সন্ধ্যা ০৭:০৩ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

মানসিক রোগ বলে কিছুই নেই: ডা. আতিক

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাকিয়া আহমেদ।।

মানসিক রোগ বলে আসলেই কিছু নেই বলে মনে করেন বিশিষ্ট মনোচিকিৎসক ও ‘ঠিকানা সাইক্রিয়াটিক অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডিকশন ক্লিনিক’-এর কর্ণধার ডা. আতিকুল হক মজুমদার। তিনি বলেন, কোনও মানসিক সমস্যাই সুনিদির্ষ্ট কোনও রোগ নয়। এটা হচ্ছে কিছু উপসর্গের সমষ্টি মাত্র। চিকিৎসা পদ্ধতিতে বৈশ্বিকভাবে এর আমূল পরিবর্তন আনা উচিত। শনিবার মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডে অবস্থিত তার ক্লিনিকে বসে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ সব কথা বলেন।  

ডা. আতিক বলেন, মানসিক সমস্যা নিয়ে প্রচলিত অনেক কিছুই ভুল হিসেবে রয়েছে সমাজে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন,  আমি কাউকেই মানসিকে রোগী বলতে রাজি নই। চিন্তার বা বোঝার সমস্যার জন্য আমাদের ভেতরে মতবিরোধ হতে পারে, সেটাকে আলোচনার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আর এটা করতে পারলেই,  অনেক সমস্যা থেকে বের হতে পারবে মানুষ।

মানসিক অসুস্থতা বাড়ার কারণ সম্পর্কে ডা. আতিক বলেন, অনেক সমস্যাকেই এখন মানসিক সমস্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যাচ্ছে , যা আগে যেত না। কিন্তু সমস্যা জীবনে আগেও ছিল, এখনও আছে। পরেও থাকবে। আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের দিয়ে ভাবাচ্ছে—আমরা বর্তমানেই বেশি সংকটে আছি। এ থেকে বের হতে হলে কাজ করতে হবে প্রচুর। কাজই হলো মেডিটেশন। তিনি বলেন, ব্যক্তি আমার কথা ভাবতে গেলেই দুঃখ, কষ্ট, হতাশার জন্ম হয়। প্রত্যেকে মনে করে, আমারই কেবল এ অবস্থা। কিন্তু হতাশা, দুঃখ, কষ্ট থাকবেই। সেই সঙ্গে আমরা নিজেরা কিছু কষ্ট বানিয়ে নেই।

এই মনোচিকিৎসক বলেন, সুখের বড় শর্ত হলো চাহিদা কমানো। সুখের কোনও শর্টকাট ওয়ে নেই। আমরা নিজেদের চরিত্রের যে জিনিসগুলো নেতিবাচক, সেগুলো নিয়ে অপরাধবোধে ভুগি, বিব্রত হই। কিন্তু এগুলোতে আমাদের নিজেদের তৈরি করা নয়। তাহলে সেগুলো কেন আমাদের বিব্রত করবে—প্রশ্ন রাখেন তিনি। এটা নেই, ওটা নেই, এগুলো ভাবলে চলবে না।

ডা. আতিক বলেন, নিজের কত ডেফিসিয়েন্সি রয়েছে, কিন্তু ‌‌‌আমার রাগ বেশি, চারিত্র্যিক কিছু দুবর্লতা আছে, নেগেটিভ দিক রয়েছে। এগুলো নিয়েই নিজেকে নিয়ে বিব্রত বোধ করি। এখান থেকে বের হতে হবে।

অতীতের কোনও ভুলত্রুটি না ভোগার পরামর্শ দিয়ে এই মনোচিকিৎসক বলেন, অতীত মানেই ডিপ্রেসন, ভবিষ্যত মানে টেনশন। অতীত-ভবিষ্যত থেকে যদি বর্তমানে থাকতে পারি তাহলে ডিপ্রেসন কিংবা হতাশা থেকে দূরে থাকতে পারব। বর্তমানের মধ্যে নিজেকে থাকতে হবে। তা হলেই কেবল সফল হওয়া সম্ভব।

 ডা. আতিক বলেন, খুঁজতে চাইলে জীবনে অসংখ্য সমস্যা মিলবে। প্রতিটির কারণও অসংখ্য। সুনির্দিষ্ট কারণ খোঁজাটা তাই অর্থহীন। সমস্যা ও কারণ, সবই আছে চিন্তায়, বাস্তবে নয়। রাগ-দুঃখ, কষ্ট ক্ষোভ-লালসা ভালোবাসা সবকিছু নিয়েই মানুষের জীবন। আমরা এ সব আবেগকে ডিফাইন করি ভালো-মন্দ আখ্যা দিয়ে। কিন্তু সব আবেগই প্রাকৃতিক। তাই এসব আবেগ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ খুব বেশি পরিবর্তন করে না, যতক্ষণ না আমরা আমাদের চিন্তায় পরিবর্তন আনি। তিনি যোগ করেন, চিন্তার পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গেই আমাদের পরিবর্তন হবে। আমরা পরিবর্তনের মানদণ্ড দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করি। আমি, আপনি বা তথাকথিত শিক্ষিত কিংবা বুদ্ধিজীবীরাও এই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নন। তিনি বলেন, চিন্তার সংকীর্ণতা বা চিন্তার প্রথাগত ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, লজ্জা জিনিসটাই একটা ইল্যুয়েশন। কোনও কিছুর জন্যই আমরা দায়ী নই। অথচ আমরা বিভিন্ন কারণে অপরাধবোধে ভুগি। এগুলোই আমাদের পঙ্গু করে দেয়।

