রাত ১১:০৬ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

পিনপতন কান্না।। মনি হায়দার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তোর বাবা আমাকে বিয়ে করতে চায়।
দু’জনার সামনে স্যুপের বাটি। স্যুপ থেকে গরম ভাপ উঠছে। বসেছে জানালার পাশে। বাইরে গরম এবং  প্রচুর মানুষের আনাগোনা। বসেছে দু’জনে মুখোমুখি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টে। দু’জনের হাতে স্যুপের চামচ। বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করে রিমি, কি বলবি বল।
সুহীর কথা বুঝতে পারে না রিমি। স্যুপ খেতে খেতে সুহীর দিকে তাকায়। অনেকক্ষণ ধরে গলায় কাঁটার মতো আটকে থাকা কথা বলতে পেরে স্যুপের পেয়ালায় সুহী চামচ নাড়তে থাকে। একটু সময় দিয়ে সুহী তাকায় রিমির দিকে। রিমি ওর দিকে তাকিয়েই আছে। সামনে এক জোড়া বিক্ষত চোখ।
হাসে রিমি, ফাজলামোর একটা সীমা থাকা উচিৎ।
সুহী চোখে চোখ রাখে রিমির চোখে, জানতাম তুই এটাই বলবি। কিন্তু রিমি আমি একদম ফাজলামো করছি না। সিরিয়াস আমি। তোর বাবা আমাকে আট নয় মাস ধরে ফুসলাচ্ছে। অনেক লোভ দেখাচ্ছে। আমি মানুষ, আমারও একটা স্থায়ী ঠিকানা দরকার। সেই কবে আমার ডির্ভোস হয়েছে। একলা একলা থাকি-
সুহী, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না তোর কথা। বাসায়তো আমি আর বাবাই থাকি। বাবার সঙ্গে আমারতো বন্ধুর মতো সম্পর্ক। আমরা সব কিছু আলাপ করি। কই, কখনওতো আমাকে এসব বলেনি- একটানা কথা বলে রিমি। ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়ছে ও। মনে হচ্ছে- সামনে বান্ধবী সুহী নয়, বসে আছে একটা রাক্ষসী। সিনেমার বিশাল পর্দা থেকে নেমে এসেছে একটা লোভী ডায়নোসার।
সব কথা কি মেয়েকে বলতে পারে বাবা? আর বলেই বা কি করে- যখন বাবা বিয়ে করতে চায় মেয়েরই বান্ধবীকে?
কিন্তু কেনো? কেনো বাবা বিয়ে করবেন? রিটায়ার্ড করেছেন। বয়স হয়েছে। আর কতোদিন বাঁচবেন? তাছাড়া-
তাছাড়া কি?
মানুষ শুনলে কি বলবে? আত্মীয় স্বজনদের মুখ দেখোবো কি করে? রিমির চোখে মুখে ক্রোধ, হতাশা আর বিরামহীন বিরক্তি।
হাসে সুহী, রিমি মানুষের কথায় কি দুনিয়া চলে? চলে না। তোর বাবার বয়স হয়েছে ঠিক কিন্ত ভদ্রলোক এখনও হ্যান্ডসাম। এবং তার প্রবল শারীরিক চাহিদাও আছে-
সুহী! আমি আর শুনতে চাই না।
সেটা তোর ব্যাপার। কিন্তু ভদ্রলোক তার হয়ে তোকে বলতে বলেছে, আমি বললাম। দায় ঠেকে আমি আমার দায় পালন করলাম মাত্র। তুইও শুনলি। ব্যাস!
এই তোর দায় পালন?
হ্যাঁ। বশীরকে আমি বলেছি, তোমার মেয়ে তুমিই বলো। বশীর বলেছে, আমি পারবো না। আমার হয়ে তুমি বলো। তুইতো আমাকে জানিস নাচতে নেমে ঘোমটা দেয়া আমি একদম পছন্দ করি না। বিয়ে যখন করবো সবাই জানবে। তো, মুখ ঢেকে কি লাভ?
সুহী, তোর এতো অধঃপতন?
