দুপুর ০১:২৩ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

ভি. এস. নাইপল : বিতর্ক ও ভারত ভ্রমণ || পর্ব- শেষ || ফাহমিদ আল জায়িদ

প্রকাশিত:

পূর্ব প্রকাশের পর


নাইপলের কাছে মনে হয়েছে যে এই ভারতের না পারার, না এগিয়ে যাবার কারণগুলি খুঁজতে হবে ভারত যে প্রক্রিয়ায় ইংরেজ শাসনের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে তার উপর। তার ভাস্যমতে ‘আর কোন দেশকে এমন করে বিজয়ীদের স্বাগত জানাতে দেখা যায়নি। ব্রিটিশদের মতো আর কোন বিজয়ীদের এমন করে স্বাগত জানানো হয়নি।’ অর্থাৎ, ভারত নিজের দেশের স্বার্বভৌম রক্ষার জন্য লড়াই না করে বিজয়ীদের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল– এমনটিই বলতে চান নাইপল। বিদেশী সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতির উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল যেটি ভারতের স্বাভাবিকভাবে নেয়ার ক্ষমতা ছিলনা। তাই নাইপলের কাছে ভারতে যা কিছু আছে তার সবই কোথাও না কোথাও হতে আমদানি করা।

কিন্তু মজার ব্যাপার হল নাইপল লক্ষ্য করেন যে, ত্রিনিদাদের অবস্থা ভারতের মতো নয় বেশ আলাদা। সেখানে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি অতটা দমনমূলক ছিলনা। এছাড়াও পোশাক, ভাষা বা অন্যান্য রীতিনীতি যে ভারতীয়রা কোন বাছ-বিচার ছাড়াই ইংলিশদের কাছ থেকে অনুকরণ করেছে সেটিও নাইপল প্রত্যক্ষ করেন। নাইপলের কাছে মনে হয়েছে ভারতীয়রা অনুকরণের চর্চা করলেও এগুলির গভীর অর্থ সম্পর্কে মোটেও ওয়াকিবহাল নয়। সকল ক্ষেত্রে ভারতীয়দের এই অন্ধ অনুকরণ নাইপলের মোটেও সহ্য হয়নি। তিনি বলেন ‘গতকাল অনুকরণ করতো মুগলদের; আজকে করছে ইংরেজদের; আগামিকাল হয়তো রাশিয়া বা আমেরিকাকে করবে।’ নাইপল সব চেয়ে বেশি বিরক্ত হন যখন দেখেন যে ভারতের সত্যিকারের বাস্তব অবস্থা কেউ দেখছেনা অথবা দেখতে চাচ্ছেনা। তার কাছে সমগ্র ভারতের ইতিহাস যেন মিথ এবং মিথ্যায় ভরপুর। তিনি উল্লেখ করেন যে, টুরিষ্ট গাইডগুলিও ভারতীয় অতীত জ্ঞান ও ঘটনা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। গাইডটি বলে ‘সে দিল্লীতে গেল এবং সেখানে একটি বড় শহর বানিয়ে ফেললো।’ ভাবখানা এমন যে শহরটি সৃষ্টি আর ধ্বংসের আর কোন ব্যাখ্যার দরকার নেই। নাইপলের মতে, বর্তমানের দুর্দশা ও অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি থেকে ভারতীয়রা নিজেদের রক্ষা করার জন্য নিজেদের সৃষ্টি কিছু ফ্যান্টাসিতে তারা মুখ লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করে।

