রাত ১০:৩৩ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গ্রন্থ হলো, বিষাদসিন্ধু || কামরুজ্জামান কামু

প্রকাশিত:

[বাংলা ভাষাভাষিদের পত্রিকা লোক-এর পক্ষ থেকে সম্প্রতি একটি আড্ডার আয়োজন করা হয় গত বছর লোক সাহিত্য সম্মাননাপ্রাপ্ত কবি কামরুজ্জামান কামুকে কেন্দ্র করে। 
কামরুজ্জামান কামুর ইতিমধ্যে ৫টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবি মুখপত্রহীন, অহেতুক গুঞ্জনমালা, মামুজির নৌকায়, নিগার সুলতানাচেয়ে আছো এবং শিশুতোষ গ্রন্থ তুনির কবিতা। এছাড়াও কামু অসংখ্য গান লিখেছেন। পাশাপাশি তিনি ফিল্মও তৈরি করেছেন। তার দি ডিরেক্টর  ছবিটি দীর্ঘদিন সেন্সরবোর্ডে আটকে থেকে সম্প্রতি প্রকাশের অনুমতি পেয়েছে। 
এই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন লোক সম্পাদক অনিকেত শামীম, কবি ফিরোজ এহতেশাম, কবি হিজল জোবায়ের, সংগীতশিল্পী পদ্ম এবং আড্ডার শ্রুতিলিখন করেন রিয়াজ উদ্দিন। শুরুতেই ফিরোজ এহতেশাম আলাপের সূচনা করেন।]

 

ফিরোজ এহতেশাম : আমার মনে হয় কামরুজ্জামান কামুকেই জিজ্ঞেস করি যে, কী ধরনের প্রশ্ন করলে উনি স্বস্তিবোধ করবেন।
অনিকেত শামীম : আমি ফিরোজ এহতেশামকে নিলাম এই কারণে যে, একই এলাকার দুজন মানুষ। একই সাথে বেড়ে উঠেছেন। শৈশব-কৈশোর না হলেও অনন্ত কবিতা লেখার শুরুর থেকে কামুর সাথে ফিরোজের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। 
ফিরোজ : আচ্ছা, আপনি কবি, গীতিকার, ছড়াকার নাকি ফ্লিম-মেকার, কোন পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেন?
কামরুজ্জামান কামু : কবিতাই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে লেখছি। ফলে আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় ধরে আছে কবিতা। এইটা প্রধান। এমনও হতে পারে যে পরে গিয়ে আমি আর কবিতা লিখলাম না, আমি হাজার হাজার গান লিখে ফেললাম, তখন হয়তো দেখা যাবে আমার গানটাই প্রধান হয়ে উঠলো। কিন্তু আমি প্রধান অর্থে কবিতা লেখছি। গান আমি যে খুব বেশি, কবিতার মত লিখে আসছি এরকম হয় নাই। আর একটাই কঁ লেন্থের ছবি বানাইছিলাম। আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হইছে কবিতার পিছনেই।
ফিরোজ : এই কবিতা লেখার শুরু করেন কীভাবে, কখন মনে হইলো কবিতা লিখব, কবিতার জগতে প্রবেশের অনুপ্রেরণা পেলেন কীভাবে?
কামু : ঠাকুরগাঁয়ের পীরগঞ্জে আমার বাবা চাকরি করতেন। ঐখানে ক্লাস সেভেন-এইট হবে, এই সময় কোনো একদিন কবিতা লিখছিলাম। সেই সময় জীবনানন্দের কবিতা ক্লাসের বইয়ে যেটুকু পড়ছিলাম, সেটুকু পড়েই আমার মনে হয়, ঐ কবিতা একটু সমসাময়িক, অন্যগুলা যেমন ছন্দে ছন্দে মিলিয়ে লেখা, এগুলো একটু আলাদা। আমার মনে হয়েছিল আধুনিক কবিতা বোধ হয় এই রকমই হয়। সেভাবেই আমিও একদিন কবিতা লেখা শুরু করলাম। প্রথম কবিতাটা আজ আর মনে নাই, তবে জীবনানন্দের মত করার চেষ্টা ছিলো । সে হিসেবে ক্লাস সেভেন-এইটে প্রথম কবিতা লেখা শুরু ১৯৮৫-৮৬ এর দিকে। 
শামীম : এই যে সেভেন-এইটের বয়সে কবিতার জগতে প্রবেশের পাশাপাশি,  নির্ধারিত পাঠ্যবই-এর বাইরে অন্য কোন পড়াশোনা করেছ?
কামু : আমার স্কুলের পেছনে ছিল সরকারি গণগ্রন্থাগার। সেই লাইব্রেরি থেকে নানা রকম বই পড়ার নেশা তৈরি হয়। দিনে ২-৩ টা বই পড়ে ফেলি। বাসায় পড়াশুনার ফাঁকে, ক্লাসের বই-এর নিচে অন্য বই রেখে পড়তে হতো। বাবা-মাকে লুকিয়ে পড়তে হতো। ঐ সময় অনেক বই পড়ছিলাম, এখন মনেও নাই তেমন। সেখানেই শামসুর রাহমান, আমি তো আগে জানতামই না যে, শামসুর রাহমানদের আবার আলাদা কাব্যগ্রন্থ বের হয়। আমি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল পড়তাম। ছোটবেলায় বিষাদ সিদ্ধু পড়ছিলাম। রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী তারপর নজরুলের সঞ্চিতা এগুলা ছিল বাড়িতে বাপ-মায়ের সূত্রেই। পরে ঐ লাইব্রেরির সূত্রে দেখি যে আরো অনেক আধুনিক কবি আছে। তাদের কাব্যগ্রন্থ আছে। সেগুলা পড়া শুরু করি। কিছু বুঝি না, কিন্তু দেখি যে অন্যরকম লাগে। সেখানে মোশারফ ভাই নামে একজন লোক ছিলেন, উনি ন্যাপ করতেন। বড় ভাই ধরনের, ওনার প্ররোচনায় আমি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হই। নানা রকম বিষয়ে আমার পড়াশোনা করতে হয়। ক্লাস এইট থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ছাত্র ঐক্য সমিতি করি সিরিয়াসভাবে। তখন আমার কাছে মনে হতো, বিপ্লব হবে। আমি টিফিনের পরে প্রতিদিন স্কুল পালাইতাম। পালায়া গিয়া বাপের মটর সাইকেল চুরি করে মোশাররফ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের স্কুলগুলাতে গিয়ে গিয়ে দল করছি। পরে দেখা গেছে যে কলেজে আমাদের দলে অনেক ছাত্র। তখন সিরিয়াসলি রাজনীতি করতাম। পরে এই সব রাজনীতির ব্যাপারে আর আগ্রহ থাকে নাই।
শামীম : কী জন্য রাজনীতির প্রতি অনীহা?
কামু : পরে এটাকে আমার ভাওতাবাজি হিসেবে মনে হইতে লাগল। ফলে আর রাজনীতির দিকে ঝুঁকি নাই। এমনকি সংবাদপত্রও খুব একটা পড়তাম না। ঐ সময়টাতে কবিতাটবিতা পড়তাম। 
হিজল জোবায়ের : আপনার প্রথম বই কবি মুখপত্রহীন-এর আগের লেখাগুলির কী অবস্থা?
কামু : সেগুলা তো আমি বেরই করি নাই।
হিজল : এই যে সিরিয়াসলি আপনি নিজের ওরিয়েন্টেশনটা দাঁড় করাইতেছেন, যে আমি লিখব, বা আমার জিনিসটা প্রচারিত হবে, সেই প্রিপারেশন বা সেই লেখালেখিটা কোন সময় থেকে?
কামু : নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে আমার সাথে মাসুদ খানের দেখা হয়। পশ্চিমবঙ্গের কবিদের সাথে পরিচয় আমার হয় আসলে মাসুদ খানের মাধ্যমে, জয় গোস্বামী, রণজিৎ দাশ। ছন্দের ব্যাপারে ছোটবেলায় আমি যতটুকু জানতাম, পরে দেখলাম যে, না, ছন্দটা আরো অনেক বড় একটা বিষয়। মাসুদ খানের সাথে মিশতে মিশতে এইটা আমার হইছিল।
হিজল : মাসুদ খানের সাথে কোথায় দেখা হইছিল? বগুড়া, গাইবান্ধা নাকি?
কামু : কুড়িগ্রামে দেখা হইছিল। পরে যখন আমি কারমাইকেলে পড়ি, তখন উনি রংপুরে বদলি হয়ে আসেন। সেই সময় ফিরোজ, শাহীন, মাসুদ খানও ছিলেন আমাদের সাথে। এই সময়ের চর্চাগুলো থেকেই আমি বই বের করি। ইন্টারমিডিয়েটের আগে আমি অনেক কবিতা লিখছিলাম, সেগুলা হারায়া গেছে।
শামীম : তাহলে এই যে কবিতার ছন্দের বিষয়ে পূর্বের থেকে যে ধারণা ছিল, মাসুদ খানের সাথে পরিচয়ের সাথে সাথে কবিতার আড্ডা দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ছন্দের বিষয়ে আরো ব্যাপকভাবে জানা হলো, তাই তো?
কামু : তখন এই বিষয়গুলাতে আমার আরো আগ্রহ তৈরি হইলো। তখন আমি নিজের মতো করে এগুলা লিখতে থাকলাম। আমি যতটুকু জানতাম একটা প্রান্তিক অঞ্চলে বাস করা মফস্বলের ছেলে হিসাবে। রাজধানীকেন্দ্রীক সাহিত্যকে জানা ও পড়া আমার মাসুদ খানের সাথে পরিচয় হবার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।
হিজল : আপনার নিজস্ব যে কাব্য ভাবনা, যেটা আমরা বলি কামু প্রণীত, অর্থাৎ যে ধরনের ভাষা বা টুলস দিয়ে কবিতা লিখছেন সেটা কি মাসুদ খানের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে নাকি, সেই সময় অন্যান্য যারা লিখছিল তাদের খেলা পড়ে আপনার নিজস্ব একটি জায়গা তৈরি হয়? এটা আপনি কিভাবে করছেন?
কামু : আমি যখন মাসুদ খানের সূত্রে ঐ কবিদের পড়তে শুরু করলাম, জীবনানন্দ তো আগেই পড়া ছিল, দেখা গেল আমার প্রথম বইটাতে বিনয় মজুমদার, কখনো রণজিৎ দাশ, এই যে পশ্চিমবঙ্গের কবিদের প্রভাব, ওই সময় আমার উপরে পড়ে। পরবর্তীতে অহেতু গুঞ্জণমালায় আমি সেটা থেকে বের হতে চাই। বের হতে গিয়ে আমি আবার পুরানা পয়ারের মতো করে, অর্থাৎ জীবনানন্দের আগের যে সুরেলা পয়ার, সেই রকম করে কিছু পয়ার লেখলাম। এগুলা অহেতু গুঞ্জণমালায় আছে। আমি আসলে অন্য কী করা যাইতে পারে তার খোঁজ করতে থাকলাম। ঠিক পয়ার লেখায়, অর্থাৎ এই সময়ের একজন কবি আগের মতো সুরেলা পয়ার লিখে যাচ্ছে, তাতে তো আর তৃপ্তি হয় না। এই সময় ধরেন যে আমার সমসাময়িক অন্যদেরও লেখা পড়তেছি। একটু আগের ব্রাত্য রাইসুর কবিতার প্রভাব আমার উপরে পড়ে, কবিতায় হাস্যরস যুক্ত হয়। বাংলা কবিতায় হাস্যরস আগে ছিল, মধ্যযুগে। কিন্তু তিরিশের পরে (অবশ্য জীবনানন্দে আছে) আর হয় নাই। আরেকটা জিনিস, নিকানোর পাররা পড়ে আমি এক ধরনের স্টান্ট হয়ে গেলাম। এরকম থ্রোয়িং, এত সোজাসাপ্টা চাবুকের মত লাগছে, কোনো অলংকার নাই, নিরলঙ্কার স্ট্রেইট বলে যাওয়া, এটা আমাকে আকৃষ্ট করে, ফলে এটারও একটা প্রভাব পড়ে। আমার অহেতু গুঞ্জণমালায় দুইটা পার্ট আছে। একটা পার্টের কবিতাগুলো দেখা যাবে যে ওই রকম। 
হিজল : আপনার কবিতার যে টেন্ডেন্সি, অর্থাৎ সিরিয়াস কথাগুলা তামাসার ভঙ্গিতে বলা।
কামু : এখানে পুরাটাই যে তামাশা, তা কিন্তু নয়, কবিতার ভিতরে একটু হেসে ওঠার স্পেস পাওয়া, টানা গাম্ভীর্য ধারণ করে আছে, কেমন যেন বোরিং লাগে। এই জিনিসগুলা কিন্তু অন্য অনেকের কবিতাতেও পাওয়া যায়। এই প্রবণতা আমার মধ্যে আসলো, এবং দ্বিতীয় বইটাকে অন্য একটা চেহারায় দাঁড় করালো।
হিজল : এখানে আমার একটু জানার আছে, যে, এই প্রবণতাটা যে আপনাকে নাড়া দিলো, বা এইটাতে আপনি আকৃষ্ট হলেন, এটা কি আপনার মধ্যে ছিল নেচারালি?
শামীম : ও বলতে চাচ্ছে যে এটা কি স্বতস্ফূর্তভাবে তোমার মধ্যে ছিল, নাকি পরে রাইসু বা অন্যের কাছ থেকে পাওয়া?
কামু : আমি আমার সমসাময়িক যাদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হইছি তার মধ্যে রাইসু গুরুত্বপূর্ণ, গোমেজ গুরুত্বপূর্ণ মাসুদ খানও গুরুত্বপূর্ণ। আমার বই কিন্তু একেকটা একেক রকম। অহেতু গুঞ্জনমালা বইটার মধ্যে যে লেখাগুলো, সবই নবইয়ের দ্বিতীয়ার্ধের দিকে লেখা। তারপর কিন্তু আমার সাহিত্যিক যাত্রাটা ঐভাবে গতিশীল থাকেনি।  জীবনের অস্থিরতার কারণে আমার কিছু ধরে রাখা হয় নাই। আমার সুশৃঙ্খলভাবে পড়াও হয় নাই। এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে, মাঝে মাঝে কোথাও থেকে বিশেষ কোনো সংখ্যার জন্য লেখা চাইল। আমি লিখে দিলাম। এরকম করে দশ বছর ধরে লেখা কবিতা দিয়ে আমার তৃতীয় বই মামুজির নৌকায়। অনেকে মনে করেন, এইটা আধুনিক কিছু হইল না, বা এইটার গুঢ় কোনো অর্থ নাই। হয়ত গুঢ় কথা কিছু বলতে যাই, আবার ধাম করে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যে মনে হচ্ছে যেন এইটা কী কবিতা লেখলো, একটা ফালতু জিনিস। একটা সময়কে বা একটা গতিকে নিয়ে যে একটা খেলা, এই খেলাটা আমার এই ভাবেই খেলতে ইচ্ছা করছিল। পাঠককে একটা জায়গায় নিয়া, ধাম করে একটা আপাত স্থুল কিছু বলে দেওয়া। পাঠকের জন্যে একটা কেমোফ্লেজ তৈরি করা। এমন একটা লাইন বলে দিলাম যে, তুমি যাতে ইজিলি বলতে পারো যে, একটা স্থুল জিনিস এইটা। তুমি যদি ভাল করে লক্ষ করতে থাকো, তাইলে দেখবা যে, না না উনি তো খালি এইটাই করতেছেন না। তখন তুমি আসল জিনিসটা বুঝতে শুরু করবা, যে কেমনে কেমনে কইরা খেলতেছে। এই বইয়ে যে পয়ার ব্যবহার করা হইতেছে সেটাও কিন্তু লক্ষ করার দরকার আছে। অল্প মনোযোগী পাঠকের পক্ষে এই বই পড়ে দিগভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। খেয়াল কওে পড়লে বইটা তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে।
শামীম : ঢাকার কবিতার জগৎটা তো অত্যন্ত কঠিন জগৎ। এখানে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। ঢাকা শহরে  একটা রিক্সা আরেকটা রিকশার পিছনে লাইগা থাকে, আামদের কবিতার জগৎটাও অনেকটা এইরকম। সে ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, কামু যেভাবে সহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশের দুইটি বড় দৈনিক ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলো থেকে, এইটা কেমন করে পাইছ? তোমাকে কীভাবে তারা গ্রহণ করছে এবং অনেকেই বলে থাকে যে, কামু খুব আনুগত্য পেয়েছ পত্রিকা থেকে। এক্ষত্রে তোমার প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য কী? বিশেষ করে যেহেতু একজন কবি ছিলেন সেখানে, সাজ্জাদ শরিফ। তার সাথে একটা বন্ধু বা বড় ভাইসুলভ সম্পর্কের কারণে এইটা আরো বেশি হয়েছে। এটা কীভাবে তুমি ব্যাখ্যা করবে।
কামু : আমি যদি একটা সাহিত্য পত্রিকা করি তাহলে সেখানে আমার কাছে যাদের কবিতা ভাল লাগবে আমি তাদেরটাই বড় কইরা ছাপাব। আমি কিন্তু আমার মামাতো ভাইকে দিয়া কবিতা লেখায়া তাকে বাংলাদেশের শামসুর রাহমান বানায়া দেওয়ার চেষ্টা করব না। সাজ্জাদ ভাইও সেরকম কোনো চেষ্টা করছেন বলে মনে করা যায় না। ওনাকে কি আমরা সেই ধরনের মনে করি? না, তার একটা রুচি আছে। আমার কাব্যভাষা হয়ত তাকে বেশি আলোড়িত করছে। এইরকম ভাবেই ঘটছে ঘটনাটা। আমারটা ওনার ভালো লাগছে। এইরকমই তো হওয়ার কথা। আরেকজনেরটা তার ভাল লাগতেছে না, তার কাছে সেটা কম ছাপা হবে। ছাপা না হইলেই সেই কবি আমার থেকে ছোট কিনা, সেটা আলাদা বিষয়। তুমি হয়ত কারো নাম বললা, যে ওনাকে তো নিতে পারত। এইটাও তো বলা যায় না। কারণ দেখা যাবে, হয়ত ওনার ম্যাচ করলো না। এইটা হলো ম্যাচ করার ব্যাপার। যার সাথে যার ম্যাচ করার ব্যাপার।
শামীম : অপপ্রচার আছে যে, আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলো একেক সময়  একেক জনকে স্টার বানায়। বিষয়টি তাহলে সেই রকম না, হয়ত তোমার কবিতার প্রবণতার সাথে তার বিষয়টি মিলে গেছে। তিনি সেটা পছন্দ করেছেন। যে কারণে তোমাকে তিনি বেশি জায়গা দিচ্ছেন।
কামু : স্টার বানানোটা সে রকম হইতে পারে। যদি তোমার স্টার বানানোর দরকার পড়ে, তাইলে তোমার স্টার বানানোর জায়গায় তুমি তোমার যেটা বেশি শক্তিশালি মনে হবে সেটাকে স্টার বানাবা। ভাই, আমার স্টার বানানো লাগবে, এখন যদি ২/৪ জন থাকে, তখন আমি কী করবো? দেখব যে এর শক্তি আছে, এ-ই স্টার হইলে আমার ভালো হয়।
পদ্ম : শামীম ভাইয়ের জায়গাটা কি এরকম যে কামরুজ্জামান কামুর লেখা রুচিগত সমর্থন ছাড়াই, তাকে চেষ্টা করা হইছে স্টার বানানোর, নাকি টেক্সট-এর উপর ভিত্তি করেই বানানো হইছে? আপনার কী মনে হয়?
