রাত ০৫:৪০ ; সোমবার ;  ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮  

‘মায়ানহর’ লোকগানে তারুণ্যের জয়গান

প্রকাশিত:

ওয়াহিদুল হাসান।।

“বৃষ্টি ভেজা মায়াতে,দুপুরমণির ছায়াতে, ও তার লাল পাড়ের আঁচল ভেজা, কর্ণফুলির জলেতে মনের ও অতলে...” এটি একটি লোক গানের পঙক্তি। কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণের কণ্ঠে গানটি শুনে খোঁজ নিতেই জানতে পেলাম ব্যান্ড দল ‘মায়ানহর’ এর কথা।

 ব্যান্ডের সদস্যরা জানালেন, মায়ানহর শব্দটার অর্থ অনেকেই জানেন না। নহর অর্থ  ঝর্ণা।  মায়ার ঝর্ণা হচ্ছে মায়ানহর। দলের সদস্যরা অবশ্য বলেন,  মায়ানহর হলো একটা আন্দোলন, একটা মুভমেন্ট, একটা দল, গানের দল, একটা পরিবার। এটি এমন একটি গানের দল যারা আন্দোলন করছে, বাংলা গানের আন্দোলন। বাংলা লোকসঙ্গীতের জন্য আন্দোলন।

আমাদের এই উপমহাদেশের বিলীন হতে থাকা লোকসঙ্গীতের ধারাটা  বজায় রাখতে মায়ানহর খুব ক্ষুদ্র একটি প্রয়াস বলাই চলে।

বর্তমান আধুনিক সময়ে রক, মেটাল, হেভি মেটালের ভিড়ে লোকগানের লোকই খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। সেখানে মায়ানহরের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। সাদী, দোলন, আসির, প্লাবন, রাজিন, রাজিব, অনিক, সাদমান এই আটজন মূল সদস্যসহ আরো অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী এবং গানপাগল মানুষকে সঙ্গে করে মায়ানহর তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

 মায়ানহরের শুরুটা খুব মজার। বলতে গেলে নির্জলা আড্ডা থেকেই শুরু হয়েছিল দলটির । ২০১৩ সালের প্রায় শেষের দিকে দোলন, আসির, আকাশ আর হুমির মতো কিছু আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখা মানুষের হাতে জন্ম হয় দলটির।  প্রথম প্রথম পরিকল্পনা করেও দৈনন্দিন কাজ আর পড়াশোনার চাপে সেটি নিয়ে খুব বেশি আগানো হয়নি তাদের। এর ভেতরেই আড্ডায় আসিরের সাথে পরিচয় হয় রাজিন আর প্লাবনের। গানমুখর আড্ডা মানেই তো গানপাগল মানুষের মেলা। আসিরের থেমে থাকা স্বপ্নের চাকা ঘুড়তে শুরু করে আবার। আর হবেই না বা কেন। রাজিন আর প্লাবনের স্বপ্নটাও তো সেটাই ছিল বাংলাদেশের শেকড় নিয়ে, গ্রাম বাংলার গান নিয়ে কাজ করার ইচ্ছাই ছিল প্রধান। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু হলো নিয়মিত আড্ডা এবং গান। নতুন করে পরিচয় হলো সবার। দোলন এর চমৎকার কন্ঠশৈলী আসির আর প্লাবনের ব্যাঞ্জ-গীটারের খেলা আর রাজিনের পারকুয়েশনের মায়া নিয়ে নতুন করে পথ চলতে শুরু করে মায়ানহর। দলের নামটা মায়ানহর রেখে দেয়া হয় সবার সম্মতিতে।

এভাবেই কেটে যায় অনেক সময়। গানপাগল মানুষগুলোর আশির্বাদ হয়ে আসে  কাহনবাদক রাজিব, সাদী ( যে কিনা অসাধারণ হারমনিকা আর গীটার বাজায় আর সমধুর কন্ঠে গান করে)। আর সেই সঙ্গে অনিক তবলা, ঢোল, নাল আর কাহন যার হাতে কথা বলে ওঠে। যোগ দেয় লালন ভক্ত সাদমান। অসামান্য লালনের গান করে সে আর কাজু নামক বাদ্যযন্ত্রের সুরের মুর্ছনয়ায় ভুলিয়ে দিতে পারে দুঃখ যন্ত্রনা।