হিন্দু ঐতিহ্য এবং বর্ণ প্রথার মধ্যেই ভারতীয় চরিত্রের সারাংশ খুঁজে পাওয়া যাবে যেটি আসলে ভারতীয় সমাজ কাঠামোকে নির্ধারণ করে। নাইপল এখানে মুসলিম বস্তি সম্পর্কেও লিখেছেন। হিন্দু পত্রিকার প্রতিনিধি মুসলিম তরুণ আজিজের সাথে পরিচয় ঘটে নাইপলের এবং স্বীকার করেন যে মুসলমানরা আসলেই আলাদা। মহাত্মা গান্ধীর ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ দেখান নাইপল। গান্ধীকে নাইপল তার বইটিতে ব্যবহার করেন। কারণ গান্ধীর পশ্চিমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাইপলের মতোই গান্ধী একজন ভারতীয় হয়েও পশ্চিমা চোখ দিয়ে ভারতীয় বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। বইটিতে নাইপল মোটামুটি গান্ধীর একটি সন্তোষজনক চিত্র একেঁছেন। ভারতের একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক হিসাবে তিনি গান্ধীকে মানেন, একটি নির্মোহ এবং অবশ্যই পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভারতকে দেখেছেন গান্ধী এবং এ কারণেই পরিবর্তনের জন্য তাগিদ অনুভব করতেন গান্ধী। নাইপলের মতে, গান্ধী যেভাবে ভারতের দিকে তাকিয়েছেন, ভারতকে বুঝতে পেরেছেন এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন তা এক কথায় বৈপ্লবিক বলে মনে করেন নাইপল। আর তাই তিনি গান্ধীর উদ্দেশ্যে বলেন ‘তাকে একেবারে ভারতীয় মনে হয় না। মনে হয় তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের একটি ঔপনিবেশিক সংমিশ্রণ।’

নাইপলের আইডেনটি এই ভ্রমণের কাহিনি বর্ণনাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ত্রিনিদাদে যেমন তিনি একজন ভারতীয়, ভারতেও তেমন একজন ভারতীয়। তবে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যও বিদ্যমান। নিজের মাতৃভূমিতে বসে যে ভারতের গল্প শুনেছেন, যে ভারতকে কল্পনার ফ্রেমে বেঁধেছেন, সে ভারতকে বাস্তবে পাননি নাইপাল। সত্যিকারের ভারতকে দেখে আঘাত পেয়েছেন, মেলাতে পারেননি নিজের কল্পনার সাথে কিছুতেই। সুতরাং শৈশবের ভারত যখন বাস্তবের ভারতের মুখোমুখি হয় তখন নাইপলের কল্পনার ভারত একটা আস্ত মিথে পরিণত হয়। আবার ভারতে এসে নিজেকে ভারতীয়ও ভাবতে পারেননি, বিচ্ছিন্নতায় ভুগেছেন, নিজেকে একজন পর্যটক ভাবতে বাধ্য হয়েছেন। নিজেকে ভেবেছেন ত্রিনিদাদ এবং ইল্যান্ডের সৃষ্টি। কিন্তু পূর্ব পুরুষের জন্মভূমির প্রতি রেখেছেন প্রচণ্ড টান ও দরদ।