ডা. আতিক বলেন, আমরা নিজেদের আড়াল করি বারবার—উই আর ডুয়িং রং। আমাদের প্রকাশ করতে হবে। সেলফ এক্সপ্রেশন না থাকলে নিজের মুক্তি সম্ভব নয়।   যারা ড্রাগ নিচ্ছে, যারা হতাশায় ভোগে, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের পরিবারকে সচেতন হতে হবে। এই তরুণদের বোঝাতে হবে। প্রকৃতিতে একেক বিষয় একেক রকম হয়। কারও যদি বোহেমিয়ান ভাব থাকে, সেটাকে আমি কী করে খারাপ বলব, ঘৃণ্য বলব—প্রশ্ন তোলেন তিনি।

প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতির প্রসঙ্গে টেনে বিশিষ্ট এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রকৃতিতে ফুল ফুটছে, আবার সময়মতো ঝরেও যাচ্ছে, এটাই স্বাভাবিক। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। সামাজিক প্রথা, ডাক্তারের নির্দেশ, বাবা-মায়ের আদেশ সব মটিভেট করতে হবে। নিজেকে বুঝতে হবে আগে। খারাপ সব কিছুকে ইগনোর করতে হবে, ভালো বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রমোট করতে হবে বারবার। নিজেকে বলতে হবে, তাহলেই সেলফ রিয়েলাইজেশন আসবে। কৃত্রিমতার প্রয়োজন নেই, জোর করা যাবে না। জেনারেশন চেঞ্জ করতে পারব না, তাদের মোটিভেট করে চেঞ্জ করতে হবে।

ডা আতিক বলেন, আমরা নিজের সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে, জীবনের জটিলতা সম্পর্কে যা কিছু ভাবি, যা কিছু সত্য মনে করি, তার সবই ঠিক নয়। জীবন কখনও জটিল নয়। মস্তিষ্ক সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানই পারে আমাদের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে সহজভাবে নিজেকে গ্রহণ করতে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহযোগিতা দরকার। বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন—সবার সহযোগিতা দরকার। তিনি

বলেন, আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাগ, কষ্ট, দুঃখ এ সবই নিউট্রাল। ভালো-মন্দ ক্যাটাগরিতে ফেলা আমাদের এখতিয়ারের বাইরে।

যেসব দেশে অভাব-দুর্নীতি বেশি তাদের ভেতরে সামাজিক অস্থিরতা বেশি বলে মন্তব্য করেনে ডা. আতিক। তিনি বলেন,  এটা থেকেও বের হওয়া সম্ভব। আমরা যদি একটা মুভমেন্ট করতে পারি যে,  চিন্তার পরিবর্তন সম্ভব; তাহলেই প্রত্যেকেরই চিন্তার পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, নিজের পেটে ক্ষুধা থাকলে অন্যকে খাওয়াতে ভালো লাগবে না। তাই আগে নিজেকে আমি কৃত্রিম বা অতিপ্রাকৃতিক ভাবলে চলবে না। দেশের সামাজিক সমস্যার মূল কারণ হিসেবে নিজেদের জ্ঞানের অভাবকে দায়ী করলেন ডা. আতিক।

খারাপ মানুষের সংজ্ঞা এই মনোচিকিৎসকের কাছে একটু ভিন্ন। তিনি বলেন, যারা বিভিন্ন খারাপ কাজ করে, আমরা তাদের বলি এরা মানুষ নয়, এরা জানোয়ার। কিন্তু এরাই মানুষ, জানোয়ার হলে এটা তারা করত না। প্রতিটি মানুষের ভেতরে এ সব বৈশিষ্ট্য আছে। হিংস্রতা, খারাপ জিনিস, ক্রোধ আছে। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, কোনও মানুষের ভেতরে যখন নেগেটিভ আচরণগুলো প্রকাশিত হতে বাধা পায়, বা কোনও কিছু  মেনে নিতে পারে  না, তখনই আরও ক্ষতিকরভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

দেশে আগের চেয়ে সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন ডা. আতিক। তিনি বলেন, সচেতনতা যত বাড়ানো যাবে, ততই সেল্ফ ডেভলপমেন্ট হবে। পাগলের ডাক্তারের কাছে যাব, তাহলে কি আমি পাগল? এই প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, মানসিক রোগ বলে কিছু নেই। এগুলো মেন্টাল ডিজঅর্ডার, ডিজিজ নয়।

/এমএনএইচ/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।