রাত ১০:২২ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

পদ্মার বুকে হারানোর সুখে..

প্রকাশিত:

ফারুখ আহমেদ।। 

একটি ভাঙ্গা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আছি । এটি চর জানাজাতের ভিউ পয়েন্ট। জায়গাটা যে খুব পরিচিত তা নয়, আগে কখনও এখানে আসিনি। চর জানাজাতের খেয়াঘাট ছিরু চৌধুরীর ঘাট থেকে দশ মিনিট হাঁটলেই এখানে চলে আসা যায়। আকাশের এখানে কি ব্যাপক বিস্তার! বর্ষায় এলাকার পুরোটাই পানির নিচে ছিল। এখন ফসলের জমি। সে জমি পেরিয়ে আরো সামনে দৃষ্টি চলে যায়, মনে হচ্ছে যেন পেঁজাতুলোর মেঘ আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভূত রূপালি আর নীল আভা চারিদিকে। বিচ্ছিন্ন কিছু ছনের ঘর আর দুপাশে সরু মেঠো পথ।

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের একদিন খুব সকালে বের হয়ে পড়েছিলাম ভাগ্যকূরে উদ্দেশ্যে। ফাঁকা রাস্তায় একঘন্টার মধ্যেই ভাগ্যকূল পৌঁছে গেলাম।পৌঁছেই চিত্তরঞ্জন সুইটমিটে পরোটার সঙ্গে ডিমভাজি আর ঘোল খেয়ে নিজেকে একটু ফুরফুরে মনে হতেই মন খারাপের খবর। দোকানের বড়দা বললেন, বাবা মানে বড়কর্তা মারা গেছেন আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে। এতক্ষণ মনেই ছিলো না চিত্তরঞ্জন কাকার কথা। ভাগ্যকূল আসা মানেই কাকার মিষ্টির দোকানে ঢুঁ-মারা। অনেক সময় কাটিয়ে ঘোল খেয়ে বাড়ির পথ ধরা। চিত্তরঞ্জন কাকাকে দেখতাম একটা টুলের ওপর পা তুলে বসে থাকতেন সব সময়। আজ কেন যে খেয়াল হলো না কাকা নেই, বুঝলাম না! এরমধ্যেই সামাদ ভাই এর ফোন, ভাগ্যকূল খেয়াঘাটের ইজারাদার। আমাদের জন্য ট্রলার ঠিক করা হয়ে গেছে। ট্রলারে যখন চড়ে বসি তখন সকাল দশটা প্রায়।

প্রমত্তা পদ্মা বলা হয়, কিন্তু পদ্মার সে রূপ এখন আর নেই। তবু পদ্মাকে একবারে শান্ত মনে হলো না। স্রোতে উত্তাল, চির যৌবনা পদ্মার রূপ প্রায় বিবর্ণ হলেও গতরাতে বৃষ্টি হওয়ায় আজ পদ্মা কিছুটা উত্তালই। বিভিন্ন জায়গায় চর জেগে পদ্মার প্রবাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তারপরও পদ্মার চারপাশে দৃষ্টি প্রসারিত করলে কূলকিনারা পাওয়া যায় না। পদ্মা সবসময় আমাদের টানে, সে টানে আমরা ছুটে আসি বারবার। অবশ্য আজকের কথা আলাদা, পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বিভিন্ন চর দেখতেই আজকে আমাদের ছুটে চলা।

খুব বড় না হলেও একবারে ছোট বলা যাবে না ট্রলারটিকে। ট্রলার চালক হাবিব মোল্লা জানতে চাইলেন গন্তব্য। বললাম জেগে ওঠা চরের কাশবন। তখন ছিলো শেষ সময়ের কাশফুল। চালকের উত্তর ‘কাইস্যার বন কি দেখবেন স্যার!’ আমি তার কথায় হাসি। সে বলে চলেছে, ‘কাইস্যা হইলো গরুর খাওন। অহন পইত্যেকদিন কাইস্যা কাইটা নিয়া যাইতাছে।’ আমি বললাম, দুই ধরনের কাশ হয় এসব চরে। খসখসে কাশ তো খাওয়া যায় না। এবার চালকের উত্তর, স্যার ওইটা দিয়া বেড়া দেয়। বুঝলাম প্রকৃতির শিক্ষা!

