রাত ১১:১৩ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

মুক্তিযুদ্ধের পরে যা হয়েছে তা স্বাভাবিক কিন্তু সঠিক নয় : আহমদ রফিক

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[আহমদ রফিক বাংলাদেশের একজন মুক্তমনা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং ভাষা সংগ্রামী। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। রবীন্দ্র গবেষক হিসেবে তিনি সমাধিক পরিচিত। তাঁর কাজের স্বীকৃতিসরূপ টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাঁকে রবীন্দ্রত্ত্বাচার্য উপাধিতে ভূষিত করে।তিনি জন্মেছেন ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ সালে কুমিল্লার শাহবাজপুরে। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক-সহ দেশ বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শারমিনুর নাহার।]

 

শারমিনুর নাহার: কেমন আছেন রফিক ভাই?
আহমদ রফিক: ভালো, ভালোই আছি। শরীরটা ভালো থাকলেই ভালো থাকি। আর লিখতে পারলে। 

শারমিনুর নাহার: এখনো তো হাতেই লিখেন?
আহমদ রফিক: হ্যাঁ, হাতেই লিখি, তেমন একটা অসুবিধা হয় না। তোমাদের ওসব কম্পিউটারে এখনো আসক্ত হতে পারিনি। 

শারমিনুর নাহার: জন্মদিনে কেমন লাগে?
আহমদ রফিক: দেখো, প্রথমেই বলি, আমি এসব জন্মদিন পালনে বিশ্বাসী নই। জন্মদিন পুরোটাই ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য, ওদের আনন্দ আহ্লাদের জন্য। বুড়োরা বা বয়স্করা জন্মদিন পালন করবে এটা বিশ্বাস করি না। অনেক সময় অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়। গত বছর জন্মদিনে বেশ কয়েকজন প্রকাশক, বন্ধু-বান্ধব বাসায় এসে হাজির। কেউ বাসায় এলে তো বলা যায় না যে, তুমি বের হয়ে যাও। কাজেই এটা গিলতে হয়েছে। আর এবার কয়েকজন রাজনৈতিক তরুণ বন্ধু, তারা এক প্রকার জবরদস্তি করেই ধরল। আমার চিন্তাকে সম্মান জানাতে চায়। ওরা ১১ তারিখ বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে একটা অনুষ্ঠান করবে। আরেকটা– কয়েকজন তরুণ কবি, সাংবাদিক তারও একটা অনুষ্ঠান করতে চায় ১২ তারিখ পাবলিক লাইব্রেরিতে। আর বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেল তাদের ওখানে ডেকেছে। এইসব আয়োজন জন্মদিনকে ঘিরে। এসবকে আমার তেমন বিশেষ কিছু মনে হয় না। 

শারমিনুর নাহার: কোন দিনকে বিশেষ কিছু মনে হয়?
আহমদ রফিক: তরুণরা আসলে ভালো লাগে কথা বলতে, স্মৃতিচারণ করতে। তাদের কথা শুনতেও ভালো লাগে। 

শারমিনুর নাহার: শৈশবের কথা মনে পড়ে?
আহমদ রফিক: পড়ে, গ্রামের কথা মনে পড়ে। অন্য সবার মতো আমিও শৈশবে দুরন্ত ছিলাম। হলুদ সরষে খেত, সবুজ ধানক্ষেত একেবারে মোহাচ্ছন্ন করে রাখতো আমাকে। ছায়া ঢাকা বিস্তৃত ধানক্ষেতের সারি, দিগন্ত জোড়া আকাশ খুব প্রভাবিত করেছিল শৈশবেই। এখনো চোখ বুজে দেখতে পাই। ঐ গ্রামের প্রকৃতি দেখেই প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করি। গ্রামে ছিলাম ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত।

শারমিনুর নাহার: কার কার কবিতা পড়তেন?
আহমদ রফিক: রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করায় সবাই ভাবে আমি হয়ত প্রথম থেকেই রবীন্দ্রভক্ত। কিন্তু না, ছেলেবেলায় আমি নজরুলের কবিতার প্রেমে পড়ে। আর স্কুল জীবন থেকে দুটো জিনিস আমার মধ্যে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এর একটি হলো রাজনীতি আর দ্বিতীয়টা হলো সাহিত্য। পাঠ্যপুস্তকের পড়াশুনার পাশাপাশি এগুলোও গায়ে গায়ে জড়ানো ছিল। রাজনীতি মানে কিন্তু তখনকার প্রচলিত মুসলিম লীগের রাজনীতি নয়, বামপন্থি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি। যদিও কথাগুলো বহুবার বলেছি, আবারো বলি, কবিতায় তো বললাম বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র বসু। স্কুলজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সে জের এখনো টেনে যাচ্ছি। 

