রাত ১০:২১ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

সিনসিয়ারলি, অনেস্টলি কাজ করা, পরিশ্রম করা– এইগুলো বাদ দিয়ে কিছু হয় না : যোগেন চৌধুরী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সৈকত হাবিব

তাঁর ছবি-রেখা-রঙের সঙ্গে যারা পরিচিত তাদের মনে হতে পারে তিনি খুব রাগী ও দশাসই চেহারার একজন শিল্পী। কিন্তু তীব্র-তুখোড় শিল্পী যোগেন চৌধুরীর মুখোমুখি হলে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয়। মনে হয় ঝাঁকড়া চুলের এক মিষ্টি কিশোর। চেহারায় এক প্রশান্ত স্নিগ্ধতা, কথা বলেন মৃদু লয়ে ও খুব গুছিয়ে।   
২০১১ সাল। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে দুই বাংলার শিল্পীদের নিয়ে চলছে আর্ট ক্যাম্প। বিমানবন্দর সংলগ্ন বেঙ্গলের ভবন ও চত্বরজুড়ে যেন শিল্পী ও তাঁদের ক্যানভাসের মেলা। এ উপলক্ষে এসেছেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী। আমার অনেক দিনের অপূরিত স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি করে দিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের, মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত। খুব স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তরঙ্গভাবে কথা বলে গেলেন তিনি। এখানে তাঁর কথাস্বভাব অক্ষুণ্ন রেখে বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।  
 

সৈকত হাবিব : শিল্পে আপনার তো অনেক বড় ভ্রমণ। এতটা পথ হাঁটার পর আপনার অনুভূতি কেমন? প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তো আপনি ছবি আঁকছেন।
যোগেন চৌধুরী : একচুয়ালি সমস্ত সময়ই আমাদের সামনে কোনো না কোনো সমস্যা থাকে। যখনই যে কাজ করি তারপরই মনে হয় যে, একটা কিছু করা দরকার। এরকম একটা অবস্থা যে, সময় চেঞ্জ করে...সমস্যা চেঞ্জ করে...ব্যক্তিগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা এসব কিছু অনবরত চেঞ্জ করে আমাদের এগোতে হয়। সুতরাং কতটা অতিক্রম করেছি সে জায়গাটা মনে থাকে না। যেটা মনে হয় সামনে এটা করতে হবে, আমাদের প্রত্যেকেরই তাই সেভাবেই এগোতে হয়। ওইভাবে ওই অ্যাসেসমেন্ট করার ভাবনাটা চট করে আসে না।

সৈকত হাবিব : শুরু থেকেই আপনার ছবির মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে। আপনার ছবি দেখলেই বোঝা যায় এটা যোগেন চৌধুরীর কাজ। নিজেকে এভাবে নির্মাণ করার বিষয়ে কিছু বলুন।
যোগেন চৌধুরী : প্রথমত শিল্পের কাজই হচ্ছে, শিল্পীকে এমন একটা কিছু করতে হয়, যাতে স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি হয়। স্বতন্ত্র জায়গা যদি আমরা সৃষ্টি করতে না পারি তাহলে আমাদের ভূমিকাটা থাকছে না। আমরা তো আর একই জিনিস রিপিট করতে পারি না। ধরা যাক, শিল্পের একটা ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে এখন নানান রকম মানুষ-শিল্পী নানান জিনিস তৈরি করেছে। আমি যখন একটা নতুন কিছু তৈরি করছি তখন সেই ক্ষেত্রটা এক্সটেনডেট হয়, সেই এক্সেটেনশনটা আমাদের চরিত্র...তারপর আমাদের অভিজ্ঞতা তার মধ্য থেকে আসে এবং আমাদের সার্চ ও আমি কী ভাবছি। না ভাবলে তো আমাদের ভাবনাটা আমি কী করব সেটা ঠিক তৈরি হবে না। আমদের ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে, সামাজিক সমস্যা থাকে, তারপর আমার পার্সোনালিটি যেরকম...এই ইনডিভিজুয়াল জায়গাগুলো, এই সব মিলিয়েই একটা মানুষের সমস্ত জায়গা তৈরি হয়। তার সঙ্গে সার্চ, এখন সেটা করতে গিয়ে আমাদের একটা ইনডিভিজুয়াল কতগুলি জায়গা তৈরি হয়। সেটাই কিন্তু আমাদের কাম্য। এখন আমি যদি একই জিনিস করি; ধরা যাক, পশ্চিমে অনেক কাজ হচ্ছে, আমি এখানে তারই একটা রেপ্লিকা তৈরি করলাম সেটা কিন্তু আমাদের কাজ না। আমাদের সমস্ত জায়গা থেকে আমরা যেভাবে এগোচ্ছি, আমাদের একটা চরিত্র আছে, আমাদের একটা কালচার আছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সে যে জিনিসগুলো গড়ে উঠবে সেটাই ইম্পর্টেন্ট আমাদের কাছে। আমরা একটা তৃতীয় জায়গায় পৌঁছাতে চাই সব সময়।

