রাত ১১:২৪ ; সোমবার ;  ২২ অক্টোবর, ২০১৮  

জীবাণুর বিরুদ্ধে এক গেরিলা যোদ্ধা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এহতেশাম ইমাম।।

জীবাণুকে কব্জায় আনতে চেষ্টার কমতি নেই বিজ্ঞানী মহলের। এর মাঝে কেউ ব্যস্ত জীবাণু দিয়ে অস্ত্র বানানোর কাজে, কেউ চান সেই জীবাণুর ভ্যাকসিন বানাতে। এই জীবাণু গবেষণার যুদ্ধে বাংলাদেশও সামিল। এমনকি আমাদের দেশ জীবাণু গবেষণার প্রাথমিক স্তর পার করেছে বললেও ভুল হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। সেখানকার শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জীবাণু গবেষক। এমনই এক জীবাণু-যোদ্ধা ঢাবির অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সাবরীন বাশার। আজকের গল্পটা তাকে নিয়েই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস অ্যাওয়ার্ড থেকে শুরু করে এরই মধ্যে ঝুলিতে পুরেছেন আধ ডজন পুরস্কার। সাবরীন বাশার এখন গবেষণা করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অণুজীব বিজ্ঞানী আনোয়ার হোসেনের তত্ত্বাবধানে। গবেষণাগার বায়োইনফরমেটিকসে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে। লক্ষ্য একটাই- দেশের জীবাণু প্রতিরোধী ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন।

সাবরীন বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু এবং অ্যান্টিবায়োটিকের দূষণ নিয়ে কাজ করছি। আমাদের চিকিৎসা সেবায় অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ প্রভাবের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। কারণে অকারণে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার খুব বাজে প্রভাব পড়ছে মানবদেহে। লক্ষ্য করলে দেখবেন বিদেশের বিভিন্ন দেশে কম মাত্রার যে কোনও অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই রোগ সারছে, অথচ বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে অল্পতেই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দিতে। অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প কিছু উদ্ভাবন করা যায় কিনা তা নিয়েও কাজ করছি।’

সাবরীন জানান, ‘ছোটখাট রোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ক্রমেই মানবদেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। এটি এখন খালি চোখে ধরা না পড়লেও ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব বাড়বে বহুগুণে। তখন পুরো জাতি হুমকির মুখে পড়বে।’

 

অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি হওয়ার নেপথ্যে মূল কলকাঠি নাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ। যথেচ্ছ ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিকের নানা উপাদান যেনতেনভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ থেকে মানুষের খাদ্যে, সেখান থেকে আবার মানবদেহে যাচ্ছে ওই সব উপাদান। অ্যান্টিবায়োটিকের ওই ‘উচ্ছিষ্টে’র সংস্পর্শে আসা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস তখন দ্রুত নিজেদেরকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী বানিয়ে ফেলতে পারে। সেই অনুযায়ী প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারে জীবাণুরা। আর তাই দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু এবং এ সংক্রান্ত দূষণের প্রকৃত পরিস্থিতি আসলে কোন পর্যায়ে, তা নিয়ে কাজ করাটা অণুজীব গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

তবে দরকার আরও উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা। সাবরীনও তাই ভবিষ্যত পরিকল্পনা সেরে ফেলেছেন। মাইক্রোবায়োলজির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসবেন দেশে।

অর্জনের ঝুলি                                                                

সাবরীনের অর্জনের তালিকায় আছে বেশ কয়েকটি স্কলারশিপ ও পদক। এর মধ্যে আছে বোর্ড জুনিয়র স্কলারশিপ, জয়নুল মেমোরিয়াল স্কলারশিপ, ইবিএল-ডিইউএএ স্কলারশিপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিন্‌স অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল সায়েন্স এবং টেকনোলজি ফেলোশিপ।

 

                                                                                        

আগে লক্ষ্য, পরে চেষ্টা

মা ও তিন বোনের সংসারে সাবরীন মেঝ। ছোটবেলা থেকেই নিজের পছন্দের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তবে পছন্দ আর প্রয়োজনের মাঝে যে বড় পার্থক্য আছে সেটা বুঝতে পারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সমাজ কাঠামোতে এখনও পরিবারের বড়দের পছন্দের পেশা ছোটদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু লক্ষ্য করুন, আমি যে বিষয়ে কাজ করছি সেটি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। কোনওভাবেই বাদ রাখা যায় না। তবে আমি নিজেকে যথেষ্ট সৌভাগ্যবান বলবো। কারণ আমি পড়াশোনার ধারাবাহিকতার মাঝেই পেশা জীবন বাছাই করে নিতে পেরেছি।

সমবয়সীদের প্রতি তার আহ্বান- জীবনযাত্রায় সবার আগে প্রয়োজন নিজের লক্ষ্য স্থির করা, পরে সেটাকে জয় করার চেষ্টা করে যেতে হবে বিরামহীমভাবে।

তরুণ বিজ্ঞানমনষ্কদের প্রতি সাবরীনের পরামর্শ-যে কোনও ক্ষেত্রেই গবেষণার বিকল্প নেই। গবেষণা মানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। নবীন গবেষকদের এ জন্য শুধু নিত্যনতুন প্রযুক্তি জানতে হবে তা নয়, চিন্তা-চেতনা, কর্মদক্ষতাকেও আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হবে।

 

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।