সকাল ১১:৪৫ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

নন্দনতত্ত্ব ও উত্তরাধুনিকতা || শরীফ আতিক-উজ-জামান

প্রকাশিত:

শুরুতে নন্দনতত্ত্ব ছিল দর্শনের একটি বিষয় যা শিল্পের প্রকৃতি ও সেই সম্পর্কিত শিল্পপ্রেমীদের অভিজ্ঞতার স্বরূপ অনুসন্ধান করতো। ১৮ শতকে ইয়োরোপে এর সূচনা হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন দার্শনিক গোষ্ঠী কবিতা, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্যকলা ইত্যাদির বিকাশে বিশেষ জ্ঞানতাত্ত্বিক ভূমিকা রেখেছেন। তারা সব শিল্পকেই একটি বিশেষ কাঠামোয় বন্দী করে সামগ্রিকভাবে তার নামকরণ করেছিলেন Les beaux arts ev The fine arts। বাংলায় যাকে আমরা ‘শিল্পকলা’ বলছি। দার্শনিকরা শুরুতেই বলে আসছেন যে শুধু কারণ নির্ণয়ের মাধ্যমেই সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা করা যায় না। সৌন্দর্যের শৃঙ্খলা, প্রতিসাম্য বা সুষমতার মতো কিছু যৌক্তিক গুণ বা বৈশিষ্ট্য থাকলেও তা প্রকৃত অর্থে এমন এক অভিজ্ঞতা যা শুধু যুক্তির দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বজ্ঞা বা অন্তর্জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাথে অনুভূতি ও আবেগের সমন্বয়ে তা অনুধাবন করতে হয়। নান্দনিক অভিজ্ঞতা আনন্দ, বেদনা, ক্রোধ, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদির বিশুদ্ধ বা মিশ্র অনুভূতি ধারণ করে থাকে।  

ইমানুয়েল কান্ট নন্দনতত্ত্বের মূল্য নিরূপণে গড়নকে প্রয়োগের ওপরে স্থান দিয়েছেন। একটি ঘোড়া যে মাঠে ভালো দৌঁড়ায় সেই স্থান ব্যতিরেকেই সে সুন্দর। কোনো কিছুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের গুণেই সে সুন্দর হয়ে থাকে তার দ্বারা প্রাপ্ত উপকারের বিচারে নয়। তারপরও বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও ইতিহাস পরম্পরায় শিল্প মূল্যায়নের সর্বজনীন কোনো মানদণ্ড আছে কি না সেই জিজ্ঞাসা রয়েছে, আর সেই প্রশ্ন জোরেশোরে করেছেন উত্তরাধুনিকরা। শিল্প কী? নান্দনিক অভিজ্ঞতা কাকে বলে? কিভাবে নান্দনিক মূল্য নিরূপিত হবে? এই অভিজ্ঞতায় কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ? একটি বস্তু কেন সুন্দর হয়? কিভাবে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নিরূপণ সম্ভব? কিভাবে শিল্পকে মূল্যায়ন করা হবে? কিভাবে একটি মতামত যুগবৈশিষ্ট্য বা যুগের প্রকাশ হয়ে ওঠে? শিল্প কি রাজনীতি নিরপেক্ষ? কিভাবে একটি শিল্পকর্ম নির্মিত হয়? এইসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের সাথে নন্দনতত্ত্ব শিক্ষায়তনিক পঠন-পাঠনের বিষয় কি না তা নিয়েও তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা নন্দনতত্ত্বকে জাতি, শ্রেণি ও লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছেন। শিল্পকে সুশীল সমাজের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তারা।

