রাত ০৪:৫৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

কবি উৎপলকুমার বসুর স্মরণে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উৎপলকুমার বসু গতকাল ৩ অক্টোবর ব্যক্তিগত নশ্বরতার দিকে যাত্রা করলেন। জীবনানন্দ উত্তরকালের কবিতায় তিনি ট্র্যাডিশনাল ফর্ম আর সিনট্যাক্সের বিরুদ্ধে লড়েছেন। ফলে নতুন পাঠকের কাছে তিনি একটু দূরূহ। নতুন কবির কাছে ঈর্ষণীয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে– চৈত্রে রচিত কবিতাপুরী সিরিজআবার পুরী সিরিজলোচনদাস কারিগরখণ্ডবৈচিত্রের দিনসলমাজরির কাজ, কহবতীর নাচনাইট স্কুলটুসু আমার চিন্তামণি  প্রভৃতি। তিনি জন্মেছেন ১৯৩৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুরে। তাঁর প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে তাৎক্ষণিক গদ্য লিখেছেন কুমার চক্রবর্তী এবং মৃদুল মাহবুব। 

 

আরো শব্দহীনতার প্রতি... অস্তিত্বজটিল || কুমার চক্রবর্তী

কবিদের ধর্মত্যাগ তাঁদের মহত্ত্বের দিককে উন্মোচন করে এবং তাতে কবিতা এমন এক উচ্চতাপ্রাপ্ত হয় যাতে তা হয়ে ওঠে স্মিত ও অভাবিত। কারণ কবিদের ধর্মত্যাগ স্রোতে ভেসে যাওয়ার আতঙ্ক থেকে তাদের রক্ষা করে, ফলে রদ্দি মালের মোহ থেকে কবি থাকেন মুক্ত যা তাদের নতুন কবিতার অলীক ইশারা জোগায়, আত্মনিয়োগ ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটায়। উৎপলকুমার বসু আমাদের ধর্মত্যাগী কবিদের একজন যার হাতে ভাষা সার্বভৌম হয়ে উঠেছে আপন খেয়ালে, ফলে দেখা মেলেছে এমন কবিতার যাকে বলা যায় জৈবনিক আচ্ছন্নচারিতা। কেনো তাঁর কবিতাকে ভালোবাসি? কারণ, তাঁর ধ্বনিবৈশিষ্ট্যের স্বচ্ছতা, বাক্রীতির অভিনব ভঙ্গি;  তা জন্ম দেয় স্বকীয় শৈলীর যা স্বয়ম্ভূ ও স্বাধীন, যা  কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং নিজ ক্ষমতায় ঋজু ও আবর্তনশীল, ঠিক যেন পৃথিবীর মতো– অন্তর্গত শক্তিতে গতিমান। তাঁর প্রস্বর প্রগলভ, যা রিলেশনস ওয়ার্ড বা সম্পর্কিত শব্দের খেলায় অনিশ্চিতভাবে সাড়া দেয় স্মৃতির ভেতর। বস্তুত বিষয়ানুষঙ্গ নয়, ভাষা, ভাষাই সৃষ্টি করে এক বলয়বিশ্বের যেখানে কবির আবেগ পরিণত হয় বৌদ্ধিকতায় আর বৌদ্ধিকতা আবেগে, আর এই দুই মিলেমিশে জন্মলাভ করে বিহ্বলতা ও বিস্ময়। এই রীতির ভেতর ক্ষমতা শুধু অশ্মীভূতই নয়, তা ওভারচার্জড, কনফেশনাল এবং ম্যাজিক্যাল:

১.
সমুদ্র সৈকত ধরে এত দূর, এত গাঢ় স্তব্ধতার কাছে এসে
তোমার প্রবল দৌড় দেখা গেল, যেন
আরো শব্দহীনতার প্রতি– অন্ধকার ঝাউবনে– অস্তিত্বজটিল

২.
মন মানে না বৃষ্টি হলো এতো
সমস্ত রাত ডুবো নদীর পাড়ে
আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে।

