বিকাল ০৪:৪৬ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯  

লেখক-ব্লগার মরলে দেশের অবস্থা ভালো হয়, তাই না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ফজলুল বারী॥

কোনও কিছুতেই মন্ত্রিত্বের সমস্যা হচ্ছে না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর! লজ্জাও নেই যে পদত্যাগ করবেন। অথবা কোমরে জোর নেই যে ব্যর্থতার জন্য পদচ্যুত করবেন পুলিশের আইজি, র‌্যাবের ডিজিকে! চুরি-ডাকাতি-টেন্ডারবাজি না, শুধু লেখার জন্য দেশের প্রতিভাবান প্রজন্মদের জবাই করছে মারছে একদল অসভ্য ধর্ম ব্যবসায়ী কসাই। একেকটি ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্লজ্জের মতো কী বলেন না বলেন, এগুলোর কোনও আগা নেই-মাথা নেই! একবার বলেন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড! এরপরই আবার বলেন বিচ্ছিন্ন ঘটনা! দেশের অবস্থা ভালো, খুব ভালো ইত্যাদি! একটা দেশে লেখার জন্য মানুষ খুন করা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তা ভালো, খুব ভালো অবস্থা মনে হয়? না লেখক-ব্লগার জবাইকৃত অবস্থায় মরলে ভালো দেখায় দেশের অবস্থা? পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয় কী করে? আর কতোগুলো এমন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ঘটলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মনে হবে অনেক জারিজুরি দুই নাম্বারি বক্তব্যতো দিয়েই গেলাম, এবার আমি যাই! যদিও এটা কোনও দিনও বাংলাদেশে হবে না। এখানে সবাই নিজেদের খুব দক্ষ-প্রয়োজনীয় ভাবেন! মনে করেন তিনি চেয়ারে না থাকলে দেশটা রসাতলে চলে যাবে!

শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্যে যে আওয়ামী লীগ দলটার সাতখুন আমাদের কাছে মাপ, সে দলের আরেক প্রতিভা(!) মাহবুবুল আলম হানিফ! একদার কুষ্টিয়াবাসী নেতাটি আজ কিসের গুণে দলের মুখপাত্র, কিসের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বিতাড়িত সে দিকে আজ গেলাম না। ইনি আজ কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে এক শোকার্ত পিতার কুষ্ঠি ধরে টান দিয়েছেন!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামখ্যাত একজন অধ্যাপক, তার লেখালেখিসহ নানা কিছুতে সারাজীবন যিনি ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা, নিহত সন্তান লেখক-প্রকাশক দীপনের লাশ কবরে রেখে আসতে না আসতে তার শোকার্ত পিতাকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর লোক বলে দিলেন আওযামী লীগের মুখপাত্র? একজন শোকার্ত পিতা কোন অসহায়্ত্ব থেকে বলেছেন তিনি সন্তান হত্যার বিচার চান না তা বোঝার সক্ষমতা থাকলে হানিফ সাহেবের নামের আগে অধ্যাপক বিশেষণটিও হয়তো থাকতো। বিচার চাইলেই কী তারা বিচার করেন? অভিজিত রায়ের পিতা অধ্যাপক অজয় রায় সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে কত কাঁকুতিই না করেছেন! তার সন্তানের খুনিদের বিচার করেছেন?

সাগর-রুনি হত্যার বিচার করেছেন? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সোচ্চার শিক্ষকদের অন্যতম অজয় রায়কে অপমান করেছে কে? অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারকে অপমান-সিলেট ছাড়া করার মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে কে? হানিফ সাহেব আজ ক্ষমতার গুণে আপনার কত টাকা তা হয়তো আপনি নিজেও হিসাব করে বলতে পারবেন না। আর অজয় রায়, আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যাররা সন্তানহারা। সন্তানের লাশের বিনিময়ে তারা আপনাদের কাছেতো  টাকা-চেক কিছুই চাননি। একজন সন্তানহারা পিতাকে তার মতো করে কথাও বলতে দেবেন না? এমন একটি কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ যদি মাহবুবুল আলম হানিফকে মুখপাত্রের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করতো তাহলে ভালো করতো।