শামীম : না, টেক্সেটের উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত হলো ঐ সময় হয়তো আরো অনেকেই ছিল পটেনশিয়াল, সেখান থেকে হয়ত কামুকেই করা হয়েছে।
হিজল : শামীম ভাই বলতে চাচ্ছিল যে, স্টার বানানো বলতে ওনার মনে হয়, যিনি যাকে স্টার বানাবেন, সেই স্টার যাতে ওনার অনুগত থাকে, এক কথায় এটাই বোঝায়। আমার কন্ট্রোলের লোকগুলাকে আমি স্টার বানাব। আপনাকে স্টার বানালে তারও লাভ আছে। শামীম ভাই মনে হয় এটাই বোঝাতে চাচ্ছিলেন।
শামীম : এই কাজটা যিনি করবেন উনি তো তার অবচেতন মনে এটা লালন করবেনই।
হিজল : আপনাকে স্টার বানালে সাজ্জাদ শরিফের কোন লাভ ছিল কি না? এই লাভটা কি তার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে, না একটি বড় প্রতিষ্ঠানের জায়গা থেকে? যেহেতু এটি মেইন স্ট্রিমের জিনিস, তাদের যেটা বেশি চলতেছে বা যেহেতু দৈনিকটি বাজারে বহুল প্রচলিত, সেহেতু সে কিন্তু ঐ রকম জিনিসই বাজারে দেবার চেষ্টা করবে। সাথে সাথে তাদের নিজের জিনিসও খাওয়াইয়া দিবে, কিন্তু কিছু বেসিক জিনিস তার থাকবে, বড় পত্রিকার বড় জিনিসই থাকবে। 
হিজল : শামীম ভাই এর প্রশ্নের উত্তর আপনি অলরেডি দিয়া দিছেন। এই প্রসঙ্গে আরো আসতে পারে যে, শামীম ভাই আনুগত্যের একটা প্রশ্ন আনছিল। আপনাকে কি কোনো ব্যক্তিত্ব বিসর্জন, বা আরোপিত আনুগত্য, বা কোথাও আত্মসমর্পন, বা ছাড় দিতে হইছে, যেটা আপনার সাহিত্যের ক্ষতি করছে? এরকম কি কিছু করতে হইছে? এই প্রবণতাগুলা বা এই গোষ্ঠীবদ্ধতাগুলাকে কিভাবে দেখব, বা আপনি কীভাবে দেখেন আসলে? 
শামীম : হিজল যে প্রশ্নটা করছে আমার হয়ত পরবর্তীতে এই প্রশ্নটাই থাকত। হিজল খুব পরিষ্কারভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করছে। পরিষ্কারভাবে বললে এই যে আনুগত্যের জায়গাটা। 
কামু : তুমি যাদের লেখা ছাপাও বা পুরস্কার-টুরস্কার দিচ্ছো, তুমি তাদের কাছে কী ধরণের আনুগত্য আশা কর? আনুগত্য কী? মানুষের সম্পর্ক, কোনো সম্পাদক আমারে ছাপতেছে, তার সঙ্গে তো একটা সম্পর্ক রচিত হয়। আমরা জীবনভর কবিতা লিখতে লিখতে পাঠকের সাথেও তো একটা সম্পর্ক রচনা করি। সম্পর্কটা ধীরে ধীরে রচিত হয়। এর মধ্যে আনুগত্য কী? এতে ভালোবাসা থাকে, পারস্পরিক প্রয়োজনও থাকতে পারে। সম্পাদকের যেমন লেখার প্রয়োজন থাকে, আবার লেখকেরও একটা সম্পাদিত পত্রিকা থেকে প্রকাশিত হওয়ার প্রয়োজন থাকে। সেটা তো সর্বক্ষেত্রে একই রকম। এখানে প্রশ্ন হলো এতে আমার স্বকীয়তা বা আমার ব্যক্তিত্বের কোন ক্ষতি হয় কী না। আমি তো দেখছি যে আমার কবিতায় কখনো কখনো এমন কিছু শব্দ থাকে, যা হয়তো যে কোনো দৈনিকেই, বা যে কোন মাস-মিডিয়াতেই প্রচার করা মুশকিল হয়ে পড়ে।
ফিরোজ : আপনার ‘সীমান্ত’ কবিতার গল্পটা বলেন। 
কামু : বুলবুল সরোয়ার বলে আমাদের এক বন্ধু আছে, দেখা নাই অনেকদিন। কবিতা লিখত, তো ওনার সাথে আমাদের দেখা হইছিল, উনি ওইদিকে চাকরি করতেন। গাড়িতে করে ওইদিকে যাইতেন, উত্তরের দিকে, আমাদেরকে নিয়ে-টিয়ে যাইতেন, আমরা হইলাম গিয়া ছাত্র-টাত্র বেকার-টেকার ব্যক্তি, ভালো খাওয়ায়, নিয়ে যায় গাড়িতে করে, ঘোরায়, আমরা বর্ডার দেখতে পারতেছি, তিনবিঘা করিডোর ঘুরে আসতে পারতেছি। বোঝোনি কেসটা? আমরা খুশিতে চলে যাইতাম, তো ওই তিনবিঘা করিডোর ওইবার গেছি, কবিতাটা ওইখানে আমার মাথায় আসল। ফিরে এসে, বাসায় বসে লেখছি। সীমান্ত। মানে সীমান্তে গিয়ে আমার একটা ওইরকম অনুভূতি হইছিল। ওইটাই লেখছি, একদম সরাসরি। কবিতাটা উচিৎ ছিল বুলবুল সরোয়ারকে উৎসর্গ করা। 
হিজল : বুলবুল সরোয়ার অনুবাদও করে না? ওই ভদ্রলোক?
শামীম : বুলবুল সরোয়ার কি জামায়াত করত একসময়?
কামু : আমি শিওর না। একসময় রাজনীতি বিষয়ে অনাস্থা চলে আসে আমার ভিতরে, তারপরে আমি আর নতুন করে রাজনীতি শুরু করি নাই, ফলে নানারকমের লোক আসত, এদের নানারকম পরিচয়, আমি শুনতে-টুনতে চাইতাম না। কে আওয়ামী লীগ করে, কে বিএনপি করে, কে জামায়াত করে, কে কী, এগুলো আমি শুনতে-টুনতে চাইতাম না। আমরা যখন রংপুরে থাকতাম, আমাদের পাঠক বলে একটা দোকান ছিল, সেখানে বুলবুল সরোয়ার আসত, মাসুদ খান আসত, মাসুদ খানকেও আমরা কখনও জিজ্ঞেস করিনি, আপনি কোন পার্টি করেন। আমরা কবিতা করতাম, কবিতা লিখতাম, পার্টিটা করি নাই। এই আর-কী। পরে শাহেদ শাফায়েত আসল, তাকেও আমরা কখনও জিজ্ঞেস করিনি, তুমি কোন পার্টি কর, এরকম আর কী। এ ধরনের বাস্তবতার ভিতর দিয়েই আমরা আসছি। 
শামীম : যেমন ধর, আমার অনেক হিন্দু ধর্মের বন্ধু আছে, বহুদিন পরে আমি জানছি যে ও হিন্দু ধর্মের। 
হিজল : হ্যাঁ সেটাই, ধর্মের কারণে যেমন বিভেদ রাখা যাবে না, রাজনৈতিক কারণেও বিভেদ রাখা যাবে না। 
ফিরোজ : মানে, আপনার কাছে শুধু মানুষ পরিচয়টাই মুখ্য। 
শামীম : তোমার ভিতরে ধর্মচেতনা, ছোটবেলা থেকেই, যেমন ধরো, আমরা যারা মুসলিম পরিবারের সন্তান, আমাদের বাবা-মা মুসলিম দেখে আমরা মুসলিম। তো আমাদের ছোটবেলায় যেটা হয়, বাবা-মা’র সাথে...
কামু : ধর্ম বিষয়টা নিয়ে আমরা কথা না বলি, সেনসেটিভ ইস্যু, আমরা মুসলমান ঘরের সন্তান, ছোটবেলায় হাসান-হোসেনের কাহিনী শুনে, আমাদের বাপ-মায়েরা, দাদিরা, আমার দাদা ছিলো বিষাদসিন্ধু পড়ার ওস্তাদ লোক। অত্রাঞ্চলে বিষাদসিন্ধু পড়ে বিরাট তারকাখ্যাতি ছিল তাঁর। উনি পড়তেন, অন্দরের মহিলারা হু হু করে কান্নায় ভেসে যেত। পরে এই প্রক্সি আমাকে দাদা মারা যাবার পরেও আমার দাদির জন্যে দিতে হইছে, শোনাইতে হইতো।
হিজল : যার ফলে উনি ওই ঐতিহ্য থেকে বের হওয়া। 
ফিরোজ : ওই থেকেই আপনি পয়ার লিখছেন?
কামু : হ্যাঁ, ওটা থেকেই। এই যে পয়ার-ময়ার যে আমি লিখছি, এগুলো কী? এগুলা এমনি-এমনিই ছিলো আমার ভিতরে। কিন্তু আমি কথাগুলা পাল্টে দিছি। পাল্টে দিয়ে ফুংফাং কথা দিয়ে দিছি ওর ভিতরে। যেমন ধর, ওখানে মুসলমানদের বড় বড় কাহিনী বলা হচ্ছে, হাসান-হোসেন-ইয়াজিদ বিশাল যুদ্ধ। বড় ব্যাপার। সেখানে আমি শুরু করলাম কীরকম? হয়তো আমার যৌনচেতনার কথা বললাম।
পদ্ম : আপনার ব্যাপার হলো, নিগার সুলতানার ভিতরে এ কার হৃদয়ের কাজল গ’লে যায়, এই কবিতার ভিতরে কিন্তু সেই স্মৃতিটার কথা আছে, সাথে আপনার আরও কিছু কথা আছে। ওই সময়টার স্মৃতি বলেন।
কামু : হাসান-হোসেন আমি ওখানেই পাইছি। হাসান-হোসেনের মতো করে জবাই করার সেই দৃশ্যটা। 
শামীম : পদ্ম একটা ভালো টার্ম নিয়ে আসছে। ওইটা কোন বইয়ে আছে?
পদ্ম : নিগার সুলতানায়। 
কামু : বিষাদসিন্ধুর প্রভাব আমার জীবনে, আমার ব্যক্তিত্বে, আছে কীভাবে? টেক্সট হিসাবে নয়, বিষাদসিন্ধুর ব্যবহারিক মূল্য, সমাজে এটার প্রচলন, যে সমাজে এটার প্রচলন আছে, সেই সমাজের একটা কিশোর চরিত্র, কেমন করে দাদার সাথে নাতি বেড়ে ওঠে, এবং সেই নাতি যখন আবার গায়ক বা কবি বা ওরকম জাতীয় কিছু একজন হয়, তখন সেটা বোঝা যায়। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গ্রন্থ হলো, বিষাদসিন্ধু। 
পদ্ম : নিগার সুলতানা বইটায় আপনার সেই স্মৃতিগুলো বা সেই ছায়াটা অনেক তীব্র, যে ওই বইয়ের ভাষা মহাকাব্যিক একটা ব্যাপার। ওটার মধ্যে ... 
কামু : নিগার সুলতানা বইটার ভিতরে একটা সুরেলা ব্যাপারের চর্চা করছি বার বার। আরও অনেক করতে পারলে হয়তো একটা চেহারা দাঁড়াতো, কিন্তু আমার জীবন অতটা অবকাশ দেয়নি আমাকে। খুবই অস্থিরতার ভিতরে থাকতাম, টাকা-পয়সার জন্যে। ফলে এসব সুশৃঙ্খলভাবে আরও বড় চেহারায় তৈরি হয় নাই। 
পদ্ম : কামু ভাই, আপনি তো ফুংফাং কথা বলেন কবিতার মধ্যে। যেমন, গভীর একটা ভঙ্গি নিয়ে আসলেন, আইসা হঠাৎ কইরা ঝড়টা মাইরা এমন একটা রসিকতা করে ফেললেন, মানুষ কিন্তু একটু ভ্যাবাচ্যাকা খা’য়ে যায়, যেমন নতুন পাঠক। এরকম হয়তো আপনার মামুজির নৌকা’র মধ্যেও আছে। কিন্তু মামুজির নৌকার মধ্যে সিরিয়াস কবিতাও আছে। নিগার সুলতানায় আইসা আপনি ওই ভঙ্গিটা যেন, আপনার ওই প্রথম বই...