উৎপলকুমার বসুর কবিতা স্বগতোক্তি ও আত্মকথনে সম্পর্কবন্দি। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, সব কবিতাই আসলে স্বগতোক্তি । কিন্তু স্বগতোক্তিকরণের আত্মপন্থাই কবিকে করে আলাদা। আমরা স্বপ্নের ভেতর এক মঞ্চ তৈরি করি আর তার ওপর অভিনয় করে যাই, এই অভিনয়ের সংলাপগুলোই আমাদের ভাষা যা কবিতা হয়ে ওঠে। আস্থায়ী থেকে আভোগ, পুরোটাই অন্তর্দীপনে ঋদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায়, তার মধ্যে আত্মভাবনার স্বতন্ত্র স্বর ওঠানামা করে ফাতনার মতো। তাঁর কবিতা আত্মময়, ট্যাকটাইল, গ্রোটেস্ক, আর প্রত্নভাষিক:

ক. 
কেবল পাতার শব্দে আমি আজ জেগেছি সন্ত্রাসে
ভেবেছি সমস্ত দিন এত লেখা, এত গূঢ় প্রশ্ন উত্থাপন

খ.
আজ আছি চিরন্তন রৌদ্র ও হিম সকালের
আবরণ উদ্ভাবনে– যে প্রহর বাজে না চকিতে
কেবলই বুকের তলে ক্ষয়ে যায় অজ্ঞান অলক্ষ মাত্রায়
পুরনো পাতার শব্দে, ঝড়ে পড়া– অঘ্রাণে, শীতে।

গ.
তারপর ঘাসের জঙ্গলে পড়ে আছে তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি। এবং 
আকাশ আজ দেবতার ছেলেমেয়েদের নীল শার্ট-পাজামার মতো বাস্তবিক।
একা ময়ূর ঘুরছে খালি দোতলায়।
ঐ ঘরে সজল থাকতো।

ঘ.
...এবারের সমুদ্রবাতাসে আমি খুলিনি জানালা শুধু
আয়নায় ওঠে প্রতিধ্বনি শুধু আয়নায় ওঠে প্রতিধ্বনি...

ঙ.
তবুও ঝড়ের শেষে তবুও দিনের শেষ, অন্ধকার বনে
            বৃষ্টির মেঘের তলে শোনা গেল আর্ত কেকারব
বুঝি নির্জনতা পেয়ে পুনর্বার মেলেছে বিশাল
নক্ষত্রে সাজানো ডানা। পেয়েছ নির্দেশ?

চ.
ময়ূর, বুঝি বা কোনো সূর্যাস্তে জন্মেছ।
এবং মেঘের তলে উল্লাসে নতুন ডানাটিকে মেলে ধরে
যখন প্রথম খেলা শুরু হবে– সেই স্থির পরকালে
আমি প্রথম তোমার দেখা পেয়েছি ময়ূর।

জয়েসের ইউলিসিস-এর প্রথমদিকে স্টিফেন ডিডালাসের এক প্রশ্নের উত্তরে বাক মোল্লিগান বলে, ‘কিছুই স্মরণ করতে পারছি না আমি। শুধু করতে পারছি চিন্তা আর সংবেদন।’ উৎপলকুমার বসুর কবিতা পড়ে এক অধিপ্রাণময় বারোকচিন্তায় আমাদের পেয়ে বসে। 
মৃত্যু এক উদ্ভটত্ব, বা এক প্রস্থান যা যবনিকার পর তার ভ্রমণ শুরু করে। কেননা তার অবিচ্ছেদ্য বিচলিত মূর্ছনা কানে কানে বলে যায় : ‘সূর্য ডোবা শেষ হলো কেননা, সূর্যের যাত্রা বহুদূর।’ ♦



‘‘উৎপলকুমার বসুর উচ্চতা ভালো বা মন্দ কবি হিসাবে নয়। বা তার টেক্সের পাশে নম্বরিং করার দরকারও নাই। তিনি হলেন সেই হিরো, যাকে দেখে এন্টি-হিরোরাও হিরো হবার জন্য বড় রাস্তায় দাঁড়ায়ে শীস দিচ্ছেন। তার কবিতা এক একটা খাদ, পরিখা। তাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা শিখে নতুন লেখাটি লিখে নিতে হবে।’’