সৈকত হাবিব : আপনার ফিগার এবং কালার, আমরা দেখছি যে, এখানে নতুন একটি ধারণা। আপনার ফিগারের যে কনসেপ্ট, কালারের ব্যবহার, বেশ কালার– যার মধ্যে বড় বেশি ধাক্কা মারার ব্যাপার আছে। এগুলি কি আপনার কোনো জেদ বা ক্রোধের প্রকাশ?
যোগেন চৌধুরী : আমি সবসময় যে অনেক কালারের ব্যবহার করেছি তা না, কখনও কখনও করি। যখন পেইন্টে ইউজ করেছি, তখন কালার ইউজ করেছি। আসলে রঙ ব্যবহার করা হলো কী হলো না এটা বড় কথা নয়, কথাটা হলো যে আমি কী ভাব থেকে এটা তৈরি করেছি। রঙটা আসলে ছবির সঙ্গে এসোসিয়েটেড হয়ে এসে যায়। রঙটা আমরা আগে থেকে ঠিক করি না। কাজটা করতে করতে কতগুলো রঙকে রঙ অটোমেটিক্যালি টেনে আনে সেই ছবির মধ্যে। কাজেই রঙটা কখনো ডিমান্ড করে, কখনো ডিমান্ড করে না। কখনো হয়ত গ্রে বা অল্পের মধ্যেই রয়ে যায়। সেখানে মনে হচ্ছে এখানেই সম্পন্ন হলো। আবার কখনও মনে হচ্ছে কাজটা করতে গিয়ে এটা রঙ চাইছে। তখন রঙটা আসে। আর মন তো আমাদের নানা রকম ভাবের সঙ্গে যুক্ত, রঙটা হচ্ছে ভাবকে গেজ করে এগোয়।  

সৈকত হাবিব : আপনি তো ফ্রান্সে ছিলেন। বিশ্ব চিত্রকলায় আপনার জীবৎকালে প্রবণতাগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে হয়?
যোগেন চৌধুরী : আমরা তো শুরু করেছি ষাটের দশক থেকে। প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। এই ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে– রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক পরিবর্তন, শিল্প-সাহিত্যের পরিবর্তন, জীবনযাপনে পরিবর্তন। নতুন টেকনিকস এসেছে, টিভি এসেছে, কম্পিউটার এসেছে, মোবাইল ফোন এসেছে– আমাদের জীবনের ওপর একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে। এই সমস্ত কিছু আমাদের কালচারকে ইনফ্লুয়েন্স করে। সুতরাং সেক্ষেত্রে এগুলো আমাদের জীবনের ওপর, আমাদের ভাবনার উপর, আমাদের কাজের ওপর রিঅ্যাকশন করে। সুতরাং সেগুলো আস্তে আস্তে আসতে থাকে, সেগুলো বলতে গেলে অনেক ডিটেইলস বলতে হবে।