কামু : নিগার সুলতানাটা কী, আমি একটু বলি– নিগার সুলতানাটা হইল, দশ বছর ধরে কবিতা মাঝেমধ্যে, হঠাৎ করে লিখে লিখে একটা বই বের করলাম, মামুজির নৌকায়। তবে হ্যাঁ, বেশ কয়েকটা কবিতা টানা একটা সময় লিখছি। এইরকম একটা অবস্থায়, একটু জীবনে লাফাঙ্গাপণার উদযাপন, এইসেই বিষয়াদির মধ্যে আমি ঢুকছিলাম, অনেকদিন কবিতা আমি পড়িও নাই, লক্ষই করি নাই। পরে মনে হলো, আচ্ছা, আমি তো কবি! আমার কী এমন কবিতা লেখা হলো! একজনকে জিগ্যেস করলাম যে, আচ্ছা, সবচেয়ে বেশি পড়ে কোন বই মানুষ? কী ধরনের বই? হ্যাঁ, বলল যে, প্রেমের কবিতা। আমার কথাটা কেন যেন সত্যি মনে হলো। আমি প্রেমের কবিতা লিখতে শুরু করলাম। নিগার সুলতানা হলো, ওই যে মধ্যযুগের প্রেমোপাখ্যানগুলা ছিলো না? ওগুলা টানা একধরনের একটা উপাখ্যান, এর ভিতরেও না একটা উপাখ্যান আছে, প্রেমের উপাখ্যানের মতো তৈরি করার একটা চেষ্টা। ওই সময়ের ওইরকম, বা আগের থেকে চালু গল্পকে ইয়ে করা, এটা তো আর এখন করলে হয় না, এখন যদিও একইসঙ্গে আমি মডার্নও আবার হয়তো মডার্ন অনেককিছু আমি করতেছি না। হয়তো ক্লিশেপনার জন্য আমি ভঙ্গিগুলা গ্রহণ করতে চাচ্ছি না। তখন আমি হয়তো নানাকিছুই করতে চাচ্ছি, কখনও কখনও জাস্ট, যে জিনিসগুলাকে এই আধুনিক সমাজে বা দৃষ্টিভঙ্গিতে রিজেক্ট করা হচ্ছে, সেই জিনিসগুলাকে আমি ডিল করতে চাই। আমার সিনেমাতেও সেরকমই হইছে, আসলে আমি একজন কবি, স্বভাবতই আমি হব যে, মধ্যবিত্তের, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রুচির একটা জায়গায় থাকার কথা। আমার ছবিটা যে কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক ছবি, আবার দেখা যাচ্ছে আমি নিচের ক্লাসের রুচির, যে বাংলা সিনেমার নায়িকা এনে একধরনের যে গান-ড্যান্স, ওই টাইপগুলো নেওয়া, তখন আবার এই শ্রেণিতেও একটা ঝামেলা হচ্ছে, এই কাজগুলি কিন্তু আমার কবিতাতেও আছে, আমার যদি ছবি না হয়, তাহলে এক হিসাবে কবিতাও হয় নাই। 
পদ্ম : আমার মনে হয় যে, আপনার মামুজির নৌকা, এই কবিতার বইয়ের সাথে আপনার সিনেমার খুব মিল। যেমন আমার মনে আছে, আপনি বাণিজ্যের স্বাদ এবং গোল্ডের বিজনেস, আমার সামনে আপনি ব্যবসার প্ল্যান করলেন, যে ব্যবসা করব এবং ব্যবসা করে কত টাকা ইনকাম হবে, এটা দিয়ে কী করব, প্ল্যান করে নগদে কবিতা লিখে ফেললেন। সিনেমাটাও আপনার এরকম। লাগাতার ভঙ্গিতে সিনেমা বানাইছেন, যা যা মনে হইছে, গভীর-অগভীর, বাস্তব-অবাস্তব যা যা মনে হইছে, একজন বলছেন আমি ড্যান্স দিব, তারে আপনি ড্যান্সের দৃশ্য বানায়ে দিছেন, র‌্যান্ডম একটা যে স্বতস্ফূর্ততা, যে একটা সাহস র‌্যান্ডমলি কাজ করা। মামুজির নৌকার সাথে কিন্তু দি ডিরেক্টরের মিল আছে। এরপরে এসে যে নিগার সুলতানা বইটা আর আপনার প্রথম বইটা, কবি মুখপত্রহীন, যে ক্ল্যাসিক ভঙ্গি, একটা বিস্তৃত ব্যাপার ছিলো, দৃশ্যগুলো না ভেঙে দেয়া, দৃশ্যগুলোকে আগায়ে নিয়ে যাওয়া, টেনে নিয়ে যাওয়া, কিন্তু মামুজির নৌকায় আপনি ভাঙছেন, গড়ছেন, কোলাজ বিষয়গুলো বেশি আসছে, ভেঙেচুরে, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাওয়া, উইথড্র করা, কিন্তু  নিগার সুলতানায় এসে আপনি যেন একটু শিথিল হয়ে গেলেন, নিজেকে...
কামু : এই যে শিথিল হয়ে গেলাম না? এটা হলো, ওই যে দশবছর কবিতা লিখতে পারি নাই, তারপর আমার কবিতা লেখার সাধ হইছে আবার। মনে হইছে আমাকে কবিতা লিখতে হবে। তারপরে আমি কবিতায়, প্রেমের কবিতার ভিতর দিয়ে, কবিতায় প্রবেশ করার চেষ্টা করছি। নিগার সুলতানা আমার সেই বই। কিন্তু ভিতরে ঢুকে আবার থাকতে পারিনি আমি। এই যে বাস্তব জীবন, এইসেই, সিনেমার পিছনে দৌড়, এইসেই।
শামীম : কামুর এই পাঁচটা বইয়ের মধ্যে আসলে কিন্তু একটু বিভাজন করা যায়... 
কামু : নিগার সুলতানা আসলে অনেকদিনের পরে একটা ফেরা। আমি চেষ্টা করছি বাঙালির কাছাকাছির, বাংলাদেশের চেহারার একটা বই, এরকম ভাবছি, সেখানে, এই যেমন সুরেলা করার চেষ্টা করছি, যে আচ্ছা, সারাদেশের যে গানের লেভেলের কবিতাও গ্রামগঞ্জে তৈরি হয়, যেগুলো সুরে সুরে পড়ে। ওরকম একটা জায়গায় দেখার চেষ্টা করছি। আবেগকে, আবেগের বাহুল্যকে, তোমার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নেগেটিভ হিসেবে দেখা হয়, হ্যাঁ, আমি এখানে আবেগে গদগদ হবারও চেষ্টা করছি অনেক সময়। আবেগের একটা তীব্র প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করছি যে, কান্নাকাটিমূলক বই একেবারে। এই বই পড়তে গেলে, মানে ফিল করে করে পড়তে গেলে তোমার কান্না পাবে। 
পদ্ম : কিন্তু এরপরের দৃশ্যটা আমি বলি...
কামু : এই কান্নাকাটি কিন্তু ছিলো না আমার। এই বইটা একটা আলাদা বই আমার। 
পদ্ম : এবং এরপরের বইটা, চেয়ে আছো, আমার কাছে মনে হয় এই বইটাও আলাদা, এই বইটাতে আপনি কোলাজ থেকে বের হয়ে আসছেন, আমার কাছে তাই মনে হইছে। এবং গল্পের মতো করে বলে গেছেন। একটি স্পষ্ট দৃশ্য নির্মাণ করছেন। এই টেন্ডেন্সিটা আপনার ভিতরে, অতি-বাস্তবতা কিন্তু বেশি মাত্রায় দেখা গেছে। এই বইটাতে হঠাৎ করে আপনি খুব সাধারণ জীবনের, খুব শান্ত, এবং খুব স্বাভাবিক জীবন নিয়ে কথা বলছেন, বিষয়গুলো কোলাজ না, একটা সিনেমার মতো। 
কামু : একদম শান্ত, দুইএক জায়গায় যদিও একটু অস্থিরতা, খুবই তীব্র লেভেলে চলে গেছে, সেটা হয়তো আগের রেশ, এই বইটা মোটের উপর একটু শান্ত মেজাজের। 
হিজল : সরাসরি একটা প্রমাণ্যতা তৈরি করা, নিজের কোনো কিছু আরোপ না করে, একদম যা তাই।
শামীম : এবং আমার কাছে যেটা মনে হয়, তার শেষ বই, চেয়ে আছো’র যে প্রবণতা, এই প্রবণতা একেবারে সরাসরি চেয়ে আছোতে উঠে আসেনি, এই প্রবণতা আমরা টের পাচ্ছি তার মামুজির নৌকা থেকে। সহজ-সরল ভঙ্গিতে দৃশ্যময় কিছু কথাবার্তা, কোনো আড়াল নাই, যাকে বলা হচ্ছে, একেবারে সাদামাটা অর্থেই বলা হচ্ছে। বরং তার আগের বই দুটোয় কবিতার যে একটা আড়াল আছে, আমরা সবসময় আড়ালকে একটু পছন্দ করি, যে আড়াল খুঁজে নিব, নিজের মতো করে, সেটা তার প্রথম দুই বইতে খুব প্রকটভাবে আছে, ভালোভাবে আছে। 
পদ্ম : আমার যেটা মনে হয়, প্রথম আর দ্বিতীয় বইয়ে একটা বাঁক আছে। কবি মুখপত্রহীনের পরে অহেতু গুঞ্জনমালা বইটাতে আইসা, আপনি উইটগুলো ঢোকানো, বা একটু রেগুলারিটি ব্রেক করা, যে আপনি নিজেকে একটু ভাঙার চেষ্টা করছেন। অহেতু গুঞ্জনমালার মধ্যে মনে হইছে একটা বাঁক নিছেন। যেটা মামুজির নৌকায় এসে প্রকট হইছে।  
কামু : না না, মামুজির নৌকা আলাদা ধরনের বই, অহেতু গুঞ্জনমালার থেকে। আমার একটা বইয়ের সাথে আরেকটা বইয়ের মিল নাই। আমি কখনো একটানা লিখে যেতে পারি নাই। 
ফিরোজ : আপনার কিন্তু শুরু থেকেই পরিবর্তন হইছে, মানে আপনার কবিতা লেখার ভঙ্গিগুলো, আসলে কখনই ওরকম প্রজেক্ট ধরে কবিতা লেখা হয়নি। আপনি মনে করছেন যে এভাবেই আমি লিখব, এরপরের বইটা এরকম করে লিখব, এরকম তো হয় নাই। হইছে? 
কামু : নিগার সুলতানা বইটা একটা প্রজেক্ট ধরে লিখছিলাম, যেটাতে আমি ... 
ফিরোজ : এই পাঁচটা বইয়ের ভিতর থেকে এখন কোনটাকে আপনার বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। নাকি সবগুলোই একইরকম গুরুত্ব বহন করে। 
কামু : আমি একটার চেয়ে আরেকটার কিছুই ভালো-মন্দ বলতে পারি না। এই সমস্যায় আমাকে পড়তে হয়।
ফিরোজ : বইলেন না তাইলে, আপনার যে এই চেঞ্জগুলা হচ্ছে, ওগুলোই একটু বলেন, যে কিভাবে চেঞ্জগুলো হচ্ছে, তাহলে আমাদের পাঠকদের জন্যে একটু সুবিধা হয়। 
পদ্ম : আমার কাছে ইম্পর্টেন্ট মনে হয় যে তার কবিতার সাথে তার মিল আছে ব্যক্তিজীবনে। ব্যক্তিজীবনে তাকে দেখলেই তার কবিতা অনেকটা দেখা হয়ে যায়। ওনার চলাফেরা বা কথাবার্তার স্টাইল, বা তার কবিতার মধ্যে যে এলিমেন্টগুলো আছে, আমার কাছে যেটা মনে হইছে কামু ভাই
শামীম : প্রশ্ন পরে, আগে ওইটা দিয়ে নিক। 
কামু : আমার প্রবণতা আমি অত হিসাব করে দেখি নাই। যেমন যৌনচেতনা আছে... 
পদ্ম : আপনার যে চেয়ে আছো বইটা, আপনার মুখের ভাষা চলে আসে, এবং সরল ভাষায়, তার মানে এতদিন আপনি এখানেই আসার জন্যে ট্রাই করছেন? এত যে এলোমেলো, এত যে গভীরতা, ভাসা-ডোবা, আবার ভাসা-ডোবা-রসিকতা, হেঁয়ালি, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে, কিন্তু শেষপর্যন্ত আপনি এই চেয়ে আছোতে যে স্বপ্ন বর্ণনা করে দিচ্ছেন, একটা গল্প বর্ণনা করে দিচ্ছেন, আপনি কি তাহলে এতদিন ধরে এই চেষ্টাটাই করছিলেন? নাকি এখানে আপনি আসছেন?
কামু : আমি এত হিসাব করে এখানে আসিনি, এই বইটা যে ভবিষ্যতে লিখব বলে একখান থেকে যাত্রা শুরু করছিলাম, এরকম কিছু আমি বুঝতে পারি না, বা ওইখানে যাব, কী করেই বা ভাবা সম্ভব আগে, কারণ ওইখানটাতো তুমি দেখনি কখনও, এটা লিখতে লিখতে একটা চেহারা পায়, এক সেকেন্ড আগেও জানা যায় না, যে এক সেকেন্ড পরে কী ঘটতেছে। আমরা যে কবিতা লিখি, এখানে সবাই কবি, আমরা কি লেখার আগ পর্যন্তও জানি যে, বিষয়টা কী, আমরাতো লেখা শুরু করি, অটোমেটিক, তাৎক্ষণিক একটা স্বতস্ফূর্ততার ভিতর দিয়েই একটা জিনিস তৈরি হয়ে যায়।
হিজল : আপনার প্রথম দুইটা বই বা প্রথম তিনটা বইয়ের প্রবণতা থেকে পরের দুইটা বইয়ের প্রবণতার মধ্যে একটা ব্যাপক ফারাক আছে, বা আপনি যেমন ওই যে শুরুর দিকের যে আলাপ হইছিল, পরের কাজগুলো নিয়ে আর ওই আলাপ হয়নি, কিন্তু পরবর্তীতে আপনি আরও বেশি স্বকীয় চেষ্টা করছেন, আরও বেশি ডিফারেন্ট জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আমি ফিরোজ ভাইয়ের কথাটাতেই আসতে চাই, যে আপনার মনে হয় যে, এই বইটাতে স্পেশালি এক ধরনের কাজ করা হইছে, যেটা আসলে তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ...
ফিরোজ : আচ্ছা মনে করেন যে, ব্ল্যাকবোর্ডে এই পাঁচটা বইয়ের নাম লিখে দেওয়া হলো...
কামু : আমার নিগার সুলতানা বইটার প্রতি একধরনের বিশেষ টান আছে।  
ফিরোজ : আচ্ছা মনে করেন যে, ব্ল্যাকবোর্ডে এই পাঁচটা বইয়ের নাম লিখে দেওয়া হলো, একটা একটা করে মুছতে বলা হলো, শেষে কোনটা মুছবেন? 
কামু : কষ্ট হয়ে গেল আসলে, নিগার সুলতানা বইটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। 
শামীম : গুরুত্বপূর্ণ’র চেয়ে মনে হয়, তুমি যেটা বলতে চাচ্ছ যে, আত্মিক, নিজের একটা দূর্বলতা আছে।
কামু : হতেও পারে। যেটাতে আবার আমি চেয়ে আছোতে থাকি নাই। ওরকম করে আমার আরও কবিতা লেখার ছিলো হয়তো। নিগার সুলতানার আরও... 
পদ্ম : আপনি যে নতুনভাবে কবিতা লিখতে আসলেন, ভাবলেন যে নতুন ভাষা নিয়ে, আমার কোশ্চেন এখানেই, ভাষা নিয়ে নতুন ভাবনা আপনারা ভাবলেন যে... 
কামু : এটার জন্যে নিশ্ছিদ্র সময় দরকার। 
হিজল : সুর এবং আপনার গীতিধর্মিতা ওইটাতো অনেক অন্যরকম, মানে আমার কাছে মনে হয়েছে অন্যরকম কাজও হচ্ছে আসলে। কবি কামরুজ্জামান কামুর জায়গা থেকেও হচ্ছে, বা আমাদের এখানকার কবিতাতেও যে ঢংগুলো আবার রিভাইব করা, সেটা ছোট ছোট করে আপনি করছেনই, কিন্তু এখানে যেন আরও মনোযোগ দিয়ে, আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে, ক্লাসিক্যাল, আমাদের যে গ্রামাঞ্চলের গীতগুলা গাওয়া হয় বা সুরগুলা, এগুলাতে আপনি বা আপনার সমর্পণের যে জায়গাটা, মানে আছে না যে, কবির একটা সমর্পনের সত্তা, ওই সত্তাটা এখানে প্রচণ্ড প্রবল। নিগার সুলতানাটা আমার কাছে খুবই ইম্পর্ট্যান্ট লাগছে। ইভেন আসাদ কবিতাটার যে সিরিজ, ওইটাতো দুর্দান্ত একটা। আসাদ নিয়েও বলতে পারেন।
পদ্ম : আচ্ছা কামু ভাই? প্রথম বইটা লেখার পরে যে আপনি টার্ন নিলেন, বা ভাষাটা নতুনভাবে তৈরি করার যে ট্রাই করলেন, সেখান থেকে বের হয়ে এসে আবার নিগার সুলতানায় যে মহাকাব্যিক জায়গায়, কেন আবার ফিরলেন?
কামু : তুমি নিগার সুলতানা বলতেছ? হ্যাঁ, টোটালটা মিলিয়ে একটা মহাকাব্যিকই মনে হয় না? এমনকি আসাদও একটা নতুন মহাকাব্যিক চেহারার মতো।
পদ্ম : এই জায়গাটা কেন এমন, আপনার তো ভাষাটা যাচ্ছিল অন্যদিকে, কিছু প্রতিকবিতার মতো করেও চর্চা করছেন। হঠাৎ করে একটা মহাকাব্যিক জায়গায় কেন মনে হলো আপনার? এই বিষয়টা জানতে চাচ্ছি আরকি।
কামু : ওই যে বললাম, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গ্রন্থ হলো বিষাদ সিন্ধু। সেইখানকার তো প্রভাবগুলো পড়ছে ওইভাবে, ফলে একবার মনে হইছে যে, আবার একটা বিষাদসিন্ধু লিখতেছি। ফলে তোমার কাছে ওইরকম একটা মহাকাব্যিক বিষয়, ধর্মীয় মিথ-টিথ এর ফ্লেবার আসার কারণে, এটা মনে হচ্ছে। ফিরলাম কেন, এরকম কিছু জিজ্ঞাসা করলা?
পদ্ম : হ্যাঁ হ্যাঁ,  এতদিন পরে এসে ওই ফিলটা কেন?
