রাত ১০:০৫ ; মঙ্গলবার ;  ২৫ জুন, ২০১৯  

কোন বেড়ালের ভাগ্যে... || তপন শাহেদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

‘‘এটা বলাই বাহুল্য যে, একই বছরে একাধিক লেখক―সারা পৃথিবী থেকে তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে একই দেশ বা ভাষার মধ্যে থেকেও―এই পুরস্কার পাবার যোগ্য থাকেন। তাই, আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়নে জাতিগত বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বিবেচনা নিষিদ্ধ করলেও এইরূপ বিবেচনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। বরং বলা যায়, বহুদিন হলো এইরূপ বিবেচনাই নোবেল পুরস্কার সম্বন্ধে পূর্বানুমানের ক্ষেত্রে প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে।’’ 

 

আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে বলে গেছেন, সেই ব্যক্তি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন ‘যে-ব্যক্তি সাহিত্যক্ষেত্রে একটি আদর্শ চিন্তাভিমুখে সবচেয়ে অনন্যসাধারণ সৃজনকর্ম সম্পাদন করেছেন’।

নোবেল পুরস্কারের ১১৪ বছরে ১১১জন সাহিত্যে নোবেলজয়ীর প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নোবেলের প্রতিশ্রুতি তাঁর প্রতিনিধিরা রক্ষা করতে পারেননি সে-সত্য জগতবিদিত। কিন্তু তবু প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে সারা পৃথিবীর সাহিত্যপ্রেমীরা যেমন তেমনি সাহিত্যসেবীরাও তাকিয়ে থাকেন কৌতূহল কিংবা আশা নিয়ে।

নগুগি ওয়া থিয়োঙয়ো (নাইজেরিয়া)

নোবেল পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক চিরকালই ছিলো। তবু এর মর্যাদা আর এর জন্য আকাঙ্ক্ষার তুলনায় তা কিছুই নয়। অনেক লেখকই নোবেল নিয়ে অন্তত দৃশ্যত নির্লিপ্ততা দেখান। দুজনতো প্রত্যাখ্যানও করেছেন এই পুরস্কার—জাঁ পল সার্ত্র, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার না নেবার নীতিগত বা আদর্শগত কারণে, আর হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে যৌথভাবে পুরস্কার পাওয়া ভিয়েতনামের লে দুক থো। পুরস্কার না পেয়ে অনেক বড়ো লেখক আপাত-নিস্পৃহতা দেখিয়েছেন, অথবা সত্যিই তাঁদের এই পুরস্কারে কিছু যেতো-আসতো না। এঁদের মধ্যে আছে টলস্টয়ের মতো বিরাট নাম। ১৯০১ সালে টলস্টয় পুরস্কার না পেলে বিশ্বখ্যাত লেখকদের অসন্তোষ আর সহমর্মিতার জবাবে টলস্টয় বলেছিলেন যে তিনি খুশি যে তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি, কিন্তু বোর্হেস তো আক্ষেপ করে বলেই ফেলেছিলেন যে তাঁর মনে হচ্ছে স্টকহোমের লোকগুলো মনে হয় ভাবছে যে তাঁকে ইতিমধ্যেই পুরস্কারটা দেওয়া হয়ে গেছে। তাঁর সে আক্ষেপ আক্ষেপই থেকে গেছে। 

কিছু পরের মার্সেল প্রুস্ত (রিমেমব্রেন্স অভ দি থিংকস পাস্ট, ১৯১৩-২৭, ইংরেজিতে ১৯২২-৩১), জেমস জয়েস (ইউলিসিস, ১৯২২), ভার্জিনিয়া উলফ (প্রধান কাজগুলো ১৯২৫ থেকে ১৯৩১-এর মধ্যে প্রকাশিত হয়ে গেছে), ডব্লিউ এইচ অডেন, জন আপডাইক কোনোকালেই এই পুরস্কার পাননি। 
অবশ্য নোবেল পুরস্কারের জন্য অনেকের অপেক্ষাই আবার দীর্ঘায়িত হয়নি। ৫০ বছরের আগে নোবেল পুরস্কারের পেছনের তথ্য প্রকাশ করা হয় না। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন ও রিপোর্টস-এর প্রকাশিত রেকর্ডস-এ দেখা যাচ্ছে, ১৯৫০-এর দশকে যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগকেই প্রথমবার মনোনয়ন পাবার পর খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি পুরস্কার পাবার জন্য। যেমন―