সৈকত হাবিব : দুই বাংলার চিত্রকলার মধ্যে বড় মাপের কোনো পার্থক্য কি চোখে পড়ে?
যোগেন চৌধুরী : নিশ্চিতভাবে। প্রথমত যখন বাংলা এক ছিল তখন আমাদের গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজটা ছিল একটা সেন্টার পয়েন্ট। সেখানে বাংলাদেশের যেসব প্রথম যুগের শিল্পীরা...তারা কিন্তু ওখানে এডুকেডেট অনেকেই। কিবরিয়ার জন্ম ছিল আমাদের বীরভূমে। এমনকি জয়নুল আবেদিনও ওখানকার ছাত্র। তারপর কামরুল হাসানও ওখানকার ছাত্র। সবাই কিন্তু ওখানকার ট্রেনিং নিয়ে বড় হয়েছে, অর্থাৎ ফিগারেটিভ আর্টের একটা বেসিক ইয়ে ছিল। কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে... সম্ভবত ধর্মীয় কারণেই দেখা গেছে একটা গ্রুপ অব পিপল, তারা মোর অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি এঁকে গেছে। হয়তো ধর্মীয় একটা নিয়মের কারণে, যেমন– ইসলাম ধর্মে আছে তারা ইমেজ তৈরি করবে না। হয়তো তাদের মনের মধ্যে এই ভাবনাটা আছে, আমি এই ফিগার করব না। তারপর এখানে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের আধিক্য আছে। ফিগারও আছে... তবে কে কী আঁকবে এটা যার যার ব্যাক্তিগত ব্যাপার।
কিন্তু আমার কাছে একটা প্রশ্ন তৈরি হয় সেটা হচ্ছে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের যে আন্দোলন সেটা কিন্তু একটা পাস্ট আন্দোলন, এটা মডার্নিজম নয়। গত এক শতাব্দী আগে ইউরোপে এই মুভমেন্টটা তৈরি হয়, কনসান্স আন্দোলন যেটাকে বলি। কিন্তু তাই বলে অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ হবে না তা নয়। অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজেরও আবার রকমফের আছে। একটা ইনডিভিজুয়াল অ্যাপরোচ থাকতে পারে। যেমন– ইন্ডিয়াতে আছে ‘কোল্টে’, কিংবা আমাদের গণেশ হালুই কিছুটা অ্যাবস্ট্রাক্টের সাথে যুক্ত।
এরকম কোনো কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্ট আছেন যারা...যেমন রামকুমার, সেও অলমোস্ট অ্যাবস্ট্রাক্টের ওপরই কাজ করে। কিন্তু তার মধ্যে ইনডিভিজুয়ালিটি থাকতে হবে, অর্থাৎ থটলেস হবে না। আমার মনে হয় যে, সেই জায়গাটা গড়ে তোলার দরকার আছে যে, অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টেরও একটা পরম্পরা আছে– এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে এসেছে।

সৈকত হাবিব : এমন কি হয় যে, শিল্পের বেসিক জায়গাটা ভালোভাবে প্রাকটিস না করার কারণে অনেক সময় শিল্পীরা অ্যাবস্ট্রাক্টের আশ্রয় নিয়ে এগোতে চান?
যোগেন চৌধুরী : ধরা যাক ইন্ডিয়াতে এখন এক হাজার আর্টিস্ট কাজ করছে, এক হাজার আর্টিস্ট তো আর একচুয়ালি এক্সেলেন্সির কাছাকাছি পৌঁছাবে না। এক হাজার আর্টিস্ট গ্রেট আর্টিস্ট হবে না। ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়...আজকের ফ্রান্সে কনটেমপরারি কোনো গ্রেট আর্টিস্ট নেই। তবে একটা-দুটো নাম হয়ত নেওয়া যায়। কিন্তু ওখানে নিশ্চয়ই এখনো হাজারো শিল্পী প্রাকটিস করে। একটা সময় ফ্রান্সে খুবই ভালো আর্টিস্ট ছিল, সারা পৃথিবীকে তারা ডোমিনেট করতো। ইন্ডিয়াতেও এখন ধরা যাক অন্তত দু’হাজার আর্টিস্ট প্রাকটিস করে। তার মধ্যে সিগনিফিকেন্ট আর্টিস্ট হয়ত ৫০ জন। তার মধ্যে গ্রেট আর্টিস্ট তো আরও কম হবে। এইটা, এই রেশিওটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। এরকমভাবে বাংলাদেশেও, ধরা যাক তিনশো আর্টিস্ট বা পাঁচশো আর্টিস্ট ছবি আঁকছে। তার মধ্যে আমার ধারণা, বেছে বেছে আমরা হয়তো শেষ পর্যন্ত...। নিজেদের টাইমে জায়গাটা একটু ঘোলাটে থাকে নানান কারণে।... আমরা তো তখন কাউকে ক্রিটিসাইস করি না, কাউকে বলি না তোমারটা এরকম হচ্ছে তো ও-রকম হচ্ছে। তারপর আস্তে আস্তে মূল সময় থেকে সরে এলে পরে দেখা যাবে, হয়তো পঞ্চাশ বছর পরে এই সময়ের সত্যিকারের আর্টিস্ট কে তা নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। যেরকম জয়নুল আবেদিন, কী কামরুল হাসান, কী কিবরিয়া, আমরা কিন্তু এঁদেরকেই ফ্রন্টে রাখি। তাই না?

