রাত ১১:৩৭ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

মায়া ঝরনার মায়ায়

প্রকাশিত:

সামিউল্যাহ সম্রাট।।

সিলেট জেলাকে প্রাচীরের মত ঘিরে রেখেছে সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য মেঘালয় । এই মেঘালয়ের গভীর বনাঞ্চল বেষ্টিত পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ছে অনেক ঝরনা ।নয়নাভিরাম এই ঝরনাধারাগুলো বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে বেশ স্পষ্ট ভাবেই দেখা যায় । কিছু কিছু ঝরনা দেখতে হলে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ । তেমনি এক ঝরনা পান্তুমাই । এটি এখন ধীরে ধীরে বেশ পরিচিত হয়ে উঠছে । খুব বেশী পর্যটক এটির রুপ এখনও অবলোকন করেন নি । পান্তুমাই দেখতে যাওয়া এক ধরনের অভিযানও বটে । সিলেটের সবাদকর্মীদের মুখে অনেকবার শুনেছি কিন্তু সুযোগ মিলছিলনা যা ওয়ার । এবার দুজন সঙ্গী পেয়ে গেলাম । শুক্রবার সকালে অচেনা পথে পান্তুমাইয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পরলাম ছোটভাই ম্যাক্স, সুহৃদ সুমন আর আমি ।

পান্তুমাই দুভাবে যাওয়া যায় । সুবিধাজনক মনে করে আমরা বেছে নিলাম জাফলং রুট । সকালের নাস্তা সেরে নিলাম জাফলং মামার বাজারে ।     

জাফলং জিরো পয়েন্টে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন আরও তিনজন । সিলেট মেডিকেল কলেজের ডাক্তার পীযূষ ও তাঁর দুজন কাজিন,ভালই হল একজন ডাক্তার পাশে পাওয়া গেল । দল ভারী হওয়ায় আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গেল। পিয়াইন নদী নৌকায় পার হয়ে এলাম খাসিয়াদের বাজার সংগ্রামপুঞ্জিতে । এই বাজার থেকে পান্তুমাই প্রায় ১০ কিলোমিটার । এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে হাজিপুর বাজার । সে পর্যন্তই যানবাহন চলে। পরের পথ টুকু হাঁটতে হবে । যানবাহন বলতে মোটরসাইকেল আর শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ভটভটি । ভটভটিতেই উঠে বসলাম সবাই । সংগ্রাম পুঞ্জির পরে নকশিয়ারপুঞ্জি,পুরো অঞ্চলটিই ঘন সুপারি বাগান আর পান গাছে ভরপুর । সরুপথের দু ধারে খাসিয়াদের সুন্দর বাড়ি ঘর। মাথায় পান্তুমাই তাই আর অন্য কোন সৌন্দর্য চোখে ধরছেনা ।

এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় শরীর একেবারে কাহিল, বাকি পথ চলব কিভাবে ? হাজিপুর বাজারে নেমে ভটভটির পাইলটকে ছেড়ে দিলাম । তাঁর ফোন নম্বর নিলাম এই ভেবে যে ফেরার পথে কাজে লাগতে পারে । স্থানীয় এক মধ্য বয়স্ক লোক আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন ।তাঁর কাছেই পথের সঠিক নির্দেশনা চাইলাম । কিন্তু তিনি এমন ভাবে বর্ণনা করলেন তাতে গাইড হিসেবে তাঁকেই সাথে নিতে হল । শুরু হল পদযাত্রা । পাহাড়ি স্বচ্ছ জলের ছড়া পাড়ি দিয়ে গাঁয়ের মেঠো পথ, বাঁশ বাগান, হাঁটু জলের নদী পার হয়ে প্রতাপ্পুর গ্রাম । এর পরের গ্রাম পান্তুমাই । অনেকেই কৌতুহলি দৃষ্টিতে অনেকেই আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন । মাতব্বর গোছের এক ব্যাক্তি শুধালেন কোথায় চলেছি ? আমরা গন্তব্য জানালাম । তিনি পরামর্শ দিলেন যেন ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছে না যাই । পান্তুমাই গ্রামে পৌঁছোতেই আমরা ক্লান্ত । এবার অন্ধকার এক বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছেন গাইড । পিছু পিছু আমরা ।

কিন্তু ঝরনা কই? সামনে উঁচু পাহাড় ঘেঁষে বিশালাকার এক ফুটবল মাঠ । দুপাশে গোলপোস্ট । বোঝা গেল এখানে নিয়মিত খেলা হয় । মাঠ পেরিয়ে এগোতেই জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ কানে এল । জঙ্গলের মাঝখানে উঁকি দিচ্ছে রূপবতী ঝরনা পান্তুমাই । বড় বড় পাথরের গা বেয়ে অনেক উঁচু থেকে ইংরেজি এস অক্ষরের আকৃতি নিয়ে অবিরাম ঝরছে । নিজেকে আটকানো মুশকিল । কিন্তু সীমান্তের বাঁধা যে মানতেই হবে । এত দূর এসে শুধু দৃষ্টি দিয়েই ছুঁয়ে দেখা ছাড়া আর কোন উপায় নেই । ঝরনাটিকে স্থানীয়রা ফাটাছড়ির ঝরনা বা বড়হিল ঝরনাও বলেন। পাশেই বিএসএফের ক্যাম্প। বরই গাছের সারি দিয়ে এখানে দুই দেশের সীমানা ভাগ করা । এখানে বিজিবির কোনো চৌকি নেই। ঝরনা ভারতের হলে কি হবে পানি এসে পড়ছে আমাদের দেশে, রূপ নিয়েছে নদীর । সেই নদী তেই শুরু হল দাপাদাপি। শীতল আর কাঁচের মত পরিস্কার পানিতে এক ঘণ্টারও বেশী জলকেলি হল আমাদের । দুপুরে খাইনি সে খেয়াল নেই । সূর্য হেলে পরেছে পশ্চিম আকাশে । মায়া ঝরনা মায়ায় আটকে ফেলেছে । মন কিছুতেই ফিরতে চায়না । মনের সব কথা শুনতে নেই । আবার মিলব পান্তুমাইয়ের সাথে । বুকের গহীনে আক্ষেপ,ইস !! এই ঝরনা যদি আমাদের হত ।  

 

ছবি: লেখক 

 

আরএফ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।