ইমানুয়েল কান্ট

বিভিন্ন ধরনের শিল্প– চিত্রকলা, ব্যালে, ভাস্কর্য, সঙ্গীত ও কবিতা বৈশিষ্ট্যগতভাবে এতই আলাদা যে একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বের ছাঁচে ফেলে তাকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া বোকামি, কারণ প্রতিটি বিষয়ের প্রকাশভঙ্গি ও নান্দনিকতা বিচারের ভিন্ন ভিন্ন সূত্র রয়েছে। তাছাড়া নন্দনতত্ত্ব অভিজাত বিষয় যা শিল্পবিচারের ভিত্তি নির্মাণ করে। কিন্তু কোনো একক বিষয়ে পারদর্শী গোষ্ঠী সবকিছুর নান্দনিক মূল্য নিরূপণের ক্ষমতা রাখেন না। ভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী, জাতিসত্তা ও লিঙ্গের মানুষের সামাজিক সূত্রে বিশেষ মূল্যবোধ তৈরি হয় যার ভিত্তিতে তারা নিজস্ব নান্দনিক বিচারবোধ তৈরি করেন। নিগ্রো নন্দনতত্ত্ব, নারীবাদী নন্দনতত্ত্ব, দেশীয় নন্দনতত্ত্ব, আফ্রিকান নন্দনতত্ত্ব, এশিয়ান নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি। সর্বজনীন নন্দনতত্ত্ব হতে পারে না বা সম্ভব নয়। সব মানুষের শৈল্পিক অভিজ্ঞতা এক নয়। আবার নারীবাদী নন্দনতত্ত্ব শিল্পবিচারের একেবারেই নতুন এক ক্ষেত্র। আর তা প্রাচীন নন্দনতত্ত্বের সাথে কিছু যোগ করেনি, বরং তার মৌলিক ভাবনার খোলনলচেই পাল্টে দিয়েছে। শিল্পের সর্বজনীন ভাবনা ও নান্দনিক অভিজ্ঞতাকে তা অবজ্ঞা করে। নারীবাদ দীর্ঘদিন থেকে নন্দনতত্ত্ব প্রসঙ্গে খুবই অসন্তুষ্ট। তারা খেয়াল করেছেন কীভাবে ১৮ শতকের শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নির্মাণ করেছেন। নন্দনতত্ত্ব ‘রুচিশীল’ মানুষের বিষয় হিসেবে দেখতে শেখানো হয়েছে। একজন ভদ্রলোক কিছু বৈশিষ্ট্য বা মানদণ্ডের সাহায্যে কোনো শিল্পকর্ম পরখ করবেন এবং তারপর তা ভালো বা মন্দ বলে মতামত দেবেন।

শিল্প ধর্মের বিকল্প ও তার মতোই পবিত্র। তার মতে, প্রাচীনকালে দেবতা মন্দিরে পবিত্র হিসেবে গণ্য হতেন। ধ্রুপদী যুগে রাজা রাজপ্রাসাদে পবিত্র ছিলেন। আধুনিক যুগে জনপ্রতিনিধিরা সংসদে সম্মানিত। আর উত্তরাধুনিক যুগে শিল্প জাদুঘর আর প্রদর্শনীতে সম্ভ্রমের আসন লাভ করেছে।

উত্তরাধুনিকদের কেউ কেউ মনে করেন যে শিল্পব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নন্দনতত্ত্ব শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে, কারণ শিল্প– ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং নৃতাত্ত্বিকরা সব দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে পারেন না। সাধারণ নন্দনতত্ত্ব সব শিল্পকে সবসময় সব জায়গায় ব্যাখ্যা করতে পারে না। যে শিল্প-সমালোচক ইয়োরোপে জন্মেছেন বা বড় হয়েছেন তিনি আফ্রিকার শিল্পী কর্তৃক নির্মিত শিল্পের সঠিক মূল্যায়ন কিভাবে করবেন? তারা প্রশ্ন রেখেছেন, কীভাবে একজন কিসোঙ্গি-ইথিওপিয়ান সমাধি ভাস্কর্যের নন্দনতত্ত্ব ব্যাখ্যা করবেন যদি তা তুলে এনে বৃটিশ মিউজিয়ামে স্থাপন করা হয়? কারণ ওই চিত্রকলার কাহিনি-সূত্র শুধুমাত্র মূল পরিবেশে গেলেই অনুধাবন করা সম্ভব। প্রাচীন সমাজের এই আবিষ্কারকে আধুনিক নন্দনতত্ত্ব-সূত্রে ব্যাখ্যা করলে সহজেই বিভ্রান্তির ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা। তাদের মতে, নন্দনতত্ত্বের কোনো সর্বজনীন আদর্শ নেই।

