দুপুর ০২:০২ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

ভি. এস. নাইপল : বিতর্ক ও ভারত ভ্রমণ || পর্ব-১ || ফাহমিদ আল জায়িদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ভি. এস. নাইপল আগামি ১৯-২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা লিটারেরি ফেস্টিভ্যালে যোগ দিতে ঢাকায় আসছেন। এই উৎসবে তিনি-সহ আরও একজন নোবেল লরিয়েট হ্যারল্ড ই ভার্মাস অংশগ্রহণ করবেন। এ উপলক্ষ্যে বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ আয়োজনে তাদের লেখা বা তাদেরকে নিয়ে লেখা প্রকাশ করা হবে।

 

এক.
স্যার বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল। নামটি যেমন বড়, খ্যাতিও তেমন বিশাল। নোবেল পাওয়ার আগেই ১৯৯০ সালে ‘স্যার’ উপাধি পেয়ে যান। আর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ২০০১ সালে। তার লিখা উপন্যাস এবং ভ্রমণ কাহিনি চমৎকার। গদ্যের প্রসংশা সবাই করেন। কাহিনি বলার ঢংটিও বেশ চমকপ্রদ।  আরেক নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান লেখক জি এম কোয়েটজি ২০০১ সালে দি নিউয়র্ক রিভ্যিউ অব বুকস-এ নাইপলকে ‘আধুনিক ইংরেজি গদ্যের একজন মাষ্টার’ বলে প্রশংসা করেন। নোবেল কমিটি নাইপলকে তুলনা করেন জোসেফ করাডের সাথে, বলেন ‘কনরাডের উত্তরসূরী’। ১৯৩২ সালে ক্যারাবিয়ান দ্বীপ রাষ্ট্র ত্রিনিনাদ ও টোবাগোতে জন্মগ্রহন করেন এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক। পড়াশোনা করেন অক্সফোর্ডে। তার লেখালেখিতে উপনিবেশবাদের প্রভাব যেমন আছে তেমনি পশ্চিমা সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের প্রসঙ্গটিও বাদ যায়নি। নোবেল পুরস্কার তো লেখালেখির জন্যই দেয়া হয়না! এটির সাথে ভূগোল ও রাজনীতি, গায়ের রং ইত্যাদি বিষয়ও জড়িত থাকে। তাছাড়া তৃতীয় বিশ্বের অশ্বেতাঙ্গ লেখক হওয়া সত্তেও ‘স্যার’ উপাধি জুটিয়েছেন, সেটাও বড়ই কৃতিত্বের কথা। ১৯৫৫ সালে প্যাট্রিসিয়া হেইল নামক এক ইংরেজ রমনীকে বিয়ে করেন নাইপল। নাইপলের জীবনীকার প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চকে অকপটে অনেক কথাই স্বীকার করেন তিনি। ১৯৫৫ সালে ২২ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন দু’জন। প্রাথমিকভাবে কোন পরিবারকেই বিয়ের কথা জানানো হয়নি। টাকার অভাবে নাইপল বিয়ের কোন আংটি কিনতে পারেনি। নাইপলের কাজের সাথে প্যাট্রিসিয়ার সম্পর্ক চমৎকার ছিল, বলতে গেলে তিনি ছিলেন নাইপলের আনঅফিসিয়াল এডিটর, কিন্তু দাম্পত্য জীবন সুখে কাটেনি তাদের। লন্ডন শহরের পতিতালয়ে হরহামেশাই যেতেন নাইপল (নিজেকে তিনি বলেছিলেন a great prostitute man)। ১৯৭২ সালে ৪০ বছর বয়সে মার্গারেট গুডিং নামের এক বিবাহিত আর্জেন্টাইন নারীকে মিসট্রেস হিসাবে গ্রহণ করেন নাইপল (প্যাট্রিসিয়া সেটিও জানতেন)। মার্গারেটের সাথে পরিচয় হবার পর থেকে নাইপলের অনেক উপন্যাসে যৌনতার বর্ণনার উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। জীবনীকার প্যাট্রিক বলেন যে উপন্যাসে যৌনতার বর্ণনা নাইপল কল্পনা থেকে নয়, বরং মার্গারেটের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা থেকে আমদানি করেছেন। এরপর থেকে দীর্ঘ তিন দশক তিনি নাইপলের সাথে থেকেছেন, ৩ বার গর্ভধারণ করলেও গর্ভপাত করেননি। প্যাট্রিসিয়ার কাছে সব কিছু স্বীকার করেছিলেন নাইপল। অনেক পরে তিনি বলেন ‘আমি হয়ে গেলাম স্বাধীন আর সে হল বিদ্ধস্ত এবং এটা অপরিহার্য ছিল।’ ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ৪১ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে যখন প্যাট্রিসিয়া কান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জীবনীকারকে নাইপাল বলেন ‘এটা বলা যেতে পারে যে আমি তাকে হত্যা করেছি। বিষয়টি নিয়ে আমি কিন্তু এভাবেই ভাবি।’ কিন্তু দুই মাস যেতে না যেতেই বিয়ে করেন ২৫ বছর কমবয়সি এক পাকিস্থানী সাংবাদিক নাদিরা খানম আলভিকে। নাইপলের সাথে বিয়ে হবার পূর্বে নাদিরা ২ বার তালাকপ্রাপ্ত হন, আগের পক্ষের সন্তানও ছিল। বিয়ের পূর্বেই নাইপলের সাথে পরিচয় হয় নাদিরার। মজার বিষয় হল ইসলামের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ বই বিওন্ড বিলিফ (১৯৯৮) বইটি নাইপল উৎসর্গ করেন তার এই পাকিস্থানী মুসলিম ওয়াইফ নাদিরাকে। এদিকে নাইপলের দীর্ঘদিনের বন্ধু আমেরিকান ভ্রমণ সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক পল থেরকস Sir Vidia, s Shadow (১৯৯৮) নামে এক স্মৃতিকথায় নিজেদের মধ্যকার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবার জন্য নাইপলের দ্বিতীয় ওয়াইফ নাদিরাকে দায়ী করেন।