ইন্ডিয়া: এ ওনডেড সিভিলাইজেশন
১৯৭৫ সালে ২য় বার ভারত ভ্রমণের ফলাফল হল এই ভ্রমণ গ্রন্থ। প্রথম অধ্যায় থেকেই বোঝা যায় যে, নাইপল তার দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পরিবর্তন করেছেন। এবার তিনি বাস্তবের ভারতের উপর মনযোগ দেবার চেষ্টা করেন। প্রথম বইটিতে ভারতের প্রতি একটি নষ্টালজিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও এই বইটিতে তেমন কিছু নেই বরং এটি অনেকটা বর্ণনামূলক, সাথে আছে চমৎকার বিশ্লেষণ এবং ভারতের ভবিষ্যতের উপর হালকা আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে জরুরী ঘোষণা করেন এবং ২ বছর তা স্থায়ী হয়। এই সময়টি ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়, তেমনি ছিল অত্যন্ত আতঙ্কের একটি সময়। এই সময়ের ভারতকে দেখার সুযোগ ঘটে নাইপলের এবং ২য় ভ্রমণ কাহিনিতে তিনি একটি সমৃদ্ধশালী, ভারসাম্যপূর্ণ জাতি হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলতে না পারার অযোগ্যতাকে আবারও খোঁচা মারেন। গৌরবউজ্জল ভারতের অতীতের দিকে যেমন আগেও মানুষ তাকিয়ে ছিল এই জরুরী অবস্থার সময়ও ভারত একটি স্থবির দেশ হিসাবে পরিণত হয়েছে। তবে দরিদ্রতা বর্ণনার ব্যাপারে নাইপলকে কিছুটা সহানুভূতিশীল হতে দেখা গেছে। তিনি এবারের ভারতের মধ্যে পরিবর্তন দেখলেও মন্তব্য করেন যে পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত মন্থর। ভবিষ্যতের ভারতের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও নাইপলের কাছে তখনও ভারতকে একটি ‘ওনডেড ওল্ড সিভিলাইজেশন’ মনে হয়েছে। এই বইটিতেও নাইপল বলেন যে, ভারত এখনও বিদেশি প্রথা, কৌশল, ধ্যান-ধারণা নিজেদের মতো করে রপ্ত করতে শিখেনি। তবে এসময়ের মধ্যে ভারত শিল্প ও প্রযুক্তিখাতে যে উন্নতি করেছে, তা নাইপলের চোখ এড়ায়নি। কিন্তু তিনি বলেন যে, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত এই সকল প্রযুক্তি এখনও ভারতীয় পরিবেশের পুরোপুরি মানিয়ে উঠতে পারেনি। ‘আমি একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। চারটি পরিবারের একটির জমি আছে; চারটি বাচ্চার মধ্যে মাত্র ১টি বিদ্যালয়ে যায় এবং চারজন মানুষের একজন কাজ করে।’ এবাবেই নাইপল ভারতের গ্রামীন অবস্থার বর্ণনা করেন। এছাড়াও তিনি শিশু শ্রম এবং সস্তা শ্রমমূল্যের কথা ব্যাপকভাবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি জাতি-বর্ণ প্রথার সমালোচনা করেন কেননা তার মতে বর্ণপ্রথার বাধার কারণে মানুষ নিজেদের ভাগ্যে তেমন পরিবর্তন আনতে পারছেনা।

প্রথম গ্রন্থে গান্ধীকে যেভাবে পজেটিভলি চিত্রায়িত করেছিলেন, এই গ্রন্থে নাইপল তার অবস্থা পাল্টান। গান্ধীর চিন্তা ও সমাজ সংস্কারের ব্যাপারে এবার তিনি বেশ ক্রিটিক্যাল অবস্থান গ্রহণ করেন। ভারতে গান্ধীর প্রভাবকে তিনি ব্যর্থতা হিসাবেই দেখেছেন। জরুরী অবস্থার সময় ভারতে যে সহিংসতার চিত্র তিনি দেখেছেন সেটির সাথে গান্ধীর অহিংসা মতবাদের মিলই বা কোথায়? এমন প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। এখানে নাইপল দাবী করেন যে গান্ধী ভারতের প্রয়োজনকে বুঝতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। গান্ধীর অটোবায়োগ্রাফী থেকে নানা উদ্ধৃতি টেনে এনে নাইপলন দেখানোর চেষ্টা করেন যে শুধু ভারত নয় বিদেশি সংস্কৃতিকেও বুঝতে পারেননি গান্ধী। নাইপলের মতে, পর্যবেক্ষক হিসাবেও ব্যর্থ গান্ধী।

প্রথম গ্রন্থের ন্যায় এই গ্রন্থটিতেও নাইপল ভারতীয় হয়ে উঠতে পারেনি, বিচ্ছিন্নতায় ভুগেছেন, অনুভব করেছেন শিকড়হীন। বলেছেন ‘বহিরাগতদের জন্য ভারতে কোন জায়গা নেই।’ ত্রিনিদাদে নাইপল নিজেকে ভারতীয় মনে করলেও ভারতে এসে নিজেকে ত্রিনিদাদীয়ার মনে করতে বাধ্য হন। পাল্টা প্রশ্ন ও উত্তর খোঁজার জন্য তিনি প্রায়ই ভারতের সাথে ত্রিনিদাদের তুলনা করেছেন। তবে এবারে নিজের আইডেনটিটি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতে দেখা যায় না তাকে বরং এটির সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি বলেন ‘ভারত আমার জন্য একেবারে আলাদা একটি দেশ। এটি আমার জন্মভূমি নয় এবং কখনই তা হবে না। তবুও এটিকে আমি প্রত্যাখান করতে পারি না; এটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেও পারি না। শুধুমাত্র দৃশ্য উপভোগ জন্য আমি এখানে ভ্রমণ করতে আসি নি।’

