রাত ০৫:৪০ ; সোমবার ;  ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮  

তারা সকল কাজের কাজি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এহতেশাম ইমাম।।

গত ২ বছর হলো অনার্স সম্পন্ন করেছে আসিফ কিন্তু কোথাও ভালো চাকরি পেল না। আশেপাশে বন্ধুদের ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করতে দেখে সেও ৬ মাস আগে সিদ্ধান্ত নেয় ফ্রিল্যান্সিং করবে। এ লক্ষ্যে  অনলাইনে এ সংক্রান্ত সাইটগুলোয় অনেকদিন ধরে  চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই সফল হতে পারছে না। একটি কাজ যদিও পেয়েছিল, তার নিজের ব্যাংক একাউন্ট না থাকায়, ওই কাজের পারিশ্রমিকটাও পায়নি সে।  তার এই ব্যর্থতার পেছনের কারণটি কী? কোথায় সমস্যা হচ্ছে? কেন তাকে কেউ কোনও কাজ দিচ্ছে না? তবে কি তার কোনও যোগ্যতা নেই, না কি সে নিজেকে, নিজের কর্মক্ষমতাকে তুলে ধরতে পারছে না? কাজ পেয়েও টাকা পাচ্ছে না, তবে কি এই এই পথও তাকে ছেড়ে দিতে হবে? এতশত ভাবনার ভারে প্রায় হতাশ  আসিফ।

এই ভাবতে-ভাবতে সে যখন ফেসবুকে ঘোরাঘুরি করছিল, তখনই দেখতে হাবঢাকার একটি ইভেন্ট পোস্ট। হাবঢাকা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আয়োজন করেছে একটি মিলনসভার। যেখানে নতুন-পুরনো ফ্রিল্যান্সাররা একত্রিত হবেন। তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। তখনই আসিফ ঠিক করে ফেলে, এই ইভেন্টটিতে অংশগ্রহণ করবে সে।

গত ১২ই সেপ্টেম্বর শনিবার, ইভেন্টটিতে এসে আসিফ একসঙ্গে পেয়ে গেল তার সব প্রশ্নের উত্তর। অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তাদের কর্মপরিকল্পনায় একে-একে উঠে আসে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর। এ ভাবেই নিজের অবস্থান আর সার্বিক বিষয়টি বর্ণনা করলেন হাবঢাকা এবং নিউজক্রেড আয়োজিত ডিএনএন-ফ্রিল্যান্সারস নাইটে অংশগ্রহণকারী আসিফ হাসান।

সবকাজের কাজি নয়, হয়ে উঠুন বিশেষভাবে পারদর্শী

ডিএনএন-ফ্রিল্যান্সারস নাইটে অতিথি বক্তা হিসেবে আসেন টানা দু’বছর ধরে ফ্রিল্যান্সারদের একটি পুরো টিমের নেতৃত্বদানকারী এবং  বিল্যান্সারের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান মো. শফিউল আলম। তার মতে, প্রতিবছর দেশে তৈরি হচ্ছে ১৫০-১৬০ কোটি টাকার আর্ন্তজাতিক  ফ্রিল্যান্সিং কাজের একটি বড় মার্কেট। তবে দেশের স্থানীয় ক্লায়েন্টদের ফেস-টু-ফেস এ সার্ভিস দিতে পারলে কাজ পেতে আরও সুবিধা হবে বলে  তিনি উল্লেখ করেন। এ সময় উপস্থিত সবার উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, সব ধরনের কাজের নেওয়ার প্রতি আগ্রহ না দেখিয়ে বিশেষ কোনও একটি দিকে বেশি করে গুরুত্ব দিতে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এই কর্মক্ষেত্রে বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে পরাদর্শীদের চাহিদা বিদেশি নিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। আর এ কারণে উচিত যেকোনও একটি ঘরানায় পারদর্শী হয়ে ওঠা।

বক্তব্যের শেষদিকে আক্ষেপের সুরে বলেন, বিশ্বায়নের যুগে নিজের দেশকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলেন, আমরা নিজেদের পণ্যের একদমই দাম দিতে প্রস্তুত নই। এ সময় তিনি বলেন,  ‘আসুন আমাদের নিজেদের অর্থনীতিকে সাহায্য করি, একসঙ্গ কাজ করি, দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করি।’

বিক্রি করুন দক্ষতা

পেওনির বাংলাদেশ এর ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর রিফাত আহমেদ বলেন, আসলে আমরা আমাদের দক্ষতা ততক্ষণ বিক্রি করতে পারি না, যতক্ষণ না কাস্টমার তা কিনছেন। আপনার দক্ষতা আছে কিন্তু আপনি যদি তা কাস্টমারকে দেখাতে না পারেন সুন্দরভাবে, তবে কখনও আপনার পক্ষে নিজের দক্ষতা বিক্রি করা সম্ভব হবে না। তাই আপনার মধ্যে যে দক্ষতা আছে, তা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলুন আপনার প্রোফাইলে।

শফিউল আলমের মতো রিফাতও সুর মেলান সেল পাংচার অর্থাৎ ক্লায়েন্টের সামনে নিজের অনেক দক্ষতা একসঙ্গে তুলে ধরার বিষয়ে। তিনি বলেন, আপনার সেরা দক্ষতাটি তুলে ধরুন এবং তার সঙ্গে  আনুষঙ্গিক মিল রেখে যে সব দক্ষতা আছে, সেগুলোই উল্লেখ করুন। পেওনির বাংলাদেশ-এর সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন ফ্রিল্যান্সারা পেওনিয়ারের  মাধ্যমেই খুব সহজে তাদের টাকা ট্রান্সফার করতে পারবেন এবং টাকা হারানোর কোনও  আশঙ্কা নেই।