কামু :  এই বইটা কিন্তু আধুনিক কবিতার যে চেহারা, যদিও কোথাও কোথাও তার সাথে যায়, কিন্তু যেন ওইটার থেকে বা’র হয়ে, যেমন, আধুনিকতা যে জিনিসগুলাকে রিজেক্ট করে, বেশি আবেগ, এখানে কিন্তু বেশি আবেগ আছে। 
পদ্ম : কিন্তু প্রথমের দিকে এটা ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন আপনি। ভাষাটারেই অলংকরণ করার চেষ্টা। 
কামু : একটু সুর করা, একটু সুরেলা, আমার কাছে মনে হইছে যে, একটু সুরের মধ্য দিয়ে কি কোনো আবিস্কার...জীবনান্দ তো গদ্যই, আবার ছন্দও। এই যে ছন্দই যে গদ্য, আবার ছন্দই। এরকম একটা অক্ষরবৃত্ত! আগেও তো অক্ষরবৃত্ত ছিলো। ওই যে পয়ার যেগুলা আমরা পড়ি, জিনিস কিন্তু একই। এই যে গদ্য হয়ে উঠলো, আমার মনে এরকম একটা জিনিস কাজ করছিল যে, গদ্য হয়ে উঠার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছ থেকে কবিতার যে একটু দূরে সরে যাওয়া, সেইখানেও বোধ হয় আবার একটু সুরের দিকে ফিরলে, ভাষাটাও যেন এই জীবনান্দীয় গদ্যছন্দ থেকে বের হয়ে গ্রহণযোগ্যতার জায়গায় আবার হয়তো, আমি যখন লিখতেছিলাম, ভাবছিলাম এই বই বোধ হয় ট্রেনে-ট্রেনে বিক্রি হবে, যদিও কবিতার বাস্তবতা সেরকমভাবে নাই, বা সেরকম ট্রাই করলে হয়তো বেচাও যেতে পারে, কিন্তু সেরকম মার্কেটিং করার পরিস্থিতি তো এখন নাই আর এ যুগে। 
হিজল : পদ্ম’র প্রশ্নটা ছিলো, যেমন শুরুতে বলতেছিলেন না, যে কবিতা যেন গম্ভীর হয়ে গেছিল, এই-সেই, যার কারণে আপনি চাইছিলেন একটু তামাশা, একটু শ্লেষ, একটু অন্য ভঙ্গিতে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ভিতর দিয়ে যেন কবিতারে হালকা করে দেয়া দরকার, একটু শিথিল করে দেয়া দরকার আসলে, ও বলতে চাচ্ছে শুরুতেই এই টেন্ডেন্সিটা ছিলো, কিন্তু আপনি ক্রমাগত যখন লিখতে লিখতে শেষে নিগার সুলতানায় এসে আবার প্রথম জীবনে, চর্চার প্রথম দিকে, যে ওগুলাই যেন, ওইটা ওর প্রশ্ন যে, আপনি এখানে কেন? এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হইল আপনার কাছে? 
কামু : এটা কিন্তু ওই জায়গাটাতে আসলে ফিরি নাই। এখানে শুধু অনুপস্থিত আছে হাসিটা, কবিতার ভেতরে যে হেসে ওঠার জায়গাগুলা তৈরি করতাম, সেগুলা অনুপস্থিত এই বইটাতে, কারণ এ বইটার স্বভাব সেটা না, এইটা একটা করুণ রসের প্রেমোপাখ্যান লিখতে বসছি। প্রেমটা হয়তো বাইরের ব্যক্তির সঙ্গে তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে হয়তো ওই প্রেমেরই নানা ধরনের আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি, যে আমি কি আসলে আসাদ? আসলে কে? ওটা যদি প্রেমের কবিতা হয়, তাহলে আসলে আমি নিজেই নিজেকে ভালোবাসি কি না, ওই যে আসাদ আমার বন্ধু, আমার জলার মাছ, লালপুঁটি, এগুলা বলতেছি, মানে...
হিজল : ইভেন বইটাতে আপনার সন্ন্যাসির মতো...
পদ্ম : অনেক বেশি রোমান্টিক বই। রোমান্টিক আসলে।
কামু : রোমান্টিক প্রেম উপাখ্যানই তো লিখতে চাইছি। 
শামীম : একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি, যে নিজের স্ত্রীর নামে একটা কাব্যগ্রন্থের নাম দেওয়ার কারণটা কী? বউকে খুশি করার জন্য, নাকি অন্য কোনো নিগূঢ় অর্থ আছে? 
কামু : নিগূঢ় অর্থ আছে, নিগূঢ় অর্থ হলো, আমার জীবনে যত প্রেম নারী-পুরুষমূলক যে প্রেম, এই সমস্ত প্রেম, এমনকি আমার আত্মপ্রেম পর্যন্ত আমার সমস্ত প্রেমের সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য জায়গা, সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো নিগার সুলতানা, আমার জীবনে প্রেমের যা কিছু ঘটা সম্ভব, তা নিগার সুলতানা ভাবের ভেতর থেকে, এটার বাইরে থেকে আমার প্রেমের কোনো অর্থ নাই, সেটা তো আমি আগেও বলছি, এর বাইরে থেকে আমার প্রেমের অর্থ নাই, 
শামীম : আচ্ছা, নিগূঢ় অর্থ আমরা জানলাম, এই নাম দেয়ার ফলে তোমার স্ত্রী কি খুব খুশি?
কামু : না। 
শামীম : নিজের স্ত্রীর নামে বইয়ের নাম, এটা পৃথিবীতে বিরল। সেক্ষেত্রে, ভাবির দিক থেকে, এতে স্ত্রী খুশি হইছে, নাকি আরও দূরে চলে গেছে? 
কামু : নাম দেওয়াটা তো শুধু নাম দেওয়াই না, এর সাথে আরও নানারকম বিষয় জড়িত, এটা যেহেতু প্রেমের উপাখ্যান রচনার চেষ্টা, হয়তো নানারকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমি গেছি, যেগুলোর সবকিছু হয়তো আবার তার জায়গা থেকে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে, ফলে, এই নাম দেওয়াটা তার জন্যে বিব্রতকর হইছে। এই বইটা আসলে আমার লেখা উচিত হয় নাই। 
হিজল : এই বইটা লেখা উচিত হয় নাই, না এই বইয়ের নাম দেয়া উচিত হয় নাই? 
কামু : বইটা লেখাই উচিত হয় নাই। 
ফিরোজ : কেন লেখা উচিত হয় নাই? 
কামু :  এই বইটা যদি কেউ গভীরভাবে পড়ে তাহলে সে বুঝতে পারবে যে, বইটা লেখা যন্ত্রণাদায়ক ছিলো। 
পদ্ম : গো দেবতা নামে একটা কবিতা আছে। মার্ক করতে চাই, গো দেবতা। এই কবিতাটা পড়লে এই বক্তব্যের কিছুটা সারমর্ম হয়তো পাওয়া যেতে পারে। 
হিজল : আচ্ছা ভাই, ওই যে পঞ্চম বই, আপনি যে ভাষাটা চুজ করলেন, পঞ্চম বইয়ের থেকে, একধরনের সিম্পল, একধরনের প্রামান্য।
কামু : এগুলা আমি আসলে কবিতা হিসাবে লেখিই নাই। এগুলা আমি কী করছিলাম জানো? এর মধ্যে কিছু কিছু, এই বইয়ে কিছু কিছু আছে যা আমার কবিতা হিসাবে লেখা, আর ওই যে প্রথমদিকে কিছু কিছু দিয়ে দিছি, যা একেবারেই, যা তুমি বলতেছ, এক ধরনের প্রামান্য, ছোটবেলার একধরনের স্মৃতি, আমি আসলে অতীতচারিতার ভেতর দিয়ে বর্তমান থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিলাম, যে কারণে আমি অতীত চারণা করছিমাত্র, এইগুলা হয়তো কবিতার মতো লাগতে পারে, কবিতা কিনা আমি জানি না।
হিজল : বর্তমান থেকে যে বের হতে চাচ্ছিলেন, আপনার কবিসত্তার ভেতর থেকে বের হতে চাচ্ছিলেন, এখানে বর্তমানটা ব্যাখ্যা করার জন্য, বা আপনার বর্তমান যে যাপন বা থাকা, অবস্থান, এটা খুব যন্ত্রণাদায়ক হইছে বলেই কি আপনি ওইদিকে চলে যাচ্ছিলেন?
কামু : না না। আমি নিগার সুলতানা বইটাকে বর্তমান বলতেছিলাম। এর ভেতর থেকে বের হয়ে আমার সাহিত্যিক আশ্রয়টা অন্যদিকে নিতে চাইছিলাম। এই নিগার সুলতানার ধারাবাহিকতা আমার জন্য যন্ত্রণাদায়ক ছিল। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে যেন আমার এই স্মৃতিচারণাগুলা আসছে। এছাড়াও কিছু আছে কবিতা। এ ব্যাপারটাতো মূলত গ্রামেরই বেশি। ওই আমি আমার গ্রামে শুয়ে যেন একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। বুঝছ? 
ফিরোজ : আপনি কবিতা লেখতেছেন এখন যে ভাষায়, আবার কি কখনও পূর্বের কোনো ভাষায় ফিরে যেতে পারেন? যে ভাষায় আগেই লিখতেন, শুরুর দিকে।
কামু : কোনো একটা নির্দিষ্ট কিছুতে ফিরে যাব, এরকম কোনো কিছু আমি শনাক্তই করে উঠতে পারিনি আসলে। 
ফিরোজ : আপনার দ্বারা সম্ভব কিনা? 
কামু : আমি যদি নিগার সুলতানার ভঙ্গিটা আনতে পারি, আমি জানি না। আমরা কি হিসাব করে কিছু লিখি? পরে একদিকে হতে থাকে। 
হিজল : শেষের দুইটা বই আমার কাছে মনে হইছে যে, একটা ব্যক্তিমানুষ বা একজন কবি, তার যে জীবনবোধ, সত্যিকারের তো একটা জীবনবোধ আছে, বা একটা গভীরতা তো আছেই, যেটা থেকে আপনি আসলে হয়তো পালাচ্ছিলেন বা স্কিপ করতেছিলেন। আগের বইগুলা ওরকম না। সেই অনুভূতির জায়গা থেকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, যে বইয়ে আপনি বেশি সৎ, আপনার জীবনের অনুভবের জায়গা থেকে আপনার কবিতাকে যদি ডিফারেন্ট করতে চাই, তাহলে কোন বইয়ে আপনি বেশি সৎ, আপনার জীবনের অনুভবের জায়গা থেকে? কোন জায়গাগুলো থেকে আপনি এখন কবিতা নিয়ে ভাবছেন, বা কবিতার যে যোগাযোগ বা ব্যক্তিজীবনের বাহির-তাৎপর্য সম্বন্ধে অনুধাবনের সঙ্গে এইটার গুরুত্বকে আপনি কিভাবে দেখেন, যেটা আগের বইগুলোতে আমি ওইভাবে পাই না, এটাতে যতটা পাই, এখন এসে আপনি এই জিনিসটাকে, এই যোগাযোগটাকে কীভাবে দেখেন? এটা আসলে কী রকম? সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটা কতটুকু প্রয়োজনীয়? এই যে নিজেরই জীবনের গভীর অনুভবগুলা, যেটাতে থেকে আসলে মানুষ পালাইতে চায় বা আপনার হয়তো প্রথম ২/৩টা বইয়ে এগুলা অনেক হালকা জায়গায় ছিলো, আপনি কিন্তু ধরতে গেলে গভীর একটা জায়গায় চলে আসছেন আপনার জীবনের মুক্তির জায়গায় চলে আসছেন, যা আপনি আগামী দিনেও...
কামু : প্রথমটাকেও তো মানুষ গভীর মনে করে। পরবর্তীতে আমি গভীরতার সঙ্গে কিছু কিছু জিনিস যুক্ত করছিলাম, যেগুলা এই গভীরতার দর্শক-শ্রোতা-পাঠক বা ভোক্তাকে বা রসিককে ডিস্টার্ব করে একইসঙ্গে। যে কারণে আমার দি ডিরেক্টর ছবিটাও এরকম। আমি যে-দর্শককে দেখার জন্য ডেকে আনতেছি, তাকেই আবার ডিস্টার্ব করতেছি। তো সেইটা একধরনের লাফাঙ্গাপণা যুক্ত হইত। আমার কাছে তো মামুজির নৌকা বইটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইও লাগে। আমার আসলে ব্যবসা করতে গিয়া ব্যবসা নিয়া, বাণিজ্যচেতনাও তো আমার আছে রে। 
শামীম : আচ্ছা, আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। কবিতার প্রবণতা ছাড়া অন্য আরও যে পরিচয়গুলো তার আছে, সেই পরিচয়ের দিকে আগাই, বিশেষ করে গান। গানের ক্ষেত্রে তিনি কিভাবে আসলেন, এবং এই গান বিষয়ক তার কাছে জীবনের অনেক উপাখ্যান আছে কবিতার বাইরে, বিশেষ করে সঞ্জীবদা’র সাথে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা একটু দীর্ঘ আলোচনা করব।
কামু : পুরা জীবনে সুশৃঙ্খল কোনো চাকরি পাইনি, ফলে আমি টাকা-পয়সার টানাটানির ভিতরেই সবসময় থাকছি, কবিতার বাইরে আমি যা কিছু করতে গেছি, গান বলেন, সিনেমা বলেন, সেটা আমার একটা জীবিকার জায়গা হতে পারে কিনা, সেরকম একটা ইচ্ছা থেকে, পরে হয়তো সেটার মায়ায়ও পড়ে গেছি, প্রেমে পড়ে গেছি, কিন্তু প্রথম প্রথম ওই ধরনের আকাক্সক্ষা থেকেই আমি এগুলা করতে গেছি। গানের বিষয়ে সঞ্জীবদা আমাকে একদিন বলল, গোল্ডেন ড্রাগনে, যে, তুই আমাকে গান লিখে দে, আমি তোকে পাঁচ হাজার এক টাকা করে দেব। আমি মনে করলাম কী, বোকার মতো, যে গান তো আমি লিখতে পারব অনেক, আমি এসে ওই আজিজ মার্কেটের সুরের মেলায় গিয়া কিছু ফোকগানের অ্যালবাম কিনলাম। আমি জানি যে ফোকগান চলে ভালো, ফোকগানের অ্যালবামগুলা নিয়া মামার বাসায় চলে গেলাম। আমার তো আর শোনার যন্ত্র নাই, মামার বাসা ছিলো যাত্রাবাড়িতে।
শামীম : কোন সালে?
কামু : এসব টাইম-টুইম না এই মুহূর্তে আমি মনে করতে পারব না। পরে উদ্ধার করব। মামার বাসায় পনের দিন থাকলাম টানা। বাইরেও বেরুলাম না। খালি সিগারেট-টিগারেট খেতে যাই নিচে। ওই পনের দিনে আমি গানগুলা শুনলাম-টুনলাম, আর নিজে লিখে ফেললাম ষাটটা গান। গেলাম সঞ্জীবদা’র কাছে ষাটটা গান নিয়ে। মামাতো ভাই মাসুদকে বললাম, ‘এগুলা মনে কর চেকের মতো, চেক’। এটা যে আসলে চেক না ভাই, এই বাস্তবতা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি কেন জানি! ওই গান নিয়ে সঞ্জীবদা রেখে দিল। দুইটা গাইল, দুইটা বাড়াইলো। তারপরে দেখি যে, পাঁচশ টাকা করে দেয়, পাঁচশ টাকার হিসাব করে। মদ-মুদ খাওয়াইয়া-দাওয়াইয়া, এইভাবে, অবশ্য তারচেয়েও বেশি টাকার মদ খাওয়াইছেন উনি আমাকে, সেটা যাই হোক, পরে বুঝলাম যে আসলে গান-টান লিখে, জীবিকা-টীবিকা হবে! অন্য কেউ আমার কাছে সেভাবে কখনও গান-টান চায়ও নাই। একজন-দুজন চাইলেও হঠাৎ, এ বিষয়ে আমার আর আগ্রহই হয় নাই। কারণ গান লেখা তো আমার সময় নিবে রে ভাই, এ দিয়ে যদি আমার জীবিকা না হয়, তাহলে আমার দরকারটা কী! হবেনে পরে। 
হিজল : ওই একটানা ষাটটা লিখছেন, আর এরপরে হয়তো...
কামু : এরপরে বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একটা গান লেখছি আমি। পরে দেখি যে, না, এটার একটা বাজার আছে, বাজারকে ডিল করার বিষয়টা সম্পূর্ণই আলাদা একটা বিষয়। অন্যধরনের নানারকমের যোগাযোগ, নানাধরনের বিষয়-আশয় জড়িত থাকে। আমার অবস্থানহীনতা থেকে সেটা সম্ভব নয়।
শামীম : এখনও তো তোমার গান বিভিন্ন মোবাইলটোনে আছে, এর থেকে কি কোনো ইয়ে পাওয়া যায়, যেমন ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায়’? 