হাসে সুহী, আমি একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছি এটা তোর কাছে অধঃপতন মনে হলো? আর যারা বিয়ে না করে এক সঙ্গে থাকে, তাদেরকে তুই কি বলবি? সব দোষ আমার? আমিতো দশ বছর আগে ভালোবেসে একজনকে বিয়ে করছিলাম। তুই বল, করেছিলাম না?
তুই বাসা থেকে ভেগে গিয়েছিলি।
হ্যাঁ গিয়েছিলাম। কেনো গিয়েছিলাম? ভালোবেসেতো?
ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময়ে একটা মেয়ে একটা ছেলের হাত ধরে সংসার থেকে চলে গেলে সেটাকে ভালোবাসা বলে?
বলে, দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেয় সুহী। মানি, আমি একটু ইচড়ে পাকা ছিলাম। কিন্তু মননকে ভালোবাসায় আমার কোনো খাঁদ ছিল না। কিন্তু আমি জানতাম না- লোকটা আমার জীবনটাকে একদিন, মাত্র কয়েক বছর পর তছনছ করে দেবে? তুই বল, এসব কি আগে থেকে জানা যায়? জীবনতো পানসি নৌকা। বেয়ে বেয়ে যাওয়ার পর না বোঝা যায় কোথায় কতদূর এসেছি? আমি খুব ক্লান্তরে...। হাত ধরে রিমির। রিমি হাতটা সরিয়ে নেয়। সুহী হাসে। কিন্তু সুহীর সুন্দর মুখের হাসিটা বিশ্রী কদাকার লাগে রিমির।
আমি যাই? দাঁড়ায় রিমি।
যাবি?
হ্যাঁ। এক মুহূর্ত এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না। চাইনিজ রেস্টুরেন্টের ভেতরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসেও ঘামছে রিমি। কি চায় সুহী? আর বাবাই বা কেমন মানুষ? আমার বান্ধবীকে বিয়ে করবে? যে মেয়েটি বাসা থেকে আর একটা ছেলের হাত ধরে চলে গিয়েছিল, সেই মেয়েকে? যে মেয়েকে তার বাবা মা ভাইবোন এখনও বাসায় নেয়নি। সুহী একটা নাচের স্কুলে নাচ শেখায়। পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে গিয়ে নাচে। এইভাবে ওর জীবন চলে। সেই মেয়েকে বিয়ে করবে বাবা? মাথায় আগুন ধরে যায়। দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামে রিমি। কী করবে বুঝতে পারছে না। বাসায় যাবে? বাবাতো বাসায়। এখনই ঘটনার একটা বিহিত হওয়া দরকার। কিন্ত কিভাবে? হঠাৎ সৌম্যকে মনে পড়ে। সেল বের করে ফোন দেয়, হ্যালো?
হ্যালো? সৌম্যর গলা।
তুমি কোথায়?
কোথায় আবার? অফিসে।
তোমার সঙ্গে জরুরী দেখা হওয়া দরকার আমার-
তুমি অফিসে চলে এসো।
না, তোমার সঙ্গে নিরিবিলি কথা বলা দরকার।
কিন্তু এখনতো বের হতে পারবো না, বাজে মাত্র আড়াইটা। বিগ বসেরা সব অফিসে। তুমি এক কাজ করো- বাসায় চলে যায়, অফিস ছুটির সঙ্গে সঙ্গে আমি তোমাকে তুলে সেই রেস্টুরেন্টে যাবো। এখনই একটা টেবিল রিজার্ভ করি, কি বলো রিমি?
করো- বাই। লাইন কেটে দিয়ে একটা রিকশায় ওঠে রিমি। রিকশা চলতে শুরু করে। এতো গরম, তবুও চারদিকে জ্যাম। রিকশা কয়েক হাত যাওয়ার পরে জ্যামে আটকে গেছে। রিমি মনে করতে চায়, কবে দেখা হয়েছিল সুহীর সঙ্গে? প্রায় বছর খানেক আগে, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। ওর স্কুলের মেয়েদের নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় এসেছিল। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার সুহী। কী সুন্দর যে লাগছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই- ওর ফিগার যেকেনো পুরুষের চোখে লোভনীয়। মাথায় ফুলের মুকুট পড়ে নাচছে আর হাসছে। রিমির সঙ্গে সৌম্য। সুহীই প্রথম দেখে রিমিকে। মঙ্গলশোভা যাত্রার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।
এই রিমি! সামনে তাকাতেই দেখে শোভাযাত্র থেকে বের হয়ে আসছে সুহী। সুহীকে দেখে আনন্দে আটখানা রিমি। কতোদিন পরে দেখা। দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে। সৌম্য ছবি তোলে।
কিরে কেমন আছিস? প্রশ্ন করে সুহী।
ভালোরে। তোর কি খবর?