ফ্রানজ ফ্যানোন

নন্দনতত্ত্বের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী আদর্শও রয়েছে। সমালোচকরা বলেছেন যে নন্দনতত্ত্ব রাজনৈতিক আকার নিলে তা হয়ে ওঠে দমনমূলক। বড় দেশের আদর্শ ছোট দেশের ওপর চেপে বসে, তারা ছোটদেশের নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠতে দেয় না। ফ্রানজ ফ্যানোন একবার বলেছিলেন কীভাবে ইয়োরোপীয় নন্দনতত্ত্ব আফ্রিকার কলোনিগুলোতে ‘internal psychic policeman’ হিসেবে কাজ করেছে। তারা স্থানীয় শিল্পকে সম্মানের চোখে দেখেনি। সেখানে ফরাসি নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়েছে। আর ভারতে চর্চা হতো বৃটিশ আদর্শ। ইয়োরোপীয় শিল্প আদর্শ এক ধরনের অবদমিত পরিবেশ তৈরি করেছিল। আর এখন বিশ্বায়নের নতুন যুগ। সমালোচকরা বলছেন যে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্বব্যাপী শিল্প-সংস্কৃতির একটি সমরূপ বৈশিষ্ট্য প্রচার করছে। কিন্তু তা সংস্কৃতির ‘পণ্যায়ন’ (commodification) তৈরি করলেও স্থানীয় শিল্পের মানের অবনমন ঘটাচ্ছে। পেশাজীবী শিল্পসমালোচকরা যতই বলুন না কেন যে, নন্দনতত্ত্ব রাজনীতি নিরপেক্ষ একটি আদর্শ এবং শিল্পকে সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য দ্বারা মূল্যায়ন করা সম্ভব, তথ্য-প্রমাণ অন্য কথা বলে। নন্দনতত্ত্বে সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য নেই, আর তাই তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঠন-পাঠনের উপযোগী বিষয় নয়।

অনেক শিল্পতাত্ত্বিক ধর্মকে শিল্পের সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করেন। ফ্রান্সে সমাজতান্ত্রিক সমালোচক রেজিস ডিব্রে (Régis Debray) যুক্তি দেখিয়েছেন যে, শিল্প আজ ‘ধর্মের অবক্ষয়ী বিধান’ এর স্থান দখল করে নিচ্ছে। তিনি শিল্পকে ‘সর্বজনীন’ প্রমাণের মরিয়া প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। শিল্প ধর্মের বিকল্প ও তার মতোই পবিত্র। তার মতে, প্রাচীনকালে দেবতা মন্দিরে পবিত্র হিসেবে গণ্য হতেন। ধ্রুপদী যুগে রাজা রাজপ্রাসাদে পবিত্র ছিলেন। আধুনিক যুগে জনপ্রতিনিধিরা সংসদে সম্মানিত। আর উত্তরাধুনিক যুগে শিল্প জাদুঘর আর প্রদর্শনীতে সম্ভ্রমের আসন লাভ করেছে। একসময় ধর্ম বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল, উপজাতি, শহর, নগর ও সমগ্র সভ্যতায় পবিত্রতার উৎস হিসেবে গণ্য হতো। কিন্তু বর্তমানে শিল্প হলো বৈশ্বিক ধর্ম যা সব দেবতা, ঈশ্বর, সভ্যতা ইত্যাদিকে সম্পৃক্ত করেছে। কিন্তু উত্তরাধুনিকদের মতে,‘সর্বজনীন’ শিল্প বলে কিছু নেই। শিল্প শুধুমাত্র স্বদেশীয় ও স্থানিক। বৈশ্বিক সংস্কৃতি শুধুমাত্র বদ্ধ-সংস্কার যেখানে সদগুণ বা মূল্যবোধ বলে কিছু নেই। ভারতীয় পৌরাণিক মহাকাব্য ‘মহাভারত’ ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে একসূত্রে গেঁথে রাখার জন্য অনুঘটকের কাজ করলেও প্যারিসে তার কোনো প্রভাব নেই। আবার ফরাসি মানুষের ওপর নাট্যকার রেচাইনের কিছু প্রভাব থাকলেও বেনারসে আদৌ কিছু নেই।

সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বর্দি (Pierre Bourdieu) নন্দনতত্ত্বের প্রতি বুর্জোয়া ‘মেজাজ’কে শ্রেণিনির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন। বেঁচে থাকার জন্য যাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের দুর্ভাবনা নেই তারা শিল্প নিয়ে নানা ভাবনায় সময় দিতে পারে। রেনেসাঁর নান্দনিক আদর্শ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির মেজাজ মাফিক তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। চিন্তার এই ক্ষেত্র এখনো সারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। কিন্তু সমালোচকরা জোরালো যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, নান্দনিক অভিজ্ঞতা সর্বজনীন নয়। এই সংক্রান্ত সমস্ত মন্তব্যই স্ব-বিরোধী; কোনো বিবৃতিই সব সম্ভাব্য সত্যের সাথে নিবিড় সম্পর্ক দাবী করতে পারে না। শিক্ষায়তনিক বিষয় হিসেবে নন্দনতত্ত্ব পাঠ্য হতে পারে না, কারণ তার সর্বজনীন বৈশিষ্ট্যের অভাব রয়েছে। শিল্পকে অনির্দিষ্ট বহুত্ববাদী বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা উচিত। উত্তরাধুনিকরা চান যে, মানুষ ইউরোকেন্দ্রিক বুর্জোয়া আদর্শের বাইরে শিল্পের বহুমাত্রিকতা উপভোগ করুক নিজস্ব শিল্পরুচি দ্বারা। রাজনীতি মানুষের প্রতিটি প্রকাশভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। শিল্প-রাজনীতি বিষয়ক সমালোচনার এইসব স্বরাঘাতের মাঝে উত্তরাধুনিকরা বলছেন যে, নন্দনতত্ত্ব বড়জোর ‘স্থানিক তত্ত্ব’, সর্বজনীন নয়।

এমিলে জোলা ১৮৬৬ সালে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি সৌন্দর্য বা তার উৎকর্ষ নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নই। আমি গুরুত্বপূর্ণ শতকের বিষয়টাকে গ্রাহ্য করি না। আমি যা কিছুর বেশি মূল্য দেই তা হলো জীবন, সংগ্রাম ও তার গভীরতা। আমি আমার প্রজন্মেই স্বস্তিতে আছি।’ দ্বান্দ্বিকতা (Dialectics) দর্শনের একটি বিষয় যা দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যকে ধারণ করে, গঠনমূলক সমালোচনাকে উৎসাহ জোগায় এবং সমস্যাকে পরিমাপ করতে সাহায্য করে। ইংরেজ সাহিত্য সমালোচক টেরি ঈগলটন নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে বলেছেন যে, তা শুরু থেকেই একটি বিপরীত ও দ্বিমুখী ধারণা। একদিকে তা বন্ধনমুক্তির শক্তি যা দ্বান্দ্বিক নিয়মরীতির বাইরে সংবেদনশীল অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। অন্যদিকে তা একধরনের অভ্যন্তরীণ অবদমনের হাতিয়ার যা বিশাল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রণাধীন জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সমাজতাত্ত্বিক আরনল্ড হসার (Arnold Hauser) বলেছেন যে, শিল্প দ্বান্দ্বিক। সংস্কৃতির মতো শিল্প দ্বন্দ্ব, বৈপরীত্য ও বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। তিনি শিল্পকে যুগপৎ সৃষ্টিশীল ও ধ্বংসাত্মক বিকাশ হিসেবে দেখেছেন। শিল্পকে এইভাবে না দেখলে তার সঠিক উপলব্ধি সম্ভব নয় বলে তার ধারণা। এই পরিপ্রেক্ষিতেই উত্তরাধুনিকদের বক্তব্য হলো, যদি নন্দনতত্ত্বকে একটি যৌক্তিক প্রতর্কের ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হতে হয় তাহলে তার শ্রেণি, জাতিসত্তা বা লৈঙ্গিক রাজনীতির স্বরূপটি জানতে হবে।
শিল্প কী? প্রচলিত মতবাদে সমালোচকরা দীর্ঘকাল ধরে দ্বিধান্বিত। যেমন, গ্রিকদের ছিল অনুকারী তত্ত্ব (Mimetic theories), যার মূল কথা হলো, শিল্প প্রকৃতির অনুকরণ।