সৈকত হাবিব : আপনি তো শান্তিনিকেতনে আছেন। রবীন্দ্র চিত্রকলা সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি আলাদা ঘরানা তৈরি করেছেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা নিয়ে কী রকম চর্চা হয় বা সেখানে তার ছবি নিয়ে কী ধারণা পোষণ করা হয়?
যোগেন চৌধুরী : শান্তিনিকেতনে বসে তো রবীন্দ্রনাথ অনেক কাজ করেছিলেন। শান্তিনিকেতন মানেই যে প্রতিটি মানুষ একেবারে রবীন্দ্রজ্ঞ বা রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ তা নয়। সেখানেও নানা রকম মেন্টালিটির লোক থাকে। সেখানে কেউ বাসস্থান তৈরি করতে যায়। কেউ শান্তিতে থাকবে বলে যায়। কেউ ভাবে যে, একটা চাকরি পেয়ে গেলে ছেলেমেয়েদের ওখানে পড়ানো যাবে...সেরকম লোকও আছে।
কিন্তু আবার এরকম লোকও আছে যারা সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথের ছবিগুলো দেখে, বুঝতে পারে বা বিশ্বাস করে। রবীন্দ্রনাথকে বোঝে এমন লোকও থাকছে সবসময়। সুতরাং সেখানে রবীন্দ্রনাথের একটা জেনারেল আর্ট কলেজে যারা আছে তার নিশ্চয়ই ছবি সম্পর্কে যথেষ্ট খেয়াল রাখে। রবীন্দ্রনাথের ছবিকে তারা যথেষ্ট সত্যিকারের বুঝে– তাকে রেসপেক্ট করে, সেরকম তো হবেই। থাকারই কথা।

সৈকত হাবিব : রবীন্দ্রনাথের দেড়শোতম জন্মবর্ষ চলছে। শিল্প-সাহিত্যর সব রকমের কাজই তিনি করেছেন। তাঁর আঁকা ছবি সম্পর্কে আপনার নিজের মূল্যায়ন কী?
যোগেন চৌধুরী : আমি রবীন্দ্রনাথকে ওয়ান অব দি গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট মনে করি। সারা পৃথিবীর যে কাজ, সেদিকে তাকিয়েই বলছি– চিত্রশিল্পের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ থাকবে, বড় শিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ থাকবে। কারণ আমাদের কী হয়, আমরা যারা...যেসব দেশ আর্থিকভাবে পৃথিবীতে পিছিয়ে আছে তারা কিন্তু.... ওইটাকে বলে কালচারাল...মানে...ইমপেরিয়ালিজম বলে একটা কথা আছে, যে দেশ যত বেশি উন্নয়নের দিকে যাবে, যাদের টাকাপয়সা বেশি থাকবে তারা পৃথিবীকে ডোমিনেট করবে। নিয়ম হচ্ছে তাই। চায়না এখন টাকা-পয়সার দিক থেকে এগিয়ে আসছে। চায়না ক্রমাগত পৃথিবীকে ডোমিনেট করতে যাচ্ছে। সেই রকম ইন্ডিয়া বা বাংলাদেশ যদি ইকোনোমিকালি এগিয়ে আসতে পারে তখন তারাই প্রোমিনেন্ট হতে পারবে। আমেরিকা বা ইউরোপ যেহেতু প্রচুর আর্থিকভাবে এগিয়ে ছিল, তাই তারা কালচারালিও ডোমিনেট করছিল। আমরা তখন আমাদের মাথা নিচু করে তাদের কথা শুনতাম, ভাবতাম তাদের কথাই শেষ কথা। একচুয়ালি তা সত্যি নয়। আমি যখন প্যারিসে ছিলাম তখন এনসাইক্লোপেডিয়া কিনেছিলাম... তিন-চারটে বই কিনেছিলাম। তার মধ্যে একটি ছিল কনটেমপরারি আর্টিস্ট। সেখানে আছে সেকলিমিজি বলে একজন তৃতীয় শ্রেণীর শিল্পী, তার উপরে সেই এনসাইক্লোপেডিয়ায় প্রায় এক পেইজ পুরো লেখা। তার এক্সিবেশনও আমরা দেখেছি। সেখানে রবীন্দ্রনাথের উপর মাত্র তিন লাইন। সুতরাং এটাকে বলে কালচারাল ডোমিনেশন।

