বিকাল ০৪:০১ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

৩০ বছর ধরে রাইটার’স ব্লকে ভুগেছেন যাঁরা || মিলন আশরাফ

প্রকাশিত:

ইংরেজি রাইটার’স ব্লক-এর বাঙলায়ন হতে পারে অচল লেখক। লেখকরা আবার অচল হয় কেমন করে— এই প্রশ্নটি চলে আসা খুবই স্বাভাবিক। কেউ কেউ এ সময়টাকে লেখকের বন্ধ্যাত্বকাল বলেও অভিহিত করেন। অর্থাৎ যে সময় লেখকরা কিছুই লিখতে পারেন না। কিন্তু কেন এমনটি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে মানসিক চাপের কারণে কিংবা সৃষ্ট চরিত্র সঠিকভাবে ডিল করতে না পারার যন্ত্রণায় এরকমটি হয়ে থাকে। আরো নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। রাইটার’স ব্লক নাকি খুব বড় লেখকদের ক্ষেত্রে হয়, গৌণ লেখকদের ক্ষেত্রে এ ব্লক প্রযোজ্য নয়। এই ব্লক ছাড়াতে বিভিন্ন লেখক ভিন্ন ভিন্ন পন্থা বেছে নিতেন। বিশ্বসাহিত্যে তো বটেই বাংলা সাহিত্যেও আমরা এরূপ দেখতে পাই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি এই ব্লক ছাড়াতে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। অবশ্য এক হিসেবে ভালোই হয়েছে, তাঁর এই বনে-জঙ্গলে ঘোরাঘুরিতে বাংলা সাহিত্যে যোগ হয়েছে আরণ্যক  নামে অসাধারণ একটি উপন্যাস। কল্লোল যুগের লেখকরা নাকি এটা থেকে রেহাই পেতে বিশেষ-পল্লীতে যেতেন। অ্যালেন পো রাইটার’স ব্লক কাটাতে পিস্তল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্য খুনের অভিযোগও আছে।
সম্প্রতি(১৮/০৬/১৫) ডানিয়েল কোলিজ নামের এক গবেষক ১০ জন লেখককে নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, তাঁরা সবাই ৩০ বছর ধরে রাইটার’স ব্লকে ভুগেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে ৫ জনকে নিয়ে এই আয়োজন।

 

স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ
বিশ্বসেরা ‘অ্যাইনসিয়ান্ট ম্যারিনার’ ও ‘কুবলা খান’ সৃষ্টির মহান কারিগর কোলরিজ। মধ্য বিশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠেছিলেন তিনি। বিশ্বসাহিত্যের আরেক দিকপাল বন্ধু ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর সঙ্গে একত্রে কাজ করে বিশ্বসাহিত্যে যোগ করেন আরেকটি মহান গ্রন্থ ‘লিরিকাল ব্যালাডস’। কিন্তু পরবর্তীতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন আফিমের নেশায়। যদিও বলা হয়, তাঁর দাঁতে ব্যথা থাকার কারণে তিনি নাকি আফিমের প্রতি ঝুঁকি পড়েন। ফলশ্রুতিতে তিনি বন্ধু ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলেন। তবে এটাই শেষ কথা নয়। রাইটার’স ব্লকও এক্ষেত্রে অন্যতম কারণ। তিনি আর লিখতে পারছিলেন না। ১৮০৪-এ তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে কোলরিজ লেখেন, ‘পুরো বছরটা চলে গেল অথচ আমি কিছুই লিখতে পারলাম না, এর চেয়ে লজ্জার ও দুঃখের আর কী হতে পারে।’

 

জোসেফ মিচেল
বিশ শতকে জোসেফ মিচেল লেখক হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করেন। নিউইয়র্কের ছোটজাতের প্রতি অসীম দরদ ছিল মিচেলের। ‘জো গোউল্ড’ উপন্যাসের মধ্যে তিনি ধরতে চেয়েছিলেন এইসব বিষয়। গোউল্ড জাকজমকপূর্ণ জীবন পছন্দ করে এবং একটু বাচাল টাইপের। সে এসেছে পশ্চিমের এক অজ-পাড়াগাঁ থেকে। ব্যক্তি জীবনে সে বোহেমিয়ান। দশ বছর ধরে সে মুখে মুখে ঘোষণা দিয়ে আসছে বর্তমান পৃথিবীর ইতিহাস সে লিখবে। আসলে মিচেল নিজেকেই গোউল্ড-এর ভেতর দিয়ে প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। আসলে বাস্তবে কোনো বই লিখতে পারছিলেন না তিনি। গোউল্ড-এর ব্যক্তিগত নোটটাও কিছুই না। সেখানে লেখা থাকতো তার গোসলের কথা, খাবারের কথা, এবং কিছু ব্যক্তিগত খিস্তিখেউড়। ক্রমাগত এটা লেখা হচ্ছিল এবং পুনর্লেখনও চলছিল সমানে। ওই একই ঘটনা মিচেলের জীবনেও আমরা দেখতে পাই। তিনি নিয়মিত অফিস করতেন। ত্রিশ বছর ধরে তিনি এটা লেখার ভান করে গেছেন শুধু। প্রতিদিন তিনি লেখার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কিছুই প্রকাশ করতে পারেননি। ১৯৯২ সালে ওয়াশিংটন পোস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এই বছরগুলোতে জো গোউল্ডই আমাকে পরিচালিত করেছে।’

