ভোর ০৬:০৬ ; শনিবার ;  ১৯ অক্টোবর, ২০১৯  

হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢোল

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

নীলফামারী প্রতিনিধি।।

ক’দিন পরই শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আরতিতে ঢাক-ঢোলের বিকল্প নেই, তাই নীলফামারীর কারিগররা পার করছেন বছরের ব্যস্ততম সময়। বিপুল উদ্যমে চলছে ঢাক, ঢোল, দোতারা, তবলা, ঢুগি, খোল, খঞ্জনি, একতারা প্রভৃতি বাদ্য তৈরির কাজ। তবে আগের চেয়ে এখন বাজার কমেছে এসব বাদ্যযন্ত্রের। তারওপর লাভ তো দূরের কথা, তৈরির খরচই উঠছে না কারিগরদের। ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না পেরে বাপদাদার পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

নিলফামারী সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, সদরসহ পাঁচটি উপজেলার প্রায় আড়াইশো পরিবার ঢাক ও ঢোল তৈরির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের।

ঢোল তৈরিতে কারিগররা সাধারণত দেশীয় আম, জাম, রেইনট্রি, কড়াই ও মেহগনি কাঠ ব্যবহার করেন। ঢাকের পর্দা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় ছাগল ও ভেড়ার চামড়া। বেড় দেওয়ার জন্য মহিষের চামড়াই কারিগরদের পছন্দ। বাদ্যযন্ত্র নির্মাতাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার হঠাৎ চামড়ার দাম চড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। এছাড়া পরিবহন খরচও বাড়তি। খরচ বহনের সাধ্য নেই বলে অনেক পরিবারই এবার হাত দেয়নি এ কাজে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না পেরে অনেকে ইতোমধ্যেই ছেড়েছেন বাপদাদার পেশা। যারা টিকিয়ে রেখেছেন, তারা একরকম প্রাণকে পণ করেই তা করছেন।

নীলফামারী জেলা শহরের গাছবাড়ি এলাকার প্রবীণ ঢোল কারিগর সাগর চন্দ্র দাস বলেন, ‘ঢাক ঢোল বানানো আমার জন্মগত পেশা। আমি ১৫ বছর ধরে এ কাজ করছি। আগে একটা ঢোল বিক্রি হতো ছয় থেকে সাত হাজার টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়, অথচ তৈরির খরচ আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই পৈত্রিক পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি।’

নীলফামারী সদরের বাহালিপাড়া গ্রামের প্রৌঢ় ঢোল কারিগর সুবাস ঋষি বলেন, ‘একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজের অর্ডার আসতো। এখন আর তেমন অর্ডার আসে না। সামনে দুর্গাপূজার জন্য অল্প কিছু কাজ পেয়েছি মাত্র।’

এখানকার বাদ্যযন্ত্র বিশেষ করে খোল ও ঢোল একসময় পাশের দেশ ভারত ও নেপালেও পাঠানো হত। এখন আর সে সুদিন নেই। নীলফামারী ভাওয়াইয়া সঙ্গীত একাডেমির সভাপতি জামিল ইসলাম ও স্বরনালী সুরসঙ্গীত একাডেমির সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, ‘পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। ঢোল প্রস্তুতকারক সম্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’

নীলফামারী জেলা প্রশাসক জাকির হোসেনের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। জানালেন, ‘জেলায় অসংখ্য পরিবার এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে জীবন চালায়। তবে এ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিক নানা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ বাদ্যগুলো, ঢোল এর  অন্যতম।‘ উপজেলাভিত্তিক সমিতির মাধ্যমে দেওয়া আর্থিক সহায়তাটুকু যেন ঢাক ও ঢোলনির্মাতা পরিবারগুলো পায়, সমাজসেবা কর্মকর্তাদের তিনি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন।

/এইচকে/এফএস/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।