রাত ১০:৩০ ; সোমবার ;  ২২ অক্টোবর, ২০১৮  

খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকারীরা ‘পুরস্কৃত’

হামলাকারীরা ছাত্রলীগের ছিল না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হবে: বিএনপি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সালমান তারেক শাকিল ও চৌধুরী আকবর হোসেন।।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে সাংগঠনিক পদ ‘পুরস্কার’ পেয়েছেন হামলাকারী ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। ২০ এপ্রিল সোমবার বিকেলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণাকালে কাওরানবাজারে এ হামলার ঘটনা ঘটে।গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষিত হয়। এই কমিটিতে যে ৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই হামলার দিনে ঘটনাস্থলে ছিলেন। এমনকি তাদের একজন বাংলা ট্রিবিউনকে ওই রাতেই স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা সত্যি নয়। ওটা কাওরানবাজারের সাধারণ লোকরা ক্ষিপ্ত হয়ে করেছিল।’

বিএনপি বলছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যে ছাত্ররাজনীতি সরাসরি সন্ত্রাসে উৎসাহিত হবে। যে ঘটনা সারা বিশ্ব দেখেছে, ছাত্রলীগ নেতাদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তার মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য আমাদের বেদনাহত করে।

হামলায় যুক্ত ওই ৫ নেতার পক্ষেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন কমিটির ঘোষক ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান।বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘কমিটিতে যারা দায়িত্ব পেয়েছে তারা ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত। ১২/১৫ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাদের। ভালো ছেলে হিসেবেই সবাই তাদের চেনে। তেজগাঁও থানা সভাপতি হয়েছে হেলাল। সে তেজগাঁও মাদ্রাসার ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক ছিল। তার আগে ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা ছিল। থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন। তিতুমীর কলেজের নিয়মিত ছাত্র।’

ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদ সাক্ষরিতে এক বছর মেয়াদকালীন এ কমিটিতে রয়েছেন সভাপতি হেলাল আহম্মেদ রাজু, সহ সভাপতি আবুল হাসান খান, সাধারণ সম্পাদক হাবিব এলাহী রুবেল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেন আল আমীন, প্রচার সম্পাদক মো মহসিন। তবে বাকি পদগুলো কবে নাগাদ পূরণ করা হবে, সে তথ্য নেই এই তালিকায়। ঘোষিত পাঁচটি পদের প্রত্যেককেই খালেদার গাড়িবহরে হামলার প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যাখ্যান

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘হামলা হয়েছিল কে বলেছে? ওই দিন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবহরের কর্মীরা কাওরানবাজারে হামলা করে। তাদের উপর বাজারের লোকেরা ক্ষিপ্ত হয়েছিল। এরা তো কেউ ছাত্রলীগের ছিল না। বাজারের লোকদের জিজ্ঞেস করুন।’’

ওই রাতে হামলায় সম্পৃক্ত একজন বর্তমানে তেজগাঁও থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেন আল আমীন। হামলার কথা স্বীকার করে ২০ এপ্রিল সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, 'আমার হাতে প্রথমে একটি ইটের টুকরা এসে পড়ে, এতে হাতে ব্যথা পাই। এরপরই আমি প্রতিবাদ করেছি।' কী কারণে হামলা করতে গেলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আল আমিন জানান, 'কী কারণে তা সবাই জানে। আপনি সাংবাদিক, আপনার তো আরও আগে জানার কথা।'

আল আমিন আরও বলেন, 'আমি তেজগাঁও কলেজে অনার্সে পড়ি। রাজনীতি করি না।'

কমিটি প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের তেজগাঁও থানার সাবেক এক নেতার দাবি, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করার পুরস্কার হিসেবে এ ৫ জন পদ পেয়েছেন। আপাতত অন্য কাউকে নেওয়া হয়নি। ওই সূত্রের দাবি, ঘটনার দিন উত্তরের নেতা মিজানুর রহমানের ভূমিকা প্রকাশ্য ছিল। তার নেতৃত্বে হয়েছে। এখন তার কমিটি তো তার অনুসারীদের দিয়েই করানো হবে।

তবে মিজানুর রহমান হামলার বিষয়টিকে রাজনৈতিক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যখন কোথাও মুখোমুখি অবস্থানে জড়িয়ে যায় সেক্ষেত্রে যারা ছাত্রলীগ করে তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে ভূমিকা নেবেই। আর ভূমিকা নিতে গেলেই তখন হয়ত বিভিন্ন ধরনের ফুটেজ, ছবি আসতে পারে। সেটা দলের স্বার্থে, কেউ তো ব্যক্তি স্বার্থে করেনি। দলের স্বার্থে কেউ কাজ করতে সে কাজের মূল্যায়ন করা উচিত কর্মীদের। তা না হলে তৃণমূলের কর্মীরা উৎসাহ পাবে না।

হামলার দিন ঘটনাস্থলে ছিলেন নতুন সভাপতি হেলাল আহম্মেদ রাজু। বাংলা ট্রিবিউনকে হেলাল বলেন, ‘এটা দলের ব্যাপার, এ বিষয়ে আমার মন্তব্য নেই। আমরা সামনের দিকে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করে কাজ করে যাব।’

হামলার রাতে স্বীকারোক্তি দেওয়া তেজগাঁওয়ের একটি ওয়ার্ডের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন আমির হোসেন আল আমীন। তিনি বলেন, ‘আমি তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনার ছাত্র। যারা রাজপথে থাকে, দলের জন্য কাজ করে তারাই কমিটিতে থাকে। আমিও হয়ত দলের জন্য কিছু করতে পেরেছি তাই আমাকে কমিটিতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার কোনও অপরাধীদের প্রশ্রয়-আশ্রয় দেয় না।’

তার ওই দিন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার পুরস্কার হিসেবে পদ দেওয়া হয়েছে কী না, এমন প্রশ্নের উত্তরে আল আমিন বলেন, ‘বিএনপির বিরুদ্ধে মুখ্য ভূমিকা পালন করায় আমাকে পদ দেওয়া হয়েছে। কেউ ভাবে সেটা ভুল। মাঠে একা একা আন্দোলন হয় না।’

 

সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হবে: বিএনপি

গাড়িবহরে হামলা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বেদনাহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘এটা দুঃখজনক, নিন্দনীয়। একটি সত্য ঘটনাকে চাপা দিয়ে যুক্তদের বিচার না করে পদায়ন করা দেশের রাজনীতির জন্য দুঃসংবাদ। নিঃসন্দেহে এতে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হবে।’

এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন বিএনপির সুহৃদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি মনে করেন, ‘এসব ঘটতে থাকলে পুরো রাজনীতি কলুষিত হবে। মাস্তানরা আস্কারা পাবে এবং পাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ একটি পুরনো দল-সংগঠন। তাদের এসব অন্যায়গুলো এড়ানো উচিৎ।’

 

/এসটিএস/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।