নাইপল ভারতীয় বলেই বাঙালি পাঠকদের বেশ আগ্রহ চোখে পড়ে, যদিও বাংলাদেশে নাইপলের লেখালেখি খুব বেশি অনুবাদের মুখ দেখেনি। তবে একবার বাঙালিদের খুব পড়ুয়া জাতি বলে প্রশংসা করেছিলেন নাইপল। তবে ব্যক্তিগত জীবন বাদ দিলেও নাইপলকে ঘিরে বিতর্ক কম নেই– বিশেষ করে তার কিছু মতামত, বক্তব্য এবং লেখালেখির কারণে। ১৯৭৯-৮০ সালে নাইপল পাকিস্থান, ইরান, ইন্দোনেশিয়া এই চারটি ইসলামিক দেশ ভ্রমণ করে লিখেন ‘অ্যামং দি বিলিভার্স: এ্যান ইসলামিক জার্নি (১৯৮১)’ নামের বিতর্কিত গ্রন্থটি। ভারতীয় সমালোচক ইকবাল আহম্মেদ বিরক্ত হন এ কারণে যে নাইপাল কৌশলে তার ভ্রমণ কাহিনি থেকে কিছু বিষয় বাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন ‘ফয়েজ আহম্মেদ ফয়েজ, যিনি ইকবালের পর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলে বিবেচিত, তিনি নির্বাসনে। হাবিব জালিব জেলে। এবং ৬০ পৃষ্ঠায় লন্ডন থেকে আসা নাইপলের মতো একজন সিরিয়াস লেখক যিনি কিনা জেনারেল জিয়াউল হক জিয়ার শাসনামল বর্ণনা করছেন এটা উল্লেখ না করেই যে আমরা হয় জেলে অথবা নির্বাসনে ধুকে ধুকে মরছি। এটাকে লেখা বলেনা। লেখলেখি বন্ধ করে নাইপলের সসিজ বিক্রি করা উচিত।’ প্রায় বিশ বছর পর সেই একই দেশগুলি পুনরায় ভ্রমণ করে নাইপল এবার প্রকাশ করেন বিওন্ড বিলিফ (১৯৯৮) গ্রন্থটি। সময় পাল্টালেও ইসলাম এবং মুসলিমদের সম্পর্কে নাইপলের মত তেমন পাল্টায়নি। বরং তার দ্বিতীয় গ্রন্থে এমনভাবে ইসলামী সংস্কৃতি ও মুসলিমদের এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন তাতে পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য সমালোচক, ইতিহাসবিদ সবাই বেশ চটেছেন। এডওয়ার্ড সাইদ চারশ পৃষ্ঠার এই মোটা বইটিকে নাইপল তার ‘নির্বোধ ও অপমানজনক তত্ত্ব’ প্রচার ছাড়া আর কিছুই মনে করেননি। সাইদ নাইপলকে ‘ইডিওটিক’ বলে বাতিল করেছেন। বিখ্যাত বাঙালি অক্সফোর্ড ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরীও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন নাইপলের। বিট্রিশ লেখক ডেভিড গিলমোরও নাইপলকে ছেড়ে কথা বলেননি। আরেক নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত ক্যারাবিয়ান কবি ডেরেক ওয়ালকট নাইপলকে একজন ‘neo-colonial apologist’ বলেছেন। ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে নাইপল বলেছিলেন ‘ঐতিহাসিক ভারসাম্য’ এবং রাম জন্মভূমি প্রত্যাবাসনকে তিনি ‘হিন্দু প্রাইডের পুনঃস্থাপন’ বলে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৬ ’শ শতাব্দীতে সম্রাট বাবরের ভারতবর্ষ আক্রমণকে বলেন ‘mortal wound’। ১৫৬৫ সালে পতন হওয়া বিজয়নগরকে আফসোস করে বলেন ‘হিন্দু সভ্যতার শেষ বুরুজ’। আর তাই ২০০২ সালে আরেক ভারতীয় সুনামধন্য লেখক সালমান রুশদি বিজেপি সরকারকে সমর্থন প্রদানের জন্য (২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময়) নাইপলকে বলেন ‘a fellow traveler of fascism’।