নাম ..................................প্রথম মনোনয়ন..................................পুরস্কারপ্রাপ্তি
পার লাগের্কভিস্ট                   ১৯৪৭                                              ১৯৫১
ফ্রাঁসোয়া মোরিয়াক                 ১৯৪৬                                             ১৯৫২
উইনস্টন চার্চিল                     ১৯৪৬                                             ১৯৫৩
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে                 ১৯৪৭                                              ১৯৫৪
হালতুর কিলিয়ান লাক্সনেস        ১৯৪৮                                             ১৯৫৫
আলবেয়ার কামু                     ১৯৪৯                                              ১৯৫৭
বরিস পাস্তেরনাক                   ১৯৪৬                                              ১৯৫৮

নোবেল পুরস্কার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এই পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রবর্তক তাঁর উইলে একটি বিশ্বদিগন্ত চিন্তায় ধারণ করলেও নোবেল কমিটি একে একটি ইউরোপীয় ব্যাপারে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ ছিলো কিংবা এখনো আছে। নিচের তালিকাতেই এই পুরস্কারের ইউরোপমুখিতা সুস্পষ্ট শুধু নয়, দৃষ্টিকটুভাবে প্রকট। 
১৯০১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সাহিত্যে ১০৭টি পুরস্কারের ১১১জন বিজয়ী যে-যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন তার সংখ্যাতত্ত্ব 

ইংরেজি...................................২৭....................................বাংলা....................................১
ফরাসি.....................................১৪....................................চীনা.....................................২
জার্মান.....................................১৩....................................চেক.....................................১
স্প্যানিশ...................................১১....................................ফিনিশ..................................১
সুইডিশ....................................৭......................................হিব্রু......................................১
ইটালিয়ান.................................৬......................................হাঙ্গেরিয়ান..............................১
রুশ.........................................৫......................................আইসল্যান্ডিক.........................১
পোলিশ....................................৪......................................অকসিটান..............................১
নরওয়েজিয়ান............................৩.......................................পর্তুগিজ................................১
ডেনিশ.....................................৩.......................................সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান..................১
গ্রিক........................................২.......................................তুর্কি.....................................১
জাপানি....................................২........................................ঈদ্দিশ...................................১
আরবি......................................১       
  

হারুকি মুরাকামি (জাপান)

এই সংখ্যা পৃথিবীতে বর্তমানে অস্তিত্বশীল ছয় হাজারের বেশি ভাষার মধ্যে মাত্র ২৫। অবশ্য সব ভাষারই যে বর্ণমালা বা লিখিত রূপ আছে তা নয়। একইভাবে সব ভাষার সাহিত্যও নয় সমানভাবে পরিপক্ব, বৈচিত্র্যময়। তবু ২৫ সংখ্যাটি, আর তাতে ইউরোপের একচ্ছত্র প্রাধান্য মেনে নেওয়া কঠিন। অবশ্য ১৯৮৪ সালে সুইডিশ অ্যাকাডেমির তৎকালিন স্থায়ী সচিব ঘোষণা করেছিলেন যে অ্যাকাডেমি এই পুরস্কারের বিশ্বব্যাপী বণ্টন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এখন আসা যাক কোন বিড়ালের ভাগ্যে এবার শিঁকে ছিঁড়বে তা অনুমান করার, বা বলা ভালো নিজের মতো আশা করার, চেষ্টায়। 
পুরস্কার ঘোষণার তারিখ এখনো জানানো হয়নি। নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বলছে, ঐতিহ্য অনুযায়ী সুইডিশ অ্যাকাডেমি এই তারিখ পরে জানাবে। ২০১৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য ২৫৯টি প্রস্তাব পেয়েছিলো সুইডিশ অ্যাকাডেমি। তাঁদের মধ্য থেকে ১৯৮জনকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এই ১৯৮জনের মধ্য থেকে বিভিন্ন ধাপে বাছাইয়ের পর একটি হ্রস্বতালিকা তৈরি করা হবে। শেষ অব্দি তাঁদের মধ্যে থেকে একজন পাবেন এই পুরস্কার। 
এটা বলাই বাহুল্য যে, একই বছরে একাধিক লেখক―সারা পৃথিবী থেকে তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে একই দেশ বা ভাষার মধ্যে থেকেও―এই পুরস্কার পাবার যোগ্য থাকেন। তাই, আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়নে জাতিগত বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বিবেচনা নিষিদ্ধ করলেও এইরূপ বিবেচনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। বরং বলা যায়, বহুদিন হলো এইরূপ বিবেচনাই নোবেল পুরস্কার সম্বন্ধে পূর্বানুমানের ক্ষেত্রে প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে। 
গত ৩ দশকের নোবেল পুরস্কারের তালিকায় চোখ বুলালে দেখা যাবে, ১৯৮৬ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে আফ্রিকানদের ভাগ্যে নোবেল-এর শিঁকে ছিঁড়লেও তার পর ১২ বছরে আফ্রিকায় কোনো নোবেল পুরস্কার যায়নি। এর মধ্যে এই পুরস্কারের অন্যতম জনপ্রিয় দাবিদার চিনুয়া আচিবে মারা গেছেন। আছেন তাঁর স্বদেশী নগুগি ওয়া থিয়োঙয়ো। আমি শুরুতেই থিয়োঙওকে এবারের জন্য প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে বাজি ধরবো। 

