রাত ১১:০২ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

চল যাই তাজহাট জমিদার বাড়ি..

বেড়ানোর গল্প

প্রকাশিত:

নোরা তাসনিম।।

সাদা ধবধবে বিশাল প্রাসাদটি নীল আকাশের নিচে যেন ফুটে আছে শ্বেতপদ্মের মতোই। বেশ বড় এলাকা নিয়ে তৈরি রাজবাড়িটি। ঘাট বাধানো পুকুরে ফুটে আছে লাল শাপলা। রংপুর জেলার তাজহাট, ডিমলা, কাকিনা, মহুনা, পীরগঞ্জ বর্ধনকোট ইত্যাদি এলাকার বেশকিছু বিখ্যাত জমিদার বংশ ছিল। তাদের ছিল বিশাল আয়তনের সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ। এদের মধ্যে অন্যতম তাজহাট জমিদার বাড়ি। রংপুর শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ জমিদার বাড়িটি দেখতে আসেন দেশ বিদেশের পর্যটকরা।

 

ইতিহাস

শিখ ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরিত মান্নালাল রায় ছিলেন তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পাঞ্জাব থেকে এদেশে আসেন এবং রংপুরের মাহীগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। সে সময় মাহীগঞ্জ ছিল রংপুরের জেলাসদর। তিনি ছিলেন স্বর্ণকার। ধারণা করা হয় তার আকর্ষনীয় তাজ কিংবা রত্নখচিত মুকুটের কারণে এ এলাকার নামকরণ করা হয় তাজহাট। মান্নালাল রায় তার জীবদ্দশায় প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হন এবং রংপুরের অনেক এলাকা নিজ আয়ত্ত্বে নিয়ে আসেন। তার নাতি ধনপত লাল রায় বিয়ে করেন রতন লাল রায়ের নাতনিকে। রতন লাল রায়ও পাঞ্জাব থেকে অভিবাসন গ্রহন করেন। ধনপত রায়ের নাতি উপেন্দ্রলাল রায় অল্প বয়সে মারা যাওয়ার কারণে জমিদারির দায়িত্ব তার কাকা মুনসেফ গিরিধারী লাল রায়ের হাতে এসে পড়ে। নিঃসন্তান হওয়ার কারণে তিনি কলকাতার জনৈক গোবিন্দ লালকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারীর উত্তরাধিকারী হন। তিনি ছিলেন খুবই স্বাধীনচেতা এবং জনপ্রিয়। তিনি ১৮৮৫ সালে রাজা, ১৮৯২ সালে রাজা বাহাদুর এবং ১৮৯৬ সালে মহারাজা উপাধি গ্রহণ করে। ১৮৯৭ এর ভূমিকম্পে নিজ বাড়ি চাপা পড়ে মারা যান তিনি। ১৯০৮ সালে তার ছেলে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ধারণা করা হয় বিংশ শতকের শুরুর দিকে তিনিই এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন।

১৯৪৭ সালে জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ৫৫ একর জমিসহ এগ্রিকালচার ইনিষ্টিটিউটকে দেওয়া হয় । ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ভবনটিতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন হিসেবে উদ্বোধন করেন।

পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে হাইকোর্ট ডিভিশন উঠে গেলে ১৯৯৫ সালে রাজবাড়িটি ১৫ একর জমিসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০০৫ সালে রাজবাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করে। জাদুঘর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান।

 

