সকাল ১১:৪০ ; বুধবার ;  ২০ জুন, ২০১৮  

হয়ে উঠুন আর্ন্তজাতিক সেলিব্রেটি

প্রকাশিত:

তারুণ্য ডেস্ক ।।

২০১০ সালের কথা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ ও ফেসবুক তৈরির জানা-অজানা কাহিনী নিয়ে 'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' সিনেমা তৈরি হচ্ছে এমন খবর ছড়িয়ে পরে। তবে খবরের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ ছিল অনেকের। আর এ সত্যতা যাচাইয়ে সবার আগে বিষয়টি নিশ্চিত করে সিনেমা বিষয়ক নিশ্চিত সোর্স হিসেবে খ্যাত ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেইস, যা আইএমডিবি নামে পরিচিত।

আইএমডিবি কি?

আইএমডিবি কাজ করে যাচ্ছে সারাবিশ্বের সিনেমা সংক্রান্ত তথ্যাবলী নিয়ে, কিন্তু কোথা থেকে কাজ করছে,কীভাবে কাজ করছে, কতজন কাজ করছে, কারা কাজ করছে এই সকল তথ্য নিয়ে? ১৯৯৮ সালের মধ্যেই আইএমডিবি হয়ে ওঠে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সাইটের একটি ।প্রতিমাসে সাইট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৮ মিলিয়নের বেশি। ব্যবহারকারীরা ৪ লাখেরও বেশি মুভি ও এন্টারটেইনমেন্ট ডেটাবেজ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিতে পারে। আর কী নেই সেখানে। সিনেমা সম্পর্কে সকল তথ্যের পাশাপাশি আছে ছবি, ভিডিও, ট্রিভিয়া।

আলাদা ভাবে যে সুযোগটি দেওয়া হচ্ছে সৃজনশীলদের জন্য

আইএমডিবির বিশেষ যে দিকটি সর্ম্পকে অন্যান্যরা একটু কম জানেন সেটি হচ্ছে আইএমডিবি প্রো অ্যাকাউন্ট। এটিকে বলা যায় যেকোনও শিল্পীর জন্য আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেওয়ার জন্য শক্তিশালী প্লাটফর্ম। কারণ, বিশ্বের বাঘা বাঘা নির্মাতার তাদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শিল্পী থেকে প্রয়োজনীয় টিম মেম্বারটি বাছাই করে নেন এই সাইটটি আপলোড করা প্রোফাইল দেখে।

সম্প্রতি আইএমডিবি প্রো অ্যাকাউন্টে প্রোফাইল তৈরি করেছেন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা সাব্বির আহমেদ। তার মতে সম্ভাবনাময় এ সুযোগটি নেওয়া উচিৎ বাংলাদেশি শিল্পীদের। তিনি বলেন, ‘আইএমডিবির প্রো অ্যাকাউন্ট অপশানে বাংলাদেশি বেশ কয়েকজন শিল্পীর অ্যাকাউন্ট থাকলেও সেগুলো সম্পূর্ণ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধু শিল্পীর পরিচয় আর কয়েকটি কাজের উল্লেখ্য ছাড়া বিস্তারিত কোনও তথ্য দেওয়া নেই প্রোফাইলে। ফলে অনেকেই ভাল কাজ করলেও নিন্তাতই সচেতনতার অভাবে কারণে হারাচ্ছেন ভালো কোনও সিনেমায় কাজ করার সুযোগ। ’

শুধু নিজের আগ্রহের জায়গাটি পূরণ করতে নয়, আগ বাড়িয়ে দেওয়া সুযোগটি নিতে লেগে পড়ুন আইএমডিবির প্রো অ্যাকাউন্টে। বলা তো যায় না, বিশ্বখ্যাত কোন পরিচালকের টিম মেম্বার হয়ে যেতে পারেন যে কোন সময়।


যে তরুণ পথ করে দিয়েছে অন্যান্যদের

বিশ্বব্যাপী আইএমডিবির যাত্রার শুরু সিনেমা পাগল এক তরুণের হাত ধরে। ৯০’এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কোল নিডহ্যাম ২৩ বছর বয়সে জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের তথ্য নিয়ে শুরু করেছিলেন একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ । এসব তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি একটি সফটওয়্যারও তৈরি করেন। বছর ঘুরতেই তার এ তথ্য ভাণ্ডারে যোগ হয় দেশ বিদেশের সহস্রাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীর তথ্য ।একসময় তিনি অন্যান্যদের সিনেমাপ্রীতির কথা মাথায় রেখে তথ্য ভাণ্ডারটি অনলাইন করে দেন। সেই অনলাইন ডাটাবেইজটি আজকের আইএমডিবি।

কোল নিডহ্যামের মুভিপ্রেম স্কুল জীবন থেকে। নব্বইয়ের দশকের এ তরুণ যখন উদ্যোক্তা স্কুলে পড়েন, তখন তার বাসায় প্রথমবারের মতো ভিএইচএস প্লেয়ার আসে। তার বন্ধুদের একটা ভিডিও শপ ছিল। সেখান থেকে ভিডিও টেপ ভাড়া পাওয়া যেত, একটা ভিডিও ২ সপ্তাহ রাখার অনুমতি ছিল। সেই শপ থেকে তিনি প্রথম যে টেপটি নিয়ে এলেন তার নাম 'এলিয়েন'। প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে ফিরে ১৪ দিনে মোট ১৪ বার সিনেমাটি দেখেন।