প্লেটো

প্লেটো বলেছেন, ‘শিল্প প্রকৃতিকে নকল করে।’ নকল বলতে প্রকৃতির উপস্থাপন বা ব্যাখ্যা যে কোনোকিছুই হতে পারে। তার মতে, শিল্পী প্রকৃতি নকল করেন, কিন্তু প্রকৃতি উঁচুমাত্রার রূপ বা গড়নের নকল। আর গড়ন চোখের আড়ালে থাকা মহৎ ভাবনা বা রীতিকে নির্দেশ করে অর্থাৎ আমরা যেভাবে দেখে থাকি তার বাইরের সৃষ্টি। অন্যভাবে বললে, লোকে পার্থিব জগতে যে সব বস্তুনিচয় অবলোকন করে তা মহৎ ভাবনার ছায়া যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। অ্যারিস্টোটল এই ভাবনার সাথে কিঞ্চিত যোগ করেছেন। তার মতে, নাটক মহৎ ভাবনার ফসল। বিয়োগান্ত নাটক একজন মানুষের উঁচু থেকে নিচু অবস্থানে অবনমনের কাহিনি তুলে ধরে যা উচ্চ ভাবনার ফসল। নাটকটিতে এই বিমূর্ত ভাবনার নির্দিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ ধরা থাকে। তিনিও প্রকৃতির মাঝে উঁচুমাত্রার গড়ন দেখতে পান, যেমন– বীজের মাঝে একটি বৃক্ষের রূপ লুকিয়ে থাকে। শেকসপীয়রও কি একই কথা বলেন নি? হ্যামলেট যখন বলেন, ‘… to hold, as ‘twere, the mirror up to nature.’ তখন আমরা ওই একই বিবৃতির প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। শিল্পের বিভিন্ন তত্ত্ব ভিন্ন ভিন্ন কথা বলে। ভ্যানগঘ, গগ্যাঁ, মুঙ্খ প্রমুখ প্রকাশবাদীরা শিল্পকে শিল্পীর অন্তর্লীন জীবনের প্রকাশ বলে মনে করেন। ভাবাদর্শবাদীরা (Idealist) শিল্পকে একবারেই স্বজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মন্তব্য করেছেন। বেনেদেত্তো ক্রোচে যখন বলেন যে, শিল্প বিশুদ্ধ ‘স্বজ্ঞা’ বা অন্তর্জ্ঞান তখন তা আসলে বোঝায় সেই অনুভূতি যা কিছু গড়ন তৈরি করে। শিল্প ‘প্রণোদনা’র ওপর নির্ভরশীল যা থেকে প্রতিনিধিত্বশীল রূপ বা গড়ন নির্মিত হয়। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্প হলো যুক্তির ক্ষমতা ও বস্তুতান্ত্রিকতার বাইরে সত্তার বিশেষ প্রকাশ। মনস্তত্ত্ব শিল্পকে লুকানো আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী উপস্থাপনা বলে সংজ্ঞায়ন করেছে। ফ্রয়েড যুক্তি দিয়েছেন যে, শিল্প অর্থবিত্ত, সম্মান, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা লাভের আকাক্সক্ষার তাড়না। আর তাই শিল্প হলো স্নায়ুবৈকল্যের প্রকাশ। লেখক-কবি-শিল্পী সবাই তাদের আবেগ ঢেকে রেখে শিল্পের মাধ্যমে নিজেকেই প্রকাশ করতে চান। গঠনবাদীরা (Formalist) মনে করেন, শিল্পের মূল্য নিরূপিত হয় রূপ বা গড়নের ওপর ভিত্তি করে। শিল্পীর অভিপ্রায় বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। আবার সৌন্দর্য তত্ত্ব অনুযায়ী শিল্প ভিত্তি পায় সৌন্দর্যের অনুভূতির ওপর। এই মতবাদের অনুসারীরা উনিশ শতকের ইয়োরোপকে ‘the ugly industrial age’ বলে অভিহিত করেছেন। অনেক দার্শনিকও মনে করেন যে, শিল্পের ভিত্তি সৌন্দর্য-অনুভূতির ওপর এবং কেবল সৌন্দর্যের ওপরেই শিল্প দাঁড়াতে পারে। প্রয়োগবাদীরা শিল্পের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে তার মূল্য নিরূপণ করেন। সেখানে সৌন্দর্য বা গড়নের কোনো ভূমিকা নেই, আছে কার্যকারিতার।