আছিরে। এখনতো কথা বলা যাবে না- আমার স্কুলের ছেলেমেয়েরা সামনে চলে যাচ্ছে। তোর সেল নাম্বার দে- দু’জনের মধ্যে সেল নাম্বার বিনিময় হতে হতে সুহী তাকায় সৌম্যর দিকে- তোর বর নাকিরে?
নাহ।
তাহলে কি? বয়ফ্রেন্ড? সৌম্যর দিকে চোখ রেখে রিমির কানে কানে বলে সুহী- দেখতে কিন্তু নায়কের মতো। লেগে থাকিস। আমি যাই আর ফোন দিস- অনেকের ভিড়ে হারিয়ে যায় সুহী দ্রুত।
কে?
সৌম্যর প্রশ্নের উত্তরে জানায় রিমি- আমার ছোট বেলার বন্ধু। আমরা এক সঙ্গে স্কুলে, কলেজে পড়িছি। ও অবশ্য ইউনিভারসিটিতে পড়তে পারেনি। কলেজ থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এই এতোদিন পরে দেথা হলো। হাত ধরে সৌম্যর- চলো সামনের দিকে যাই।
তুমি তোমার বান্ধবীকে আমার পরিচয় দাও নি যে!
আমিই তোমার পরিচয়, আবার বান্ধবি লাগবে কেনো? আর ওইসব ইনিয়ে বিনিয়ে পরিচয় দিতে আমার ভালো লাগে না। কেনো পরিচয় না করিয়ে কি অন্যায় করেছি?
আরে দূর, সামনে চলো। দু’জনে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। সেই দেখার কয়েকদিন পর সুহী ফোন করে- কিরে কেমন আছিস?
ভালো। তুই?
আমিও ভালো। কোথায় বাসায়?
না, অফিসে।
চাকরি করিস নাকি? সুহীর কণ্ঠে উচ্ছাস- কোথায় তোর অফিস?
মতিঝিলে, একটা ব্যাংকে জয়েন করেছি। সুহী?
বল।
একদিন বাসায় আয়। জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে। কতোদিন দেখা হয় না। সেই যে বিয়ে করে হারিয়ে গেলি- আর নো দেখা, নো কথা। আসবি বাসায়?
আসবো, তোর বাসার নম্বরটা মোবাইলে পাঠিয়ে দে।
এখনই দিচ্ছি। আর শোন ছুটির দিনে আসিস। সারাদিন থাকবি কেমন?
ওকে বস।
সেলে ঠিকানা দেয়ার দিন পনেরোর মাথায়, এক ছুটির দিনের সকালে বাসায় আসে সুহী। দুই বন্ধু মেতে ওঠে আড্ডায়, স্মৃতিতে। দুপুরের খাবারের পর বিকেলে দেখা হয় বশীরউদ্দীনের সঙ্গে সুহীর। সকালে বশীর বাইরে ছিল। ড্রয়িরুমে পত্রিকা পড়ছিলো বশীর।
বাবা? আমার বন্ধু সুহী।
ও আচ্ছা! কখন আছো সুহী? বাসা কোথায়?
বাসা আজিমপুরে। আমি ভালো আছি আংকেল।
তোমরা বসে গল্প করো- আমি চায়ের খবর দিয়ে আসি। চলে যায় রিমি। টিভির শব্দ কমিয়ে দেয় বশীর- তো কি করছো তুমি?
তেমন কিছু না। একটা নাচের স্কুলে নাচ শেখাই?
তোমার স্বামী কি করছে?
নিশ্চুপ থাকে সুহী। অবাক বশীর- কোনো সমস্যা?
মানে আমি ওকে ডির্ভোস দিয়েছি।
হতেই পারে। এ নিয়ে এতো কুণ্ঠিত কেনো তুমি?
