রাত ১১:১৬ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

বৈঠক চলে চলন্ত গাড়িতে-হাইওয়ে হোটেলে!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সালমান তারেক শাকিল।।

সরকারের নানামুখী চাপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে না জামায়াতে ইসলামী। তবে  সাংগঠনিক  সভা, সেমিনার ও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে বেছে নেওয়া হয়েছে নতুন কৌশল। এরই অংশ হিসেবে দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতা চলন্ত  গাড়িতে বসে সেরেছেন নীতিনির্ধারণী বেশ কয়েটি জরুরি সভা। এছড়া ঢাকার বাইরে হাইওয়ে হোটেলগুলোয়ও তারা জরুরি  বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন নিয়মিত। যদিও বৈঠকগুলোয় দলের সিনিয়র-অসুস্থ নেতারা অংশ নিতে পারেন না। দলটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।

সূত্রের দাবি, তীব্র প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছ জামায়াত। স্বাভাবিক তৎপরতা বাধাগ্রস্ত থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়ে নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বলে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা দাবি করেন।

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা মহানগর জামায়াতের সক্রিয় একজন কর্মীর সঙ্গে। যিনি বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবলয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানান, জামায়াতের বর্তমান শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা হলেন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ ও ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।

পুরানা পল্টনে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয়ে বসে এই জামায়াতকর্মী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী চার নেতা তাদের বৈঠকগুলো নতুন-নতুন নিয়মে করেন। এর মধ্যে নৌভ্রমনের নামে চলন্ত লঞ্চে, কখনও বড় নৌকায়, কখনও কোনও নির্দিষ্ট নেতার বাসায় বসে তারা সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করেন এবং সিদ্ধান্তও নেন।  তবে বেশিরভাগ সময় চলমান মাইক্রো বাস বা নোহা গাড়িকেই তারা বৈঠকের স্থান হিসেবে বেছে নেন। তিনি জানান, মোবাইল ফোনে আলাপকে বিপজ্জনক মনে করেন জামায়াতের এই নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এ কারণে যোগাযোগের এই মাধ্যমটিকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলছেন তারা। তবে কখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি সক্রিয় হলে ভাইবার, স্কাইপেও একে-অন্যের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বলেও তিনি জানান।

সূত্রমতে, এই নেতাদের কেউ কেউ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ঢাকার বাইরের হাইওয়ে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। খেতে-খেতে কেন্দ্রীয় নেতারা বৈঠক সেরেছেন আঞ্চলিক পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে। এর মধ্যে বিগত এক বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ‘উজানভাটি হোটেল’, হবিগঞ্জের ‘হাইওয়ে ইন’এ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে কুমিল্লা ও সিলেট জোনের নেতাদের সঙ্গে।

এ সব বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের দুই সদস্যকে প্রশ্ন করা হলে তারা দুজনেই হেসে ওঠেন। পেশায় একজন প্রকৌশলী, অন্যজন শিক্ষক। দুজনেই এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছা জানিয়েছেন। তবে তাদের দাবি, ‘সরকারের
উপর্যূপরি বাধায় কখনও কোনও সংগঠন থেমে থাকে না। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক স্বার্থেই সময়োচিত যেকোনও কৌশল গ্রহণ করতে হয় রাজনৈতিক দলকে।’

এদিকে, দলীয় বৈঠকের বাইরে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের  সঙ্গে লিয়াজোঁ মেনটেইন করেন জানায়াতের নির্বাহী পরিষদের প্রভাবশালী নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল মুহাম্মদ তাহের। পেশায় চিকিৎসক এই নেতা গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।  এর বাইরে কুমিল্লায় একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গবর্নিং বডির চেয়ারম্যানও তিনি।

সূত্র জানায়,  বিশ্বস্ত নেতাদের বাসায় বৈঠক অনুষ্ঠান একটি নিয়মিত বিষয় ছিল। তবে বাসায় বৈঠককে নিরাপদ মনে না করায় অনেকটা আউটডোর বৈঠকেই মনোযোগী ছিল জামায়াত নেতারা। সর্বশেষ, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মিরপুর পল্লবীর একটি বাসায় থেকে দলটির দুই গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষনেতা—মুজিবুর রহমান ও গোলাম পরওয়ার গ্রেফতার হন। এদিকে, জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অনেকে অসুস্থ  দলের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জোট ও বাইরের দূতাবাসগুলোর আনুষ্ঠানিক যেকোনও কাজে অংশ নিতেন। খালেদা জিয়া কোনও অনুষ্ঠানে অংশ নিলে তিনিও সেখানে যেতেন। সম্প্রতি তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি  জামায়াতের দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের এলাকাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতেন। তিনিও গ্রেফতার হয়েছেন মুজিবুর রহমানের সঙ্গে।

কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনিম আলম। সাংগঠনিক কার্যক্রমে সীমিত অংশ নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিবির নেতা। তার শারীরিক পরিস্থিতিও অনেকটা নাজুক।

দলীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল হালিম একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন। মুক্তিও পেয়েছেন। বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে বৈঠক, ২০ দলীয় জোটের বৈঠকগুলোয় নিয়মিত অংশ নেন। একটি মেডিক্যালের পরিচালক তিনি।

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রচার বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। তার শরীরের পরিস্থিতিও অনেকটা খারাপ। সম্প্রতি তার বুকের ব্লকে অপারেশন হয়েছে।

সর্বশেষ তথ্যমতে, তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জামায়াতের প্রচার বিভাগের দায়িত্ব তিনি দেখভাল করতেন। পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের মামলাসহ আইনীদিকগুলোও সমন্বয় করতেন।

সিলেট মহানগর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিয়মিত বিরতি দিয়ে তিনি গ্রেফতার হন। সর্বশেষ গত মাসের শুরুতে সিলেট শহরের একটি মসজিদ থেকে নেতাকর্মীসহ তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।