২০১১ সালে রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটিতে দেয়া এক সাক্ষাতকারে নাইপল বলেন, যে নারী লেখকদের লেখালেখি পুরুষ লেখকদের লেখালেখির চেয়ে নিকৃষ্ট এবং এমন কোন নারী লেখক নেই যিনি তার সমতুল্য হতে পারেন! নাইপলের মতে, নারীদের লেখালেখি ‘সম্পূর্ন আলাদা’ তাদের সেন্টিমেন্টালিটির জন্য এবং নারীদের মানসিকতা ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ। এমনকি জেন অস্টিনকেও পাত্তা দিতে চাননি! অস্টিনের লেখাকে বলেছেন খুব বেশি ‘সেন্টিমেন্টাল’। ১৯৭০ এর দশকে নাইপল যে উপন্যাসগুলি প্রকাশ করেন, সেগুলির উপর ৬ টি নারীবাদী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং অধিকাংশ প্রাবন্ধিক নাইপলকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নারীবিদ্বেষী বলে অভিহিত করেন। সবাই একমত যে, সেই ফিকশনগুলিতে নারীর উপস্থাপন মোটেও সুবিধাজনক ছিলনা। সমালোচকগণ দাবী করেন যে, নাইপল যে ধরনের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, সেখানে নারীদের ‘আদার’ হিসাবেই দেখা হয়ে থাকে। ইউরোপীয়ান এবং আমেরিকান ফিকশনগুলিতে রোমান্টিক ভালোবাসা এবং নারীদের যৌন স্বাধীনতাকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়, নাইপলের উপন্যাসে সেভাবে দেখা যায়না। নাইপলের উপন্যাসে নারীরা হয় মা, নয়তো ওয়াইফ, স্বাধীন নারী দেখতে পাওয়া যায়না। নারী চরিত্র খোঁজার জন্য নাইপল নিজের সমাজ, নিজের অভিজ্ঞতার ভেতরেই থাকতে চান, দূরে যেতে চাননা মোটেও। নাইপলের প্রথম তিনটি উপন্যাসে নারী চরিত্রের স্বাধীন কোন অস্তিত্ব নেই তবে পুরুষ চরিত্রগুলি খুবই স্বাধীনচেতা। আবার নারীদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হচ্ছে কে কোন পুরুষের সাথে আছেন, তা দিয়ে। অর্থাৎ, পুরুষের সামাজিক মর্যাদাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে নারীর সামাজিক মর্যাদা। মিগুয়াল ষ্ট্রিট উপন্যাসে স্বামী তার ওয়াইফকে প্রায়ই মারধর করতে দেখা যায়। নারীর প্রতি এধরনের সহিংসতার ব্যাপারে নাইপলকে তেমন কিছু বলতে দেখা যায়না তার শুরুর দিকের ফিকশনে। পাশাপাশি, রোমান্টিক ভালোবাসা এবং ফলশ্রুতিতে বিয়ে– এটির কোনটিই দেখা যায়না নাইপলের উপন্যাসে।