আপনি যেভাবে নিলেন, সবাইতো নেয় না। যখন শোনে, আমি একা থাকি, আমার জামাই নেই- সবাই আমাকে খারাপ মেয়ে ভাবে। আমার দিকে অন্যরকম চোখে তাকায়। মনে হয়, আমি অপরাধী। কিন্তু আপনি অন্যরকম মানুষ- আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে আংকেল।
শোনো সুহী, আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ. বিশেষ করে পুরুষ মানুষ নিজেকে মনে করে আসমানের চাঁদ। নিজেরা কতো অপরাধ করে কিন্ত সাফল্যের সঙ্গে সব গোপন রাখে। ফলে, তাদের কেউ কিছু বলে না। অথচ তুমি যে লড়াইটা করছো সমাজে টিকে থাকার জন্য, তার সৎ মূল্যও তোমাকে কেউ দেবে না। আপনি একেবারে ঠিক বলেছেন- আমাকে থাকতে হচ্ছে সরকারের এক ডরমেটরিতে। এক রুমে তিন জন থাকি- কারো কোনো প্রাইভেসি নেই। একা মেয়ে থাকবো- একটা দুই রুমের বাসা চাইলাম, কতো খুঁজলাম, বেশি ভাড়া দিতে চাইলাম- তবুও পেলাম না।
তোমার বাবা মা কোথায়?
আছে এই শহরে।
তাদের কাছে গেলেই পারো-
চাইলেও যাওয়া সম্ভব নয়।
কেনো?
নিজের জীবনের গোপন গ্রন্থি খুলে দেয় বন্ধু রিমির বাবা বশীরউদ্দীনের কাছে। বশীরউদ্দীন মনযোগ দিয়ে শোনে। চা এবং বিকেলের নাস্তা নিয়ে যখন রিমি ঢোকে, তখন কাঁঁদছে সুহী। বশীরউদ্দীন তাকিয়ে দেখেন সুন্দরের স্বপ্নভঙ্গ আর রোদনের বিন¤্র হাহাকার।
হতবাক রিমি জিজ্ঞেস করে- কি হয়েছে বাবা?
ওর বিয়ে, বাবা-মার ঘটনা বলতে বলতে কেঁদে ফেললো আর কি!
সত্যিই আমিও খুব কষ্ট পেয়েছি বাবা। সকাল থেকে একসঙ্গে থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনেছি- ট্রে রেখে বসে সুহীর কাছে- সুহী!
আমি আসছি- সুহী দ্রুত রুম থেকে চলে যায়। ঢোকে বাথরুমে- আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক, আমি এখনও সুন্দর? কাঁদলে আমাকে আরও সুন্দর লাগে- আমি জানতাম নাতো। আয়নায় প্রতিফলিত সুহীকে দেখে প্রকৃত সুহী আবেগে বিহ্বল, চঞ্চল। চোখে মুখে পানি দিয়ে নিজেকে একটু সুস্থির করে।
সুহী, আয়- বাবা অপেক্ষা করছেন, এক সঙ্গে নাস্তা করবি।
দরজায় মুখ বাড়ায়, ছিঃ ছিঃ কী যে হয়ে গেলো- আমি আংকেলের কাছে আমার সব গোপন প্রকাশ করে দিলাম? কি ভাববে আংকল?
কিছু ভাববে না- হাত ধরে সুহীর, বাবা বলছিলেন- মেয়েটা বড় দুঃখী। নিজের কিছু বেদনার ভার অন্যকেও দিতে হয়- বাবাতো মুরব্বী মানুষ। তার কাছে বলেছিস তো কী হয়েছে। চল।
রিমির সঙ্গে সুহী আবার আসে ড্রয়িংরুমে। রিমি চায়ের কাপে চা ঢেলে দেয়, সুহী বিস্কুট আর নুডুলস প্লেটে তুলে দেয় বশীরউদ্দীনকে। চা নাস্তা খেতে খেতে আরও অনেক কথা হয়, গল্প হয়- গোটা পরিবেশটার মধ্যে একটা আন্তরিক পরিস্থিতি ফিরে আসে।
রিমি, আমি হাঁটতে গেলাম, নাস্তা করে দাঁড়ায় বশীরউদ্দীন, তাকায় সুহীর দিকে- তুমি আজকে যেও না। রিমির সঙ্গে থেকে যেও- বলতে বলতে রুম তেকে বের হয়ে গেলেন বশীরউদ্দীন। রাতে খাবার টেবিলে আবার দেখা ও কথা হয়। কিন্তু সুহী জানায়- খেয়েই আমি চলে যাবো।
কেনো?