আদুনিস (সিরিয়া)

এই আশার কারণ, আমার অন্য একটি আশা যে, ইউরোপ-প্রিয় নোবেল পুরস্কার এবার ইউরোপে যাবে না। এই আশার অন্যতম কারণ হলো শেষতম পুরস্কার ইউরোপে যাওয়া। খুব সম্প্রতি চীনে নোবেল যাওয়ায় আপাতত এশিয়ার সম্ভাবনা কম, হারুকি মুরাকামির জোর দাবি সত্ত্বেও।
আদুনিস আরবিভাষী দুনিয়া থেকে পুরনো দাবিদার হলেও মন বলছে এই অস্থির সময় তাঁর এই পুরস্কার পাওয়ার প্রতিকূলে। তাছাড়া মাত্র ৪ বছর আগে কবিতায় নোবেল পুরস্কার গেছে (২০১১, টমাস ট্রান্সট্রোমার, সুইডেন)। উল্লেখ্য, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে গদ্যকারদের প্রাধান্য নিরঙ্কুশ। ১১১ জন নোবেল লরিয়েটের মধ্যে ৭৬ জনই মূলত গদ্যকার।
আফ্রিকার পরে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বোধহয় ফিলিপ রথের আমেরিকা। একটা কারণ হলো, মাত্র ২ বছর আগে উত্তর আমেরিকায় কথাসাহিত্যের জন্যই নোবেল গেলেও (২০১৩, এলিস মুনরো, কানাডা)মুনরো ছাড়া ১৯৯৩-এর টনি মরিসনের পরে আমেরিকায় আর নোবেল যায়নি। অবশ নোবেল পাওয়ার জন্য ফিলিপ রথের হয়তো এটাই উপযুক্ত বছর। ৮২ বছরের রথ সেক্ষেত্রে হবেন সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পাওয়াদের অন্যতম। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে পুরস্কার পেয়েছেন রাডিয়ার্ড কিপলিং ১৯০৭ সালে, ৪২ বছর বয়সে। তার ঠিক ১০০ বছর পরে সবচেয়ে বেশি বয়সে পেয়েছেন ডোরিস লেসিং ২০০৭ সালে, ৮৮ বছর বয়সে। তবু কেন যেন রথ আর থিয়োঙয়ো-র মধ্যে মন বেশি টানছে কালো আফ্রিকানের দিকে। দক্ষিণ আমেরিকার উপস্থিতি আপাতত দৃশ্যপটে ক্ষীণ।
২০১৫ সালের নোবেল পুরস্কারের প্রতিযোগী হিসেবে শক্তিশালী নারী লেখক হচ্ছেন বেলারুশের সাংবাদিক ও গদ্যলেখক সভেৎলানা আলেক্সেইয়েভিচ। 

ফিলিপ রথ (যুক্তরাষ্ট্র)

