রাত ০৫:৩০ ; শনিবার ;  ১৯ অক্টোবর, ২০১৯  

ভারতীয় গরুর হাটে ইজারাদারদের চাঁদাবাজি

প্রকাশিত:

আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম॥

ঈদ-উল আজহাকে সামনে রেখে কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে আসছে প্রচুর ভারতীয় গরু। জেলার ভারতীয় গরুর হাট নামে খ্যাত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় অবস্থিত যাত্রাপুর হাট এখন ভরপুর ভারতীয় গরুতে। এই সুযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্র গরু প্রতি আদায় করছে বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা। আর চাঁদার টাকা গুণতে গুণতে নাকাল হয়ে পড়ছেন গরু ব্যবসায়ীরা।

ভারতীয় গরু প্রবেশ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বিগত কয়েক মাস থেকে ভারতীয় গরু কম আসলেও কোরবানি ঈদ উপলক্ষে গত দু‘মাস ধরে প্রচুর পরিমাণ ভারতীয় গরু সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। দেশের অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকার তুলনায় কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বেশি গরু প্রবেশের কারণ হিসেবে বিজিবির একটি সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম সীমান্তবর্তী ভারতের ধুবরী জেলার অন্তর্গত অনেক স্থানে সম্প্রতি বন্যার পানি প্রবেশ করায় ঐ স্থানগুলো থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের টহল সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে। ফলে ওই এলাকাগুলো দিয়ে ভারতের গরু ব্যবসায়ীরাই বাংলাদেশ সীমান্তে গরু প্রবেশ করাচ্ছে। আর কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে গরু প্রবেশের সংখ্যা।

কুড়িগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মিলে এখন পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা সেতু করিডোর এবং রৌমারী করিডোর দিয়ে প্রায় ৭০ হাজার গরু-মহিষের করিডোর করা হয়েছে যা বিগত বছরের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (কুড়িগ্রাম সার্কেল) জি এম আশরাফুল আলম ট্রিবিউনকে জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু কুড়িগ্রাম ধরলা সেতু করিডোর পয়েন্ট দিয়ে প্রায় চব্বিশ হাজার গরু-মহিষ করিডোর করা হয়েছে এবং ঈদের আগ পর্যন্ত তা ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশের পর তা কাস্টমসের মাধ্যমে করিডোর করতে হয় । আর এক্ষেত্রে সহায়তা করে বিজিবি। করিডোর করার জন্য ভারতীয় গরুগুলো রাখা হয় বিট বা খাটালে (গরু রাখার স্থান)। এখানে ৫০০ টাকার বিনিময়ে করিডোর করতে হয়। কিন্তু গরুর ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, করিডোর বাবদ তাদের কাছে গরু প্রতি ৫৫০ টাকা করে নেওয়া হয় এবং বিটের নামে নেওয়া হয় ১০০ টাকা, যদিও সরকার রাজস্ব পায় শুধু ৫০০টাকা। আবার হাটে বিক্রির সময় ইজারা ফি বাবদ গরু প্রতি একশত ৮০ টাকা দেওয়ার বিধান থাকলেও ইজারাদাররা নিচ্ছেন ২৩০-২৫০ টাকা। যাত্রাপুর হাটে গিয়ে এর সত্যতাও পাওয়া গিয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অতিরিক্ত এই টাকা না দিলে শুরু হয় নানা ধরনের হয়রানি। এই হয়রানির ভয়ে তারা অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদেরকে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

কুড়িগ্রাম জেলার অভ্যন্তরে গরুবাহী ট্রাকগুলোতে পুলিশের চাঁদাবাজি না থাকলেও মহাসড়কের অন্যান্য স্থানে পুলিশের হয়রানি আছে বলে জানান অনেক ব্যবসায়ী। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থেকে আসা শাহিন নামে একজন গরু ব্যবসায়ী জানান, কুড়িগ্রামে পুলিশের চাঁদাবাজি না থাকলেও রংপুর পেরিয়ে শুরু হয় পুলিশের নানা হয়রানি। গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ সহ কয়েকটি জায়গায় পুলিশকে চাঁদা দিতে হয় বলে জানান এই ব্যবসায়ী। একই অভিযোগ করেন বাইরের জেলাগুলো থেকে আসা আনোয়ার, সালাম এবং জাহাঙ্গীর নামে কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী।

গরুর খাটালে অতিরিক্ত টাকা বা বিট আদায় করা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিটের টাকার কোনো অংশই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। এর পুরোটাই চলে যায় সংঘবদ্ধ একটি চক্রের পকেটে। কুড়িগ্রাম কাস্টমস এর সূত্র অনুযায়ী শুধু আগস্ট আর সেপ্টেম্বর মাস মিলে কুড়িগ্রাম ধরলা সেতু করিডোর পয়েন্ট দিয়ে যে পরিমাণ ভারতীয় গরু-মহিষ এসেছে তাতে গত দেড় মাসে একশত টাকা হারে প্রায় ষাট লাখ টাকার অবৈধ বিট আদায় করা হয়েছে, যার একটি টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। মেসার্স ডি,এস ট্রেডিং নামক প্রতিষ্ঠানের নামে বিট আদায়ের রশিদে দেখা যায়, রশিদটি ২০১০ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি স্মারক নাম্বারের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হচ্ছে যা নবায়ন করা হয়নি। তারপরও এই রশিদ দিয়ে আদায় করা হচ্ছিল গরু প্রতি একশত টাকা। বিট বিষয়ে ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানাযায়, একটি রিট পিটিশনের (রিট পিটিশন নাম্বার৯৩৯৭/২০১৫) পরিপ্রেক্ষিতে এই বিট আদায় মহামান্য হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছেন। হাইকোর্টের এই আদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার রংপুর, জেলা প্রশাসক কুড়িগ্রাম এবং বিজিবি ৪৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক, কুড়িগ্রামকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। বিট আদায়ের আইনি বৈধতা সম্পর্কে কুড়িগ্রাম পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকনের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বর্তমানে যে বিট আদায় হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।

এ ব্যাপারে বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খাঁন মো. নুরুল ইসলাম এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি তৎক্ষনাৎ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যাতে এ ধরনের অবৈধ চাঁদা আদায় করা না হয় এবং হাট প্রাঙ্গণে মাইকিং করে তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় অবৈধ বিট আদায়।

তবে বিট আদায় বন্ধ হলেও হাট ইজারাদারের অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজিসহ পুলিশের হয়রানি বন্ধ না হলে গরু নিয়ে ভোগান্তি থেকে সহসা রেহাই পাবে না এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

/টিএন/

 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।