ইন্ডিয়া: এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ
ভারত ট্রিলজীর শেষ খণ্ড হল এই গ্রন্থটি। প্রথম দুটি খণ্ড থেকে এটির পার্থক্যও চোখে পড়ে, বিশেষ করে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি নাইপলের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের ক্ষেত্রে। ১৯৮০ এর দশকের ভারতীয় সংস্কৃতি এবং এটির পরিবর্তনের গতি প্রকৃতি প্রত্যক্ষ করে নাইপল মত প্রকাশ করেন যে, ভারত সঠিক পথেই এগুচ্ছে। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে দেখে তার মনে হয়েছে যে অবশেষে ভারতীয় জনগনের ঘুম ভেঙ্গেছে ।

নাইপলের মতে, ভারতীয়দের জীবনযাত্রার মান এবার যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। তিনি মত প্রকাশ করেন যে এটি সম্ভব হয়েছে মানুষের চিন্তা আর আচরণের ভেতর এক ধরণের পরিবর্তন আসার কারণে। মানুষ পার্থিব চাওয়া পাওয়া ও অর্জনকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রবেশ করার ফলে মানুষের জীবনযাপন অনেক সহজ হয়েছে। তবে নাইপল এটি উল্লেখ করতে ভোলেননি যে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সবুজ বিপ্লবের ফলে গ্রামীণ ভারতে এক শ্রেণির শিক্ষিত মধ্যবিত্ত টাকাওয়ালা শ্রেণির উত্থান ঘটছে। আবার দ্রুত ঘটে যাওয়া এসব পরিবর্তনের মাঝেও নাইপল ভারতের সমাজের অন্ধকার দিকগুলির কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি, বিশেষ করে অপরাধ, খুন-যখম, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, যৌনব্যবসা ইত্যাদি। আবার ততদিনে বাঙ্গালুর শহর ভারতের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সেটিও নাইপলের চোখে এড়ায়নি। ভারত ভ্রমণের শেষ বইটিতে সমাজে নারীদের অবস্থান পরিবর্তন সম্পর্কেও মন্তব্য করেন নাইপল। তিনি বলেন যে স্বাধীনতার পূর্বে ভারতে কোন নারী ম্যাগাজিন ছিলনা। কিন্তু এখন ভারতীয় মধ্যবিত্ত নারীরা ম্যাগাজিন পড়ছে। তারা শিক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে। যদিও এ্যারেনঞ্জ ম্যারেজ/বিবাহ এখনও বেশি। তবে ল্যাভ ম্যারেজ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিদেশিদের সাথে ভারতীয়দের বিয়েও কম হচ্ছেনা। সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার মান ও সমাজে নারীর অবস্থান উন্নত রাষ্ট্রের মত না হলেও আস্তে আস্তে সেই দিকেই এগুচ্ছে বলে মনে করেন নাইপল।

গান্ধী যেভাবে ভারতের দিকে তাকিয়েছেন, ভারতকে বুঝতে পেরেছেন এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন তা এক কথায় বৈপ্লবিক বলে মনে করেন নাইপল। আর তাই তিনি গান্ধীর উদ্দেশ্যে বলেন ‘তাকে একেবারে ভারতীয় মনে হয় না। মনে হয় তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের একটি ঔপনিবেশিক সংমিশ্রণ।’

