দুপুর ০৩:৫৫ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

উড়োচিঠি || গৌতম চৌধুরী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

 

 

১.

ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নের মধ্যে ভেসে আসে অস্পষ্ট কয়েকটি কণ্ঠস্বর। তবে কি জঙ্গলের ভিতর কথা বলছে রূপকথার পশুপাখির দল? কানে আসছে তাদের শেষ না-হওয়া কিছু বাক্য। আকাশের দিকে উড়ে যাওয়া আচম্বিত দু’একটি শব্দ। পরিচিত অথচ কার্যকারণহীন। কূল না পাওয়া কাহিনির সূত্র লাফ দিয়ে নাগাল পেতে চাইছে তাদের। যেন, বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া রঙবেরঙের বেলুনের পিছু ছুটে যাচ্ছে একদঙ্গল হল্লাবাজ শিশু। অথচ ত্রিসীমায় জনমানুষের কোনও অস্তিত্ব নেই। এসব আসলে না-পোড়া বাজির ফুলকি। পিছু পিছু চলে এসেছে। বনভূমির এই ঠা ঠা একাকিত্বে এরাই আমার চলনদার...

২.

সোঁতার ধারে আজ দেখি, ডিমের মতন একটা পাথর পড়ে আছে। নানা রকম রঙ ঠিকরে পড়ছে রোদ্দুর লেগে। ভাবলাম কুড়িয়ে নিই। কিন্তু নিচু হয়ে, মুঠোয় ভরতে যেতেই, ছিটকে গেল দূরে। তারপর গড়গড়িয়ে চলতে লাগল জঙ্গলের ভিতর। ভাবলাম, যা হোক একটা পথপ্রদর্শক পাওয়া গেল তাহলে। কে যেন বলল, কাঁচকলা। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে দেখি, চোখ মটকাচ্ছে একটা বুড়ো কাকাতুয়া। বলল, ওই নেউলটাকে দেখ্‌। একটা কেউটের বাচ্চা খতম ক’রে এল। কিন্তু সাপটাও দিয়েছে ছোবল। দেখি, চোখেমুখে রক্তমাখা একটা নেউল কোনওরকমে নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঝোপের ভেতর। ওদের কে যে কাকে পথ দেখিয়েছিল কে জানে...

৩.

হরেক দিন যে নতুন ক’রে শুরু করার কথা, তা নয়। দুদ্দারুন গরমের মধ্যেও বহুদিন চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকি কবরখানার এক কোণে। ওটাকে মমিই বলা যায়। চার হাজার বছর পর চোখ দাঁত নখ নিয়ে গবেষণা হবে, আমার সাক্ষ্য ছাড়াই। কিন্তু আমিই বা আর কতটুকু? অ্যামিবা। তবু এমন ঝড় বাদলের দিনে, আমিও ভাগ হয়ে যেতে চাই। আরক লাগানো শরীর ছেড়ে ছড়িয়ে পড়তে চাই কাননে কাননে। একেকটা গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে বাতাস সেখানে তখন সৃষ্টি করছে এক উন্মত্ত সংগীত। এর অনেক সুর আমার চেনা। যেমন অনেক নক্ষত্র। আবার অচেনাও তো অনেক। চিনতে চাই। রেণু রেণু হয়ে ছড়িয়ে পড়তে চাই, কান্তার ভেদ ক’রে এক অপার শূন্যতায়। এক এক দিন...

৪.

সবকিছুই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হয়তো এইকথা জেনে, কথাহীন হয়ে থাকে পাথরখণ্ড। নদীর চোখের তারা থেকে সরে যায় কৌতূহলের আলো। সে-ই কি সত্যের অনুগমন? সবকিছুই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তবু, এই মুহূর্তটির দিকে তাকাই। একদিকে মহীরূহের উত্তুঙ্গ তরঙ্গগুলি আকাশ স্পর্শ করতে চাইছে। অন্যদিকে মাটির বুকে ঝরে পড়া পাতাদের কোলাহল। কিছু দূরে, নদীতীরের স্তব্ধতা মাড়িয়ে জলপান ক’রে যাচ্ছে রকমারি পশু। পাখিরা ডেকেই চলেছে, আর উড়ে যাচ্ছে নক্ষত্রলোকের দিকে। এই যে মুহূর্তটি, কত হাজার রকমের চিহ্ন ছড়িয়ে দিতে চাইছে, কত হাজার দিকে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার জন্য তার কোনও দুশ্চিন্তা নাই...

৫.

মাটির ভিতর দিয়ে পথ ক’রে চলা পিঁপড়ের মতো, এই বাক্য। নিজের ভিতর দিয়ে এইভাবে রক্তমাংসস্নায়ু কেটে যেতে যেতে সে কি একের ভিতরে লীন হয়ে যায়? না কি এই একাকিত্বকে যখন উদ্‌যাপন করি, প্রতিটি বৃক্ষের ভিতর তার দৃশ্য সঞ্চারিত হয়। অদূরের নদীর ক্ষীণ ঊর্মিগুলি তার অপ্রত্যাশার কাছে চকিতে উঁকি দিয়ে যায়। দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শত শত কীট পতঙ্গ পাখি আর জীবজন্তুরা তার মগ্নতার সাক্ষ্য থাকে। এমন কি বহু দূর থেকে ওই ছায়াপথ আর অন্য অন্য নীহারিকাগুলি, তারাও কি অংশ নেয় না এই কথোপকথনে? আরও কেউ কি থাকে, ওই জ্যোতির্পুঞ্জেরও ওপারে, অবয়বহীন কোনও শ্রোতা? থাক্‌ বা না থাক্‌, স্বগতোক্তিগুলি এইভাবে কেবলই এক অব্যক্ত সংলাপের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায়। অথচ তেমন না-হওয়াটাই এই বনভূমির শর্ত...

 

অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।