আরো আছেন ৭৭ বছরের আমেরিকান গদ্যলেখক জয়েস ক্যারল ওট্স। অবশ্য সৃষ্টিশীলতা আর জ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বীকৃতির অভাবের মতোই সাহিত্যে সবচেয়ে বড়ো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও নারী বহুদূর পিছিয়ে। ১০৭ বছরের (বিভিন্ন বছরে সাহিত্যে মোট ৭টি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি কোনো সাহিত্যকর্ম গুরুত্বের বিচারে যোগ্য বিবেচিত না হওয়ায়) মোট ১১১ জন নোবেল পুরস্কারজয়ীর মধ্যে নারী মোট ১৩ জন। তবে আশার কথা হলো, গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে নারী লেখকরা ক্রমবর্ধমান হারে সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন। ১৯০১ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত ৬৬ বছরে যেখানে মোট ৬ জন মাত্র নারী লেখক নোবেল পেয়েছেন, সেখানে বাকি ৭ জনই পেয়েছেন ১৯৯১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত মাত্র ২৪ বছর সময়কালে। যাই হোক, মাত্র দুবছর আগে উত্তর আমেরিকা থেকে একজন নারী লেখকের পুরস্কার পাবার পর ওট্সের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেছে। 
কিন্তু এসব নেহাতই পাঠকের অনুমানমাত্র, বলাই বাহুল্য। নোবেল কমিটি চমক পছন্দ করে। প্রস্তাব পর্ব থেকে শুরু করে পুরস্কার ঘোষণা পর্যন্ত থাকে সেই চমক। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের সূচনাই হয়েছিলো টলস্টয় বা চেখভ বা ইবসেনকে বাদ দিয়ে ফরাসি সুলি প্রুদোমকে পুরস্কার দেওয়ার মধ্য দিয়ে। চার্চিলের সাহিত্যে নোবেল পাওয়া যদি চমক হয় (যদিও ১৫৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া উইনস্টন চার্চিল ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে সাহিত্যে নোবেলের জন্য ২১ জনের মনোনয়ন পেয়েছিলেন, শান্তির জন্য পেয়েছিলেন ২ জনের মনোনয়ন), তাহলে এই তথ্যেও চমক আছে যে ১৯১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া রোমা রল্যাঁ তাঁর পরিচিত সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে ১৯৩৬ সালে সাহিত্যে নোবেলের জন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ফ্রয়েড ১২ বার চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, কিন্তু ১৯২৯ সালে নোবেল কমিটি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিলো, যেহেতু ফ্রয়েডের কাজের কোনো প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক মূল্য নেই তাই তাঁর ব্যাপারে আর কোনো চিন্তা-ভাবনার দরকার নেই। এবারের মনোনয়নের তেমন চমক হলেন আমেরিকান গায়ক গীতিকার বব ডিলান। 

সভেৎলানা আলেক্সেইয়েভিচ (বেলারুশ)

বাংলা ভাষায় কেন এই পুরস্কারের দ্বিতীয় প্রবেশ কেন আজো ঘটেনি তার একটা উত্তর উপরের ঐ ভাষাভিত্তিক পুরস্কারের তালিকাটা দেয়। নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক নিবন্ধের পরিচিতিতে তাঁর সম্বন্ধে বলা হচ্ছে, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর―অখ্যাত থেকে বিখ্যাত’। নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের মাত্র ৪০ বছর আগে যে-ভাষার সাহিত্য ‘আধুনিক’ যুগে প্রবেশ করেছে (‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রকাশসাল ১৮৬১, আর ‘দুর্গেশনন্দিনী’র প্রকাশসাল ১৮৬৫ মনে রেখে), প্রবর্তনের ১৩তম বছরেই সেই ভাষার একজন কবিকে পুরস্কার দেওয়ার কথাটা চিন্তা করলে ঐ শিরোনামকে সঙ্গতই মনে হবে। কেননা তাঁর পূর্বজ টলস্টয়, চেখভ, ইবসেন কেউই পুরস্কার পাননি। যদিও এঁদের পুরস্কার না পাওয়ার জন্য ঐতিহাসিকভাবে নোবেলের উইলের ভাষার সংকীর্ণ ব্যাখ্যা দায়ী, কিন্তু কার্যত নোবেল পুরস্কার কোনোদিনও আদর্শগত এবং জাতিগত সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। নোবেল পুরস্কারের ভাষাগত সংখ্যাতত্ত্বে তার আংশিক প্রমাণ আছে।
কোনো সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষার সাহিত্যে—কবিতা ও গদ্য দুই ক্ষেত্রেই—বিশ্বমানের ব্যক্তিত্ব অনেকেই এসেছেন। কিন্তু শতাব্দীরও অধিককাল আগে পাওয়া একটিমাত্র পুরস্কারের পর বাংলা সাহিত্য দৃশ্যত নোবেল কমিটির দৃষ্টি ও বিবেচনার অগোচরে রয়ে গেছে। এর কারণ খোঁজা দরকার আজকের লেখক, পাঠক, প্রকাশক, সমালোচক—সবারই। গত এক-দেড় দশকে বাংলাদেশের সাহিত্যের সবচেয়ে বড়ো আশার ঘটনা হলো ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চার ক্রমিক প্রসার। ইতিমধ্যেই এই চর্চা আন্তর্জাতিক পাঠক-সমালোচক-প্রকাশকের সমীহ পেয়েছে। অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষার সাহিত্যও তা পাবে এটাই প্রার্থনীয়। নোবেল পুরস্কার যে সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্বের পরম মাপকাঠি নয় সে-সত্য কে না জানে। তবু বাংলাদেশের সাহিত্য, হোক তা বাংলা বা ইংরেজিতে লেখা, সারা বিশ্বের পাঠক পাবে, এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ আজকের পৃথিবীতে সাহিত্যমাত্রই বিশ্বসাহিত্য। অন্তত তাই হওয়া উচিত। 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।