উপরের প্রতিটি সংজ্ঞার মধ্যেই কিছু সত্য রয়েছে। কিন্তু তা এই জটিল বিষয়কে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। উত্তরাধুনিকরা তাই নন্দনতত্ত্বের নতুন প্রতর্ক নির্মাণ করেছেন। তারা তাদের তত্ত্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলোকে ভিত্তি হিসেবে ধরলেও ত্রুটিমুক্ত করতে চেয়েছেন। একটি দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিকোণ প্রাচীন বৈশিষ্ট্যকে অন্তর্ভুক্ত করলেও তাদের গতিশীলতাকে ব্যাখ্যা করেছে। শিল্পের উদ্দেশ্য সেই নান্দনিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যা রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন এবং তা থেকে মুক্তি লাভ করতে চায়। সর্বজনীনতার সমস্যা নিয়ে আলোচনাই এই মতবাদের মূল লক্ষ। দার্শনিক ডি ডব্লিউ গোটশালকের মতে, শিল্পের উপাদান, রূপরীতি, প্রকাশ, উপযোগিতার মাঝে এক ধরনের মিথষ্ক্রিয়া রয়েছে। প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের নিজস্ব গতিশীলতা থাকলেও তাদের মিথষ্ক্রিয়া খুবই শক্তিশালী।  

