রাত ১১:৩৬ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

কাঙ্ক্ষিত কাশ্মির

প্রকাশিত:

ফারজানা মনি।।

পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় টুরিস্ট স্পট কাশ্মির। বরফে আচ্ছাদিত হিমালয়ের শৃঙ্গ গুলো জড়িয়ে রেখেছে পুরো কাশ্মিরকে। পর্বত, নদী, উপত্যাকা সব মিলিয়ে কাশ্মির তুলনাহীন। কাশ্মির গেলে এর প্রেমে আপনি পড়বেনই। সময়ের সাথে সব প্রেম ধোয়াটে হয়ে যায় কিন্তু কাশ্মির কিছুতেই তা  হতে দিবে না, এই বুঝি তার পণ। দিল্লি বিমানবন্দরে যখন পৌঁছেছি আমাদের ফ্লাইটের তখনও দুই ঘণ্টা বাকি। আমার সফরসঙ্গী বিমানবন্দরে বিশ্রামের জন্য রাখা লম্বা চেয়ার পেয়ে ঘুম। আমি একা একা বই পড়ি। আর পাশেই চার্জে দেয়া মোবাইলের দিকে নজর রাখি। আমার আশেপাশেই যারা বসেছে তাদের বেশীর ভাগই মেয়ে। কি ভাষায় কথা বলছে তার কিছুই বুঝিনা। একটা সময় পর আলাপে জানতে পারলাম তারা সৌদি আরব থেকে এসেছে কাশ্মীর দেখতে। আমাদের সাথে একই ফ্লাইটে ওরাও শ্রীনগর যাবে।    

শ্রীনগর যখন পৌঁছালাম তখন প্রায় বেলা বারোটা। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে সবেই ছেড়েছে। বিমানবন্দর পথেই ইংরেজিতে লেখা পৃথিবীর স্বর্গে আপনাকে স্বাগতম। স্বর্গ-নরক বলে আদৌ কিছু আছে বলে আমার জানা নাই। তবে আমাদের এই জম্মু-কাশ্মির ভ্রমণে বারবারই মনে হয়েছে হ্যাঁ যদি স্বর্গ বলে কিছু থাকে তবে তা দেখতে কি এর থেকেও বেশী সুন্দর হবে! এর থেকে আর কি সুন্দর হতে পারে!আমাদের এই কাশ্মির ভ্রমণের কিছু অংশ আজ আপনাদের সাথে ভাগ করব।

হোটেল চেকইন করেই যেন তর সইছিল না বাইরে যাবার। ফ্রেশ হয়েই তাই বের হয়ে গেলাম। নতুন দেশ আবিষ্কার করবার জন্য অস্থির হয়েই ছিলাম। কিন্তু তার আগে খেতে হবে। সেই সকালে ফ্লাইটে কি খেতে দিয়েছিলো পরে তো কিছুই খাওয়া হয়নি। হোটেল থেকে আমাদের জন্য ট্যাক্সি ঠিক করে দিলো। খেয়েই আমরা ছুটলাম মুঘল গার্ডেন দেখতে,  প্রথমেই সামনে এলো নিশাত বাগ। ওখান থেকে গেলাম শালিমার বাগে সম্রাট জাহাঙ্গীর তার প্রিয় মহিষী নুরজাহানের জন্য তৈরি করেন এই বাগান। শ্রীনগরে দেখার আরও অনেক কিছু আছে তার মধ্যে নেহেরু পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন, শঙ্করাচার্য মন্দির। তবে শ্রীনগরের মুল আকর্ষণ ডাললেক। ডাললেকের ইচ্ছা করলে আপনি রাত্রি যাপন করতে পারেন। ওখানে থাকার জন্য অনেক হাউজবোট রয়েছে।

দ্বিতীয় দিন আমরা গেলাম গুলমার্গ দেখতে। ফার্সিতে গুল শব্দের মানে হোল ফুল। গুলমার্গ মানে হোল ফুলের উপত্যকা। শ্রীনগর থেকে এর দূরত্ব ৫৭ কিলোমিটার। শ্রীনগর থেকে গুলমার্গ পর্যন্ত যাবার রাস্তাটি আপনাকে মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। তবে আমাদের কাছে গুলমার্গ আকর্ষণীয় মনে হয়েছিলো এর কেবল কারের জন্য। কেবল কারে ওঠে ১৪ হাজার ফিট ওপরে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া করার কি উপায় আছে! ১৪ হাজার ফুট উপরে ওঠে জীবনে প্রথম বরফ দেখার মুহূর্তটা সত্যি অন্যরকম বলতেই হবে। সন্ধ্যায় যখন হোটেলে ফিরলাম লবিতে আলাপ হল এক ভারতীয় যুবকের সাথে। তার নাম ইমরান, তিনি এসেছেন মহারাষ্ট্র থেকে। তিনি বহুবার এখানে এসেছেন। তার অনেক টিপস আমাদের পুরো কাশ্মির ভ্রমনে অনেক কাজে লেগেছে। শুধু ইমরানই নয়, কখনও আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার, কখনো আমাদের সহযাত্রী বা কখনো হোটেল কর্মচারী নানাভাবেই আমাদের বিভিন্ন ভাবেই আমাদের যাত্রার টিপস দিয়ে সহযোগিতা করেছে। সবার নাম আমার এখন মনে পড়ছে না। তাদেরকে সকলকেই অনেক ধন্যবাদ।তাদের জন্যই আমাদের বেড়ানো অনেক সহজ হয়েছে ।