কামু : ও ও, আমাকে কিছুদিন আগে ওই তোমার রঙের মেলার জন্য, এটা মঞ্চে যতবার গাইবে ততবার আমার জন্য টাকা, কত টাকা করে যেন, বাপ্পা নিয়ম করছে যে, যার যার গান গাইবে তাদেরকে রেমুনারেশন দিবে, তো, ও আমাকে আট হাজার টাকা দিছিল, আট হাজার টাকা পাওনা হইছিল। ম্যানেজারকে ফোন দিলাম, একদিন লোক পাঠায় দিছি, দিয়ে দিছে টাকা। আট হাজার। এই-ই।
হিজল : এমনি রিংটোনের টাকাগুলো পান না?
কামু : রিংটোনের, পাই-টাই না কিছুই। মেরে-ধরে খায় সব। 
ফিরোজ : তার মানে গান লেখার তাগিদ থেকে গান লেখেন নাই। টাকা-পয়সার জন্যেই গান লেখছেন, এই তো? 
শামীম : তোমার কি ভবিষ্যতে আবার গানের দিকে যাওয়ার প্ল্যান বা ইচ্ছা আছে?
কামু : হ্যাঁ, ভবিষ্যতে, ২-৩ হাজার গান লেখব। জীবনের শেষের দিকে ১০ বছর খালি গানই লেখব, ২-৩ হাজার গান  লেখলে রবীন্দ্র-নজরুলের সমান গান হয়ে যাবে আমারও, তখন গানগুলা বাজতেই থাকবে চারদিকে, আমি ওদের সমান কবি হয়ে যাব, তাই না? 
ফিরোজ : তাহলে তো গান লেখাটাই আপনার উচিৎ আসলে। 
কামু : গান-টান মিলিয়েই, গানও তো কবিতাই আসলে। 
হিজল : গান কবির জন্য সহজ তো, লেখা উচিত কবির, গান-শিশুসাহিত্য এগুলা লেখা উচিত। 
কামু : তুমি যখন গানই লিখবা, যখন তুমি গানটাকে সাধনা হিসাবে নিছো, তখন তোমার সুরের জায়গায়, গানে একদম নতুন জায়গায় চলে যাবা তুমি। এটা সম্ভব। 
রিয়াজ : কামু ভাই আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, কবি-জীবন কীভাবে উপভোগ করেন?  
কামু : এই যে আপনারা পুরস্কার দিচ্ছেন, টাকা দিবেন।
হিজল : ও, টাকা বাড়াইছেন আপনি? এগুলোও আমরা শামীম ভাইকে বলব।
কামু : হিজল জোবায়েরের একটা প্রস্তাব আছে, সেটা হলো যে, আমরা লোক পুরস্কার না বলে লোক সম্মাননা বলি না কেন? 
শামীম : এটা হয় কী, সম্মাননার ক্ষেত্রে আসলে কোনো টাকা জড়িত থাকে না, শুধু একটা সার্টিফিকেট দেয়া হয়, পুরস্কারে...
কামু : এরকম কোনো বাধাধরা সরকারি নিয়ম কিছুই নাই। তুমি যা করবা, সেটাই নিয়ম। তুমি সম্মাননাই দিলা, টাকাটাও সম্মাননা হিসাবেই দিলা। 
হিজল : অর্থমূল্য বাড়ানো উচিৎ, এটা আমরা সিরিয়াসলি, এটা এই আলাপে থাকুক শামীমভাই, হ্যাঁ, অর্থমূল্য বাড়ানো...
কামু : যেহেতু আমরা মনে করি তোমার প্রতিষ্ঠানটাই এখন বাংলা সাহিত্যের... ওইপারে একটা আছে দেশ– ওরা বড়, আর বাংলাদেশে আছ লোক, তুমি বড়। অন্যগুলাতো দৈনিক পত্রিকার হিসাব, এতোবড় একটা প্রতিষ্ঠানের সম্মাননা...
শামীম : যেহেতু বিষয়টি এসেই গেছে, সেহেতু আমি একটু বলি, হিজলের যে প্রস্তাব, এইক্ষেত্রে লোক পুরস্কার শুরু হয়েছিল ১০,০০০ টাকা দিয়ে, এরপরে এটা ২৫,০০০ টাকা করা হয়েছে। একটি ছোটকাগজ হিসাবে, পৃথিবীতে কোনো ছোটকাগজ ওইভাবে পুরস্কার দেয় না, বাংলাদেশে এটা শুরু হয়েছে, তো সেই হিসেবে টাকার অংকে এটা কিছুই না। বাংলাদেশের যেখানে অন্যান্য মিডিয়াগুলো ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এখন দিচ্ছে। প্রথম আলোর মতো একটা বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিন্তু ৫০ হাজার করে দিত, এই রিসেন্ট শুরু করেছে এক লক্ষ। একটু ব্যাখ্যা করে বলি, এই পুরস্কারের আর্থিকমূল্য এই ২৫ হাজারকেই ২৫ লক্ষ মনে করতে হবে, অন্যঅর্থে, দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, যেহেতু আমাদের এটি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না কবিতাকেই যেহেতু লোক সম্পাদক ভালোবাসে, নিজে কবিতা লিখে, সেই হিসাবে সাহিত্যের জগতে, লেখালেখির জগতে, কিছুটা অবদান রাখা। সেই অর্থে এটা দেয়া, এবং এই পুরস্কারটা কিন্তু কোনো জনপ্রিয় লেখক, বা যাদের বয়স বেশি হয়ে গেছে তাদেরকেও দেয়া হচ্ছে না। ৯০ থেকে এ পুরস্কারটি শুরু হয়েছে এবং সেটা নিচের দিকে আসবে, সিনিয়র কোনো লেখকদের দিকে যাবে না। সেই হিসেবে যদিও বর্তমান বাজারমূল্যে ২৫ হাজার টাকা কম, এটা আমরা চেষ্টা করব যে বাড়ানো যায় কিনা। সবচাইতে বড় বিষয় যে আমি মনে করি এই পুরস্কারের বড় সাফল্যটা যে জায়গায়, যেটি পৃথিবীর কোনো পুরস্কারে নাই, অনেক খোঁজ-খবর নিয়ে দেখেছি যে, তাঁর উপরে পূর্ণাঙ্গ একটি সংখ্যা করা। এই সংখ্যাটির দাম-ই তো ২৫ কোটি টাকা হয়ে যেতে পারে। 
কামু : না, ওই সংখ্যাটি দেখলেই মনে হবে যে, যারা আমাকে প্রথমবার তোমার সংখ্যার মধ্য দিয়ে চিনবে কবি কামরুজ্জামান কামু সংখ্যা, এই লোক কবে মারা গেছে। তুমি আমাকে মাইরাই ফেলতেছ। 
শামীম : আচ্ছা এটা লোকের চেষ্টা থাকবে, যেহেতু ঘোষণা হয়ে গেছে ২৫ হাজার, সেটা পরবর্তী পুরস্কার থেকেও হতে পারে, এ পুরস্কার থেকেও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে যেহেতু বিষয়গুলো আসলোই, আমরা আর একটু মজার দিকে যাই, সেটা হচ্ছে, এই পুরস্কার ঘোষণার তিনমাস পর...
হিজল : পুরস্কার শব্দটাকে সম্মাননা করলে আপনার আপত্তি কোথায়?
শামীম : এটা ভাবতে হবে। যেহেতু একটা জিনিস শুরু হয়ে গেছে, এটা আবার সম্মাননা করলে, আগে যাদের বলছি পুরস্কার আবার তো, সেটা ভেবে দেখা যাবে। 
কামু : পুরস্কার বললে জিনিসটা ছোট হয়ে যায়, সম্মাননা বললে জিনিসটা বড় হয়। এখন যেটা শুধু একটা শব্দ চেঞ্জ করেই সম্ভব। সেটা তোমার করতে যদি আপত্তি থাকে, তাহলে সেটা কী ধরনের আপত্তি? 
শামীম : লোক সাহিত্য সম্মাননা?
কামু : হ্যাঁ, তোমার টাকাও খরচ হচ্ছে না এটা করতে। জাস্ট পুরস্কারটার জায়গায় সম্মাননা। 
শামীম : আচ্ছা, পুরস্কারকে সম্মাননা করা হবে। আমি কী বিষয়ে যেন বলতেছিলাম, ও স্যরি, এই পুরস্কারটি যখন দেয়া হয়, দেয়া বলতে, যখন নাম ঘোষণা করা হয় তার আগে লেখকদের কাছ থেকে একটা সম্মতি নেয়া হয় মৌখিকভাবে। অনেক পুরস্কার বা সম্মাননার ক্ষেত্রে লিখিত চিঠি দেয়া হয়, তার সম্মতি আছে কিনা, যেহেতু আমিও এই সময়ের একজন সহযাত্রী কবিতার, সে হিসেবে প্রায় সবাই কিন্তু আমার বন্ধু-বান্ধব। আমার যারা বিরুদ্ধাচরণ করে, যে এই শামীম তো খালি বন্ধুদের পুরস্কার দেয়, আচ্ছা, যারা পুরস্কার পাবে তারা তো আমার বন্ধুই হবে। আমি এই সময়ে লেখালেখি করছি, তাদের সাথেই লেখালেখি করতেছি, এরা আমার বন্ধু হবে না তো দূরের কেউ হবে? আমি যদি লেখালেখির জগতে না থাকতাম, সেটা একটা হতো।
কামু : বুদ্ধদেবের বন্ধু কিন্তু জীবনানন্দ এমনি-এমনি না। 
শামীম : তিন মাস পরে কামু ফেসবুকে ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই পুরস্কারটা প্রত্যাহার করে নিল। 
কামু : সেই প্রসঙ্গেও এখন আলোচনা করবা?
শামীম : সেটাই তো, একটু কৌতুক করি আর কী। যে এটা নিয়ে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যারা বাংলা ভাষাভাষী যারা লেখালেখির জগতে আছে প্রায় সবাই জানে। তো পরবর্তীতে কী অনুশোচনায় বা কী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেটাকে আবার গ্রহণ করা হলো। আমরা ব্যক্তিগতভাবে হয়তো জানি, কিন্তু যারা ফেসবুকের মাধ্যমে দেখেছে, তারা এই উত্তরটির মাধ্যমে জানতে পারবে। 
কামু : তাহলে  তো তুমি বেকায়দা পড়ে যাবা। 
শামীম : বেকায়দায় পড়লে এডিট হবে, আমার বেকায়দায় কিছু হবে না। 
কামু : কিছু বললে, তখন নানারকম প্রসঙ্গ বলতে হয়, দরকার নাই। প্রসঙ্গ অ্যাভয়েড করা উচিত। 
হিজল : একটা ইয়ে করা যায়, কামু ভাই, সেটা হচ্ছে যে, এই টোটাল ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে যে একটা ভাঙন, একটা কমিউনিটি তো, ভাঙনও তৈরি হইছে, সেই ভাঙনটাকে আসলে আপনি কিভাবে দেখেন? এটা আপনার নীতিগত জায়গা থেকে, ভাঙনটা অনেকটাই হয়তো ঠিকঠাকও হয়ে যেতে পারে, আপনার যে দুই চাওয়াই সৎ ছিলো, এবং সেটা কী কী কারণে সৎ, সেটা কিন্তু আসতে পারত।
কামু : হ্যাঁ, আমি যেমন, দেখতেছিলাম চারপাশে, সবার কাছে শুনে শুনে যে, চঞ্চল ফরিয়াদ করছে যেহেতু, চঞ্চলেরটা বিশ্বাস করছি আমরা। সে ফেসবুকে জানাইছে, আমরা বিশ্বাস করছি এবং দেখা যাচ্ছিল এটার কোনো প্রতিকার নাই। জিনিসটার কোনো অ্যানসার নাই, জিনিসটার বিষয়ে কারও কোনো স্যরি নাই, আচ্ছা, এটার আসলে কী করা উচিৎ? যদিও আমি জানতাম, যে এটা পারভেজ ভাইয়ের পুরস্কার নয়, কিন্তু এটা বুঝতে পারছিলাম, এটা যদি আমি প্রত্যাখান করি এই মুহূর্তে, তাহলে পারভেজ ভাই একটু বিব্রত হবে। ফলে আমি সেইটা করছি, সেই সময়ে সেটা কার্যকরও হইছে, অন্যকিছুই তো করার কোনো উপায় ছিলো না আর। এখনও নাই, কী করবে? মানে কী করার আছে, আবার পারভেজ ভাইকে সবাই ধরে মারবে? না কী করবে? কিছু তো করার নাই আসলে। সে স্যরিও বলে না। আবার আড্ডাটা ছিল মদের। এদিকে আমিও তো সমাজের বাইরের কেউ না, আমাকে আবার শামীমকেও ফেস করতে হয়, যে আমার তো কোনো দোষ নাই। এখন, দোষ তো আসলে তার নাই, দোষ থেকে থাকলে ওই ঘটনায় পারভেজ ভাইয়ের আছে। পরে আমি মনে করি যে শামীমকেও উদ্ধার করা দরকার, কারণ শামীম তো ফাইনালি সেই ঘটনাটা ঘটায় নাই এবং সেই প্রশ্নও অনেকেই তুলছিলেন সেই সময় ফেসবুকে। যদিও তারা পরে আমি এটা শুধরে নেওয়ার আলাপ তুলতেই, ফেসবুকে আমাকে গালাগালি শুরু করলেন। হুজুগে বাঙালি কোনো একটা বিষয় নিয়ে মাতলেই যে আমিও মাতব, আমি সেটাতে একাত্ম না-ও হইতে পারি। পরবর্তীতে দেখলাম, এটা একটা দলাদলির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। দলাদলির মধ্যে আমি থাকতে চাই না, সব সাহিত্যিকের সাথে আমার কমবেশি চেনাজানা আছে, সৌহার্দমূলক সম্পর্কই আছে, আমার সাথে কোনো শত্রুতা নাই কারো। আমি সেখানে একটা শত্রুতার অবতারণা কেন ঘটাতে যাব? 
পদ্ম : আমার একটা গম্ভীর ধরনের কথা আছে। একটা সময়ে শিল্প মাধ্যম হিসেবে, সিক্সটিজের দশকে, কবিতা খুব জনপ্রিয় ছিলো পৃথিবীব্যাপী। তখন বাংলা ভাষার সাথে ওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন কবিদের একটা যোগাযোগ ছিলো, তারপরে অন্যান্য মাধ্যমগুলো জনপ্রিয় হলো, ফটোগ্রাফি, পেইন্টিং, ভিজ্যুয়াল আটর্, আর্টের বিভিন্ন মাধ্যমগুলো এখন জনপ্রিয় হচ্ছে। অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় কবিতা আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। আপনার কী মনে হয়, এখানে আগে যেভাবে কবিতাচর্চা হইছে, এতগুলো মাধ্যম আসার পর এখন কি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হইছে কবিতার জায়গাটা? মাধ্যম হিসাবে কবিতার এখন কী করণীয় বা অন্যকোনো চ্যালেঞ্জ আছে কিনা সামনে কবিতার জন্য?
হিজল : আশি পর্যন্তও ছিলো, আবৃত্তি একটা বড় কারণ। 
কামু : কবিতা তো একটু আত্মমগ্নতার বিষয়। কবিতা পাঠ করাও তো সেরকমই। কবিতার রসাস্বাদনের চেয়ে মুহূর্তের মধ্যে পর্নোগ্রাফী দেখা যাচ্ছে, মোবাইলে, ফলে মানুষ আসলে সহজ আনন্দের দিকে যাইতে চাচ্ছে, বা চায়, এটা কি আসলে সভ্যতার অগ্রগতির মধ্যে কোনো একটা, উচিৎ নয় হয় তো, ঔচিত্যের জায়গা থেকে দেখলে, কিন্তু তারপরেও সেইদিকে যাচ্ছে সভ্যতাটা। মানবিক জায়গাগুলো কমে আসতেছে। শেষপর্যন্ত যেন কবিতা বললে, কবি বললে, একটা মানবিক সত্তা আমাদের সামনে হাজির হয়, হইতে পারে কোনো একটা সময়ের খুবই বিষোদগার, তার মধ্য দিয়ে বের হচ্ছে, কিন্তু ওই সত্তাটা কিন্তু মানবিক, তার ভিতরে হয়তো যন্ত্রজীবনের, নগর জীবনের, হয়তো বিষ বাইর হইতেছে তার ভিতর থেকে, কিন্তু কবি বলতে আমরা একটা মানবিক সত্তা দেখতে পাই। সেই জিনিসটাকে, আর আমাদের সভ্যতার অগ্রগতি হয়তো এমনভাবে ঘটতেছে, সিংক্রোনাইজেশন এমনভাবে হচ্ছে যেখানে এই মানবিক সত্তাটা আসলে মার খেয়ে যাচ্ছে। মানবিক সত্তাটাকে প্রাধান্য দেয়ার বা গুরুত্ব দেয়ার অবকাশ থাকতেছে না এই বিকাশের ভেতর। যে কারণে হয়তো, এই বিকাশের ভেতরে, এই মেকানিজমের ভেতরে তুমি একটা পার্টস হইলে, তোমাকে ওই ভূমিকায় হয়তো রাখতে হবে, হয়তো আমাকে নিয়ে গিয়ে একটা কর্পোরেট হাউজে কাজ দেয়া হলে, একটা সুইচ বানানো হলে, আমাকে টিপলে ওই ধরনের কাজই বার হবে, এটা হয়তো আমরা পরে গেছি একটা সংকটে। 
পদ্ম : এখানে কী করণীয়? সেক্ষেত্রে কবিতার ভবিষ্যৎ আপনার কী মনে হচ্ছে? 