লোয়ার রেটেড, হেভিওয়েট লিজেন্ডারী পয়েট অব বেঙ্গলী : উৎপলকুমার বসু || মৃদুল মাহবুব

উৎপলকুমার বসুর স্কেচ

১.
উৎপলকুমার বসু।
হ্যাঁ, তার সম্মন্ধে একথা বলাই যায় যে তিনি যতবড় কবি, তত কম খ্যাতি নিয়েই যাপন করেছেন তার কবি জীবন। এবং গাণিতিক হারে ক্রমবর্ধমান পাঠক রেখে তিনি আজ চলেই গেলেন তার কবিতাকে সংকটের মুখে ফেলে রেখে। সংকট? কারণ তিনি জানতেন কবিতার ভাষা বদলায়। তাঁর আবিস্কৃত পথও উল্টে যাবে একদিন। বোনের সাথে তাজমহল আর কবুতরের বিষ্ঠা উভয়ই চন্দ্রতাপে উড়ে যেতে চায় মূর্খ-শূন্যতায়। চাতুর্যে ভারা আমাদের আমরতার আশা তাকে ঠিক ধরে রাখতে চায় আগের মত, চির-কামানের ছায়ায় বসে দেখি দমকল ছুটে যাচ্ছে ধ্বংস রুখতে, ছাই কমাতে, সভ্যতার না বাড়ুক কার্বন মনোক্সাইড। কবি উৎপরকুমার বসু এই চির-কবিতার ফর্মটাকেই ভেঙে দেখেছেন। শিল্প বা কবিতা যে শেষ অব্দি ফর্মের ডিলিং, এর থেকে বেশি কিছু নয় তারই অগনন উদাহরণ তার সবকটি বই, লেখাপত্র। ‘ধূসর আতাগাছ’ বা ‘নরখাদক’এর মত লেখাতে ভাংচুরের ঝনঝন। অতিব্যবহারের আড়ষ্ঠতা কবিকে কাটিয়ে তুলেই লিখতে হয় নতুন কবিতায়। আর ভাষা যে বদলায়, সেই বদলের শেষতম উজ্জ্বল উদাহরণও কিন্তু তিনি নন; কেননা তিনি যে নভোছক আর নভোযান রেখে গেছেন ভাবী কবি আর পাঠকের জন্য, সেই অশ্রুত নব লেখনী কবিতাকে বদলে দেবার জ্বালানী দেবার জন্য যথেষ্ট। এভাবেই তিনি ভাষার শাসক। তার কবিতার মধ্যে তিনি রেখে গেছেন রেজারেকশনের সূত্র আর শক্তি। সজীব প্রাণকোষ যেভাবে নিজেকে ক্ষয়ের সাথে সাথে নতুন ভাবে সৃষ্টির যে রহস্য নিয়ে বয়ে চলে যুগের পর যুগ, উৎপলকুমার বসুর কবিতা তেমনি জীবন্ত প্রাণ, ক্ষণে ক্ষণে ক্ষয়, বৃদ্ধি, সদা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। কবিতাশিল্পে রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ পরবর্তী হেভিওয়েট মোহাম্মদ আলী তিনি, মুষ্ঠি এঁটেছেন ট্র্যাডিশনাল ফর্ম আর সিনট্যাক্সের বিরুদ্ধে, রিং-য়ের বাইরেই তিনি একে একে ধারাসাই করেছেন বাংলা কবিতার পেলবতা, মধুরতা, বসস্ত যামিনী-যাপন। তার বাংলা কবিতার ভাষা, ভাব, ডায়ালগ যদি ট্র্যাডিশনাল বাংলায় আপনি অনুবাদ করতে বসেন তো ভুল হয়ে গেছে ডেয়ার! এই ভাষা, ভাব আর ভঙ্গী অতীব নতুন বাংলা ভাষায়। তবে ইউরোপীয় কবিতার সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা হয়তো বলতেই পারেন বিশ্বকবিতায় এ আর তেমন কী নতুন সংযোগ। হাবা যুবকের হাসি দুশো বছরের পুরানো রেকর্ড। এমন অনেক স্ফূলিঙ্গ তিনি আমদানী করেছেন ইউরোপীয় কবিতা জগৎ থেকে। এমন অনেক বিষয় তারা অনুসন্ধান করে আবিষ্কার করেছেন। এই ইউরোপীয় কানওয়ালা গাধার পিঠে বসা কাব্য সমালোচক হয়তো জেনে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের কপি-শিল্পের বিরুদ্ধে উৎপলকুমার বসুই প্রথম কবিতা মিউট্যান্ট তৈরি করেছেন। মানে বাংলাভাষা আর ইউরোপীয় ভাবের সঠিক ছহি মিশ্রণে