সরকারি ডরমেটরিতে থাকিতো, রাতে বাইরে থাকলে আগে থেকেই সুপারকে জানাতে হয়। না জানালে বিপদ হতে পারে।
কি বিপদ?
আসলে অনেক চাহিদাতো সিটের, যে কেনো সময়ে আমার রুম বাতিল করে দিতে পারে। তখন আমাকে রাস্তায় থাকতে হবে। আর এখনকার সুপার খুব খারাপ-
চলো। আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। রিমি, ড্রাইভার কি চলে গেছে?
হ্যাঁ বাবা।
ঠিক আছে, সুহী তুমি প্রস্তত হয়ে এসো। আমি গাড়ি বার করছি- বশীরউদ্দীন রুমের বাইরে চলে আসে। নিচে নেমে গাড়ি বের করে স্ট্রাট দিয়ে অপেক্ষা করে। নিচে নেমে আসে সুহী আর রিমি। সুহী গাড়িতে চড়ে বসে, বশীরউদ্দীন গাড়ি ছেড়ে দেয়। রিমি ফিরে যায় নিজের ঘরে।
তোমার সেল নাম্বারটা দেবে সুহী? গাড়ি থেকে নামার সময়ে বশীরউদ্দীন প্রশ্ন করে।
কেনো নয়! গাড়িতে বসেই দুজনের সেল নম্বর বিনিময় হয়। এবং একটা সূত্র তৈরী হলো বশীরউদ্দীনের সঙ্গে সুহীর যোগাযোগ রাখার। সেই সূত্র ধরে, রিমির অজান্তে ঘটনা, ঘটনার ঘনঘটা, রিমির অফিস সময়ে সুহীর বাসায় আসা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকা... থাকতে থাকতে, শরীরের ছবি আঁকতে আঁকতে সুহী আর বশীরউদ্দীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
কতোদূর, কতো গভীরে গেছে ওরা? নিজের বাড়ি থেকেও কিছু জানতে পারলো না রিমি। রিকশা বাসার কাছে আসলে বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। গেলেই বাবাকে দেখতে হবে। এতোদিন কিছু জানতো না, কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আজতো সব, সব জেনে গেছে রিমি। কি করে বাবার সামনে দাঁড়াবো আমি? নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বাবাকে ফোনে সব জানিয়েছে সুহী। বাবা কি সামনে আসবে? বাবার চোখে  কি করে তাকাবো? ভাবতে ভাবতে বাসায় ঢোকে। বাবা ড্রয়িংরুমে টিভি দেখছে। ওর শব্দ পেয়েই ডাক দেয়, রিমি?
গলায় আটকে যায়- বাবা আসছি। কোনোভাবে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। টিভি থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকায় বশীরউদ্দীন, এক কাপ চা করে দেতো মা।
দিচ্ছি! চুপিচুপি চলে যায় রিমি।
রিমি রান্নাঘরে যায়, যন্ত্রের মতো চায়ের কেটলি চুলোয় চড়ায়। সত্যি যদি বাবার সঙ্গে সুহীর বিয়ে হয়, এই সংসারের ও একজন হয়ে যাবে। ওর সঙ্গে আমাকে একই বাসায় থাকতে হবে? নাকি সৌম্যর হাত ধরে বাসা ছেড়ে চলে যাবে? না, সবার মতো নয় রিমি- নিজের মনে বলে, আমি পারবো না। আমার ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দিতে পারবো না। সৌম্য নিজে থেকে না বললে আমি কখনও বলবো না বিয়ের প্রসঙ্গ। হোক, যতো কষ্টই হোক। কিন্তু মা? মায়ের সংসারে মা আজ কোথায়? এই সংসার, সংসারের যাবতীয় খুঁিটনাটি সব মায়ের হাতে সাজানো। মা কতো বছর আগে মারা গেছেন? কর গুনে হিসেব করে, সাত বছর হলো। এই সাত বছরে মা একেবারে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলো সংসারে? বাবাতো মাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তা হলে? বিয়ে, প্রেম, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কি মৃত্যুর পর থাকে না? সব হারিয়ে যায় অন্ধকারের গহ্বরে?