প্রয়োজনে কাজ করুন টিমের হয়ে

রূপক চৌধুরী প্রতীক, প্রশাসন, ওয়ার্ডপ্রেসিয়ান এবং পিএইচপিএক্সপার্টস জানান, কাজ করতে হলে অবশ্যই ক্লায়েন্টের  সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। ক্লায়েন্ট কোনও কাজ দিলে, আপনি যদি সেই কাজ না করতে পারেন, বা না করতে চান, তবে তাকে সুন্দরভাবে না বলুন। ক্লায়েন্ট যে ধরনের  কাজ চায়, তার জন্য প্রাথমিক গবেষণা করে নেওয়া ভালো। তবে আপনি কোনও কাজ না পারলেও যদি আপনার পরিচিত অন্য কেউ থেকে থাকে, তবে তার কথা বলুন। এতে আপনার ক্লায়েন্টের সঙ্গে  আপনার সম্পর্ক আরও ভালো হবে এবং আপনি আরও বেশি কাজ পাবেন পরবর্তী সময়ে।

তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেটি ফ্রিল্যান্সাররা অনেক সময়ই উপেক্ষা করে থাকেন । সেটি হচ্ছে, যদি সার্ভিস দিতে না পারেন, তবে সেই কাজ কখনোই নেবেন না। এ ক্ষেত্রে একটি টিম যদি করতে পারেন, তবে সাধারণত দেখা যায়, একেকজন একেক কাজে এক্সপার্ট হলে কাজ আর ফেরত দেওয়া লাগে না। সুতরাং টিম গঠন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে তিনি চিরাচরিত বাক্যটি মনে করিয়ে দেন, ‘আপনি যদি দ্রুত যেতে চান তবে একা দৌড়ান, আর যদি বহুদূর যেতে চান তবে একসঙ্গে দৌড়ান।

কিছু করতে চাওয়ার মানসিকতা একটি বড় সম্পদ

ডেভসটিমের কর্ণধার এবং নির্বাহী প্রধান তাহের সুমন অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিয়ে আগত অংশগ্রহণকারীদের উজ্জীবিত করেন। তিনি বলেন, ‘নিজে কিছু করতে চাই, মনের মধ্যে এই কথাটাকে কেউ সম্পদ হিসেবে নিতে পারে না। কিন্তু এটাই ছিল ডেভসটিম-এর জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। ২০১০ সালে কয়েকজন অপরিচিত তরুণ যারা শুধুমাত্র ব্লগিং-এর মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিলেন এক সন্ধ্যায় তারা দেখা করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন টিম গঠন করবেন এবং একত্রে কিছু করবেন। সেই থেকেই তাদের যাত্রা শুরু। ২০১২ সালে তাদের যাত্রা সম্পূর্ণরূপে শুরু হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, একটি জরিপে দেখা গিয়েছে গড়ে প্রতিদিন ১ লাখ ৩৭ হাজার ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে, এই ওয়েবসাইট তৈরির মধ্যেই অনেক ধরনের কাজ আছে। আমরা সেই কাজগুলোর সব ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, যত কাজই করুন তারমধ্যে থেকে অবশ্যই পরিবারকে সময় দিন। পরিবারই হবে আপনার সকল প্রেরণার উৎস।

এড়িয়ে চলুন একই কাভার লেটারের ব্যবহার

সর্বশেষ বক্তা ছিলেন হাবঢাকার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান, সাজিদ ইসলাম। তিনি আনন্দপ্রকাশ করে বলেন, হাবঢাকা নতুনদের জন্য এই ধরনের কাজ করার মাধ্যমে নিজেদের  আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে তাদের ভূমিকা অসাধারণ। তিনি ফ্রিল্যান্সারদের উদ্দেশে বলেন, গুরুত্বের সঙ্গে এবং সময়মতো কাজ জমা দেওয়াটা  জরুরি। ক্লায়েন্টের কাজের গোপনীয়তা রক্ষা পেশাদারিত্বের মধ্যে পড়ে।

এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন সাজিদ ইসলাম। তার মতে, একই কাভার লেটার বারবার ব্যবহার করা উচিত নয়।  এটা খুব সহজেই ধরা পড়ে যায় এবং এ বিষয়ে রিপোর্ট হলে আপনার একাউন্টটি বাতিল হয়ে যেতে পারে। ফলাফল, মুছে যেতে পারে সময় নিয়ে গড়া পুরো প্রোফাইলটি।

‘শুধু নিজের দক্ষতা নিয়েই বসে থাকবেন না, এর জন্য বিনিয়োগও করুন। এর ফলে আপনার রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বক্তব্যের রেশ টানেন সাজিদ। 

শুধু নতুন এবং পুরাতনের স্বতঃস্পূর্ত অংশ গ্রহণ নয়, আয়োজনের শেষ অংশে ছিল  সরাসরি প্রশ্ন-উত্তরের আয়োজন। যার মধ্যদিয়ে পুরোপুরি একটি সার্থক মিলনমেলা হয়ে উঠেছিল তরুণ  উদ্যোক্তাদের জয়যাত্রার গল্পের পুরো আসর।

/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।