গড়া তার কাব্য কলা। মানে বসুর কবিতা অনেক বেশি ইন্দো-ইউপরোপীয় রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের চেয়ে। যেখানে বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ উভয়েই ইউরোপীয় ভাব-চোরা বাংলাভাষী, যাদের একজন এই বাংলা লিখিত ভাষা আর ভাবের চিরন্তন একটা ম্যাপ এঁকেছেন ইউরোপীয় ভাষা-সাহিত্যের আদলে আর অপরজন সেই ম্যাপের ডিটেলিং আর রং চং করেছেন সেই একই রঙে। এই দুইজনই বাংলা ভাষার সাহিত্য কলার জন্য অবধারিত, উপেক্ষাহীন। রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ ছাড়া কবিতা বলতে আমরা আজ অব্দি যে ট্রেন্ড বুঝি তা তৈরিই হতো না। আর আমরা যেনো ভুলে না যাই আমাদের বাংলা কবিতা বলে আমারা যা বুঝে থাকি, যা আমাদের কবিতা বলে প্রচলিত, যার ধারাবাহিকতা বহমান তা ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে গড়ে ওঠা একটা শব্দানুভূতির মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ কেউই শব্দানুভূতিতে ইউরো ধারার বাইরের কেউ না। সেই অর্থে ল্যাটিন বা আফ্রিকান সাহিত্য বলে আমরা যা আন্তর্জাতিকভাবে পড়ে থাকি তাও ল্যাটিন বা আফ্রিকার সাহিত্য নয়। তাই বিশ্বে সাহিত্য বলে যা পঠিত, হিতকর, আরামদায়ক তা ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে গড়া মাল সামানা। এই কথা মেনে নেওয়ার মধ্যে হীনমন্যতার কিছু নাই যে বাংলা কবিতা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে তা ইউরোপীয় কবিতার এক্সটেনশন। ইউরো স্ট্যান্ডার্ড বাংলা সাহিত্যের মূলত আমাদের জন্যই। দীর্ঘ চর্চার ভিতর দিয়ে তা বাংলাভাষী একটা রূপ পেয়েছে। উৎপলকুমার বসুও এর বাইরের কেউ নন। শুধু উৎপলই নন হাল আমলে যাদের বলা হয় তরুণ কবি তারাও এই স্ট্যান্ডার্ডের বাইরে নন। চলমান বাংলা কবিতা বলে যা প্রচলিত সেই প্রচলনটাকে চূড়ান্ত নৈর্ব্যত্তিক জায়গা থেকে দেখার সুযোগতো উৎপরকুমার বসুই তৈরি করে দিলেন। বহুদিনের চর্চায় গড়ে ওঠা আমাদের ইন্দো-ইউরোপীয় বাংলা সাহিত্যে উৎপলকুমার বসু সেই নাম যিনি অন্তত একশ বছর নতুর লেখার প্রেরণা দিবেন নতুন কবিদের যে শিল্পের ইতিহাস প্রতিনিয়ত তৈরি হয় চলমানতা বা ট্র্যাডিশনের বাইরে। রবীন্দ্রনাথের প্যাস্টোরাল পোয়েট্রির মধ্যযুগী চনমনে ভাব বা গুনগুন সঙ্গীত মুখরতা, মুগ্ধতা আর জীবনানন্দীয় এলিয়টী বাংলা কবিতার ইতিহাস বা ‘কবিতার কথা’র ট্র্যাডিশন এন্ড ইন্ডিভিজ্যুয়ালিটির যে সংবিধান তার বাইরে দাঁড়ানো উৎপলকুমারের হাবা হাসি। সেই হাসির শব্দ দিনকে দিন প্রবল হবে। জীবনানন্দ পরবর্তীতে এমন কবিতায় অনুপ্রেরণা বিরল। সজহ কথায়, উৎপল পরবর্তী বাংলা কবিতা আন্তজার্তিক বাংলায় রচিত হবে। তিনি এই আগুন জ্বেলে গেছেন। এমন কত কত খাপছাড়া ফর্মে যে কবিতা অপেক্ষা করে বসে আছে এই কথা নতুনের জন্য তা তিনি দেখিয়েছেন। সাহিত্যজীবনে এর চেয়ে বেশি আর কিছু তার কি আর করার দরকার ছিলো।