 

ট্রুম্যান কাপোট
শেষ জীবনে ট্রুমান তাঁর কাজ সম্পর্কে সোজাসাপটা জবাব দিয়েছিলেন। কীভাবে তাঁকে অভিজাত শ্রেণিদের কাছে লাজ্জিত হতে হয়েছিল সেটিও অকপটে বলেছেন তিনি। কিন্তু ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে মার্টিন অ্যামিস ট্রুম্যান-এর সকল কাজের উপর একটা রিভিউ করেন। তিনি জানান, ট্রুমান জীবনের শেষ দশ বছরে একটি উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কখনো সেটা শেষ করতে পারেননি। অর্থাৎ তিনি বলেন এটা তাঁর ভান ছিল। কাপোট তখন প্রবল মানসিক চাপে ছিলেন। তিনি শুধু নিজের সৃষ্ট জগতে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন অনবরত। কাপোট-এর অন্যতম লেখা স্কয়ার’র মাত্র চার খণ্ড লেখা হয়েছিল তখন। কিন্তু সেগুলোতে বর্ণনা শুধু উচ্চবিত্ত সমাজ নিয়ে হাসিঠাট্টা। এরকম বদনাম ছড়ানোর দরুন কাপোটকে অভিজাত শ্রেণি থেকে বিচ্যুত করা হয়। এতে করে তিনি ভেঙে পড়েন। প্রকাশের যন্ত্রণায় কাঁতর হয়ে ট্রুম্যান ৩০ বছর ধরে আর লিখতে পারেননি।

 

হ্যারল্ড ব্রডকি
১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিন একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যেটার শিরোনাম ছিল ‘দি থার্টি ইয়ার রাইটার’স ব্লক’। হ্যারল্ড ব্রডকি ছিল সেখানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রবন্ধটিতে বলা হয় নিউইয়র্কের ছোটগল্পকার ব্রডকি ১৯৬০ সালে একটি উপন্যাস প্রকাশ করার ঘোষণা দিলেও সেটি প্রকাশ পাচ্ছে সম্প্রতি(১৯৯১)। তাও আবার একটি পার্ট। তিনি গত ত্রিশ বছর ধরে এটি শেষ করার চেষ্টা  করেছেন। একজন সমালোচক জয় পারিনি হ্যারল্ড ব্রডকির সমস্ত কাজ নিয়ে বলেন, ‘তিনি গত ত্রিশ বছর ধরে শুধু এক হাতে তালি বাজিয়েছেন।’ এটি প্রকাশ হল খুব সাদামাটাভাবে। এবং আরও যন্ত্রণা লেখকের জন্য অপেক্ষা করছিল, কয়েকজন সমালোচক নিউজউইকে লেখেন, ‘লেখকের আত্মার পরাজয় ঘটেছে এবং এটিই তাঁর শেষ লেখা। তবে এটা পুনরায় আবার লেখা প্রয়োজন।’

 

হারপার লি
হারপার লি ছিলেন কাপোটের ছোটবেলাকার বান্ধবী। প্রথম উপন্যাস (টু কিল এ মোকিং বার্ড) লেখার পর তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘গো সেট এ ওয়াচম্যান’ যখন প্রকাশ পায় তখন তাঁর বয়স ৮৯। প্রথমটার সেক্যুয়াল ছিল দ্বিতীয় উপন্যাসটি। এটা লেখার পর লি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আর কোনো নতুন লেখা লিখতে পারেননি। তিনি নিয়মিত লেখার বিষয়ে ফলোআপ করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ফলোআপ কাজে দিল না। সুতরাং আমরা বলতেই পারি এর পেছনে কারণ ওই রাইটার’স ব্লকই। তবে এটা জানা যায় যে, যখন তিনি টু কিল এ মোকিং বার্ড শেষ করেন তার কিছু বছর পর তিনি তাঁর এক বন্ধুকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি আমি আর লিখতে পারি না...। আমি ছয়টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্ত অনুভব করি। আর এভাবেই অনেক ছয়টাই জমা হতে থাকে।’

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।