ছবির দেশ পেহেলগাম:

তৃতীয় দিন ভোরে আমরা ছুটলাম পেহেলগামের উদ্দেশ্যে। ওখানে আমরা এক রাত্রি কাটাবো এই ছিল পরিকল্পনা কিন্তু শহরটি আমাদের এতো ভালো লেগে যায় যে আমরা আরও একদিন থাকার সিদ্ধান্ত নেই। নাম না জানা সারি সারি পাহাড় আর লিডার নদী স্বাগতম জানালো পেহেলগাম। ছবির মতন দেশ বলতে আমি এখন বুঝি পেহেলগামকেই। বিশাল উচুউচু পাহাড় আর তার বাকে বরফ গলে আসা পানির নিচে গড়া পড়ার দৃশ্য চোখ থেকে সরানোই যায় না। আর তার সঙ্গে আছে পাইন গাছের সারি। পাইন গাছ যেন ছাতার মতন আগলে রেখেছে পাহাড়গুলোকে। আমার সফরসঙ্গী পেহেলগামে আজীবন থেকেই যেতে চাচ্ছিলেন!

তার স্ত্রীর সামনে এই কথা বলাতে এক ধমকেই মত পরিবর্তন করেন বলেন জানা গেছে। শ্রীনগর থেকে পেহেলগামের যেতে হলে ট্যাক্সি হবে একমাত্র ভরসা। বাসের মান তেমন ভালো নয়। আপনারা যদি ৪/৫ জন থাকেন পুরো ট্যাক্সি  ভাড়া করে নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সময় এবং অর্থ বেঁচে যাবে। কিন্তু যদি  ২ জন থাকেন পুরো ট্যাক্সি ভাড়া করা হবে একটু ব্যয়বহুল। আবার স্থানীয় মানুষ যেসকল শেয়ার্ড ট্যাক্সিতে করে চলাফেরা করে এগুলো একটু সময় নিবে গন্তব্যে পৌঁছাতে। আমরা শেয়ার্ড ট্যাক্সিই বেছে নিলাম তাতে করে আমাদের পৌছাতেই দুপুর হয়ে গেলো।  আমাদের খুব সৌভাগ্য যে আমরা খুব ভালো হোটেল পেয়েছিলাম। আমাদের হোটেলের পিছন দিকেই হচ্ছে লিডার নদী। আমরা যেসকল হোটেল থেকেছি সবই ইন্টারনেট থেকে পাওয়া। ইন্টারনেটে যে দাম লেখা ছিল তার থেকে কমেই পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমার দামাদামির পূর্ব-অভিজ্ঞতা খুব কাজে দিয়েছে। আবারও ফিরে আসি পেহেলগামে। পেহেলগামে সবচাইতে জনপ্রিয় বেতাব ভ্যালি, অরু ভ্যালি আর বৈশারন। হিন্দি সিনেমা বেতাবের শুটিং হয়েছিলো বেতাব ভ্যালিতে তাই এই স্থানের নামকরন করা হয়েছে এই সিনেমার নাম দিয়ে।পেহেলগাম নাকি হিন্দি মুভি শুটিংয়ের জন্য খুব জনপ্রিয়। আমরা একটা মুভির শুটিং হতে দেখলামও। পেহেলগাম গেলে অরু ভ্যালি না যাওয়া মিস করা মোটেও ঠিক হবে না। অরু ভ্যালি যাবার রাস্তাটি খুব সরু। জানালে দিয়ে বাইরে তাকালে প্রকৃতির অপরুপ রুপ দেখতে পাবেন। কিন্তু একটু নিচের দিকে তাকালে ভয়ে আঁতকে উঠতে পারেন। বৈশারন লেক আমরা যেতে পারিনি বৃষ্টির কারনে।আমরা শ্রীনগর ফিরে আসলাম ঠিকই। কিন্তু চোখজুড়ে তখনো পেহেলগাম মুগ্ধতা।  যারা পেহেলগাম যেতে চান তারা অবশ্যই কোন ট্র্যাকিং করবেন বা ক্যাম্পিং করেও থাকতে পারেন যদি আরও রোমাঞ্চকর যাত্রা চান। আমরা ট্র্যাকিং করিনি সময়ে স্বল্পতার কারনে।   

জম্মু-কাশ্মিরে দেখবার আছে বহু কিছু। তাই হাতে কমপক্ষে ১০ দিন সময় কিন্তু রাখতেই হবে। যদি কারও  ট্র্যাকিং করবার আগ্রহ থাকে তাহলে সে অনুযায়ী সময় করে নিতে পারেন। বাংলাদেশ থেকে বেশ দূরে কাশ্মির। কাশ্মিরে দেখবার আছে বহু কিছুই  যে নামগুলো না নিলেই নয় তার মধ্যে পেহেলগাম,গুলমার্গ, শোনমার্গ, লাদাখ অন্যতম। তবে যাবার আগে প্রতিটা স্থান সম্পর্কে জেনে নিন আগে। সেজন্য ইন্টারনেট হতে পারে আপনার সহজ মাধ্যম। গুগল থেকে ভারতের ম্যাপটাও ডাউনলোড করে নিতে পারেন। অনেক কাজে দিবে।

 

ছবি: এহতেশাম বিল্লাহ 

আরএফ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।