উৎপলকুমার বসুর উচ্চতা ভালো বা মন্দ কবি হিসাবে নয়। বা তার টেক্সের পাশে নম্বরিং করার দরকারও নাই। তিনি হলেন সেই হিরো, যাকে দেখে এন্টি-হিরোরাও হিরো হবার জন্য বড় রাস্তায় দাঁড়ায়ে শীস দিচ্ছেন। তার কবিতা এক একটা খাদ, পরিখা। তাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা শিখে নতুন লেখাটি লিখে নিতে হবে। তিনি এমনই ইনেস্পাইরেশন, ফ্যাশন, প্যাশন-জাগানিয়া, ইনক্রিডেবল।

২. 
বাংলা কবিতার পাঠ্যক্রম কিন্তু এমন হতে চলেছে : জীবনানন্দ, উৎপল, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য। এইটা একটা সম্ভাবনা, চূড়ান্ত কিছু নয়।

৩. 
বিদায় মায়েস্ত্রো! উৎপলকুমার বসু! ♦


 

‘‘কিন্তু আমরা নাচানাচি করেও, আক্ষরিক অর্থে, কম কিছু দুর্নাম কুড়াইনি। সে ছিল নাচের সময়। নেশার জন্যে নাচ, নেশা কাটানোর জন্যে নাচ, বাড়ি না-ফেরার নাচ, বাসস্ট্যান্ডে নাচ, খালপাড়ে নাচ। কেউ নাচে গৌর-নিতাই ঘোরে, কারওর ক্লাসিক্যাল, করওর-বা মিহি মণিপুরি। সুনীলের ছিল হুপুহুপু ভল্লুক নৃত্য।’’