যাত্রা শুরুর সময় আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন পূর্ব পরিচিত চর জানাজাত বাসিন্দা খোকন মাতবর। কম কথা বলা ভালো মনের একজন মানুষ। আরেকজনের কথা বলতেই হবে। তিনি ঘাট ইজারাদার সামাদ ভাই। নদীর বাতাসে এক অদ্ভুত ভালোলাগা ভেসে বেড়ায়। ট্রলার চলা শুরু হতেই মুগ্ধ হতে শুরু করলাম। আমাদের ট্রলারের পাশ দিয়ে একটা মাছের নৌকা যেতে দেখে চিৎকার করে তাকে থামাই। দুইটা রুই মাছ তারা পানিতে জিইয়ে রেখেছে। দাম হাঁকলো ১২০০০ টাকা। শুনে আমাদের আক্কেল গুরুম! মধ্য দুপুরে পৌঁছলাম চর জানাজাত, যে কথা লেখার শুরুতেই বলেছি। এবার এগিয়ে যাই চর জানাজাতের পেছনের অংশ ভূমিহীন চরে। ভূমিহীনদের বসবাস বলেই চরের নাম হয়েছে ভূমিহীন। ভূমিহীন চরের এক বাড়িতে কিছু সময় কাটাই, তারপর চলে যাই ছিরু চৌধুরীর হাটে। সবাই বলে হাট কিন্তু এটি একটি গ্রাম্য বাজার। এখানে সকাল-বিকাল বাজার বসে বাকি সময় অলস অবসর। আমরা সেই নিরব বাজারের সরব অতিথি। দুপুরের খাবার ভাত পেলাম না। আমাদের জন্য বিস্কুট আর কলার ব্যবস্থা করেন খোকন মাতবর ও তার সঙ্গীরা। তারপর আবার ট্রলারে যাত্রা। চলতি পথে ১০টা ইলিশ মাছও কিনে ফেললাম আমরা। তারপর নামলাম নতুন একটি চরে। সবাই যে যার মতো ঘুরতে শুরু করল চরে। আমিও নেমে পড়লাম ক্যামেরা নিয়ে। একঝাঁক চড়ুই পাখি দৌঁড়ে উড়ে চলে গেল ফুড়–ৎ! প্রায় ধ্বংস কাশবনের কাছাকাছি যেতেই দেখা মিলল দুটো শেয়ালের। ভাগ্য খারাপ, ছবি তুলতে পারিনি। কিন্তু প্রশ্ন জেগেছে চারপাশে পানি এমন চরে শেয়াল কোত্থেকে আসলো! ভাবতে ভাবতে আরও সামনে এগিয়ে যাই। এখানে বাতাস ধেয়ে আসছে চারপাশ থেকে। বুনো গন্ধমাখা সে বাতাস প্রাণ আকুল করে। আশেপাশের কাশের জঙ্গলে অনেক বুনো গাছের সঙ্গে দেখা মিলল হাতিসুরের। দেখা পেলাম অনেক নাম না জানা বুনো ফুলের। কিছু অচেনা ফুলের ওপর ফুরফুর করে উড়ছে রঙবেরঙের প্রজাপতি। আমি প্রজাপতির ওপর ক্যামেরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এর মধ্যে কোথা থেকে একঝাঁক ফিঙ্গে উড়ে এসে বসেছে ঝোপে। আমি ফিঙ্গের দিকে যেই ক্যামেরা তাক করেছি, সঙ্গে সঙ্গে তারা দলবেঁধে উড়াল দিলো। তারপর আবার তারা ঝুঁপ করে বসে পড়লো অন্য এক ঝোপে। হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম কারেন্ট জালে আটকা পড়ে অকালে প্রাণ হারানো দুটি দারাস সাপ। নির্জন চরে ঘুরতে ঘুরতেই বিকাল হয়ে গেল। পদ্মায় ভাটা পড়ল। আমরা এবার ফেরার জন্য তৎপর হলাম। চরের বালিয়ারিতে ট্রলার আটকেছে, শুরু হল আমাদের ‘মারো ঠেঁলা হেইয়ো!’