 ভিক্ষা নিয়ে নাইপলের অবজারভেশনটি ছিল চমৎকার। তার মতে, ভিক্ষাবৃত্তিকে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে হবেনা। ভারতীয় সমাজে ভিক্ষাবৃত্তির একটি ক্রিয়াবাদী দিক রয়েছে। কারণ ভিক্ষুককে কোন কিছু দেয়াকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে দেখা হয় চ্যারিটি হিসাবে। আবার একই সাথে ঈশ্বরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন হিসাবে।

দুই.
নাইপলের প্রথম উপন্যাস মিসটিক ম্যাসুয়্যার প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে এবং সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ম্যাজিক সিডস (২০০৪)। সব মিলিয়ে ফিকশন গ্রন্থের সংখ্যা ১৫ টি। অন্যদিকে নন-ফিকশন গ্রন্থের সংখ্যাও ১৯ টি যার মধ্যে ভ্রমণ সাহিত্য বেশ বড় জায়গা করে নিয়েছে। ভ্রমণকাহিনি লিখে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছেন, তেমনি সমালোচিতও কম হননি। ভারতকে কেন্দ্র করে নাইপল তিনটি (ট্রিলজি) ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন: এ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (১৯৬৪), ইন্ডিয়া: এ্যান ওনডেড সিভিলাইজেশান (১৯৭৭) এবং ইন্ডিয়া: এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ (১৯৯০)। নাইপল এই তিনটি ভ্রমণকাহিনি লিখেছিলেন সশরীরে ভারত ভ্রমণের পর যথাক্রমে ১৯৬২, ১৯৭৫ এবং ১৯৮৮ সালে। ট্রাডিশনাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য ভারতের সুনাম আছে। অসংখ্য ভারতীয় আবার বেশ গর্বের সাথেই বলে যে তাদের দেশ আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হতে যাচ্ছে। ভারতীয় এলিট শ্রেণির মধ্যে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতা– দুটোই খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থনীতির জন্য আধুনিকতা আর সামাজিক মর্যাদার জন্য ঐতিহ্যপ্রিয়তা– এটিই যেন ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্য। তবে অধিকাংশ সময়ই বাস্তব পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন কথা বলে। নাইপলের কাছে মনে হয় যে ভারত হচ্ছে অন্ধকার, এটির সভ্যতা আক্রান্ত এবং সবাই ভারতকে একটি নোংরা পরিবেশের দেশ হিসাবেই চেনে। নাইপল তার প্রথম দুটি গ্রন্থে (এ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস, ইন্ডিয়া: এ্যান ওনডেড সিভিলাইজেশান) ভারতীয় সামগ্রিক জীবনব্যবস্থাকে বেশ সমালোচনার দৃষ্টিতেই দেখেছেন। তবে শেষ গ্রন্থটিতে (ইন্ডিয়া: এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ) তিনি ভারতের সার্বিক পরিস্থিতিতে কিছু উচ্ছাস প্রকাশ করেন। এবার আমরা দেখার চেষ্টা করবো নাইপাল ভারত, ভারতের মানুষ এবং এটির সংস্কৃতিকে কিভাবে দেখেছেন।

