সন্ধ্যা ০৭:৩৫ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

ফাঁপা মানুষের গল্প

প্রকাশিত:

হারুন উর রশীদ॥

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক চাপাতির কোপে নিহত প্রকাশক  ফয়সল আরেফিন দীপনের ভাগ্যাহত বাবা। আর এই বাবা তার সন্তান হত্যার বিচার চান না। এতেই ‘অনুভূতিতে’ আঘাত লেগেছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের। এক ‘গভীর চেতনাবোধ’ থেকে তিনি বললেন, ‘তিনি হয়তো ঘাতকদের আদর্শে বিশ্বাসী তাই বিচার চান না।’ এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই।

ব্রিটিশ কবি টিএস এলিয়ট প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘The Hollow Men.’ ১৯২৫ সালে লেখা এই কবিতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের অন্তর্গত চরিত্র তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আশা পূরণের অসম্ভব পরিস্থিতি। ধর্মীয় বিরোধ, বিচ্ছিন্নতা, বিভাজন, হতাশা এসব তিনি প্রকাশ করেছেন কাব্যিক সুষমায়। তার এই কবিতায় মোট আটটি স্তবক, ৯৪টি লাইন। বলা হয়ে থাকে বিশ শতকে এলিয়টের এই কবিতা বিশ্ব পরিস্থিতি এবং সামাজিক ও মানবিক বৈকল্য তুলে ধরতে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত করা হয়েছে। আর এরমধ্যে তার কবিতার শেষ স্তবক সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়েছে। তবে আমার কাছে প্রিয় তার কবিতার তৃতীয় স্তবকের এই ছয়টি লাইন-
 

`This is the dead land
This is cactus land
Here the stone images
Are raised, here they receive
The supplication of a dead man's hand
Under the twinkle of a fading star.’

পাঠক আপনারা হয়তো কিছুটা এখন আঁচ করতে পেরেছেন আমি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক-এর বিচার না চাওয়া এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব উল আলম হানিফের কথা নিয়ে লিখতে গিয়ে কেন এলিয়টের কবিতার প্রসঙ্গ টানলাম। টি এস এলিয়ট যে প্রেক্ষাপটে ফাঁপা মানুষদের কথা বলেছিলেন বাংলাদেশে হয়তো এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু ফাঁপা মানুষরা এখানেও আছে। এবং তারাই রাজত্ব করেন।

বাংলাদেশে এখন যা চলছে তাতে আমি কেন আমার মাটিকে উষর মাটি বলবো না। কেন বলবো না এখানে এখন ক্যাকটাসের বাগান। যার সারা শরীরে শুধু কাঁটা। এখানে মানবিক কোনও হৃদয় নেই। পাথুরে হৃদয় আঁকে পাথরের ছবি।

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের কথার গভীরতা আর বেদনার ভাষা এখানকার রাজনীতিবিদরা বোঝেন না। যদি বুঝতেন তাহলে মাহবুব উল আলম হানিফ কখনোই বলতে পারতেন না- তিনি ঘাতকের আদর্শে বিশ্বাসী।

যারা ফাঁপা, শব্দের দ্যোতনা বোঝেন না, সবকিছু দেখেন শুধু চোখ দিয়ে, হৃদয় দিয়ে দেখেন না - তারাই এটা বলতে পারেন। আরও খোলাসা করে বললে বলা যায় স্বার্থপর রাজনীতি যাদের মগজে তারা তো মানুষ বুঝবেন না।

সন্তানহারা পিতা সন্তান হত্যার বিচার চান না। তিনি এমন কিছু চান যাতে বার বার পিতারা সন্তান হারিয়ে বিচারের জন্য না কাঁদেন। তিনি বলেছেন শুভবোধের কথা, বলেছেন রাজনীতির ক্যাকটাস যুক্ত উষর ভূমি বিনাশের কথা। তিনি গভীর কথা বলেছেন, জীবনের গভীরতম বেদনায় উপলব্ধির কথা বলেছেন। হত্যাকাণ্ডের পোশাকি বিচার নয়। তিনি এর মূল ধরে টান দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু তার তল পেলেন না আমাদের রাজনীতিকরা।

ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও বিচার চান না। তিনি শুধু তার সঙ্গীকেই হারাননি। জঙ্গিদের হামলায় আহত হয়েছেন নিজেও। বিচার চান না নিলয় নীলের স্ত্রী আশামনিও। আর অনেকে তো বিচারের আশাই ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা যদি হানিফ সাহেবের কথাকে সত্য ধরে নিই তাহলে তো ঘাতকের অনুসারী বাড়ছে! আর এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিচার চাই না- এই কথা আরও অনেকে বলবেন।

যারা হত্যা করে তারা পলাতক। আর যারা বিচার চান না তারা প্রকাশ্যে আছেন। তাই হানিফ সাহেবের পুলিশ বাহিনীর সুবিধা হয়ে গেল। অনুসারীদের অন্তত আটকের কৃতিত্ব দেখাতে পারেন!

যারা অন্ধ তারা যদি আজ সবচেয়ে বেশি দেখার দাবি করেন, তারাই যদি আজ উপদেশ দেন, তাহলে আমাদের তো বধির হতে হবে। আমাদের মুক হতে হবে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায়ই বলতে হয়, ‘যাদের হৃদয়ে কোনও প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই, পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

যোসেফ কনরাড ১৮৯৯ সালে অন্ধকারের হৃদয়ের (Heart of Darkness) কথা বলেছিলেন। তবে তিনি বলেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের অন্ধকার হৃদয়ের কথা। যে হৃদয় আফ্রিকাকে অন্ধকার করে রেখেছিল। সভ্যতার আলো ছড়ানোর দাবিদার ব্রিটিশ ইউরোপ হৃদয়ে অন্ধকার ধারণ করে সে অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে আফ্রিকাকে তা তিনি দেখিয়েছেন তার উপন্যাসে। আর আমাদের ঝলমলে রাজনীতিবিদরা হৃদয়ে অন্ধকার ধারণ করেন এই ডিজিটাল যুগেও।

টি এস এলিয়ট প্লিজ দেখে যান আপনার ফাঁপা মানুষরা কীভাবে আস্ফালন করে এই বাংলায়। যোসেফ কনরাড আপনি পরজনমে বাংলাদেশে আসুন অন্ধকারের হৃদয় এখনও এখানে আছে। প্রিয় কবি জীবননান্দ দাশ দেখে যান এখনও এই দেশে যারা অন্ধ তারাই বেশি দেখে।

 লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।