সৈকত হাবিব : তবে এটাও ঠিক রবীন্দ্রনাথের এক্সিবিশন ফ্রান্সেই প্রথম হয়। ওদের মাধ্যমেই তাঁর চিত্রকলার খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
যোগেন চৌধুরী : ঠিক আছে। কিন্তু সেই রিকগনিশনটা তারা ঐতিহাসিকভাবে তো দিচ্ছে না।

সৈকত হাবিব : বেঙ্গলের আয়োজনে এই আর্ট ক্যাম্পের উপযোগিতা বা মূল্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? এটার ভালো দিকটা কী সে সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।
যোগেন চৌধুরী : একটা ব্যপার হচ্ছে, একজন শিল্পীকে মূলত কাজ করতে হয় তার নিজস্ব স্টুডিওতে। তার নিজের আন্ডারস্টান্ডিং, তার নিজের ভেতরের থেকে যেভাবে সে কাজ করে, ঘরের মধ্যেই তার শেষ কাজ। অর্থাৎ স্টুডিওর কর্নারে, ছোট কর্নারে সে যে কাজটা করে সেটাই গ্রেট। এই জায়গাটাই আসল জায়গা। এই ক্যাম্পগুলোকে একটা সোস্যাল একটিভিটি হিসেবে ধরতে হবে। এটা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ, জানা-জানি, আরেকজনের কাজ দেখা...সেসব দিক থেকে এর একটা মূল্য আছে। সেটা সবসময়ই থাকছে, এটাকে আমাদের ইন্টারঅ্যাকটিভ জায়গা। সুতরাং এর মধ্য দিয়ে আমরা পরস্পরের মতামত জানতে পারছি, এক্সপ্রেস করতে পারছি। আরও অনেককে আমরা জানতে পারছি... অনেককে জানা অবশ্য এত অল্প  সময়, তিন-চারদিনে হয় না। একটু বেশি, সাত দিন হলে পরে হয়তো আরেকটু বেটার হতো এই-ই।

সৈকত হাবিব : শিল্পকলায় আপনার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তরুণ শিল্পীদের উদ্দেশে কি আপনার অনুভূতির কথা জানাতে চান?
যোগেন চৌধুরী : আমরা তো সবসময়ই মনে করি নতুন শিল্পীরা ক্রমশ এগিয়ে আসুক, তারা আরও বেশি কাজ করুক সঠিকভাবে, সেটা আমরা চাই। বলার কথাটা একটাই হতে পারে, কয়েকটা জিনিস আমাদের মানতে হয় কিছু করতে গেলে, এক হচ্ছে যে সিনসিয়ারলি, অনেস্টলি কাজ করা, পরিশ্রম করা– এইগুলোর দরকার হয়। এইগুলো বাদ দিয়ে কিছু হয় না। এক হচ্ছে অনেস্ট হতে হবে, তারপর হচ্ছে তাকে খাটতে হবে– এই দুটো জিনিস। বাদবাকি অ্যাওয়ার হতে হবে সবটা। এই তিনটি জিনিস খুব জরুরি, অ্যাওয়ারনেসকে বাদ দিয়ে ঘরে বসে কাজ করলে তার সেই টাইমের পার্সপেক্টিভটা তার থাকবে না। টাইমের পার্সপেক্টিভের জন্য তাকে সমস্ত চারদিকে কী ঘটছে না ঘটছে খেয়াল রাখতে হবে। দুই হচ্ছে যে খাটতে হবে। আর ট্রুথফুল হতে হবে। আর্টিফিসিয়াল বা ফলস ইয়ে দিয়ে কিছু করা যাবে না।