পরবর্তীকালে মায়ানহরে যোগ দেয় গানের পাখি শাকিল তার শক্তিশালী কন্ঠ এবং বেইজ ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে। এভাবেই গড়ে উঠেছে বাংলা লোকসঙ্গীত নিয়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া কিছু গানপাগল মানুষের গানের দল মায়ানহর।

যদিও এখন আসির মায়ানহর ছেড়ে সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড “জলের গানের” সাথে কাজ করছে। তবুও সে আত্মার টানে, গানের টানে, স্বপ্নের আবেদনে মায়ানহরের পাশে আছে থাকবে, মায়ানহরে সংগে কাজ করবে সব সময়।

মায়ানহরের স্বপ্ন এদেশের মানুষ, এদেশের যুবক, বৃদ্ধ, নারী সবাই বিদেশি এবং রক গানের পাশাপাশি লোকসঙ্গীতকেও ভালোবাসবে। কোনও এক ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সন্ধ্যায় হারিকেন বা কুপি জ্বালিয়ে, নাম না জানা বট গাছের নিচে বসবে শুধু লালন, শাহ আব্দুল করিমসহ নাম না জানা অসংখ্য বাউলের গান শোনার জন্যে।

মায়ানহরের বিশ্বাস বাংলার শেকড়ের কথা ছড়িয়ে যাবে বিশ্বব্যাপী। সুদুর চীন থেকে হয়তো গানপাগল মানুষ আসবে বাংলার গান শুনতে। আর মায়ানহর সেই স্বপ্ন সত্যি করার পথে হেটে চলেছে নিরন্তর।

ইতিমধ্যে মায়ানহর ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ‘মাইক্রোসফট ইমাজিন কাপ’ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের লোকগানের সঙ্গে পরিচ্য করিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে।  সেদিন আরও আয়োজনের মধ্যে মায়ানহর  মন কেড়ে নেয় আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের শ্রোতাদের।

 এছাড়াও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল এর ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে চাম্পিয়ান টিম এন.এস.ইউ.এস.এস এর সঙ্গে কাজ করেছে মায়ানহর।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে নর্থ সাউথ, ইন্ডিপেন্ডডেন্ট, বাংলাদেশ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের  পহেলা বৈশাখ, ফাল্গুন, সমাবর্তন অনুষ্ঠান, মেলাসহ নানাবিধ অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে গান শুনিয়ে আসছে মায়ানহর। শুধুমাত্র বাংলা লোকসঙ্গীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টায়ই তাদের এই পথ চলা।

ইতোমধ্যে টেলিভিশন, রেডিওতেও লাইভ শো করে মন কেড়েছে শ্রোতাদের।  প্রতিবারই শ্রোতাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে মায়ানহর।

মায়ানহর বিশ্বাস করে, তাদের এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে।  বাংলা লোকসঙ্গীত নিয়ে মেতে উঠবে বিশ্বের মানুষ। “জয় করে তবেই হব শান্ত”  এটাই মায়ানহরের লক্ষ্য। মায়ানহরকে অনুসরণ করতে চাইলে ঢু মারুন তাদের ফেসবুক পেইজে।  (https://www.facebook.com/mayanohor?fref=ts)

 

এক নজরে  ‘মায়ানহরের’ লাইন আপ

 

  • দোলন- কন্ঠ, বাঁশি, খমক।
  • সাদীঃ কন্ঠ,  গীটার, ব্যাঞ্জো, ম্যান্ডলীন, হারমনিকা
  • রাজিনঃ কন্ঠ এবং পারকুয়েশন
  • প্লাবনঃ কন্ঠ, গীটার, ব্যাঞ্জো, হারমনিকা।
  • শাকিলঃ কন্ঠ এবং বেইজ।
  • রাজিবঃ কাজন, বায়া এবং পারকুয়েশন
  • অনিকঃ ঢোল, টবলা, নাল, কাজন

/এফএএন/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।