গঠনশৈলী

পূর্বমুখী দোতলা এ বিশাল প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ৭৬.২০ মিটার। এটি প্রায় ২১০ ফুটের মত প্রশস্ত ও চার তলার সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মুঘল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয় যার প্রমাণ মেলে মধ্যভাগে বিশাল একটি গম্বুজ ও দুই পাশে তার ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোর একটা মসজিদের অবয়ব থেকে। তবে রাজবাড়ি যেদিক থেকে বাংলাদেশের অন্য সকল প্রাসাদের থেকে আলাদা তা হলো এর সিঁড়িগুলো। সর্বমোট ৩১ টি সিঁড়ি আছে যার প্রতিটাই ইতালীয় ঘরানার মার্বেল পাথরে তৈরি। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি ১৫.২৪ মিটার প্রশস্ত কেন্দ্রীয় সিঁড়ি সরাসরি দোতলায় চলে গিয়েছে। সিঁড়ি থেকে উঠে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটাও একই পাথরে তৈরি। আটকোণা বিশিষ্ট গম্বুজটি প্রাসাদের মাঝ বরাবর ছাদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এক সময় সিঁড়ির দুই পাশে দোতলা পর্যন্ত ইতালীয় মার্বেলের ধ্রুপদী রোমান দেবদেবীর মূর্তি দিয়ে সাজানো ছিল। তবে সেগুলো অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছে। প্রাসাদের সামনের অংশের দুই প্রান্ত সেমি আটকোণা বিশিষ্ট ও মধ্য ভাগের একটি ৯.১৪ মিটার বারান্দা রয়েছে। এ বারান্দার ছাদের উপরে চারটি সুসজ্জিত স্তম্ভ ও দু পাশে প্রত্যেকটিতে দুটি করে একই ধরনের স্তম্ভ রয়েছে। যার উপরে ত্রিকোণাকৃতির দুটি কক্ষ রয়েছে। প্রাসাদটির ভূমি নকশা ইংরেজী ইউ অক্ষরের মতো। যার পশ্চিম দিক উন্মুক্ত। প্রাসাদের নিচতলায় প্রবেশ পথের পেছনে ১৮.২৯ ও ১৩.৭২ মিটার মাপের হল ঘর রয়েছে।

প্রাসাদের ভেতরে পুরো ভাগ জুড়েই আছে ৩ মিটার প্রশস্ত বারান্দা। এছাড়া ওপর তলায় ওঠার জন্য প্রাসাদে কাঠের দুটি সিঁড়ি আছে। সিঁড়ি দুটির একটি উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে, অপরটি পূর্ব বাহুর দক্ষিন প্রান্তে। প্রাসাদে মোট ২২টি কক্ষ রয়েছে। রাজবাড়ীর পেছনের অংশে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। এই গুপ্ত সিঁড়ি কোন একটি সুড়ঙ্গের সাথে যুক্ত যা সরাসরি ঘাঘট নদীর সাথে যুক্ত এমন একটা জনশ্রুতি শোনা যায়। যেটা রাজারা বিপদের সময় পালানোর কাজে ব্যবহার করার জন্যে তৈরী করেছিলেন। তবে সিঁড়িটা এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাসাদের সুন্দর ফোয়ারাটি কালের বিবর্তনে শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশা কিছুটা মলিন হলেও এখনো এর জৌলুষ বোঝা যায়। কথিত আছে রাণীর জন্যেই বিশেষ করে এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো।

 

জাদুঘর

মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে জাদুঘরে উঠলেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ যাতে রয়েছে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এখানে রয়েছে সংস্কৃত এবং আরবি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি যেমন পোড়ামাটির ফলকে লেখা আররি লিপি ও ফার্সি শিলালিপি। আরও আছে মুঘল সম্রাট আওরাঙ্গজেবের সময়ের কুরআনসহ মহাভারত ও রামায়ণ। পেছনের ঘরে রয়েছে বেশ কয়েকটি কাল পাথরের হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতি। এছাড়াও ঐতিহাসিক এ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে বেগম রোকেয়ার স্বহস্তে লেখা চিঠি, হাতির দাঁত, তৎকালীন দাড়িপাল্লা, কালো পাথর, জমিদার গোপাল রায় এর ব্যবহার্য ধাতব ঝাড়বাতি, সীল মোহর, ভাসু বিহার (বগুড়ায় প্রাপ্ত প্রত্নসম্পদ), হাতির উপর উপবিষ্ট সিংহ, প্রজা বিদ্রোহ ও ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী সরলা দেবী বৌঠাকুরানীর ব্যবহৃত সেগুন কাঠের বাক্স, পোড়ামাটির মস্তক, নারী মূর্তি, আবক্ষ মূর্তি, মস্তকবিহীন দন্ডায়মান মূর্তি, গনেশ, পিতলের দূর্গা, কবি শেখ সাদীর স্বহস্থে লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথর মূর্তি, প্রাচীন মুদ্রাসহ প্রায় ১০০ প্রকার বিরল প্রত্নতত্ত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রংপুর অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে জাদুঘরটি বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। জাদুঘরে নির্দিষ্ট প্রবেশ মূল্য পরিশোধ করে প্রবেশ করা যায়। প্রাসাদ চত্ত্বরে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে চাইলে গাড়ির জন্যও নির্দিষ্ট ফি দিতে হবে।

 

ছবি: লেখক

/এনএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।