শিল্পীর উপাদান, যেমন– রঞ্জক, বিভা, বুনট ইত্যাদি শিল্পীর হাতিয়ার এবং তা শিল্পীর অভিপ্রায়ের সাথে সম্পৃক্ত। এইগুলোর সঠিক প্রয়োগ শিল্পকর্মটির মর্ম বোঝানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নান্দনিক অভিজ্ঞতার জন্য চিত্রকলায় রঞ্জকের সূক্ষ্ন তারতম্য ও মূল্যের পার্থক্য একসূত্রে গাঁথা জরুরি। গোটশালক চিত্রকলার উপাদান, রূপরীতি ও প্রকাশভঙ্গির মাঝে একটা সংযোগ নির্মাণের ওপর জোর দিয়েছেন। মতামত দেওয়ার জন্য নন্দনতত্ত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য নির্মাণ জরুরি মনে করেছেন তিনি। একটি শিল্পকর্ম কিছু ঐক্য তুলে ধরে যা ওইসব রীতি বা বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল, আর তা শিল্প নির্মাণে সর্বজনীন হিসেবে স্বীকৃত। যেমন, পুনরাবৃত্তি বা পৌনঃপুনিকতার মাধ্যমে সঙ্গতি (Harmony) এক ধরনের ঐক্য অর্জন করে। তেমনি ভারসাম্য (Balance) ঐক্য পায় বৈপরীত্যের মাধ্যমে। নির্দিষ্ট কিছু উপাদান আছে যা নিজেদের মাঝে বিরোধিতা ও সাম্য নির্মাণ করে। সঙ্গতি ও ভারসাম্যের রীতি পরস্পরবিরোধী। ভারসাম্য জোর দেয় ‘ঐক্যের মাঝে বৈচিত্র্য’ আর সঙ্গতি জোর দেয় ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ নির্মাণে। কেন্দ্রিয়তার (centrality) নিয়ম সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন সমস্ত উপাদানের সামষ্টিক দর্শন একইসূত্রে গ্রথিত থাকে আর এক বা একাধিক উপাদানকে অন্যটি থেকে নান্দনিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন, মঞ্চাভিনয়ের সময় যে বিষয় বা চরিত্রকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হয় তার ওপর আলো ফেলা হয়। জত্তোর Madonna Enthroned ছবিতে অনেক ফিগর থাকলেও আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে ম্যাডোনা ও তার শিশুসন্তান। নান্দনিক মূল্য বিচারে উন্নয়ন বা বিকাশ (development) কেন্দ্রিয়তাকে অতিক্রম করে। যেমন, একটি ছোটগল্পে হয়তো উল্লেখযোগ্য কোনো কাহিনি নেই, কিন্তু চরিত্র, মেজাজ, বা অবস্থা নির্মাণে বিশেষত্ব থাকতে পারে। তেমনি চিত্রকলার ক্ষেত্রে সঙ্গতির বিরোধিতার মাধ্যমে নতুনত্ব নির্মাণই হলো উন্নয়নের লক্ষ্য। কেন্দ্রিয়তা নির্ভর করে প্রাধান্যপরম্পরার ওপর, কিন্তু উন্নয়ন কোনো উপাদানের পরম্পরার ধার ধারে না। উপাদানের বিন্যাসে প্রধান-অপ্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীন কোনো বিষয়ই নেই।
সঙ্গতি, ভারসাম্য, কেন্দ্রিয়তা ও উন্নয়ন– এই ৪টি রীতির আবার পৌনঃপুনিকতা, মিল, মাত্রা, বৈচিত্র্য, সুমিতি, বৈপরীত্য, ছন্দ, মাপ, প্রাধান্য, অগ্রগতি ইত্যাদি বিষয় রয়েছে যা রূপ বা গড়ন নির্মাণে শিল্পী ব্যবহার করে থাকেন। এখন রূপ বা গড়ন প্রকাশের সাথে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। শিল্পে ‘প্রকাশ’ বলতে গটশালক বোঝাতে চেয়েছেন বিষয়ের বিপুল সম্পদ– অনুভূতি, ধারণা, চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব– যা উপরিতলের বস্তুর আড়ালে এবং কাঠামোর গড়নে থাকে। শিল্পী সচেতন বা অবচেতনভাবে প্রকাশভঙ্গি দিয়ে থাকেন । ‘উপাদান’ ও ‘গড়ন’ প্রকাশভঙ্গিকে সাহায্য করে। যেমন, নৃত্যে ক্ষিপ্রগতির শরীর প্রয়োজন পড়ে নানাবিধ অনুভূতি প্রকাশের জন্য। সঙ্গীতে নানারকমের যন্ত্রের সমন্বয় ও সুরের ঐক্য মধুর ও সুরেলা প্রকাশের জন্য প্রয়োজন পড়ে। আর চিত্রকলায় কাঙ্ক্ষিত প্রকাশভঙ্গির জন্য বিভিন্ন রং ও বুনট দরকার হয়। পরিশেষে উপাদান, রং ও প্রকাশের মাঝে যে গতিশীলতা তা নিরূপিত হয় সমাজের সাথে কার্যকর সম্পর্কের ভিত্তিতে। তবে তার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে। গটশালকের রীতি নন্দনতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তা ছাড়াও শিল্পকে লিঙ্গ, জাতীয়তা, শ্রেণি, সম্প্রদায় ইত্যাদির নিরিখেও মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। নান্দনিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে এর প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তা আলাদা পঠনপাঠনের বিষয়। এর অর্থ হলো, সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের সাথে নন্দনতত্ত্বের পাঠ বৈচিত্র্যপূর্ণ এক বিষয়।