সৈকত হাবিব : এখন একটা ব্যাপার ঘটছে, থিওরিগুলি কেমন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে। একটার সঙ্গে অন্যটা যুক্ত হচ্ছে। ফলে যে কনসেপ্ট তৈরি হচ্ছে...কনসেপ্টের মধ্য দিয়ে যে আউটপুট বা প্রকাশ সেটার আসলে গতিমুখ কোথায়?
যোগেন চৌধুরী : এটা নিয়ে আলোচনার তো অনেক জায়গা আছে। তবে আমি খুব সংক্ষেপে বলছি। ইউরোপ যেহেতু আর্টে ডোমিনেট করেছে একটা টাইমে, গত সেঞ্চুরিতে এবং ইউরোপিয়ান আর্টের যে ইতিহাস সেটাকেই আমরা আধুনিক ইতিহাস হিসেবে ধরি। তার সঙ্গে প্রত্যেকটি জায়গার যে একটিভিটিগুলো সেগুলোও মূল্যবান। জাপানে যা হচ্ছে, ইন্ডিয়াতে যা হয়েছে এবং উইথ আউট কানেকটেড, মানে তাদের সাথে কানেক্ট ছাড়াও যে সমস্ত কাজ হয়েছে, হয়তো যোগাযোগ বা কিছু ইনফ্লুয়েন্স হয়েছে। কিন্তু সেই আগের গ্রোথটা কিছুটা লিনিয়ার গ্রোথ ছিল অর্থাৎ একটা ইজমের উপর বেজ করে আরেকটা ইজম।
এইভাবে ইম্প্রেশনিজমের পরে এসেছে এক্সপ্রেশিজম, তারপরে কিউবিজম এলো, তারপর অ্যাবস্ট্রাকশন– এইভাবেই আমরা রিকোগনাইজ করেছি। এবং সেটাও যে খুব বেশি লিনিয়ার তা কিন্তু না। ওগুলো ভেঙে ভেঙে এদিক-ওদিকও হয়...যদি আমরা সত্যিকারের শিল্পের ইতিহাসটা দেখি।
কিন্তু আধুনিককালে নতুন মিডিয়াম যেগুলো আসছে এবং টেকনোলোজিক্যাল ডেভেলাপমেন্ট এবং রাজনৈতিক কারণেও মানুষের যাতায়াত বেড়ে গেছে, পৃথিবীটা খুব কাছের হয়ে গেছে...টেলিভিশনের ফলে...ইয়ের ফলে। তার ফলে যেটা হচ্ছে এখন সহস্রমুখী হয়ে গেছে ।

এমনকি আজকের পোস্টমডার্নও হয়ত দেখা যাবে শুধু ইউরোপে হবে না, আমাদের গ্রামের কালচারের মধ্য থেকেও পোস্টমডার্ন আইডিয়া চলে আসতে পারে। সেই জায়গাটা একটা। এইটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে।
আর দ্বিতীয় হচ্ছে যে, এই অ্যাকটিভিটিগুলির মধ্যে এক্সেলেন্সির জায়গাটা অনেক ইমপরটেন্ট। আমি একটা কথা ইউজ করি যে, পোস্টমডার্ন নন আর্ট। পোস্টমডার্ন হয়ে গেলেই যে সে গ্রেট হয়ে যাচ্ছে তা নয়। সে তো  একচুয়ালি এক্সেলেন্সি, সে আর্ট হলো কিনা, তারও একটা আর্টের কন্ডিশন আছে তো, সে কন্ডিশানগুলো সে পূরণ করতে পারছে কিনা সেটাও ভাবতে হবে।
আর একটা কথা হচ্ছে যে, এসেনসিয়ালি কতগুলি এলিমেন্ট আর্টকে ফরম করে, আর্টকে তৈরি করে। সেই এলিমেন্টকে কি আমরা ডেসট্রয় করতে পারি? আমি কতগুলি উদাহরণ দিই– বেসিক এলিমেন্টের মধ্যে যেমন ধরা যাক, ভিজুয়াল সেন্স কতগুলি আছে, তার মধ্যে ফরম আছে, রঙ আছে; তারপর সেন্সিবিলিটির জন্য স্ট্রেকচার আছে, এগুলি কিন্তু আমাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এই জায়গাগুলিকে আমরা বাদ দিতে পারছি না।
আমি একটা রঙ দেখে রিঅ্যাক্টেট হই, আমি একটা ফরম দেখে রিঅ্যাক্টেট হই। সেক্ষেত্রে যত আধুনিকতা এসে এগুলিকে দূরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে সেটা কিন্তু দূরে সরবে না। কারণ আমাদের জীবনের সাথে এটা যুক্ত, সেজন্যই এই জায়গাগুলিকে নতুনভাবে ফিরিয়ে এনে আমরা নতুনভাবে বসাবো। কথাটা হচ্ছে সেইটাকে বাদ দিয়ে হবে না।