হিন্দুবাদ শুধুমাত্র একটি ধর্মই নয়। ভারতীয় প্রাত্যহিক জীবনে এটির প্রভাব খুবই প্রকট। নাইপল দেখতে পান যে ধর্মের অর্থ ভারতীয়দের কাছে পরিবর্তন হচ্ছে। পুরানো অনেক ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা যেমন আর টিকে থাকছেনা, তেমনি অনেক কিছুই নতুন প্রজন্মের নতুন পরিবেশের সাথে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ফিট করে যাচ্ছে। নাইপলের এবার মনে হচ্ছে হিন্দু ধর্ম নতুন পরিবেশ এবং যুগের চাহিদার সাথে অভিযোজন করার ক্ষমতা রাখে। এবং এটি করতে পেরে ভারতীয়রা বেশ খুশিই বলে মনে করেন নাইপল। জাতি বর্ণ প্রথার মধ্যেও তিনি পরিবর্তন দেখতে পান। মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তিনি শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে নয় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও অগ্রসর হতে দেখেছেন। অনেক নিচু বর্ণের সন্তান এখন ভালো চাকুরী করছে, উঁচু সামাজিক মর্যাদাও পাচ্ছে। আবার উঁচু বর্ণের অনেকেই তাদের অবস্থান হারাচ্ছে– এমনটিও দেখেছেন নাইপল।

প্রথম ভ্রমণ খণ্ডটিতে যেমন নাইপলকে ভারতের ব্যাপারে চরম অতৃপ্ত দেখা গিয়েছিলেন অথবা তার নিজস্ব আত্মপরিচয় নিয়ে বিচ্ছিন্নতায় ভুগছিলেন, তিরিশ বছর পর শেষ ভ্রমণের সময় তা অনেকটাই বদলে যায়। শুরু থেকেই জানতেন যে তিনি চাইলেও কখনোই ভারতীয় হতে পারবেন না পুরোপুরি এবং সেই চেষ্টা করা তিনি ছেড়েও দেন। বরং শেষ ভ্রমণ খণ্ডে তিনি ভারতের প্রতি প্রচণ্ড শক্তিশালী সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন ‘২৭ বছর পর এটা আমার এক ধরনের ফিরে আসা। আমি পূর্বের সেই অন্ধকারচ্ছন্নতা যেটি আমাকে পূর্ব অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, সেটিকে বিদায় করতে সক্ষম হয়েছি।’ তবে আইডেনটিটি নিয়ে তার ডিলেমাটি তিনি টিকিয়ে রেখে বলেন যে, না ভারত না ত্রিনিদাদ বরং  ইংল্যান্ডেই তিনি বেশি স্বস্তি পান। অথচ তিনি এটিও ভালো করেই জানেন যে অধিকাংশ ইংরেজের কাছে তিনি যেমন ভারতীয় তেমনি ত্রিনিদাদীয়ানের কাছেও তেমন ভারতীয়। আর এই ধরনের অবস্থানের কারণেই হয়তো নাইপল অনেকটা নির্মোহ ভঙ্গিতে ভারতীয় সংস্কৃতিকে দেখতে সক্ষম হন। তিনটি খণ্ডেই লেখেন নাইপল একই ভারতকে দেখেছেন কিন্তু প্রতিবারই তার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। আর এই আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির কারনেই ভ্রমণ গ্রন্থগুলি চমৎকার সুখপাঠ্য। প্রত্যেকটি ভ্রমণ খণ্ডেই আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রতিবারই মিশিয়েছেন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। প্রত্যেকটি ব ইয়ে তিনি মত পাল্টিয়েছেন। যেহেতু তিনটি খণ্ড প্রকাশ হয়েছে তিরিশ বছর ব্যাপী, সেই কারণে বিষয়বস্তু এক থাকলেও বৈচিত্র্যের অভাব ছিলনা। ভারত সম্পর্কে যে মায়া তিনি কল্পনার ভেতর নিয়ে প্রথমবার ভারতে আসেন, যে মোহভঙ্গ ঘটে তার, পরের খণ্ডগুলিতে তিনি সেগুলিকে মিটমাট করার চেষ্টা করেন। পূর্ব পুরুষদের জন্মভূমিকে প্রচণ্ড আপন করে নিতে চেয়েও পারেনি নাইপল। বিচ্ছিন্নতায় ভুগেছেন। আবার বিশাল আশাবাদ এবং একই সাথে প্রচণ্ড সহানুভুতি রেখেই শেষ করেন তার ভারত ভ্রমণের শেষ খণ্ড।

 

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন :

ভি. এস. নাইপল : বিতর্ক ও ভারত ভ্রমণ || পর্ব-১ || ফাহমিদ আল জায়িদ

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।