নাইপল যেভাবে ভারতকে তার ভ্রমনকাহিনিতে উপস্থাপন করেছেন, তাতে অনেকেই খুশি হয়নি। বলেছেন নাইপল সস্তা জনপ্রিয়তা পাবার জন্য নেগেটিভলি ভারতের সংস্কৃতিকে দেখেছেন। প্রথম দুটি গ্রন্থের শিরোনামই বলে দিচ্ছে নাইপলের দৃষ্টি বেশ ক্রিটিক্যাল। ভারতের ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে কথা বলতে বেশ পচ্ছন্দ করেন নাইপল। পচ্ছন্দ করেন ভারতীয় সমাজের উপর ঔপনিবেশিকতার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে। ভারতীয় সমাজ কাঠামোতে বর্ণপ্রথার প্রভাব আরেকটি ইস্যু যেটি নিয়ে আচ্ছন্ন থাকেন তিনি। ভারতীয়দের মানসিক ক্ষমতা কেমন, সেটি নিয়েও কথা বলেন। মহাত্মা গান্ধীর ব্যাপারে তার আগ্রহ ব্যাপক। নাইপলের প্রপিতামহ চুক্তিবদ্ধ আখ শ্রমিক হিসাবে ত্রিনিনাদে গমন করেন ইষ্ট ইন্ডিয়ার শাসনামলে। তরুণ নাইপল বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়তে যান এবং পাকাপাকিভাবে ইংল্যান্ডে থেকে যান। ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে তিনি নিজেকে কখনই বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি। ভারতীয় সংস্কৃতিকে তিনি ইনসাইডার এবং আউটসাইডার– দুই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখেছেন। না ত্রিনিনাদ, না ইংল্যান্ড, না ভারতকে ধারণ করতে পেরেছেন তিনি। আর এসকল বর্ণনার মাধ্যম্যেই নাইপল নিজের আইডেনটিটিকেও প্রকাশ করতে চেয়েছেন। বরং এই তিন সংস্কৃতির মিশ্রণ হিসাবেই নিজেকে খুঁজে নিয়েছেন তিনি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত হবার কারণে যেমন এটির সংস্কৃতির অনেক ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন, তেমনি একজন আউটসাইডার হিসাবে অনেকটা নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিরও অধিকারী ছিলেন। একদিকে যেমন তিনি হিন্দু মূল্যবোধকে কর্ম, ধর্ম এবং মকশা দিয়ে বিচার করেছেন অন্যদিকে পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ ও স্বাধীনতার ধারণাও বাদ দেননি। তাই এধরণের দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কোন কোন জায়গায় নাইপলের নিজস্ব অনুভূতি এবং প্রতিক্রিয়া আলাদা করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

প্রথম এবং তৃতীয় বই প্রকাশের মধ্যে সময়ের পার্থক্য প্রায় ৩০ বছর। এই তিরিশ বছরে যেমন নাইপলের ধারণা পাল্টেছে, ভারতও পাল্টেছে তার চেয়ে বেশি। তিনটির মধ্যে এ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস বইটি ইমোশনাল এবং বেশ সাবজেকটিভ। বইটিতে তিনি প্রথমবারের মতো তার পূর্বপুরুষের মাতৃভূমি ভ্রমণের কথা লিখেছেন। ভারতের যা যা তার খারাপ লেগেছে, অকপটে স্বীকার করেছেন। পরের বইটিতেও, ইন্ডিয়া: এ্যান ওনডেড সিভিলাইজেশান, তিনি ভারতকে নেগেটিভলি দেখেছেন। তার কাছে মনে হয়েছে যে ভারত এখনও অনেক কিছুই অর্জন করতে পারেনি। তবে তিনি বিশ্বাস স্থাপন করেন যে ভবিষ্যতে ভারত তা করে দেখাবে। তবে শেষ বইটিতে, ইন্ডিয়া: এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ, তিনি পূর্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেশ সরে আসেন। এই বইটিতেই নাইপলকে সবচেয়ে আশাবাদী মনে হয় কারণ শেষবারে ভারতে এসে নাইপলের মনে হয়েছে যে আধুনিকতার দাবী মেটানোর জন্য ভারতের প্রস্তুতি বেশ ভালোই এবং তা করার ক্ষমতাও ভারতের আছে।