উত্তরাধুনিকরা মনে করেন, নন্দনতত্ত্বের নতুন ক্ষেত্র নির্মাণ সম্ভব যা রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে যুক্ত করে। শিল্পের রাজনীতি এবং তার স্বাধীন ভূমিকাকে আত্মস্থ করতে গেলে শিক্ষায়তনিক পঠন-পাঠনের সাথে তার যোগসূত্র জানা জরুরি।

‘Beauty is in the eye of the beholder’এই ধ্রুপদী আদর্শের উত্তরাধুনিকতা প্রসঙ্গে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এই ‘beholder’ কোনো ব্যক্তি নন, গোষ্ঠীও বটে যেখানে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন ও আদর্শ নির্মিত হয়। সমাজতাত্ত্বিক মানসম্পন্ন পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে এই বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানবেন। দেখার চোখ না থাকলে সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। আর সেই চোখ সৃষ্টির জন্য যে অভিজ্ঞতা লাগে তা অর্জন করতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে প্রবেশ করা জরুরি। এইভাবে অংশগ্রহণকারীর প্রত্যক্ষণ পদ্ধতি সৃষ্টি হয়। তাহলে কি নতুন নন্দনতত্ত্ব সৃষ্টি সম্ভব? উত্তরাধুনিকরা মনে করেন, নন্দনতত্ত্বের নতুন ক্ষেত্র নির্মাণ সম্ভব যা রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে যুক্ত করে। শিল্পের রাজনীতি এবং তার স্বাধীন ভূমিকাকে আত্মস্থ করতে গেলে শিক্ষায়তনিক পঠন-পাঠনের সাথে তার যোগসূত্র জানা জরুরি।

নন্দনতাত্ত্বিক পঠন-পাঠনের জন্য আমরা ৩ ধরনের ক্ষেত্র বেছে নিতে চাই। ১. তাত্ত্বিক নন্দনতত্ত্ব যা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠনের সাথে যুক্ত, আরো পরিষ্কার করে বললে তা দর্শনের সাথে যুক্ত; ২. সাধারণ নন্দনতত্ত্ব যা শিল্পকলার বিভিন্ন বিষয়ের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কাজ করে; ৩. দৈনন্দিন জীবনের নন্দনতত্ত্ব যা অভিজাত শ্রেণির গোপনীয় বিষয় নয়। লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণি বিষয়ক রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। নতুন নন্দনতত্ত্ব শিল্পের সম্পূর্ণ নতুন একটি ক্ষেত্র নির্মাণ করবে যা একাধারে শিক্ষায়তনিক ও সমাজের জন্য প্রয়োজন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শিল্প হলো জীবনের ব্যাকরণ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শিল্প রয়েছে। পথে নিরাপদে হাঁটার জন্য যেমন শিল্প রয়েছে, তেমনি বিদ্যালয় পরিচালনার জন্যও শিল্প রয়েছে। শিশুদের সংবেদনশীলতা বাড়াতে, বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণেও শিল্প রয়েছে। শিক্ষায়তনিক প্রতিটি বিষয় পঠনের জন্য যেমন শিল্প রয়েছে তেমনি শিল্প অধ্যয়নের জন্য কাঠামোগত নন্দনতত্ত্ব রয়েছে। আর এসবের সঠিক অনুধাবনই নন্দনতত্ত্বের মূল কথা।  

 

অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।