রাত ১১:৪৮ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

কেন আমাদের দুঃখভোগ মুক্তিতে রূপ নিতে পারে না? : সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ

প্রকাশিত:

২০১৫ সালের নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর এই পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচের একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। রুশ ভাষায় সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জুলিয়া চায়কা। ওয়েবসাইটে এর ট্রান্সক্রিপ্টের যে ইংরেজি অনুবাদ দেওয়া হয়েছে তার বাংলা অনুবাদ এখানে প্রকাশ করা হলো। অনুবাদ করেছেন তপন শাহেদ

 

 

জুলিয়া চায়কা : হ্যালো, আমার নাম জুলিয়া চায়কা। আমি নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট Nobelprize.org থেকে বলছি। আমি সম্মানিত বোধ করছি এ বছরের নোবেল পুরস্কার পাবার জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাতে পেরে।
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : অনেক ধন্যবাদ।

জুলিয়া চায়কা : আপনি বোধহয় ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন যে এ বছর আপনি এই পুরস্কার পেয়েছেন, তাই না?
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : হ্যাঁ জানি, তবে সেটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে এখনো কষ্ট হচ্ছে (হাসি)।
   
জুলিয়া চায়কা : আমরা জানি, আপনি এখন একটা সাংবাদিক সম্মেলনে যাচ্ছেন...
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : হ্যাঁ, ট্যাক্সি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।

জুলিয়া চায়কা : আশা করি কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে ২-৩ মিনিট সময় আছে আপনার। এই সাক্ষাৎকারটা রেকর্ড করা হবে, তারপর আমাদের ওয়েবসাইটে এ বছরের অন্য লরিয়েটদের সাক্ষাৎকারের সাথে থাকবে এটা।
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

জুলিয়া চায়কা : আমরা আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছি। পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে আপনার? নাকি এমন একটা প্রশ্ন ঠিক এখনই করা উচিত হচ্ছে না?
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : (হাসি) সত্যিই তাই। তবে এই মুহূর্তে কেমন লাগছে সেটা বলতে পারি। এটা নিশ্চয়ই আনন্দের খবর, সেটা লুকানো অদ্ভুতই হবে। কিন্তু সেই সাথে এতে আমার মনের উপর চাপও তৈরি হচ্ছে, কেননা সেই বিরাট ছায়াগুলো আবার জেগে উঠছে: সোলঝিনিৎসিন, বুনিন, পাস্তেরনাক―সাহিত্যে নোবেলের সব রুশ লরিয়েট। বেলারুশ কখনো পুরস্কার পায়নি। এখন এই উপলব্ধিটা নিঃসন্দেহে দুশ্চিন্তার যে, এখন ক্লান্তি বা হতাশা কোনো কারণেই আমি আর হয়তো এই ভারটা কাঁধ থেকে নামাতে পারবো না। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি আমি, বিপুল কাজ করা হয়েছে, আর এখন আমার জন্য সামনে অপেক্ষা করছে নতুন কিছু।

জুলিয়া চায়কা : আপনার এই সুন্দর কথাগুলোর জন্য ধন্যবাদ। এখন আপনার লেখার স্টাইল নিয়ে যদি কথা বলি, একটু বলবেন কি নিজের কাজে এই যে সাংবাদিকতার ধরনটা গ্রহণ করলেন তার পিছনে কী প্রভাব কাজ করেছে?
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : আসলে আজকের দুনিয়ায় সবকিছু এত দ্রুত এবং তীব্রভাবে ঘটে যে কোনো একজন ব্যক্তি বা একটা পুরো সংস্কৃতিও সেসব বুঝে উঠতে পারে না। বড্ড বেশি দ্রুত ঘটে সবকিছু, দুর্ভাগ্যবশত। এসব নিয়ে সুস্থির হয়ে ভাবার কোনো অবকাশ নেই, যেমনটা করেছিলেন টলস্টয়―কয়েক দশক ধরে তাঁর চিন্তাগুলো পরিপক্ব হয়েছিলো। প্রতিটা লোক, আমিও, বাস্তবতার ক্ষুদ্র একটা টুকরোই বোধে ধরার চেষ্টা করতে পারে কেবল; কেবলই অনুমান করতে পারে। কখনো কখনো আমার ১০০ পৃষ্ঠা লেখা থেকে মাত্র ১০ লাইন নিই আমি, কখনো-বা এক পৃষ্ঠা। তারপর এই টুকরোগুলো একসাথে হয়ে একটা কণ্ঠস্বরের উপন্যাস গড়ে ওঠে যার মধ্যে তৈরি হয় আমাদের সময়ের একটা ছবি, আর তাতে আমাদের জীবনে যা যা ঘটছে তার বিবরণ থাকে।

