রাত ১০:২১ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

ঐতিহ্যের শহরে সবুজের চাদর

প্রকাশিত:

ফারজানা মনি।।

ঢাকা বাস করবার কারনে বড় শহর দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু দিল্লি দেখবার পর সেই আগ্রহ একটু হলেও ফিরে পেয়েছি।ভারতবর্ষ এখনও যে সবুজ এবং পরিষ্কার রাখার শপথ রেখেছে তার দেখা মেলে দিল্লিতেও। রাস্তার দুপাশে গাছ, মানুষের শৃঙ্খলা দেখে বারবারই ঢাকার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সবচাইতে অবাক লাগছিলো মোটর সাইকেল কেন ফুটপাথ দিয়ে যাচ্ছে না দেখে! দিল্লি তাই আমার কাছে প্রাচীন প্রত্নতাত্নিক স্থানগুলো ছাড়াও আরো বেশী কিছু ছিল। দিল্লিতে পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থানের মধ্যে আছে রেড ফোর্ট, কুতুব মিনার, ইন্ডিয়া গেট, হুমায়ুনের কবর, লোটাস টেম্পল সহ আরও অনেক কিছুই। প্রথমেই বলি মোঘল সম্রাটের আবাসস্থল রেড ফোর্ট প্রসঙ্গে।  শুরুতেই একটা মজার ঘটনা বলে নেই। লালকেল্লায় টিকেট কাটতে যেয়ে বিদেশী লাইনে দাঁড়াবো এটাই স্বাভাবিক। দাঁড়িয়েছিও তাই। কাউণ্টারে বসা লোকটি আমাকে একমাত্র বিদেশিনী পেয়ে জানতে চাইলেন আমি কোন দেশী। আমার উত্তর শুনে তিনি আপনি ওই লাইনে মানে ভারতীয় লাইনে দেখিয়ে দিলেন দাঁড়ানোর জন্য । আমিতো ৪৪০ রুপি বাঁচানোতে মহাআনন্দিত তখন।     

রেড ফোর্ট:

দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রায় ২৫৫ একর জায়গার উপর এই প্রাসাদটি ১৬৪৮ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহান এটি স্থাপন করেছিলেন। পুরো স্থাপত্যটি লাল পাথরের তৈরি বলে এটাকে রেড ফোর্ট বা লাল কেল্লা বলা হয়। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় স্থান পায় ২০০৭ সালে। সম্রাট শাহজাহান আগ্রা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করবার কারনেই প্রাসাদটি তৈরি হয়। আগ্রা ফোর্টের কিছু আবহ তাই এখানেও পাওয়া যায়।

রেড ফোর্ট

দুইটাই শাহজাহানের প্রিয় রং লাল এবং সাদা পাথর দিয়ে তৈরি। প্রতিবছর ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখানে পতাকা উত্তোলনের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে থাকেন। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণই এই স্থানটি তাই পর্যটকরা ভিড় করে।   

কুতুবমিনার:

সত্যি অবাক হয়েছি এই স্থাপত্যশৈলী দেখে। জানলাম এটিই পৃথিবীর সর্বোচ্চ ইটনির্মিত মিনার। এটি ৭৩ মিটার বা ২৭৪ ফুট উচু। ভাবা যায়!মিনারটির ভিতরে ৩৭৯ স্টেপের সিঁড়ি রয়েছে যা শেষ হয়েছে টাওয়ার এর উপরে। যদিও টুরিস্টদের আর ঢুকার অনুমতি নেই ১৯৮১ সালের এক দুর্ঘটনায় ৪৫ পর্যটকের নিহত হবার কারনে। ভিতরে না ঢুকতে পারলেও এই মিনার আকর্ষণ একটু কমে যায়নি তা অসংখ্য টুরিস্টদের ভিড় দেখলেই বুঝা যায়। এটিও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক  কুতুবউদ্দিন আইবেকের শাসনামলে ১১৯৩ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কিন্তু এর উপরের তলার কাজ শেষ করেন ফিরোজ শাহ তুঘলক। মিনারটির সাতটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। যা একসাথে কুতুব কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। ভূমিকম্প, বজ্রপাতে এটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো পর্যটকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। আমরা যখন কুতুব মিনারে যাচ্ছি। তখন

কুতুব মিনারের গায়ে খোদাই করা কাজ 

ঘড়ির কাটা ৫টা ছুঁইছুঁই। আশংকা হচ্ছিলো খোলা পাবো কিনা। খোলাতো ছিল বটেই পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্তিকে সঙ্গী করে যখন কুতুব মিনার ঢুকছি তখন কে জানতো শেষ বেলার পড়ন্ত আলো কুতুব মিনারকে ভিন্ন মাত্রা দিবে!

হুমায়ূনের কবর:

২০ জানুয়ারি ১৫৫৬ সালে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তাকে প্রথমে দিল্লির পুরানা কেল্লায় সমাহিত করা হয়। হুমায়ুনের প্রথম স্ত্রী বেগা বেগমের আদেশেই এই স্থাপত্য তৈরি হয়। ১৫৬৫ সালে নির্মাণ শুরু হলেও এটির কাজ সম্পন্ন হয় ১৫৭২। অর্থাৎ ৯ বছর লাগে এটির কাজ শেষ হতে।মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কবরটিও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এখানে হুমায়ুনের স্ত্রী, দারাশিকো সহ অনেকের কবর থাকলেও এটি বিখ্যাত মুলত হুমায়ুনের কবরের জন্যই। এর পাশাপাশি অন্যান্য কবরের স্থাপত্যশৈলী সকলকেই বিস্মিত করবেই।

 

ইন্ডিয়া গেট:

এটি ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধ।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে নিহত প্রায় ৯০ হাজার সৈনিকের স্মরণে এই সৌধ তৈরি নির্মিত হয়। এটি লাল ও সাদা বেলে পাথর এবং গ্রেনেট পাথরে তৈরি হয়। ১৯৩১ সালে নির্মিত এই সৌধের নকশা করেন স্যার এডউইন লুটিয়েনস। এটি তৈরি হতে খরচ হয় প্রায় ৪০০ রুপি বা ৬৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

ইন্ডিয়া গেট 

আমাদের সময় স্বল্পতার জন্য এই চারটি স্থানে দেখা সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হই। যদিও দিল্লিতে দেখবার আছে বহুকিছুই। হাতে সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন সংসদ ভবন, জাতীয় জাদুঘর, চাঁদনি চক, পুরানা কেল্লা ইত্যাদি। দিল্লিতে ভালো করে দেখবার জন্য ২/৩ সময় হাতে রাখতে হবে। পুরনো স্থাপত্য শৈলীর জন্য বিখ্যাত এই শহর আপনাকে হতাশ করবে না একদমই। 

 

ছবি: হাসিব হাসান চৌধুরী

আরএফ

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।