সৈকত হাবিব : এখন আরেকটা প্রবণতা, যেমন– কনসেপচুয়াল আর্ট বলা হচ্ছে...অনেক কিছু মিলিয়ে... সে সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।
যোগেন চৌধুরী : আসলে কনসেপচুয়াল আর্ট এনাদার ফর্ম অব আর্ট। ভিজুয়াল আর্টের সব জায়গাটাকে সে সুপার ইম্পোজ করছে না। কনসেপচুয়াল আর্ট ঠিক আছে, এটা একটা পার্ট। যেমন গল্প লেখা আর ফিল্মের মধ্যে যদি পার্থক্য হয় দুটোই আর্ট, সেরকম হবে– তাতে অসুবিধা হবে কি?
তাই বলে এই আর্টটা ভিজুয়াল আর্টটা সারপ্রেস হয়ে যাবে তা নয়। একটা মানুষ প্রাগৈতিহাসিক টাইম থেকে মানুষের ইতিহাসে সে দেয়ালের মধ্যে ছবি আঁকে, পাথরের ওপর ছবি আঁকা শুরু করলো, একটা বাচ্চা বা চাইল্ড সব সময় রঙের প্রতি আগ্রহী হয়, ফর্মের প্রতি আগ্রহী হয়, সে একটা পেন্সিল হাতে পেলে একটা লাইন দাগ দিতে চায়, সে ইমেজ মেইক করতে চায়। আমাদের হিউম্যান সেন্সিবিলিটির মধ্যে মানুষের প্রতিকৃতি করার একটা ঝোঁক আছে। সেই ঝোঁকটা আমরা আমাদের জীবন থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দেবো? এটা আদৌ সম্ভব না, কেননা মেমোরি তো আমাদের রয়েছে। যারা এই সব কথা বলে তার হয়তো, অনেক ছোট মাপের মানুষও হতে পারে। যেহেতু বিদেশি বইতে বেরিয়েছে তাই আমরা বিশ্বাস করে ফেলি।

সৈকত হাবিব : বাংলাদেশে এবং ইন্ডিয়ায় আপনার প্রিয় শিল্পী কারা?
যোগেন চৌধুরী : এই কথায় আমি পুরনোদের কথাই বলব। আমার কামরুল হাসান ভালো লাগে, কিবরিয়া ভালো লাগে, জয়নুল ভালো লাগে। এ পর্যন্তই আমি থাকলাম, কনটেম্পোরারি প্রসঙ্গে আর আসছি না! ওই দিকে তো আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছে, রামকিঙ্কর, নন্দলাল, গণেশ পাইন, সোমনাথ, লীলা মুখার্জি... এরকম অনেকেরই নাম বলা যাবে। তাছাড়া দিল্লি-বোম্বেতেও অনেকেই আছে।

সৈকত হাবিব : পশ্চিমে...
যোগেন চৌধুরী : পশ্চিমে তো প্রচুর আর্টিস্ট আছে, আমরা সবাই তাদের পছন্দ করি। যেমন– জিয়া কোনেত্তি, পল ক্লে, পিকাসো, মাতিস... তারপর সুররিয়ালিস্ট রুশো আমার খুব ফেবারিট। তারপর আরও আছে অন্তত দু’ডজন আর্টিস্টের নাম আমি বলে দিতে পারি।
তারপর কনটেম্পোরারির মধ্যে জার্মানি আর্টিস্ট জোসেফ বয়েজ...বেকন। ব্লেকের ছবিও আমার খুব পছন্দ।

 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।