তিন.
এ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস
এই বইটি লেখার পূর্বে প্রথমবারের মতো নাইপল তার পূর্বপুরুষের দেশে ভ্রমণ করতে আসেন। স্বাভাবিকভাবেই আবেগ এবং অনুভূতির প্রকাশটি হয় তীব্র। বেশ একটা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনের বর্ণনা মেলে বইটিতে। শুরুতেই তিনি প্রচণ্ডভাবে ভারতের সংস্কৃতি এবং নৈতিকতা-মূল্যবোধকে আক্রমণ করেন। নাইপল যখন ভারতে আসেন তখন দুর্নীতি এবং অপশাসনের জন্য ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয়। পূর্বপুরুষের জন্মভূমির এমন দশা দেখে তিনি বেশ ব্যথিত হন। ধুলোমাখা নোংরা রাস্তা, হাড়জিরজিরে ভিখারি আর জীর্ন-শীর্ন ভারতের সাথে শৈশবকালে শোনা ভারতের গল্পের কোন মিল নেই। ত্রিনিনাদের হিন্দু কমিউনিটির অভিজ্ঞতার সাথে ভারতের হিন্দুদের মিল দেখতে না পেয়ে তিনি আরও হতাশ হন। ভারতীয় সংস্কৃতির মনোজগতে প্রবেশ করার পূর্বে দৃশ্যমান ভারতের কথাই প্রথমে তুলে ধরেন নাইপল। রাস্তাঘাটের ময়লা আবর্জনা, ধুলাবালি, অসুস্থ মানুষ, ভিখারী, ক্ষুধা ও দরিদ্রতা– সব কিছুই ধরা পড়ে নাইপলের চোখে। সুযোগ পেলেই ভারতীয় দরিদ্রতা নিয়ে মন্তব্য করেন। তবে এই দরিদ্রতা ছিল নাইপলের কাছে বেশ কষ্টদায়ক। তিনি বলেই বসেন ‘ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে গরীব দেশ।’ তবে ভিক্ষা নিয়ে নাইপলের অবজারভেশনটি ছিল চমৎকার। তার মতে, ভিক্ষাবৃত্তিকে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে হবেনা। ভারতীয় সমাজে ভিক্ষাবৃত্তির একটি ক্রিয়াবাদী দিক রয়েছে। কারণ ভিক্ষুককে কোন কিছু দেয়াকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে দেখা হয় চ্যারিটি হিসাবে। আবার একই সাথে ঈশ্বরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন হিসাবে। ল্যাট্রিন ও টয়লেট থাকলেও ভারতীয়রা রাস্তাঘাটে মল ত্যাগের কারণ হিসাবে বলেন যে, ভারতীয়রা খোলা হাওয়া বা জায়গাতে মলত্যাগ করতে পছন্দ করেন। এটি তাদের অভ্যাস। আরও বহু কিছুর প্রতি বিরক্তি নিয়ে তাকালেও কাশ্মীর নাইপলকে মুগ্ধ করেছিল। ভারতে প্রথম বারে আসার পর থেকে নাইপল যতটা বিরক্ত হয়েছিল, কাশ্মীরে প্রবেশ করেই যেন তিনি শান্তি ও আরাম খুঁজে পান। এখানে এসেই তার হিমালয়ের কথা স্মরণ হয়। কেননা শৈশবে ত্রিনিনাদে দাদীর ঘরে হিমালয়ের একটি ছবি দেখেছিলেন নাইপল।

ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও এটির বর্তমানের সাথে ঔপনিবেশিক অতীতের একটি মিল লক্ষ্য করেন অনেকেই। অসংখ্য মসজিদ, মন্দির, ইয়োগা, ভেজিটারিয়ানদের ভূমি হল এই ভারত। প্রাচীন সময়ের ভারত ছিল এক সময়ে উন্নত একটি দেশ যেখানে ঔষধ, বিজ্ঞান এবং উচ্চ প্রযুক্তি সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। নাইপল বলেন ‘প্রাচীন ভারতে গণতন্ত্রের বিকাশ হয়েছিল। প্রত্যেকটি গ্রাম ছিল এক একটি প্রজাতন্ত্র, স্বয়ংসম্পূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং ভেতর থেকেই সকল কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা হত।’ মানুষ বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে তাকিয়ে আফসোস করে। কারণ বর্তমানে ভারতে কোন ‘উন্নয়ন ও বিকাশ’ নাই। কারণ ভারতীয় জনগণ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তেমনভাবে অনুভব করে না বলে মনে করেন নাইপল। ভারতের এই যে স্থবিরতা নাইপল তখন প্রত্যক্ষ করেন সেটার কারণ হল, তার মতে, ভারত দীর্ঘদীন ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার কারণে তার আইডেনটিটি যেমন লুপ্ত হয়ে গেছে, তেমনি বর্তমানের ভারত স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসাবে মানিয়ে নিতে পারছে না বা সময় লাগছে। স্বাধীন ভারতের যে আইডেনটিটি, সেটিকে নাইপল কৃত্রিম আইডেনটিটি বলে মনে করেন। এমনকি জাতীয়তাবাদের ধারণাটিও ভারতের উপর চাপানো হয়েছে বলে মনে করেন। তাই ইংরেজরা চলে যাবার পরও ভারত অতীতেই বসে থাকে, সবাই শুধু অতীত ভারতের স্মৃতিচারণ করে।

 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।