এনাদের কথা || উৎপলকুমার বসু

উৎপলকুমার বসুর স্কেচ

বন্ধুরা নাকি একসময় স্মৃতির গম্বুজ হয়ে যায়– বলেছিলেন আমাদের অগ্রজ অরুণকুমার সরকার। শুধু গম্বুজ কেন-ভুলভুলাইয়া, দুর্গদেয়াল, পরিখাবেষ্টিত কোতোয়ালিও হয়ে দেতে দেখছি অনেককে। কিন্তু আমাদের তেমন কিছু ঘটেনি। এই তো সেদিন আমাদেরই কার ছেলে বা মেয়ের বিয়েতে (নাকি নাতি-নাতনির) আমরা একত্রে, সান-বাঁধানো উঠোনে, চেয়ার টেবিল জুড়ে বসেছিলান। আড্ডা এমন জমে উঠল যে কেউ আর নড়তে চায় না। বিবাহান্তে বর-বউও এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। হাতে হাতে, প্লেটে খাবার দিয়ে গেল শেষপর্যন্ত।
গৃহকর্ত্রী কপট ক্রোধ প্রকাশ করলেন– আপনাদের কি বয়েস বাড়েনি? সত্যিই তো আমাদের অনেকেই জ্যাঠা-জেঠি, দাদু-দিদিমা, পিতামহ-পিতামহী হয়ে পড়েছি। তবু আদিখ্যেতা গেল না।
এই জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকার জন্যে আমাদের আলাদা আলাদা কাহিনি নেই। অন্তত একটা বয়েসে তো অবশ্যই ছিল না। সুনীলের কথা বলতে এসে সন্দীপন এসে পড়ে। শরৎ আসবে অফিস থেকে। শক্তি আর বেলাল এল বলে। দূরে বিড়-বিড় করছে বিনয়। তারাপদ গেছে হাবড়ায়– তার পর্ণকুটিরে। কাল আসবে। সমরেন্দ্র ক্ষুধার্ত। ভাস্করের পকেটের সিগারেটে আমি নজর রাখছি। এ-ছাড়া আরও কত লোক আসছে-যাচ্ছে। দু’জন অচেনা লোক সুনীলের হাতে লেখা দিয়ে গেল। তাহলে সে-কথাই থাকল– বলে গেল কেউ কেউ। কোন কথা?
কোন কথা? কতদিন আগে? এই তো সেদিন দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে সুধাংশুর সঙ্গে দেখা। জনস্বার্থে বন্ধুর নামটা একটু পালটে দিলাম। পুরানো আড্ডাধারী। প্রথমেই তার উচ্চকণ্ঠে অভিযোগ– তুই তো তখন আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই চলন্ত বাসে উঠে পড়লি। সেই যে ফ্রয়েড আর সেক্স নিয়ে তোকে যা বোঝাচ্ছিলাম।
কবে? কতদিন আগে?
কর গুনে দেখলাম সাঁইত্রিশ বছর আগের কথা বলছে সে। খেই হারায়নি। হারায়নি ঋষভকণ্ঠ, বন্ধুপ্রীতি ও স্মৃতিশক্তি। এবং কাউকে তোয়াক্কা না-করা বাচাল ভঙ্গিটি।
সন্দীপন আমাদের খ্যাপা গানের কথা প্রায়ই বলে থাকে। কিন্তু আমরা নাচানাচি করেও, আক্ষরিক অর্থে, কম কিছু দুর্নাম কুড়াইনি। সে ছিল নাচের সময়। নেশার জন্যে নাচ, নেশা কাটানোর জন্যে নাচ, বাড়ি না-ফেরার নাচ, বাসস্ট্যান্ডে নাচ, খালপাড়ে নাচ। কেউ নাচে গৌর-নিতাই ঘোরে, কারওর ক্লাসিক্যাল, করওর-বা মিহি মণিপুরি। সুনীলের ছিল হুপুহুপু ভল্লুক নৃত্য। আর শরতের হাওয়ামে উড়তা যায়। তার লাল দুপাট্টা জড়ানোর ভঙ্গিটি আজও মনে পড়ে। দীপকের প্রিয় ছিল সর্পনৃত্য। সেটা সে শুধু মেয়েদের শেখাত। বাঙ্গালোরে, মেয়েদের বাবাদের হাতে, লাঞ্ছিত হতে হতে বেঁচে এসেছে। শক্তি তো এক জ্যোৎস্নারাতে, পৌষের শীতে, শুকনো ক্যানালে পড়ে গেল নাচ ও মহুয়ার টানে। সুনীল টেনে তুলল। তুলেই এক থাপ্পর। শক্তি আবার খালে। এবার আমি টেনে তুললাম। সুনীল বেশ মারকুটে ছিল তখন। আমরা সেবার, বিশ্বভারতীয় সমাবর্তনে, উপাচার্যের বিশেষ অতিথি। আমাদের রক্ষাকর্তা, ভগ্যক্রমে, ছিলেন সাগরময় ঘোষ ও মুজতবা আলী।

এ-সব যেন এক জুরাসিক পার্কের গল্প। কিন্তু অমলিন। স্মৃতিশাণিত। অকপট। আমাদের গান বা নাচ কোনটাই শেষ হবার নয়। সত্তর বছর শব্দ দুটি সুনীলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা চলে না। আমরাই বা কী এমন অপরাধ করেছি যে বুড়ো হতে যাব? আমাদের বাহাত্তুরেও বলা চলবে না অদূর ভবিষ্যতে। আগেই শাসিয়ে রাখছি, অশীতিপর কথাটি শুনতে মন্দ নয়। কিন্তু ভালো ভালো শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে– বন্ধুত্ব নেই।

সুতরাং আমাদের রয়েছে আরও সুন্দর, আরও ঝলমলে দিনের অপেক্ষা। ♦ 

 

 

ফিচারড ইমেজের গ্রাফিক্স : মোস্তাফিজ কারিগর। উৎপলকুমার বসুর লেখা ও স্কেচ ‘ভাষালিপির’ সৌজন্যে।

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।