কামু : কবিতার তো ভবিষ্যৎ খারাপের কোনো কারণ নাই? কবিতা তো কবিতাই। কবিতা একটা কালের সাক্ষ্য, একটা কবিসত্তার ভিতর দিয়া একটা কালের স্বভাব, কালের চেহারা, সুর-ছন্দ-বেদনা অনুভূতির নানারকম জিনিসগুলা, যেহেতু বের হয়ে আসে, সাক্ষ্য হিসাবেও, টেক্সট হিসাবেও সেটার মূল্য তো আছেই। এই টেক্সটকে যদি, এই সাক্ষ্যটার সামনে যদি মানুষকে বেশি করে আনা যায় সেটা হলো মূল জায়গা। সমাজের চালিকার জায়গাগুলাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়, এই অনুভবের চর্চার জায়গাগুলাকে, মানুষকে সজাগ রাখার দিকের কাজগুলাকে সামনে আনা দরকার। এগুলো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়-আশয়ও আছে। কবিতা তো মানুষকে সময় দিয়ে লিখতে হয়, তো সময়টা দিলা কিন্তু তোমার টাকাটা পাওয়া গেল না, গান গাইলেও কিন্তু ভিক্ষা-টিক্ষা করে চলে, কিন্তু কবিতা লিখলে ভিক্ষাও কিন্তু করা যায় না, কবিতাটা পড়ে শোনালে ভিক্ষা দিবে না। সেক্ষেত্রে কবিতাকে কী করে পেট্রন করা যায়, কবিতা যে খুবই দরকারি জিনিস, যদি মানবসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই মানবিক চেহারারও বিকাশ হতে থাকে, সেজন্য মানুষের অনুভূতিটা জাগ্রত থাকুক, মানুষ জীবন্ত থাকুক, আসলে মানুষ মেশিন না হয়ে, মানুষ একটা মানুষ হিসেবে জীবন্ত থাকুক, এইটা চাইতে হবে সমাজের চালিকাশক্তিগুলাকে, তার মেশিনগুলাকে কাজে লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে। আমিতো দেখি মাঝে মাঝে ওই যে কী একটা লোক কবিতা পড়ে-টড়ে স্টেজে উঠে, গানের মতো করে, কী যেন ওনার নাম? আফ্রিকান-টাফ্রিকান হবে, কালো একজন লোক দেখি। উনি তো খুব জনপ্রিয়। 
আমাদেরও হয়তো অনেককিছু করণীয় আছে, একটা সময়ে কবিতাচর্চা করতে আসা লোকজনদের মধ্যে শক্তিমত্তারও বিষয় থাকে, তারাও কিছুটা কবিতাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া না যাওয়ার বিষয় থাকে।
পদ্ম : তারা হয়তো এখন অন্য মাধ্যমে চলে গেছে। আগে তো এত মাধ্যম ছিল না। 
কামু : সেটাও ঘটতেছে, দেখ যে কবিরা ফিল্মমেকার হয়ে জীবিকা করার চেষ্টা করতেছে। কয়েকদিন আগে আমার একটা প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তার সঙ্গে কথা হইতেছিল, উনি বললেন যে, আমাদের প্রতিষ্ঠান তো খুবই কর্পোরেট, এখানে বিবিএ-এমবিএ দিয়ে ভরা, কবিদের কোনো জায়গা নাই। সমাজটা নষ্ট হয়ে গেছে আসলে, এখানে কবিতার মূল্য নাই, মানুষের যে কোনো উপায়ে টাকা... 
ফিরোজ : এটা কি ছিলো? এখন তো প্রযুক্তির কল্যাণে আরও বরং কবিতার জন্য ভালো হচ্ছে আমার মনে হয়। 
কামু : আমার পরিবারে আমি দেখছি যে কবিতার মূল্য ছিলো, আমার বাপের কাছে, মায়ের কাছে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ার মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক উদযাপনের ভিতর দিয়ে কবিতার মূল্য ছিলো, এখন... 
ফিরোজ : এখন ওইটা নাই?
কামু : এখন... আমি জানি না ঠিক আছে কি না। প্রশ্নটা আসল বলেই আমি বলতেছি, আমি জানি না ঠিক আছে কি নাই। 
হিজল : এই উদযাপন শব্দটা খুব ভালো, আনুপাতিক হারে যত বেশি মানুষ কবিতাকে উদযাপন করত, ক্রমাগত এই সভ্যতার যে স্পিড এবং কম্পিটিশনে আসলে কবিতার উদযাপন দিন দিন কমতেছে, মানে সত্যিকার উদযাপন, হয়তো অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছে কবিতাপাঠের, কিন্তু ওখানে তো আসলে কবিতা উদযাপন হচ্ছে না। ব্যক্তিমানুষ যখন একা একা কবিতাকে উদযাপন করে, সেই যে নিজের মধ্যে ডুব দেয়া, মগ্ন চৈতন্যের মধ্যে ডুব দেয়া, সেই প্র্যাকটিসটা আসলে কমে যাচ্ছে। ওইটাই বলতেছিল যে দিন দিন সভ্যতার মধ্যে মানবিকতাটা মার খেয়ে যাচ্ছে বলেই কবিতাটা মার খেয়ে যাচ্ছে। কবিতা এবং মানবিকতা এখানে সমার্থক। 
কামু : কিন্তু... কবিতাটা পড়ে শোনানোরও দরকার আছে বলে আমার মনে হয়। কবিতা ভালো করে পড়ে শোনানোর যদি অডিও পাওয়া যায়, তাহলে ইজিলি কেউ শুনে ফেলল। এরকম হতে পারে। ভালো কবিতাগুলা, একটা ভাষার ভালো কবিতাগুলাকে ... 
হিজল : মানে কবিতা প্রকাশের ফর্মগুলা আরও অন্য হইতে পারে, যেমন আমাদের এখন শুধু প্রিন্টেড একটা মাধ্যম, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে হয়েছে, যে কবিতাগুলিকে নানা প্রকাওে, যে বিট জেনারেশন, ওরা কিন্তু গেয়ে গেয়ে কবিতাকে ইয়ে করতেছে...
ফিরোজ : ওইটাই, বরং অনেক অপশন তৈরি হচ্ছে কবিতার জন্য। 
হিজল : এরকম কোনো নতুন ফর্ম নিয়ে ভাবা যাইতে পারে বলে কি আপনার মনে হয়? এটাও পদ্মর প্রশ্ন ছিলো আসলে, যে কবিরা কি তাদের এই ফর্মটা নিয়া এক্সপ্রেসিং যে মাধ্যমটা নিয়ে কী ভাবতে পারে? 
কামু : ওইজন্যই তো নানাজন হয়তো নানা দিকে গিয়ে, সিনেমায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, এতে টাকা-পয়সা আসে বলেই, আসলে টাকাটা প্রধান হয়ে উঠছে এই সমাজে, আগের জীবনের ভেতরে যেরকম কিছুু অবকাশ থাকতো এখন অবকাশও নেই। দৌড়টা বেড়ে গেছে নাগরিক সমাজে, আর আমরা তো নাগরিক সমাজের কবি, আমরা তো সেই গ্রামীণ কবি না। সেই গ্রামও এখন আর সেই গ্রাম নাই। এখন সেখানেও জীবিকার দৌড় চলে আসছে। ফলে কবিতার চেয়ে সহজে একই জাতীয় রসপূর্তি করা যায়, ধরো ছবি দেখে ফেলতেছে, এই আসতেছে সেই আসতেছে, নানারকম ফর্ম এসে, আর্টের কাছাকাছি ধরনের জিনিসপত্র এসে ইজিলি তাদের হাতে ধরা দিচ্ছে, সারাবিশ্বের জিনিস একসঙ্গে দেখতে পাচ্ছে। জাতির শিক্ষার মাধ্যমটাও এখন ইংলিশ মিডিয়াম। আবার ইংলিশ মিডিয়াম না হলে তারা মনে করতেছে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেছে। মূল নেটওয়ার্কের অংশ হতে হলে তোমাকে ইংরেজি দিয়ে হতে হচ্ছে। বেকায়দা অবস্থা। সবকিছুসহই নিজের জায়গা থেকে লিখে যাওয়াই আসলে...
শামীম : কামুর কবিতা গান নিয়ে আলোচনা হলো, তার ফিল্ম, এই ফিল্মের জগতে তুমি কিভাবে আসলে, কিভাবে তুমি অনুপ্রেরণা পেলে। তারপরেও তোমার দি ডিরেক্টর ছবি, এই ছবির সেন্সর পাওয়া না পাওয়া নিয়ে জটিলতা এবং তোমার অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব ফেসবুকে এটা নিয়ে সংগ্রাম করেছে, আন্দোলন করেছে এরকম সার্বিক বিষয়গুলি নিয়ে...
ফিরোজ : যেমন ফিল্ম করার সময়টায় কি কবিতার থেকে আপনার ফোকাসটা সরে গিয়েছিল? ফলে কবিতা অনেকদিন লিখেননি কইছেন? 
কামু : সেটাও তো কিছুটা ঠিক, যখন তুমি অন্য একটা শিল্প মাধ্যমে ইনভলব থাকতেছ, এমনকি যখন তুমি প্রচুর গান লিখতেছ, তখন কিন্তু একই সময়ে হয়তো তুমি প্রচুর কবিতা লিখতেছ না, আবার যখন প্রচুর কবিতা লিখতেছ তখন হয়তো গান লেখা বন্ধ আছে। মানে তোমার তো একটা টাইম লিমিট আছে, যে আমার জীবনের, আমার দিনের এই সময় আমার এই এই কাজে ব্যয় করার মতো সামর্থ্য আছে। একটা বাড়লে আরেকটা কমে আরকি, তা তো আছেই। দশবছরে কবিতা তেমন লেখি নাই, অনেকদিন পর মামুজির নৌকায় বেরলো, ওই দশ বছরে হয়তো আমার দশটা বই বেরোতে পারত।
শামীম : ফিল্মটাকে কিভাবে...
কামু : ফিল্মে আসলাম কীভাবে? ঢাকায় আসার পরে যখন গান লিখেও হয় না, আবার ওই যে মাসুদ ভাই ছিলেন, উনি তখন ঢাকায়, এখানেও উনি একধরনের সহযোগিতা করেছেন, মাসুদ খান, উনিও উদ্বুদ্ধ করছিলেন আমাকে, যে ফিল্মে কিছু করা যায় কি না, আমি একটা কোর্সেও ভর্তি হইছিলাম, ওখানে দেখলাম আলো, এডিটিং, এইসব নানা ধরনের বিষয়-আশয় পড়ায়। 
হিজল : কোথায়? 
কামু : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। তখন আমি আজিজ মার্কেটে এসে দেখি যে, ধীমান দাশগুপ্তের বই পাওয়া যায়, আরে আমি তো ইজিলি এগুলা পড়তে পারি। ওই কোর্সটায় শেষপর্যন্ত যাওয়া হয়নি আর আমার। ওই সময়টাতে আলফ্রেড খোকন, আজিজ মার্কেটে দেখা হইতো, বলল যে তুমি একটা স্ক্রিপ্ট করে দাও আমাকে। আমি মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্প অবলম্বনে ওকে একটা চিত্রনাট্য বানায়ে দিলাম। সেটা অবশ্য সে পরে আর বানাইতে পারে নাই নানান কারণে। তো সেইটা প্রথম একটা চেষ্টা, অন্যের গল্প অবলম্বনে ভিজুয়ালি জিনিসটাকে দেখার চেষ্টা করা, তারপরে আমি আরেকবার সরয়ারের সাথে, আমার তখন টাকা-পয়সাও দরকার, ভাবলাম যে সরয়ারকে যদি এখন আমি একটা স্ক্রিপ্ট দিতে পারি তাইলে তো আমার টাকাটা হয়ে যাচ্ছে, আমার বাচ্চা হবে তখন, প্রথম বাচ্চাটা, তারমানে এটা ২০০২ এর আগের ঘটনা। ২০০১ এর শেষের দিকে, নিজের গল্প লিখতে গিয়ে একটা অদ্ভূত সমস্যায় পড়লাম আমি, যে বাইরে থেকে একটা গল্প কল্পনা করতে পারতেছি না। এটা হইতেছে না আমার। আমি চিন্তা করলাম, এই যে সমস্যাটা, এই সমস্যাটা নিয়েই আমি স্ক্রিপ্টটা লেখা শুরু করলাম, যে একজন স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টা করতেছে, সে পারতেছে না, তাকে গল্প ধরতে হবে, সে ট্রাই করতেছে, নিজের ফ্যামিলির মধ্যে এই ডায়লগ দাও তো, ওই ডায়লগ দাও তো, এইভাবে এইভাবে সে ধরে ফেলল গল্পটা, ওই গল্পটাই আবার আমি লিখলাম, এবং অদ্ভূত একটা ঘটনা, দ্বিতীয় ছবিতেও আমি আমার আত্মজীবনীই দেখলাম।
শামীম : দ্বিতীয় ছবি না নাটক?
কামু : দ্বিতীয় ছবি, দি ডিরেক্টর। তো, দি ডিরেক্টরের ভিতর দিয়েও কিন্তু আমি একটা আত্মজীবনীটাকেই একটা ফ্যান্টাসির ভিতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। এই একটা লোক আসতেছে, সে তার প্রেমিককো রেখে আসতেছে, আমিও তো বাইরের থেকেই আসছি একটা লোক ঢাকায়, বাংলার একটা মফস্বল থেকে আমি ঢাকার শহরে আসছি, নানা স্ট্রাগলের ভিতর দিয়ে এই যে আগাচ্ছি, ওই ছবিটা কিন্তু ওরকমই, কামরুজ্জামান কামু ঢাকায় আসে, কেন আসে? ডিরেক্টর হইতে আসে, কী জন্যে ডিরেক্টর হইতে হবে? কারণ তার প্রেমিকা বলছে যে তুমি যদি ডিরেক্টর হইতে পারো তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করব। এই যে কোনো না কোনো পিছুটান কোনো না কোনো দায় পিছনে রেখে একটা সাফল্য অর্জন করতে আসা একটা লোক নানা স্ট্রাগলের ভিতর দিয়ে যাইতেছে এটা কিন্তু আমারও আত্মজীবনী এক ধরনের। আবার আমার গল্প কিন্তু হুবহু না এটা, গল্পগুলা বানাইতেছি, আবার কনফ্লিক্ট, কামরুজ্জামান কামু নামে একটা লোক অনলাইনে সার্চ দিলে পাওয়া যায়, নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী, ক্রস-ফায়ারে মারা গেছে, আসলে কোনো শ্লেষ স্যাটায়ার কিছুই করতে চাইনি আমি। একটা ফ্যান্টাসির ভিতর দিয়ে আমার নিজের চেহারাটাকে দেখার চেষ্টা করছি। তার মধ্য দিয়ে একধরনের রস তৈরি হয়। আমি চেষ্টা করছি যে জিনিসটাকে এন্টারটেইনিং করে ফেলা, কোনো গম্ভীর ভারি কিছুর দিকে যাইনি। একটা এন্টারটেইনিং রসের ভেতর দিয়া আমি ডিল করে গেছি পুরা জিনিসটাকে। সিনেমার যে একটা স্পেস, অডিও-ভিজুয়াল স্পেস, যেটাকে অডিও-ভিজুয়ালি ব্যবহার করা যায়। অ্যাসথেটিক-ফ্যাসথেটিক হইল যে ক্যামেরা কেমন হয়, ক্যামেরার ভাষা কেমন হয়, সব মিলাইয়া হয়তো একটা ভাষা দাঁড়ায়, কিন্তু অডিও ভিজুয়াল একটা স্পেস, একটা ল্যাংগুয়েজ, এখানে যত ছবি হইছে এ পর্যন্ত, একটা হলো এফডিসির ভিতর থেকে, আর এদিক থেকে বিকল্পধারা নাম দিয়ে হইছে। এগুলো সিরিয়াস, একটু জীবনঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা থাকে, আর ওই ছবিগুলা খুবই কাল্পনিক, উদ্ভট ধরনের গল্প হয়, অতিরঞ্জিত গল্প। তো আমি দুইটা বিষয়ের মাঝামাঝি হাঁটার চেষ্টা করছি, ফলে, আমি মেশিনের সমস্যায় পড়ে গেছি। আর কিছু না। এদের যে মেশিন, এরা বলতেছে না না এটা তো আমাদের মেশিনের সাথে যায় না, আবার ওদের কাছে যাচ্ছি, ওরা একটু আনন্দ পায়, আবার বুদ্ধিবৃত্তিক জিনিসগুলা ধরতে-টরতে সমস্যা। এই একটা উভয় সঙ্কটে পড়ছি, এখন উভয় সংকট থেকে মুক্তি পাইলেই আমার মুক্তি।
শামীম : দি ডিরেক্টর মুক্তি পাওয়ার পরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
কামু : আরও ছবি বানাব, ছবি বানাইতেই থাকব। একের পর এক।
পদ্ম : এই ছবিটা আপনি, ছবিটার যে দৃশ্য, যেভাবে কবিতা লিখেন আপনি, যে লাফ মেরে অন্যদিকে চলে গেলেন, আপনার সিনেমাটাও কি আপনি ওইভাবে, আপনি মনে করেন কি কবিতার মতো করেই সিনেমা লেখতেছেন আপনি?