এক বছরে ১১০০ মুভি দেখা সম্ভব হয়েছিল তার বন্ধুর সেই ভিডিও শপের কারণে। এমনও দিন গেছে, শনিবারের ছুটির দিনগুলো তিনি ১০টা সিনেমাও দেখেছেন। এত সিনেমা দেখতে গিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হল। কী সিনেমা দেখেছেন আর কী দেখেননি সেটাই ভুলে যেতে লাগলেন। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। বছরে যদি ১১০০ সিনেমা দেখতে হয়, তবে দৈনিক গড়ে ৩টি করে সিনেমা দেখতে হয়, এক মাসে ৯০টা। সুতরাং দেখা সিনেমাগুলো সম্পর্কে তিনি নিজের কম্পিউটারে তথ্য টুকে রাখতে শুরু করলেন। সেই তালিকা প্রিন্ট করে নিয়ে যেতে হত ভিডিও শপে। তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে আনতে হত এমন সিনেমা যা দেখা হয়নি। এভাবে ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজের প্রথম ফাইলটি তৈরি হয়েছিল কোলের নিজের কম্পিউটারে।

১৯৮৯ সালে কোল নিডহ্যাম ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www) তখন খুব সীমিত পরিসরে কাজ করছিল। কোল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মুভি ডিসকাশন গ্রুপে যোগ দেন। সেখানে অবশ্য মুভি নিয়ে যা কথা হতো, তারচেয়ে বেশি হতো কোন নায়িকা দেখতে কিরকম, কোন নায়ক কি করল এমন বিষয় নিয়ে। এখানকার বন্ধুরা যখন তার তৈরি ডেটাবেজ সম্পর্কে জানতে পারল, তখন তারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। ডেটাবেজে যুক্ত হতে থাকল পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার ও নায়ক-নায়িকা সংক্রান্ত তথ্যাবলী, এমনকি সিনেমার সারসংক্ষেপও।

তারপর ১৯৯৩ সালে কারডিফ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতায় ডেটাবেজটি প্রথম ওয়েবে স্থান পায়। অল্প কদিনেই ওয়েবে ট্রাফিক এত বেড়ে গেল যে কোলকে অন্য আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে হোস্ট করতে হয়। এর মধ্যে ছিল জার্মানি, মিসিসিপি, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, দক্ষিণ আফ্রিকা, কোরিয়া, আইসল্যান্ড ও জাপান। কিন্তু তাতেও সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। ১৯৯৫ সালে দেখা গেল প্রতি সপ্তাহে সাইটের ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে। পাশাপাশি কোলের বন্ধুরা যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছিল তারা কাজের পাহাড়ে চাপা পড়ল। সুতরাং ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হল। কোলের ভাষায়, ‘আমরা একটা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলাম। আমরা কি হাল ছেড়ে দিয়ে বলব— এ ৫ বছর আমরা মজা করেছি। নাকি এখান থেকে ব্যবসা করা যায় কিনা সে সম্পর্কে ভেবে দেখব? বিষয়টা সহজ ছিল না। এমন একটা সময় যখন ইন্টারনেট বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহৃত হবে এমনটা ভাবাই অস্বস্তিকর ছিল।’

কোল ও তার বন্ধুরা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিল। ফলাফল, ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে একটি বাণিজ্যিক সাইট হিসেবে আইএমডিবি ডটকম যাত্রা শুরু করল। প্রথম সার্ভারটা কেনা হয়েছিল ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সাইটে বিজ্ঞাপন নিলেন, সেই টাকায় সার্ভারের দাম শুধু পরিশোধই হল না, আরও নতুন সার্ভার কেনা সম্ভব হল।

মনে রাখতে হবে এতদিন পর্যন্ত সাইট চলেছে স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায়। ১৯৯৬ সালে এ স্বেচ্ছাসেবকরা একে একে চাকরি ছেড়ে দিতে লাগলেন এবং আইএমডিবির ফুলটাইম কর্মচারী হিসেবে যোগদান করতে লাগলেন। কোল নিডহ্যাম নিজেও চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজের কোম্পানিতে যোগ দিলেন। ১৯৯৮ সালের মধ্যেই আইএমডিবি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সাইটের একটি হয়ে গেল। প্রতিমাসে সাইট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৮ মিলিয়নের বেশি। ব্যবহারকারীরা ৪ লাখেরও বেশি মুভি ও এন্টারটেইনমেন্ট ডেটাবেজ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিতে পারে। আর কী নেই সেখানে। সিনেমা সম্পর্কে সকল তথ্যের পাশাপাশি আছে ছবি, ভিডিও, ট্রিভিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

মজার ব্যাপার হল, আইএমডিবি কাজ করে যাচ্ছে সারাবিশ্বের সিনেমা সংক্রান্ত তথ্যাবলী নিয়ে, কিন্তু কোথা থেকে কাজ করছে, কীভাবে কাজ করছে, কতজন কাজ করছে, কারা কাজ করছে। এরা যে এক জায়গায় বসে কাজ করে তা নয়, বরং আইএমডিবির লোকজন সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।

/এআই/এফএএন/

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।