পদ্মার বুকের এই চরটি নতুন জেগে ওঠা, অল্প দিনের। এ কূল ভাঙ্গে, ও কূল গড়ে এটাই নদীর খেলা! আমরা ছিলাম মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার নতুন একটি চরে। পাশেই রয়েছে চর জানাজাত, চর কাঁঠালবাড়ি ও চর বান্দরখোলা। প্রতি সাত-আট বছরে এসব চর নদীর ভাঙ্গনে পড়ে। মানে চর এলাকার বাসিন্দারা এক জায়গায় আট থেকে দশ বছরের বেশি থাকতে পারেন না। তাই ভাঙ্গনের শব্দে চরবাসীর বুক কাঁপে। নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানকার মানুষের বসবাস। আমরা চর বাসিন্দা খোকন মাতবরকে ছিরু চৌধুরীর ঘাটে নামিয়ে ফিরতি পথ ধরি। ফিরতে ফিরতে দেখি শিশুরা পদ্মা নদীতে দাপাদাপি করে চলেছে। একপাল গরু দেখলাম পদ্মার বুকে। সুর্য আড়ালে চলে যাচ্ছে, ট্রলার ফিরতি পথ ধরেছে। স্রোতহীন পদ্মায় আমরা ভাগ্যকূলের যাত্রী।

আমাদের দেখেই কি না একদল শুশুক একটু পরপর তাদের অস্তিত্ব জানান দিতে নৃত্যরত হয়। আমাদেরও ইচ্ছে হয় পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সে সময় আমাদের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটি পাল তোলা নৌকা। নৌকা পেরিয়ে আরো সামনে যেতেই দেখা হয় ইলিশের নৌকার, তখন গোধূলিবেলা। জেলেরা বলে ‘একটু খাড়ান। অহন জাল বাইমু, মাছ নিতে পারবেন।’ আমরা মাছের আশায় সঙ্গে গোধুলি উপভোগে থেমে পরি। কি এক অনিমেষ ভাললাগা, শুধু তাকিয়ে দেখি। কত কত ভাব বিনিময়, সব শেষ হয় না। আঁধার ঘনিয়ে আসায় আমরা দ্রুত ট্রলার এগিয়ে নিতে থাকি ভাগ্যকূলের দিকে।

 

 

 

জেনে নিন

 

হেমন্তকাল চলছে। এখনই বেশ শীতের আমেজ চলে এসেছে। মন চাইলে এ সময় ঘুরে আসতে পারেন পদ্মা নদীতে। যেতে পারেন চর জানাজাত, ছিরু চৌধুরীর হাট ও ছিরু চৌধুরীর বাজারে। খুব ভাল সময় কাটবে দলবেঁধে পদ্মার বুকে। এখানে যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে ভাগ্যকূল গ্রামে। ঢাকার গুলিস্তান থেকে শ্রীনগরগামী আরাম বা মহানগর বাসে চেপে বালাসুর বাজারে নেমে পড়–ন। এখান থেকে পায়ে হেঁটে বা রিকসায় ভাগ্যকূল বাজার। তারপর ট্রলার ভাড়া করে ঘোরাঘুরি। পদ্মার বুকের চর জানাজাত ভূমিহীন বা নতুন কোন চরে অনেকটা সময় কাটাতে পারেন। দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে পারবেন। ছিরু চৌধুরীর বাজারে হোটেল আছে, তবে খাবার বা ভাত নেই। পানি ও বিস্কুট পাওয়া যায়, আর পাবেন চা। সুতরাং সঙ্গে খাবার নিয়ে নিন। আর গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় জামা-কাপড়। ফেরার পথে ভাগ্যকূল বাজারের চিত্তরঞ্জন সুইটমিটে অবশ্যই ঢুঁ মারবেন। এখানকার দধি, মিষ্টি, সন্দেশ, বরফি আর ঘোল সেরা। খেয়ে আসুন সঙ্গে নিয়েও আসুন।  




ছবি: লেখক

/এনএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।