কামু : কবিতা যেমন আমরা শুরুতে জানি না যে কবিতাটায় এই এই লেখব, ধীরে ধীরে দাঁড়ায়, এই ছবিটাও সেরকম। এটা আমি যখন শুরু করছি, তখন আমি জানতাম না যে এটা কোথায় যাবে।শেষে গিয়ে দেখা যাচ্ছে যে এই ছবির নায়ক আমি নিজেই হয়ে বসে আছি। ফলে এটা আকস্মিকতায় ভরা। গম্ভীর রসের সভার মধ্যে, গম্ভীর রস করতে করতে হঠাৎ করে একটা লাফাঙ্গা জিনিস দিয়ে চলে গেল, এরকম আমার অনেক কবিতায়ও আছে।
ফিরোজ : কবিতা লেখাটা আপনার ফিল্মের কোনো কাজে লাগছে? ফিল্মের জন্যে উপকারী হইছে বলে মনে হয়? 
কামু : উপকার বা অপকার আমি বলতে পারব না, আমি কবিতা লিখছি বলেই আমি এই ছবিটা বানাইছি আসলে।
ফিরোজ : কবিতা লিখছেন বলেই এই ছবিটা বানাইছেন?
কামু : হ্যাঁ, কবিতা লিখছি বলেই এই ছবিটা বানাইছি। কবিতা না লিখলে আমি এই ছবিটা বানাইতাম না। অন্য ছবি বানাইতাম হয়তো।
পদ্ম : আপনি যে গাইবান্ধা থেকে আসলেন, আপনার কাছেই শোনা কথা, আপনি চেঞ্জ হয়ে গেছেন, আপনার চলাফেরা বা যেভাবে মানুষের সাথে মিশতেন, যে কোনো কারণেই হোক সংকুচিত হয়ে পড়ছিলেন, এই ব্যাপারগুলো জানতে চাচ্ছিলাম। 
কামু : এগুলা আসলে অর্থনৈতিক কারণে। জীবিকার সংকটে থাকতাম সবসময়। ফলে নতুন একটা পরিবেশে এসে স্বতস্ফূর্তভাবে আমি চলাচল করতে পারি নাই। আমার স্বতস্ফূর্ততা অবদমিত হয়ে যায় ঢাকার সমাজে এসে, পরে সেখান থেকে আমাকে ধীরে ধীরে বাইর হইতে হইছে। অনেকদিন একটু সলজ্জ কবি হিসেবে থাকার ফলে, আমি মানুষের সাথে মিশতে লজ্জা পাইতাম, সেগুলা আমাকে ভাঙতে হইছে। যেমন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো আমার একটা ইচ্ছাকৃত প্রয়াস ছিলো, যে আমি যে মুখ দেখাতে লজ্জা পাই, শরম লাগে, দূর থেকে কেটে পড়ি, এই যে টেন্ডেন্সিটা, এটা থেকে আমি বারাইতে পারি কীভাবে? তাহলে ক্যামেরার সামনে যদি আমি একবার দাঁড়ায়া যাই, তাহলে তো আমার লজ্জা থাকল না, তখন তো আমি ইজি হয়ে যাব, এই ধরনের টেন্ডেন্সি থেকেই আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইছিলাম। পরে কিন্তু আমি আর করি নাই, পরে দেখলাম যে চেহারায় পরিচিত হওয়াটা খুবই বিড়ম্বনামূলক। নিজের পরিচয় আর থাকে না। যে নাটক বা বিজ্ঞাপনে তোমাকে যেই চরিত্রে দেখা গেল ওই চরিত্র ধরে তোমাকে ডাকতে শুরু করলো লোকে।
পদ্ম : আচ্ছা কামু ভাই, এই যে আপনি ঢাকায় আসলেন, আপনার কবিতার মধ্যে এতো কিছু ঘটলো, তারপর কবিতার মধ্যে আপনি ফিরে যাইতে চান মায়ের নাভির ফুলে, এই যে ব্যাক করার একটা প্রবণতা, বারবার ফিরে যাবার যে প্রবণতা, এই জায়গাটা আমি জানতে চাচ্ছি। শেষপর্যন্ত আপনি ফিরে যেতে চান গ্রামে, এর ঘটনাটা কী?
কামু : প্রত্যেকটা মানুষের মূল থাকে। সে অনেককিছু করে হয়তো, আবার বিশ্রাম নিতে আসে সেখানেই, মানুষের মূল থাকে আসলে। একটা গ্রামের বাড়ি থাকে মানুষের, আমি কিন্তু আমার গ্রামের বাড়ির অনুভূতিকে জাগ্রত রাখতে চাই, যেন ওইটা আমার মূল, ওখান থেকে আমি আসছি, বুঝছ? ছেড়ে ছেড়ে চলে যাওযার চেয়ে ঘুরেফিরে আবার আসা। 
পদ্ম : আপনার শেষ বইয়ে এ ব্যাপারটা অনেক তীব্র, চেয়ে আছো বইটার ভিতরে আপনার স্মৃতিকাতরতা, আপনার দাদা, আপনার বাবা জিজ্ঞেস করছিল যে আপনি ফিল্ড মার্শাল হবেন না কী প্রেসিডেন্ট হবেন? এখনও কি প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাধ মনে মনে লালন করেন? 
কামু : আমি কোনোকিছু লালন-টালন করি না। এগুলো হলো কী, আমি দেখে আসছি যে আমাদের একটু আগের থেকে যে কবির জীবন, তাদের যে ইচ্ছার ভঙ্গি, দেখা যায় যে একটু নিরীহ ধরনের। মানে, কবি একটু নিরীহ হবে, অন্যকিছু পারি না বলেই কবিতা লিখি, এই যে টেন্ডেন্সি, এই টেন্ডেন্সিগুলাকে ধাক্কা দেয়ার জন্য আমি এ ধরনের কথা বলি, যে আমি প্রেসিডেন্ট হতে চাই, বা আমি ব্যবসা করব, মানে আমি আসলে আমার ভাবটাকে ওই জায়গা থেকে বের করে এনে কবি মানে নিরীহ নয়, কবি মানে অন্যকিছু পারি না বলে কবিতা লিখি এইরকম জায়গায় নয়, এইরকম একটা ভাব উপস্থাপন করা।
পদ্ম : আপনাকে কিন্তু রোমান্টিক কবি বলে, কিন্তু মাঝে মাঝে আপনার বিদ্রোহী একটা চেতনা, রাজনৈতিক চেতনাও মাঝে মাঝে দেখি যে উঁকি দেয়, বা তীব্রভাবে আসে, যেমন ধরেন যে আপনার ওই ধানবেচালোক এদিক থেকে বলা যায় যে, একটা প্রলেতারিয়েত শ্রেণির কবিতা, এবং আপনি আগে বলছিলেন যে আপনি ন্যাপ করতেন, বা আমি বিশ্বজিতের বুকে রামদা কোপাই, রাজনৈতিক যে চেতনা আমরা লক্ষ করছি আপনার কবিতায়, মাঝে মাঝে যে রাজনৈতিক চেতনা আপনার ভিতরে নাড়া দেয়... 
কামু : এগুলোর তো বাইরে আমরা নই, এগুলা গাছ, নিমগাছ আছে, নিমপাতা আসে, কতকিছুই তো আসে আমার কবিতায়, সেরকম করে হয়তো ওই কবিতাটা যখন লিখতেছিলাম, সেই সময় হয়তো বিশ্বজিতের বুকে কেউ একজন রামদা কোপাইছিল, সে-ও তো একজন মানুষই রামদা কোপাইছিল, সেই জিনিসটা যেন আমি এই সভ্যতার বা এই যে মানুষের অপরাধের প্রবণতা, কী বলা যায়? এই যে অপরাধের প্রবণতা, হ্যাঁ, সেটাও হয়তো কবি তার নিজের ভেতরে অনুভব করে, যে আমিই তো কোপাই, কবি যখন পুরাটাকে ধারণ করে, তখন তো আসলে, সেই-ই কোপায়।
পদ্ম : আপনাকে মাঝে মাঝে দেখা যায়, আপনি বিভিন্ন চরিত্রে প্লে করেন নিজেকে, অ্যাক্টিংয়ে, যেমন আপনি মামুর চরিত্রে কিছুদিন প্লে করছেন, যে, নিজে একটা মামু চরিত্র ক্রিয়েট করে প্লে করছেন, এই ব্যাপারটা আমি জানতে চাই, একেক সময় একেকরকম জগৎ তৈরি করেন এবং ওই ভঙ্গিতে চলাফেরা করেন, এই ব্যাপারটা নিয়ে জানতে চাচ্ছি। মামু, কাকা, বাবা, বিভিন্ন সময়ে, যেমন মাঝে মাঝে আপনি বিদ্রোহী, এই ব্যাপারগুলো, মানে ওইসময় কিন্তু আপনি ওইভাবেই চলেন, কথাবার্তার স্টাইল, বা এই জগৎগুলো সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
কামু : এমনি এমনি হয় ওরকম আরকি, এগুলো হয়ে যায় কবিতার মতো করে, আবার বদলে যায়, আগের মতো আর থাকতে চায় না, আগের থেকে বের হতে চায়, হতে গিয়ে আবার আরেকটা নতুন চেহারা, নতুন জীবন তৈরি হতে থাকে।
ফিরোজ : সমসাময়িক কবিদের কথা বলেন, আপনার কাকে ভালো লাগে, বা আপনি আপনার নিজের প্রিয় কবি-টবির কথাও বলতে পারেন, তরুণ কবিদের প্রতি উপদেশও দিতে পারেন।
কামু : এইগুলা আলোচনা না করি।
হিজল : না, বলতে পারেন, তরুণ কবিদের জন্যে আপনি বলতে পারেন, কারণ এটা তো আপনার উপরে একটা সংখ্যা। এখানে এক ধরনের আড্ডা হইলেও এটা আপনার ইন্টারভিউ, সো একটা ওভারঅল ব্যাপার নিয়ে কথা বলতেই পারেন, এখনকার বাংলা কবিতা, বাংলা কবিতার ব্যাপারে আপনার ধারণা, আসলে আমাদের কোথায় যাওয়া উচিৎ ছিলো ব’লে আপনার মনে হয়, একটু বেশি জরুরি এই ধরনের ব্যাপারগুলা, এই উপাদানগুলা, এই যে ওভারঅল।
কামু : এরকম কোনো শক্ত অবস্থান আমার নাই, যে আমি বলব যে, এরকম হওয়া উচিৎ ছিলো। এগুলো আমি বলতে পারব না, বা এই...
হিজল : এটা আসলে আপনার ব্যক্তিগত বলাটাই, আপনি আসলে সাবজেক্টিভলি বলতে পারেন আমাদেরকে। 
কামু : সেটা আসলে কী, আমার বলার, আমি নিজেই দেখ না, আমি একরকমভাবে স্থির থাকি না, থাকতে পারি না, অন্যরকম হয়ে যাই। ফলে, আমি না আসলে কারোর জন্যই, আমি শুধু বলি যে কবিতার প্রয়োজন আছে, কবিতা লেখা খুবই, মানুষকে জীবন্ত রাখার জন্য মানবীয় অনুভূতিকে সজাগ রাখার জন্য, যন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই কবিতার চর্চাও হওয়া উচিৎ।
হিজল : ধরেন যে সত্তর পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতা আসলে একটা বড় টার্নিং পয়েন্টের ভিতর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের কবিতার যে যাত্রা এইটা সত্তরের লোকরা আসলে তাদের গড়ে ওঠা বা দেশকে দেখার ভঙ্গিটা কিন্তু সত্তরের আগের স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক বা স্বাধীন বাংলাদেশে যারা চর্চা শুরু করল এটা আগে থেকে শুরু হইছে এটা একটা ফারাক এই জায়গা থেকে আছে না, যে এরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে বলে আপনার মনে হয়, বা এই ধরনের কাজগুলি গুরুত্বপূর্ণ হইছে, এটার একটা ব্যাপার তো আছেই, বা বাংলাদেশের কবিতা এবং পশ্চিমবঙ্গের কবিতা, আমাদের যে একটা বিভাজন রেখা, এটা স্পষ্টই হওয়া উচিত।
কামু : আমার কাছে যেটা মনে হইছে, এখন আমরা কোন সময়ে আছি, কোন সময় এটা?
হিজল : ২০১০ পরবর্তী সময়।
কামু : এই, দ্বিতীয় দশকের আগে ছিল প্রথম দশক, তার আগে হলো নব্বই দশক, আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয় যে, আধুনিক কবিতা যে চেহারা নিয়ে দাঁড়ায়ে গেছে যে, রূপরেখা নিয়ে দাঁড়াইছে, যে ধরনের সংবেদনশীলতাকে আমরা আধূনিকতা বলে চিনি, সেই জিনিসগুলা থেকে, কবিতা যেহেতু এমন হইছিল যে অনেক সরাসরি ইংরেজি কবিতার থেকে এসে, ওই যেমন পরে বললাম যে নব্বইয়ের দশকে, কিছু পশ্চিমবঙ্গে, বাংলা কবিতার সব ঠিকি আছে, কিন্তু ওরা যেমন অন্য ভূখ-ে, তার সেই সমাজের শব্দ, এই মুহূর্তে কী ধরনের স্পন্দনের মধ্যে আছে, একটা রাষ্ট্র আলাদা, সেখানের শাসন আলাদা, সেখানের আন্দোলন, জীবনযাত্রা সমস্ত কিছুই আলাদা। ফলে সেখানের মানুষেরা আসলে কোন ওয়েভে চিন্তা করবে, বা কোন ওয়েভে খেলা করবে, সেটা হয়তো আমাদের এখানে না, আমাদের এখানে আলাদা, ফলে এটার একটা ভাষা বোধ হয় এখানকার ভিতর থেকেই, কিন্তু আবার ওই আধুনিক যে চেহারাটা দাঁড়াইছে, সেটা অনেকদিন পড়তে পড়তে, এখনও জীবনানন্দ পড়তে অনেক আনন্দ পাই ঠিকি, কিন্তু তাঁর মতো করে যে দাঁড়ানো জিনিস, তার ভিতরে ক্লিশে, একই রকম লাগে, সেখান থেকে কবিতা কিরকম কিরকম ভাবে বের হতে পারে, সেটা নানান কবি যদি তাদের নিজেদের মতো করে চেষ্টা করতে থাকে, তাহলে কোনোটা কোনোটা বেশ হয়তো অন্যদের কাছেও অর্থ তৈরি করতে পারবে, হয়তো তার মধ্য দিয়ে একটা নতুন চেহারা আমাদের মধ্যে আসতে পারে। সেইক্ষেত্রে আমার যেটা মনে হইছে যে, ওই যে শিকড়ের সন্ধান বলে কথাটাকে যতই আমরা, বলতে বলতে সিলি হয়ে গেছে, কিন্তু হইতে পারে এটা যে, আমাদের এখানে, যা সরাসরি ইংরেজি প্রভাবিত না, সেই সাহিত্য, সেই শিল্পগুলা এখনও যে সমাজে আছে, এখনও যে তার একটা স্পন্দনও আছে ওইসব বিষয়ে, আমাদের কিছু কিছু জায়গায় সেগুলোর ভিতর থেকে কোনো কোনো উপাদান,ভঙ্গি, স্বর এসে মিলিত হতে পারে কী না, হয়ে আবার আমাদের নিজেদের মতোই চেহারা মনে হবে, কিন্তু আবার বৈশ্বিক, বৈশ্বিক তো আমরা ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করতেইছি, কিন্তু এটাতো বাংলা কবিতা একইসঙ্গে, তা-ই যদি হইতো, তাইলে আর বাংলা কবিতার দরকার ছিলো না, তাইলে ইংরেজি কবিতা লিখলেই হইতো। এটা একটা কালচার, এই কালচারটাতে এখানকার জনসংস্কৃতির ভিতর থেকে তুলে আনা যায় সেই রকম একটা সর্বব্যাপী মনোভাব তৈরি হলে হয়তো বাংলা কবিতা অন্য একটা চেহারা নিতে পারে, দ্রুতই।
হিজল : হ্যাঁ, সেটার ব্যাপারে আপনার কী মনে হয়, সাম্প্রতিকতম, ধরেন, এই যে এখন পর্যন্ত যে, আছে না, লোকজন কাজকর্ম করতেছে, লেখাপড়া করতেছে। 
কামু : এখনও আমরা উৎস হিসেবে, আমাদের সাহিত্য সৃষ্টির উৎস হিসেবে, একই সাথে প্যারালালে চলে, কিন্তু অনেকে বলে স্বতস্ফূর্তভাবে আমার জীবন দিয়ে লিখি, আসলে তো এরকম না বিষয়টা, ওটাতো সাহিত্যের একটা ভাষার, ধারাবাহিকতার একটা অংশ, আমার কালের সঙ্গে, আমার জীবনের সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্কিত, কিন্তু সেটা ওই ভাষার ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গেও তো, সেই জায়গায় আমার এখনও মনে হয়, যে উপাদানগুলা গ্রহণ করি আমরা, অধিকাংশই আমাদের ওই আধুনিকতার ভিতর থেকেই, এখনও এই টেন্ডেন্সিটাকে অনেক শক্তির জায়গাগুলো থেকে, অনেক ক্ষমতার জায়গাগুলো থেকে প্রাধান্য দিতে শুরু করা হয় নাই, যে তুমি হিজল জোবায়ের, তুমি এসময়ের একজন শক্তিশালী তরুণ, তুমি এটাকে এসে হয়তো প্রকাশ করতেছ, এবং আরও যাদের সঙ্গে তোমার ইয়ে হচ্ছে। এই যে এরকম করে আসা, এটা নাই। সেটা যে আমার মধ্যে আছে এমনও না। আমি যেমন বললাম যে নিগার সুলতানায় ট্রাই করছিলাম, করে আমি ওটার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ বা বিকশিত কোনো চেহারা দিতে পারি নাই, ওখানে বরং ওই টোটাল বই মিলাইয়া আবার একইসঙ্গে আধুনিকতাও বিপুলভাবে আছে। তো সেরকম একটা চেষ্টা দারুণভাবে গড়ে ওঠেনি, বা উঠবে কিনা সেটাও আমি জানি না, কিন্তু উঠতে পারে, আর এক্ষেত্রে ধর যে আমরা সবাই সমকালীন কবি আসলে, সবারই এখন কে কোনদিকে, এক বুড়া কবিও শেষ বয়সে গিয়ে ধরো একটা নবীণ জিনিস করে ফেলল।
হিজল : না কামু ভাই, এইখানে আসলে আমি একটা জিনিস জানতে চাই, মানে গভীর অর্থে ছন্দের জায়গা থেকে, মানে ছন্দের যে ফর্মগুলো, নানান ধরনের ছন্দ, এইগুলার মধ্যে যে সুরগুলা আছে, এই সুরগুলার সাথে জনসংস্কৃতির তো একটা সম্পৃক্ততা কিন্তু আছে। যেটা হাজার বছর ধরে আসলে গড়ে উঠছে, সেক্ষেত্রে বাংলা কবিতায় যে ইউরোপীয় চিন্তা-চেতনাগুলো খুব সহজে জায়গা করে নিতে পারছে, বা ঢুকে পড়তে পারছে, সেক্ষেত্রে আমরা যে ক্রমাগত গদ্য কবিতা এবং দেখা গেছে যে মুক্ত গদ্য, অমুক-তমুক, এই যে ভাষার একটা স্বেচ্ছাচারিতা তৈরি হইছে, ওই ছন্দগুলি, আসলে অনেক ছন্দ ভেঙেচুরেও যেটা হয় ছন্দ, সেটাকেও ছন্দ ধরে, সুরের জায়গা থেকে আবার ভেঙ্গেচুরে যে এই ধরনের কাব্যভাষার দিকে গেছি, এই ভাষাটাও একধরনের দায়-ই বলে আমার কখনও কখনও মনে হয়, যে এমন একটা ভাষা তৈরি করি যার ফলে ওই জিনিসগুলা, ওই কালচারগুলি এডাপ্ট করতে আমাদের ইজি হইছে আর কী, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা যে এই সুরগুলির আবার যে পুনর্বিবেচনা করি, এগুলার ভিতরে যে স্পন্দনগুলা আছে, এগুলার মধ্যে যে গীতিধর্মিতা আছে এই প্র্যাকটিসটাও কবে করতে সক্ষম হবে বলে আপনার মনে হয়?