রিমি? চা দিলি না? বাবার গলা। একেবারে স্বাভাবিক বাবা। কোনো বিকার কিংবা দ্বিধা কিংবা সংকোচ নেই তার। মানে কি? বাবা সব স্বাভাবিকভাবে করছে? বাবা কিংবা মানুষ বশীরউদ্দীনের ভেতরে কি কেনো সংশয়ও তৈরী হচ্ছে না- বাসায় নিজের বিয়েরযোগ্য মেয়েকে রেখে নিজে মেয়ের বান্ধবীকে! অবশ্য বিয়ের ব্যপারে অনেক বলেছে বাবা কিন্ত সৌম্যর কারণে সব পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। আর কি অবলীলায় সুহী বললো- বশীরকে আমি বলেছি। বাবাকে সরাসরি নাম ধরে ডাকলো! বশীর! একজন পুরুষ মানুষকে একজন মেয়ে কখন নাম ধরে ডাকে, কতদূর গেলে...। মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে ওর।
দ্রুত চা করে নিয়ে আসে রিমি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকায় বশীর, কোথাও যাবি নাকি?
ঘাড় নাড়ে- হ্যাঁ।
ঠিক আছে।
বাবার সামনে থেকে চলে আসে রিমি। বাবা কতো স্বাভাবিক? নাকি ভান করছে? নিজের রুমে এসে রিমি দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শরীর কেমন অবশ লাগছে। মনে হচ্ছে- এই শরীর, এই মন, এই ঘর, এই জানালা কোনো কিছুরই মালিক সে নয়, আমি নই। অন্য কেউ... সেল বাজে। সৌম্যর ফোন।
হ্যালো?
তুমি কোথায়?
আমি তোমার বাসার সামনে। শিগগিরই এসো।
আসছি-
নিজেকে দ্রুত প্রস্তত করে নিচে নেমে আসে রিমি। লেটেস্ট মডেলের গাড়ি সৌম্যর। আর চালায়ও দারুণ দক্ষতায়। ওর সঙ্গে গাড়িতে থাকলে রিমির মন খোলা প্রান্তরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে সুদূরে যাত্রা করে। গাড়ি চালাতে চালাতে সৌম্য প্রশ্ন করে- তুমি নিশ্চুপ কেনো রিমি।
কই?
যে তুমি গাড়িতে উঠে এক মুহূর্তও কথা ছাড়া থাকতে পারো না- সেই তুমি একটি কথাও বলছো না। ঘটনা কি? অবশ্য বলেছিলে জরুরী কথা আছে। কি কথা?
গাড়ি এক জায়গায় রাখো।
এইতো চলে এসেছি- বলতে বলতে গাড়ি ঢুকিয়ে দেয় হাতিরঝিলে। একটু ফাঁকা দেখে গাড়ি পার্ক করে দু’জনে নেমে দাঁড়ায় ঢাকার হৃদপিন্ড প্রবহমান হাতিরঝিল জলধারার পাশে। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে, আকাশ জুড়ে তারার মেলা। এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো মানুষ।
কি হয়েছে তোমার রিমি?
জানো, বাবা বিয়ে করতে চায়- রিমি রাতের আকাশের দিকে চোখ রেখে বলে।
হাসে সৌম্য, তাই নাকি?
হ্যাঁ।
সে কারণে তোমার মন খারাপ?
মন খারাপের খবর না?
না, আমি মনে করি আংকেল ঠিক কাজই করছেন। দেখতে এখন দিব্যকান্তি পুরুষ মনে হয় তাকে। নিয়মিত ব্যায়াম করেন। পেটানো শরীর। মানুষও আধুনিক। বিয়ে করতেই পারেন।
বিয়ে করছে আমার বান্ধবীকে।
তোমার বান্ধবীকে?