ব্লগার রাজীব হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাসায় ছুটে গিয়েছিলেন। এখন আর কেন যান না তা সবাই বোঝেন। নিহত লেখক-ব্লগারদের শোকার্ত পরিবারের পাশে গিয়ে এখন আর দাঁড়ান না কোনও মন্ত্রীও! এরা প্রতিদিন কত জায়গায় যান তবুও কেন জবাইকৃত লেখক-ব্লগারদের রক্তাক্ত লাশ কায়দা করে এড়িয়ে যান, এর মাধ্যমে ব্লগারদের খুনিরাও বুঝি একটি বার্তা পেয়ে গেছে! তারা বুঝে গেছে তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের মানসিকতা কমজোরি! দীপন হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে হাসপাতালে গেছেন তার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। এরসঙ্গে সবাই যদি দেখতে পেতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, র‌্যাবের ডিজি এদেরকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধাতানি দিয়ে বলা হয়েছে এসব থামাতে না পারলে বিদায় হন, তাহলে অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে একটা বার্তা যেত সরকার এসব বন্ধে আন্তরিক। র‌্যাব সুন্দরবনের ডাকাতসহ কতজনকে ক্রসফায়ারের নিয়ে যায়! আর ব্লগারদের খুনিরা পায় জামাই আদর! এসবের বার্তা তারা পায় বলেইতো খুনির দল শুধুই বেপরোয়া প্রতিদিন! পোস্টমোর্টেমের ডাক্তার বলেছেন- দীপনের খুনিরা উপুড় হয়ে বসে তাকে খুব যত্মের সঙ্গে(!) ঘাড় কেটেছে! যাতে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মারা যায়! আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন বিলকুল ঠিক হ্যায়! আমাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা আজ লিখেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘাড়ের স্বাস্থ্য কী রকম বেড়েছে দেখেছেন? তারতো সবকিছুতে ‘বিলকুল ঠিক হ্যায়’ মনেই হবে।

আজকের ব্লগার-লেখক-প্রকাশক খুনের উল্লাসের নৃত্যের পেছনে কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গণজাগরণ মঞ্চ। দুনিয়ার প্রথাবিরোধী লেখকদের মতো বাংলাদেশের প্রথাবিরোধীরাও ব্লগে লেখালেখি গত দুই-তিন বছরে হঠাৎ করেই শুরু করেননি। এক সময় প্রথাবিরোধীদের মত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল লিটল ম্যাগাজিন। ইন্টারনেটের যুগের কারণে সেখানে ব্লগ এসেছে দাপটের সঙ্গে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিশেষ করে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ব্লগারদের উদ্যোগে শাহবাগের ছোট্ট প্রতিবাদের পেছনে যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিশেষ করে করে তরুণ প্রজন্মের ঢল নামলো তখন মাথা খারাপ হয় যুদ্ধাপরাধী, ধর্মব্যবসায়ী আর তাদের দোসরদের।

ওই পরিস্থিতিতে বিব্রত খালেদা জিয়া তার বেশকিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত করেন। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি নেতারাও শাহবাগে ঢুকতে কম কসরত করেননি। তারা অনুনয় বিনয় করে বলেছেন গণজাগরণ মঞ্চে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মসূচির বিষয়টিও যেন সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ অংক পরীক্ষার দিন শুধু অংক পরীক্ষাই দেব বলে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাড়া আর কোনও কর্মসূচিতে যেতে রাজি হলো না তখন খালেদা জিয়া রেগেমেগে শাহবাগে কিসের গণজাগরণ, সেখানে তো নাস্তিকদের মেলা বসেছে, সেখানে তারা গাঁজা খায়-বেলেল্লাপনা করে বলেছিলেন তা নিশ্চয় সবার মনে আছে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছেলেমেয়েদের ঢালাও নাস্তিক বলে তাদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধদের শুধু উস্কেই দেননি খালেদা জিয়া। এরপর জামায়াতের বদলে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছেন হেফাজতকে। হেফাজত যখন সরকারি ঘুষ হিসেবে রেলের জমি পেয়ে ঘরে ঢুকেছে তখন ব্লগারদের খুনের মিশনে নেমেছে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের আরেক গলাকাটা উইং!

বাংলাদেশের কিছু টকশো তারকা, কিছু পত্রিকা ব্লগারদের বিরুদ্ধে ধর্ম ব্যবসায়ীদের উস্কে দিয়েছে। কাজেই এসব খুনোখুনি বন্ধ করতে চাইলে যৌথ অপশক্তিগুলোর একটাকেও হিসেবের বাইরে রাখা যাবে না। আর সরকারি নেতাদের এলোপাতাড়ি ফাউলটক বন্ধ করতে হবে। আইজিপি-র‌্যাবের ডিজি-গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের ডেকে সময় বেঁধে দিয়ে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিন। দায়িত্ব পালন করতে না পারলে তাদের বিদায় করেন। লিখলে বই ছাপলে খুন হতে হয় এমন অস্বস্তিকর কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিন মুক্তিযুদ্ধের অর্জন বাংলদেশকে।

প্লিজ সিরিয়াস হোন। দেশের মানুষ কিন্তু এ ইস্যুতে আপনারা সিরিয়াস নন এমন ভাবতে শুরু করে দিয়েছে।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।