কামু :  আমার কাছে একধরনের সহজ সমাধান মনে হইছিল যে, এখনকার আধুনিক বাংলা ভাষার কবির টেবিলে সবচেয়ে বড় বই হচ্ছে জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশকে যদি, থাকলই সবচেয়ে বড় আধুনিক কবি, তাকে আমরা পাঠ করে আবার অনেক অন্যধরনের কবিকেও পাঠ করেও আনন্দ পাই এখনও। মাইকেল পড়েও আনন্দ আছে। আচ্ছা, যদি অন্যান্য যে কবিগুলা টেবিলে বড় হয়ে ওঠে নাই সবচেয়ে, সেগুলোকে যদি বড় করে তুলতে থাকি, তার মধ্যে যদি আমি জালালুদ্দিন খাঁর বই, লালনের গানের ভান্ডার, অমুক-তমুক, এগুলো যদি সব তুলে নেই, তাহলে উৎসটা যখন চেঞ্জ হয়ে যাবে, আবার তখন নতুন একটা চেহারা নিয়ে বাংলা কবিতা হাজির হতে পারে কি না, এরকম মনে হইছে। এটা কীভাবে হবে, এটা তো আর আমরা জানি না।
হিজল : আমি বলতেছি, উৎপলের কবিতা, এটাতো ভাইস-ভার্সা, আপনি আসলে ছন্দ, বই, ডিকশনগুলির কাছে যখন যাবেন, ওই যে ভাইস-ভার্সা, ফর্মটাকে আমি একটু আলাদা করে বলতে চাচ্ছি। আমার কেন যেন মনে হয়, এইটা খুব বড়ভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে, আমাদের নিজস্ব সুরগুলারে, কালচারটাকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এই যে ছন্দের, সমস্ত ছন্দের স্বাধীনতার যে, ছন্দের একটা বড় প্রেক্ষাপট, এটাকে আবার নতুন করে রিভাইভ করা, এটা খুব কার্যকরি, আমার যেটা মনে হয়, আপনার কী মনে হয়? 
কামু : ছন্দ তো আছেই, যেমন ধর যে এখনও যারা কবিতা লিখতেছে, ধর যে অক্ষরবৃত্তেই কিন্তু লিখে যাচ্ছে, সেইখানে হ্যাঁ, অক্ষরবৃত্তের চেহারা পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে এখনও কোনো জায়গায় যাওয়া কী না, কিন্তু অক্ষরবৃত্তটা যেভাবে ধারণ করে আছে, গদ্য অক্ষরবৃত্ত আরকি, এখান থেকে বাইর হলে হয়তো অন্য মেজাজ, সেই মেজাজটা আবার সময়কে কীভাবে ধারণ করে, একই সঙ্গে হবে না-হবে, এগুলা আসলে না হওয়া পর্যন্ত বলতে পারব না যে, কিন্তু এটা বলা সম্ভব হয় যে আমার টেবিল থেকে যদি আমার সোর্সগুলা, যদি আমি পাল্টায়ে ফেলি, তাহলে আমার কবিতার, জীবনানন্দ কিন্তু পুরাটাই তোমার আছে, অন্যগুলাও কিন্তু আছে, আরও অনেক ফিগার কিন্তু দাঁড় করানো যায়।
পদ্ম : কিন্তু এখন যে অক্ষরবৃত্তের কবি, মনে করেন যে, অক্ষরবৃত্তের ভাষা একশ বছরও হয়নি, কিন্তু বাংলা কবিতার ইতিহাস তো হাজার বছরের, বাংলা কবিতা তো আগে আসলে গান-ই ছিলো, তালেও ছিলো, তখনও পয়ার-টয়ার ছিলো, কিন্তু বাংলা কবিতা আগের থেকেই সুরের উপর চলে আসছে, পরে এসে গদ্য কবিতার যে ব্যাপারটা, জীবনানন্দদের বা মাইকেলরা লিখিত আকারে বা সুরে সুরে অনেকটা, এখন আমরা আলোচনা করতে গেলে একশ বছরের মধ্যেই ঘুরি এবং এই যে অক্ষরবৃত্তের কবির পরবর্তী যে এদের কথাই বলি, কিন্তু এদের এছাড়াও মূলধারার যে স্রোত আছে, কবিতার আলোচনা এটাকে বাদ দিয়ে কেন আমরা করি না। বৃহৎ আকারে, যেমন ধরেন যে চর্যাগীতি থেকে শুরু করে যে আবহমান বাংলার যে ধারা, মধ্যযুগ থেকে শুরু করে, প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আবহমান বাংলার যে ধারা চলে আসতেছে হাজার বছর ধরে, এরপরে আধুনিকতা বলতে যে কবিতাগুলো আমরা বুঝি। 
কামু : আসলে আধুনিক মাইকেল। আগে কিন্তু, আগের সাহিত্যগুলো ছিলো সব দেব-দেবীমূলক, মানুষ এবং নিজের কথা বলা, তুমি নিজের, কবিতার ভিতরে যে তোমার গল্পও যে গুরুত্বপূর্ণ, এটা কিন্তু তুমি আধুনিক কবিতায় এসে বলতে পারতেছ। তুমি তোমাকেই ঢোকাইতে পারতেছ। তার আগে পর্যন্ত কিন্তু দেখো, এটা একটা উপাখ্যান, বা ইসলামী একটা ইয়ে বানাইলো, বা অমুক মিথের একটা বলল, সাহিত্যগুলা কিন্তু তাই-ই ছিলো মোটামুটি, মাইকেলও তো, দেবতার মধ্যে, হয়তো যেই চেহারায় ছিলো উনি অন্য হয়তো, কবি নিজে এখানে হয়তো বড় হয়ে গেছে, 
পদ্ম : যেমন ধরেন, জয়দেবের যে শ্রীকৃষ্ণ কীর্ত্তন, ওখানে তো মানুষ হিসাবে একটা জিনিস চলে আসছে, শ্রীকৃষ্ণ, রামায়ণের যে শ্রীকৃষ্ণ আর জয়দেবের যে মধ্যযুগের, ওখানে কিন্তু, মানবিক জায়গা কিন্তু অলরেডি চলে আসছে, আমি ব্যক্তি কিংবা ফর্মটার কথা বলতেছি, আমি বলতেছি ফর্মটার কথা, যে আমাদের এখানে যে লালন বা, আব্দুল করিম, এরাও তো আমাদের সমসাময়িক। 
কামু : হ্যাঁ, তাঁদের কথাই তো বলতেছিলাম আমি, তাদেরকেও যদি টেবিলে তুলে আনা যায় যে, যদি শামসুর রাহমানের পাশাপাশি তুমি আব্দুল করিমের গানগুলাকেও রাখো, এগুলোও যদি আমাদের কবিতার অংশ হয়, তাইলে কবিতার চেহারা পাল্টে যাবে।
হিজল : আমি একটা প্রশ্ন করি ভাই, ছোট করে, ছোট করে উত্তর দিবেন, আছে না যে অলরেডি আশিতে যারা কাজ করছে তাদের বয়স কিন্তু ষাটের কাছাকাছি চলে আসছে ৫৫-৫৬-৫৮, বা তাদের আরও কাজ করার সময় আছে, ইভেন নব্বইয়ে যারা কাজ করছে, তাদেরও বয়স প্রায় ৫০ এর কাছাকাছি ধারণা করা যেতে পাওে, যে বাই দিস টাইম, তারা অনেক কাজ করছে এবং এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজও করছে। পরবর্তী কাজের হিসাব বাদেই আপনার কি মনে হয় যে বাংলা সাহিত্য যেভাবে আমরা আল মাহমুদের নাম সহজেই নিয়ে নিতে পারি, তো আশি বা আশি পরবর্তী এরকম বাংলা সাহিত্যের পারস্পেক্টিভ থেকে দুইচার জনের নাম, বা আপনার মনে হয় যে এরা গুরুত্বপূর্ণ, কে কী মনে করল এটা কোনো ব্যাপার না, আপনি সৎভাবে মনে করেন যে এই লোকগুলি আমার মনে হয় যে বাংলা সাহিত্যে বা বাংলাদেশের সাহিত্যে অলরেডি কন্ট্রিবিউট করছে, আমার এদের গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, আছে না এরকম, নাম কিন্তু আসতে পারে।
কামু : এটা আছে, কিন্তু এরা প্রায় সবাই আমার সমসাময়িক কবি তো, এইজন্যে আমি এদের নাম নেওয়ার, একেবারেই যেটা সাধারণভাবে তৈরি হয়, ওই সমস্যাটার কারণেই নাম নিতে চাই না।
হিজল : কিন্তু, আমার মনে হয় যে নামগুলো নেওয়াই উচিত, বরং তাতে আবার হয়-কী জিনিসগুলা...
কামু : যেমন ধর যে, আশির দশকে অনেকেই চর্চা করছেন, হ্যাঁ, তাদের মধ্যে, এইগুলা এই নাম বলাবলির লাইনে আসলে আমার... নাম থাক।
শামীম : আমার মনে হয় শেষ করে দেই। দুই-একটা বা ফিরোজের আর কোনো আলাপ আছে কী না? আর কোনো প্রশ্ন। যে বিষয়টি অবতারণা করতে চাই, যে কামুকে লোক সম্মাননা দেয়া হয়েছে, এই লোক সম্মাননার প্রাপ্তিতে প্রতিক্রিয়া কী। সম্মাননা প্রাপ্তিতে বা একটা পুরস্কার পেলে বা লোকের প্রতি, লোকের এই প্রক্রিয়া, সম্মাননা বা পুরস্কার দেয়ার এ প্রক্রিয়াটিকে তুমি কীভাবে দেখ আর নিজের অনুভূতিটা কী?
কামু : পুরস্কার পাওয়া না পাওয়া, এটা ধরো তুমি নিজেও জানো যে, আমি আসলে পুরস্কার পাইলাম, শিশুর মতো খুব খুশি হয়ে গেলাম, এরকম কোনো জায়গায় নাই, তুমি যখন প্রথম বলছিলা তখনই আমি বলছিলাম যে ধুর ধুর, অন্যদের দাও, আমি তো যাবই ওখানে। মানে এরকম কোনো ব্যাপার আমার মধ্যে ওইভাবে কোনো ক্রিয়া করেনি, এখন পুরস্কার জিনিসটা দিতে থাকা বলতে-কী একটা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান, তোমার সেই প্রতিষ্ঠান বছরে বছরে একটা করে যদি এরকম সম্মাননা দেয়, সেটার মধ্য দিয়ে যদি সক্রিয়তা, সাহিত্যিক অঙ্গনে যে সক্রিয়তা তৈরি হয় সেটা তো অবশ্যই যদি তুমি পজেটিভলি ব্যবহার করতে চাও যে বাংলা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে তুমি একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবা লোক’র মাধ্যমে, পুরস্কার প্রদান, এর মধ্যে দিয়ে একধরনের সক্রিয়তা, এর মধ্য দিয়ে লেখকদের সাথে তোমার সম্পৃক্ততা. তো আমি মনে করি এই পত্রিকা দিয়ে সেটা অনেক ভালো সম্ভব, এবং অনেক বেশি আগায়েও আসবে, এই মুহূর্তে আমি বরং বলতেই চাই যে, ইন্ডিয়ায় যদিও একটা আছে, তুমি যেমন লিটলম্যাগ বল তোমারটাকে, লিটলম্যাগ শব্দটা একটা আভিজাত্য পাইছে বলেই হয়তো বলো, তো, লোক সাহিত্যপ্রতিষ্ঠান হিসাবে তো দেখি সবচেয়ে সচল অবস্থায় আছে, নিয়মিত অবস্থায় আছে, ফলে এই প্রতিষ্ঠানটা অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে সাহিত্যিকদের চর্চাকে পজেটিভ দিক থেকে নেওয়ার ক্ষেত্রে। সবসময়ই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ লেখকদেরই পুরস্কার দেয়ার চেষ্টা করতে থাকাটা ভালো হবে, খাতির বশে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণকে পুরস্কার দেয়ার চেয়ে, যাকে মোটামুটি দু-চারজনের মধ্যে মনে হবে যে, আমাদের যে বোর্ড হবে, হ্যাঁ, পারতপক্ষে যার পটেনশিয়ালিটি বেশি তাকে পুরস্কার দেয়ায় চেষ্টা করতে হবে, এইটা রক্ষা করলে সৎভাবে, এই প্রতিষ্ঠানটা ইতিবাচক ভূমিকাটা রাখতে থাকতে পারবে এবং আমি সেটা চাই।
শামীম : ধন্যবাদ। আমার মনে হয় আজকে শেষ করি। কামুকে বিভিন্নজন প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে কামু অনেক অনেক কথা বলেছে, তার নিজের সম্পর্কে তার কবিতা সম্পর্কে, তার অন্যান্য কাজগুলো সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গেছে। ইতিপূর্বের অনেকের আলোচনার চেয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-আশয় চলে আসছে আমার মনে হয়। এজন্যে কামুকে তো ধন্যবাদ বটেই, উপস্থিত যারা আছে তাদেরকে লোকের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এখানেই আজকের আড্ডা শেষ করছি।

লেখাটি লোক-এর সৌজন্যে প্রকাশিত। প্রতিকৃতি : মাসুক হেলাল

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।