জুলিয়া চায়কা : এইমাত্র আপনি দারুণ একটা রূপক ব্যবহার করেছেন, ‘কণ্ঠস্বরের উপন্যাস’। আমার পরের প্রশ্নটা এটা নিয়েই। আপনার কাজে অপরিসীম দুঃখভোগ আর তার নিদারুণ প্রমাণের নজির আছে। এই ব্যাপারটা কি মানুষের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছে?
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে, তবে এইটুকু আমার বলা উচিত যে আমি এমন এক সংস্কৃতির মানুষ যার এই উচ্চমাত্রার যন্ত্রণাদায়ক তাপ থেকে কখনো রেহাই মেলেনি। অন্য সংস্কৃতিতে যা অকল্পনীয় এবং অসহনীয় তা আমাদের সংস্কৃতিতে খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। এর মধ্যেই আমরা বাস করি, এটাই আমাদের জীবনের আবহাওয়া। সারাক্ষণ আমরা বাস করছি জল্লাদ আর তার শিকারদের মধ্যে। প্রত্যেকটা পরিবারে, আমার পরিবারে...১৯৩৭ সালে চেরনোবিল, যুদ্ধ। অনেক কথা বলতে পারে এটা, প্রত্যেকের জীবনে একই গল্প...। প্রত্যেকটা পরিবার এই যন্ত্রণার উপন্যাস শোনাতে পারে আপনাকে। ব্যাপারটা এমন নয় যে এটা আমার দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা এমন পরিস্থিতিতে লোকে যেভাবে চিন্তা করে সেটা আমার ভালো লাগে। না, এটাই আমাদের জীবন। একবার ভাবুন তো, একটা লোক পাগলা গারদ থেকে বেরিয়ে এসব নিয়ে লিখছে। তাকে কি আমার বলা উচিত: “এই যে শুনুন, কেন আপনি এসব নিয়ে লিখছেন?” প্রিমো লেভি যেমনটা লিখেছেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্প নিয়ে আর সেসব থেকে নিজেকে আর ছিঁড়ে আনতে পারেননি। কিংবা শালামোভকে যেভাবে এই ক্যাম্প কব্জা করে একেবারে মেরে ফেলেছে, অন্য কিছু আর লিখতে পারেননি তিনি। আমি নিজেও কেবলই প্রশ্ন করে চলেছি, আমরা কে, কেন আমাদের দুঃখভোগ মুক্তিতে রূপ নিতে পারে না? আমার জন্য এই প্রশ্নটা খুব জরুরি। কেন এই দাস মনোবৃত্তিরই সব সময় জয় হয়? কেন আমরা আমাদের মুক্তিকে সব সময় বস্তুগত লাভে বদলে নিই; কিংবা ভয়ে, যেমনটা আমরা আগে করতাম?        
       
জুলিয়া চায়কা : কাদের জন্য লিখছেন আপনি?
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : আমার মনে হয় আমি নিজে যখন এই প্রশ্নগুলো বুঝে উঠতে পারবো তখন আমার জন্য সহজ হবে অন্যদের সাথে কথা বলা। বাস্তব জীবনে কিংবা লেখার সময়েও আমি প্রত্যাশা করি যেন আমার এমন একটা অনুভূতি থাকে যে আমি আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের সাথে কথা বলছি। আমি চাই তাদের বলতে এই জীবনে আমি কী উপলব্ধি করেছি। বিচারকের ভূমিকা আমি কখনোই বরদাশত করতে পারি না। আমি কোনো নির্লিপ্ত ইতিহাসকার নই, আমার হৃদয় সারাক্ষণ পড়ে থাকে সেখানে। যে প্রশ্ন আমার ভয়ের কারণ তা হলো, এই আতঙ্কের রাস্তায় আমরা কতদিন হাঁটতে পারবো, একজন মানুষ কতখানি সহ্য করতে পারে? সে কারণেই ট্র্যাজেডির কাব্যতত্ত্ব আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কোনো পাঠক যদি বলে সে ঐ ভয়ঙ্কর বইগুলো পড়েছে এবং পড়ে ভালো বোধ করছে, কিংবা সে চোখের জল ফেলছে এবং সেই জলে তার হৃদয় পরিশুদ্ধ হচ্ছে, তাহলে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সবগুলো জিনিস আপনাকে মনে রাখতে হবে, মানুষকে শুধু ভীতিতে আক্রান্ত করে রাখলে চলবে না।

জুলিয়া চায়কা : ধন্যবাদ। আবার অভিনন্দন গ্রহণ করুন আমাদের। ডিসেম্বরে স্টকহোমে আপনার সাথে দেখা হলে খুশি হবো আমরা।
সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ : ধন্যবাদ। গুড বাই।

জুলিয়া চায়কা : গুড বাই।

 

 

সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচের “ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিল”-এর অংশবিশেষ পড়তে ক্লিক করুন-

মৃত জ্বালানির তত্ত্বাবধায়ক

 

 

       

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।