আল্লাহতালাই মুনাফেক বলেছেন। যে জন্য তাকে আহলে কিতাব মুনাফেক বলা হয়। অর্থাৎ যার কথা কিতাবে আছে। এই আহলে কিতাব মুনাফেককে হুজুরপাক (স.) হত্যা করাতো দূরের কথা মুসলিম উম্মাহ থেকে বহিষ্কারও করেননি। তার মৃত্যুর পর হযরত মোহাম্মদ (স.) তার জানাজায়ও শরিক হয়েছিলেন। অথচ হযরত ওমর (রা.)সহ অনেক বিশিষ্ট সাহাবারা হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। আর এখন আমরা দেখছি যে ইসলামের কথিত প্রেমিকরা হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর অনুসারী হয়েও তার সুন্নত থেকে বহু দূরে সরে গেছেন। তারা কথায় কথায় মানুষ হত্যা করছেন।

সাম্প্রতিককালে ব্লগারদের জীবন যে শুধু হুমকির মধ্যে তা নয়। আমরা দেখছি যে পীর মাশায়েকদের জীবনও হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এমন কি ন্যাংটা পাগল ফকিরও রেহাই পাচ্ছে না চাপাতি থেকে। পিডিবির প্রাক্তন চেয়ারম্যান খিজির খান একজন বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং তার সততা প্রশংসনীয় ছিল পেশাজীবনে। তিনি একটা তরিকার পীরও নাকি ছিলেন। তাকে বাসায় ঢুকে হত্যা করা হয়েছে একমাসও হয়নি। যারা এই হত্যার অভিযোগে ধরা পড়েছে তারা বলেছে তার পীরানি কার্যক্রম ওদের পছন্দনীয় ছিল না। তাই তাকে জবাই করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আবার এও বলেছে, তাদের সঙ্গে গুলি থাকলেও গুলি খরচ না করে জবাই করেছে কারণ তাতে নাকি সওয়াব বেশি। এ জাতীয় হত্যাকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে অবুঝ কিছু তরুণকে কোনও গোষ্ঠী এমন বিভ্রান্ত করছে যে তারা প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে ইসলামের মহত্ব ও মমত্ব সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকছে।

সাম্প্রতিক এই হত্যাকাণ্ডগুলো সরকারকে খুবই বেকায়দায় ফেলেছে। সব মহল থেকে অভিযোগ উঠছে সরকার বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে একের পর এক ব্লগার হত্যা হচ্ছে।  এখন পর্যন্ত একজন ব্লগার হত্যারও বিচার সম্পন্ন হয়নি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য গোয়েন্দারা বেশিরভাগ মামলার কুল-কিনারা তেমন উদ্ধার করতে পারেননি। সরকারের মধ্যে একটি গোষ্ঠী এতে জড়িত এমন অভিযোগও তুলেছে গণজাগরণ মঞ্চ। সরকার কেন নিজের পায়ে কুড়াল মারতে যাবে এটা যেমন প্রশ্ন, তেমনি পাদ্রি হত্যা-পীর হত্যার ক্লু সরকার খুঁজে পায় কিন্তু ব্লগার হত্যার কুল কিনারা কেন পায় না—সেটাও একটা বিরাট প্রশ্ন বটে।

প্রধানমন্ত্রী ২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দীর জনসভার বক্তৃতায় এসব হত্যাকাণ্ডে বিএনপির হাত রয়েছে বলে ইঙ্গিত করেছেন। দেশে আন্দোলন করে সফল হতে না পেরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন বিদেশে বসে 'গুপ্তহত্যায় নেমেছেন' বলে অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে বিষয়টিকে ট্যাগ করেছেন। এর আগের দিন গণভবনেও বলেছেন- বিএনপি-জামায়াত গুপ্তহত্যা শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, জামায়াত এই কাজে জড়িত। তার ভাষায়, ‘যাহা জামায়াত, তাহাই জেএমবি, তাহাই আনসারুল্লাহ।’

বিএনপি ২০১৩ সালের শেষ চার মাস এবং ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস যে ধারার আন্দোলন করেছে তাতে এ জাতীয় অভিযোগ বিএনপির ওপর চাপানো সহজ। তবে বিএনপি বহু আগে থেকে বলছে তারা এসবে নেই, সরকার জঙ্গি নিয়ে রাজনীতি করছে। তাই সরকার অভিযোগ করে ক্ষান্ত দিলে দায়িত্ব থেকে রেহাই পাবে না। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে সত্যি সত্যি বিএনপি-জামায়াত এতে সম্পৃক্ত।

লেখক: সাংবাদিক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।