হ্যাঁ। আমার সংকোচতো ওইখানে সৌম্য।
তোমার কোন বান্ধবী?
ওই যে, পহেলা বৈশাখের মঙ্গলশোভাযাত্রায় গত বছর যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল-
নাচ করে যে?
ঠিক।
তোমার বান্ধবী রাজি?
রাজি মানে? বিয়েতো দু’চারদিনের মধ্যে হয়ে যাবে।
রিমি, মানুষের জীবন বিচিত্র ও অব্যাখাত নানা সূত্রের ভেতর দিয়ে চলে। এই যে আংকেল বিয়ে করতে চাচ্ছেন তোমার বান্ধবীকে- আমি কোনো দোষ দেখি না। তুমি মন খারাপ করো না। বরং স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করো- তোমার বেদনা কিংবা হতাশা অথবা দ্বিধার শংঙ্খচূড় ভেঙে পড়বে।
তুমি বলেছো? বিস্মিত রিমি।
বলছি।
ঠিক আছে, বাবা বিয়ে করতেই পারে, কিন্তু আমার বান্ধবীকে কেনো? দুনিয়ায় আর কেনো মেয়ে ছিল না?
হাসে সৌম্য- ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু ওই যে বললাম মানুষের জীবন অনিয়ন্ত্রিত এক ধারা। সেই প্রবহমান ধারাই তোমার বান্ধবীকে নিয়ে এসেছে তোমার বাবার কাছে। এবং তারা এখন জুটি।
আমি অন্তত তোমার কাছে অন্য কিছু আশা করেছিলাম- ম্লান গলায় বলে রিমি।
জানি, তুমি আমার কাছ থেকে তোমার পক্ষে সমর্থন চাইছো। কিন্তু সেই সমর্থন হতো অকার্যকর। কারণ, ইতোমধ্যে আংকেল এবং তোমার বান্ধবী বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা একটি স্বপ্নসেতুর ভিতর দিয়ে যাত্রা করেছে। বরং আমরা তাদের সমর্থন দিতে পারি।
রিমির ভেতরের ভুবনটা আরো সংকুচিত হয়ে যায়। জগতের সবাই বাবার পক্ষে? বাবা যে এতোবড় একটা অন্যায় করছে, কেউ কিচ্ছু বলছে না। রাতে বাসায় ফিরে বিছনায় একা একা ভাবে- সৌম্যও সমর্থন দিতে পারলো? সব পুরুষ কি ভোগ মিছিলের কারিগর? রিমি চট করে উঠে বসে বিছানায়, মেলে ধরে ল্যাপটপ, স্কাইপি খুলে বসে। অস্ট্রেলিয়ার পার্থ থেকে বড় ভাই আসিফ ভেসে ওঠে পর্দায়, কিরে বুড়ি, কেমন আছিস?
ভালো নেই।
কেনো?
বাবার কান্ড জানো?
বিয়ের কান্ডতো!
তুমি জানো?
জানবো না কেনো? আমাকেতো জানিয়েছে বাবা গত সপ্তাহে। তুই জানিস না?
তুমি এই বিয়ে মেনে নেবে?
অসুবিধা কি?
তুমি জানো, বাবা কাকে বিয়ে করছে?
তোর বান্ধবী, সুহীকে। আমি দেখেছি- স্কাইপিতে। কথাও হয়েছে। আমারতো খারাপ মনে হয়নি। বরং আমাদেরই উচিৎ ছিল আরো আগে বাবাকে বিয়ে করিয়ে দেয়া।
ঠিক আছে, স্কাইপির  লাইন কেটে দেয় রিমি। বিছানা থেকে ফেলে দেয় ল্যাপটপ। নিজেকে বাতাসহীন একটা বেলুন মনে হচ্ছে। দুনিয়ার এই ছোট্ট বাসায় কতো কিছু ঘটে গেছে, সবাই জানে কেবল জানে না রিমি। কেনো জানে না? রিমি মেয়ে, তাই? নাকি তাকে সবাই ভয় পায়?
অনানুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয়ে গেছে বশীরউদ্দীন আর সুহীর। কোর্ট ম্যারেজ করেছে। সুহী সাধারণভাবে বাসায় এসেছে নিজের যা কিছু আছে, সেইটুকু নিয়ে। রিমির হাতে কিছুই নেই। একটি দোতালা বাড়ি। অনেকগুলো কক্ষ। একটি কক্ষে রাত্রি যাপন করে সুহী, নতুন বৌ এই বাড়ির, আর তার স্বামী বশীরউদ্দীন। সেই বাড়ির আর একটি কক্ষে একা এক রিমি রাত জেগে বসে থাকে, রিমির চোখে ঘুম নেই। মনে হয়, কি যেন একটা হারিয়ে গেছে ওর বুকের গহীন থেকে। আলুথালু যন্ত্রণায় হারিয়ে যাওয়া সেই গহীনের ধুলোবালি নাড়াচাড়া করে কিন্তু হাতে কিছুই থাকে না। জলের মতো সব নিচে পড়ে যায়। নিজের খালি হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। রিমি দেখতে পায়, ওর আঙুল, হাতের তালু ফেটে ঘন কুয়াশার মতো রক্ত পড়ছে। নিজের রক্তের উপর পা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রিমি। আকাশগাঙে চাঁদ। বারান্দায় চাঁদের আলো ডিগবাজি খেলছে। রিমি চাঁদের আলোর ডিগবাজি দেখছে। পাশে এসে দাঁড়ায় সুহী। সুখী, পরিতৃপ্ত মুখ।
রিমি? তুই রাগ করেছিস, জানি। কিন্তু তোকে তো আমি বলেছি, আমার একটা আশ্রয় দরকার। সেই আশ্রয়ের জন্য একটু ছলনা, কিংবা ছিনালীপনা যে আমাকে করতে হয়নি, তেমন নয়। করতে হয়েছে। করেছিও। ছিনালীপনারও একটা সৌন্দর্য আছে, আমি সেটা জীবন দিয়ে শিখেছি।
হিস হিস করে রিমির গলা- আমি তোকে ঘৃণা করি।
করাটাই স্বাভাবিক। তোর জায়গায় আমি থাকলেও ঘৃণা করতাম।
তুই কি মনে করিস, তোকে আমি মা ডাকবো?
না, তুই আমাকে আগের মতো সুহীই ডাকবি। মনে রাখিস, তুই যে বশীরউদ্দীনের মেয়ে, আমি সেই বশীরউদ্দীনের স্ত্রী। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে তোর আমার বড় পরিচয় কি?
রিমি অর্থহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, কি?
তুই রিমি, আমি সুহী। তুই আমার বন্ধু। আমি তোর বন্ধু। আমরা দুজন নারী, জড়িয়ে ধরে সুহী রিমিকে-  তুই যদি আমার, আমি যদি তোর দুঃখ না বুঝি, আমরা বাঁচবো না রে। আর বারো তেরো বছর আগে মনে হয়েছিল, জীবন হেসে খেলে চলে যাবে, আসলে যায় না। জীবনের মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করছে লোলুপ বাঘ, মেয়েদের বড় শত্রু মেয়ে। আয়, তুই আর আমি সেই প্রথাবদ্ধ ধারণাকে ভেঙে দিই। নতুন একটা ধারণা তৈরী করি। শোন, তোর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে রিমি।
কি কথা হয়েছে?
সৌম্য তোকে শিগগিরই বিয়ে করবে। আমি নিজের হাতে তোকে সাজিয়ে দেবো। তোদের বিয়েতে আমি নাচবো। আমরা বন্ধু না!
আবেগে কাঁপছিলো সুহী। হঠাৎ এক ধাক্কায় সুহী মেঝেতে আছড়ে পড়ে। মাথাটা লাগে দেয়ালে, ব্যথায় জ্বলে ওঠে শরীর। হাত বাড়ায়, আমাকে ধর।
না, দ্রুত চলে যায় রিমি। মনে মনে জ্বলছে, আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে সব নিজের দখলে নিতে চাও। আস্ত এক ডাইনি!
সুহী কোকাতে কোকাতে দাঁড়ায়। বুক ভরে শ্বাস নেয়, রিমি আমি তোকে সত্যি ভালোবাসি।
কিন্তু শোনার জন্য রিমি ছিল না সেখানে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।