রাত ০৯:৪৫ ; বৃহস্পতিবার ;  ২০ জুন, ২০১৯  

প্রকৌশলী লাঞ্ছিত, অনলাইন লটারি মানছেন না ঠাকুরগাঁওয়ের কিছু ঠিকাদার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি।।

ঠাকুরগাঁও সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি কাজ না পাওয়ায় প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করার পর এবার টেন্ডার বাতিলের চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছেন কাজ না পাওয়া কিছু ঠিকাদার।

গত মঙ্গলবার এসব ঠিকাদার ঠাকুরগাঁও সড়ক ও জনপথ বিভাগের অফিস ঘেরাও করে প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করে অফিসের কাগজপত্র তছনছ করে। এবার কৌশল হিসেবে টেন্ডারটি বাতিল করতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু ঠিকাদার বিভিন্নস্থানে তদবির শুরু করেছেন।

অন্যদিকে, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ই-টেন্ডার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বলে দাবি করে প্রতিবাদ পত্র দিয়েছেন দিনাজপুর টেন্ডার কমিটির চেয়ারপারসন ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বুলবুল হোসেন।

ঠাকুরগাঁয়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ বেহাল সড়কটি পুনর্নির্মাণ। অবশেষে সেই দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের বড় উদ্যোগ বাস্তব রূপ নেয়ার পথে থমকে যেতে বসেছে কিছু ঠিকাদারের ষড়যন্ত্রের কাছে।

ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর সওজ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও হতে পীরগঞ্জ পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের জন্য ঠাকুরগাঁও সড়ক ও জনপদ বিভাগ থেকে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকার প্রাক্কলন ধরে টেন্ডার আহ্বান করা হয়।

যথারীতি উক্ত কাজের বিপরীতে ১৪টি সিডিউল বিক্রি হয় এবং টেন্ডার ফেলার শেষদিনে ৯ জন ঠিকাদার সিডিউল ড্রপও করে। এর মধ্যে সঠিকভাবে টেন্ডার দাখিলে ব্যর্থ হওয়ায় ৫ ঠিকাদারের সিডিউল অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

পরে দিনাজপুর তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী অফিস ই-টেন্ডারে লটারির মাধ্যমে মো. জামাল হোসেন নামে এক ঠিকাদারকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। একারণে ঠাকুরগাঁওয়ের কিছু স্বার্থলোভী ঠিকাদার ওই টেন্ডার বাতিলের জন্য উঠে পড়ে লেগে যায় এবং গত মঙ্গলবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সড়ক ভবন ঘেরাও করে নির্বাহী প্রকৌশলীকে টেন্ডার বাতিলের জন্য চাপ প্রয়োগ করে।

পরে সরকার দলীয় এক নেতার নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঢুকে তাকে লাঞ্ছিত করে ও দাপ্তরিক কাগজপত্র তছনছ করে। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার আগেই ওই সন্ত্রাসীরা সরে যায়।

এ ঘটনায় ঠাকুরগাঁও থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সড়ক ও জনপদ অফিসে গেলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে একটা অনলাইলে জিডির আবেদন এসেছে বলে তিনি জেনেছেন। তবে সন্ত্রাসীরা সনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জিডি গ্রহণ করা যায় না বলে তিনি জানান।

কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত অনলাইন লটারির ফলাফল নিজেদের পক্ষে না যাওয়ায় তারা টেন্ডারটি বাতিল করে পুনঃটেন্ডার করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ করেছেন লটারিতে কাজ পাওয়া ঠিকাদার জামাল হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, একই দিনে তাদেরই একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে লটারিতে কাজ পেলেও সেটি সম্পর্কে টু শব্দটি তারা করলেন না।

এদিকে, এক প্রতিবাদপত্রে টেন্ডার কমিটির চেয়ারপারসন ও দিনাজপুরের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বুলবুল হোসেন শনিবার জানিয়েছেন,দাখিলকৃত নিম্নতম দরদাতাদের ৩ জনের দাখিলকৃত দর একই হওয়ায় মূল্যায়নের ধারাবাহিকতায় লটারি বাটন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেনারেটেড হয়। প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয়, যেহেতু সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পিপিআর-২০০৮ এর বিধি ৩৬(৪) (খ) অনুযায়ী মূল্যায়নটি অতি গোপনীয় প্রক্রিয়া। এখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবগত করার কোনও সুযোগ নেই। অথচ ‘ঠিকাদারদের অবগত করা হয়নি’ এ অজুহাতেই অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত পত্রে আরও অভিযোগ করা হয় যে, ইজিপি সিস্টেমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠাকুরগাঁওয়ের ঠিকাদার রাম বাবুর প্রতিনিধি দীপক চন্দ্র রায় কয়েকজন দুর্বৃত্তকে নিয়ে ঠাকুরগাঁও নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় আক্রমণ ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে লাঞ্চিত করেন যা পত্রপত্রিকায় একতরফা নিউজ করা হয়।

এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রথম শ্রেণির ঠিকারদার মো. মনিরুজ্জামান জুয়েল জানান, বর্তমানে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে সকল বড় বড় কাজের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে কোনও অবৈধ কাজ করার সুযোগ নেই।

এ ব্যাপারে জানার জন্য রবিবার অভিযুক্ত রামবাবুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেন নি। তার প্রতিনিধি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক দীপক কুমার রায় আক্রমণ ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে লাঞ্চিত করার কথা অস্বীকার করে বলেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁওয়ের বিশিষ্ট ঠিকাদাররা কিছু সাংবাদিকের উপস্থিতিতে প্রতিবাদ জানাতে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে যান। নির্বাহী প্রকৌশলী অন্যায় কাজকে জায়েজ করার জন্য এখন মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন। তিনি ই-টেন্ডারের লটারিতে ঠিকাদারের উপস্থিতি থাকবে না এমন কোনও নিয়ম নেই বলে জানান।

এ বিষযে ঠাকুরগাঁও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. সোহেল আহম্মদ জানান, টেন্ডার আহ্বানের পর নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদাররা সিডিউল ড্রপ করে। সঠিকভাবে টেন্ডার দাখিল করতে না পারায় ৫ জন ঠিকাদারের সিডিউল অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তারাই মূলত চেষ্টা করছে টেন্ডারটি বাতিল করতে।

এ বিষয়ে দরপত্র কমিটির চেয়ারপারসন ও দিনাজপুর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বুলবুল হোসেন জানান, ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদাররা টেন্ডার ড্রপ করলে লটারির মাধ্যমে মো. জামাল হোসেন নামে এক ঠিকাদারকে কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ই-টেন্ডারে কোনোরকম অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির প্রশ্ন আসে না, কারণ এটা সম্পূর্ণ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত।

এদিকে পীরগঞ্জে খবরটি প্রচার হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে পীরগঞ্জবাসীর মধ্যে। পীরগঞ্জ-ঠাকুরগাঁও সড়কের বেহাল দশা থেকে মুক্তির দাবিতে অনেকবার পীরগঞ্জবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সাংবাদিক আজম  রেহমান বলেন, খুব দ্রুত  ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে একটি ভালো যোগাযোগ সড়ক দেখতে চায় পীরগঞ্জ পৌর ও উপজেলাবাসী।

/আরএ/টিএন/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।