শারমিনুর নাহার: কিভাবে? বাড়িতে রাজনৈতিক আবহ ছিল?
আহমদ রফিক: না, বাড়িতে কেউ কিছু করতো না। আব্বা তো মারা গেলেন ছোটবেলাতেই। মেঘনার ঝড়ে, নৌকা ডুবে। তার সহচার্য তেমন একটা পাইনি। আব্বা মারা যাবার পর বড় ভাইয়ের চাপাচাপিতে আমরা পুরো পরিবার নড়াইলে চলে এলাম। বড়দা ওখানে চাকুরি করতেন। তখন ওটা ছিল যশোর জেলার নড়াইল মহকুমা। বড়দা অসম্ভব বইয়ের পোঁকা ছিলেন।

শারমিনুর নাহার: বেঁচে আছেন তিনি?
আহমদ রফিক: না, আমি ছাড়া বাকি তিন ভাই বড় বোন, সবাই মারা গেছেন। আমার মা ছিলেন সৈয়দ বাড়ির মেয়ে। নামাজ-রোজ করতেন তবে রক্ষণশীল ছিলেন না। তিনি কোনদিন আামকে বলেননি নামাজ পড়তে, রোজা রাখতে। কিন্তু আমি কেনো জানি সেই সাত-আট বছর বয়সেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম, ত্রিশটি রোজা রাখতাম। 

শারমিনুর নাহার: আপনি কখনো মক্তবের পড়েছেন?
আহমদ রফিক: হ্যাঁ, নড়াইলে যাবার পরে তো মক্তবেই পড়েছি। বাংলা, আরবি, উর্দু। এই তিনটা বিষয় ছিলো। তখন উর্দু বেশ রপ্ত হয়েছিলো, এখন ভুলে গেছি। আরবিতেও ভালো ছিলাম। মক্তবে ফার্স্ট হয়েছিলাম। 

শারমিনুর নাহার: বাংলা বইয়ের বিষয় কি ছিল?
আহমদ রফিক: মূলত ধর্মীয় বিষয়গুলোরই বেশি প্রাধান্য থাকতো বইগুলোতে।  

শারমিনুর নাহার: ছেলেবেলায় কি পড়তেন?
আহমদ রফিক: প্রচুর বই পড়তাম। বেশি আগ্রহ ছিল গোয়েন্দা গল্প পড়বার দিকে। তখন ক্লাস এইটে কি নাইনে পড়ি, একটা গোয়েন্দা উপন্যাস লিখে ফেললাম। মফস্বলে তখন, কাগজের দুই পৃষ্ঠায় লেখা। খবরের কাগজে পাঠিয়েছিলাম। যথারীতি ছাপা হয়নি। 

শারমিনুর নাহার: রাজনৈতিক সাহিত্য বা রাশিয়ান সাহিত্য? 
আহমদ রফিক: তখন প্রচুর পরিমাণে এসব বই ছিল না। কিছু কিছু অনুবাদ হতে শুরু করেছে মাত্র। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ পড়ে খুব আকৃষ্ট হয়েছিলাম। আমরা তো মফস্বলে, সেখানে এতো কিছু পৌঁছাত না। আর ঢাকায় তো রাশিয়ান সাহিত্য আসলো অনেক পরে, মফিদুল হকের কল্যাণে। যখন আইএসসি পড়ি, মনে আছে তখন ষোল পর্বের ডন সিরিজ পড়েছিলাম। পরবর্তীতে দস্তয়ভস্কি, তলস্তয় পড়েছি। 

শারমিনুর নাহার: তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি কত বছর বয়সে পড়েন?
আহমদ রফিক: এটা কলেজ জীবনে। আর ওই সময়ে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমি স্কুল লাইব্রেরি থেকে একটি বই এনেছিলাম। মেধাবী ছাত্র হিসেবে মাস্টারমশাইরা খুব স্নেহ করতেন। বইটার নাম ছিল ‘সিলেক্টেড পয়েমস অফ শেলি এন্ড ওমর খৈয়াম’। তখন ওমর খৈয়াম পড়ে এতোটাই অভিভূত হয়েছিলাম যে, নরেন্দ্র দেবের অনুবাদ জোগাড় করে পড়লাম। ঢাকায় এসে অরিজিনালটা সংগ্রহ করি। ক্রান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদ আছে একটা খৈয়ামের কবিতা সেখানে আবার রবীন্দ্রনাথের চমৎকার একটা ভূমিকা ছিল। ওখানে পঁচাত্তরটা রুবাই ছিলো। আমার ওই পঁচাত্তরটা রুবাই মুখস্ত ছিলো। এই খৈয়াম পড়তে পড়তে দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। বুঝতেই পারো তাঁর ওই দর্শনচেতনা আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিলো। 

শারমিনুর নাহার: একটু আগে বলেছেন আদর্শের জের টানছেন...
আহমদ রফিক: তখন বা ওই সময়ে আমাদের আদর্শ ছিলো ব্রিটিশদের পরাধীনতা থেকে মুক্তি। স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা। এর মধ্যে দেশভাগ হয়ে গেল। আমরা নড়াইল থেকে মুঞ্জিগঞ্জে চলে এলাম। মুঞ্জিগঞ্জে এসে আমি হরগঙ্গা কলেজে থেকে আইএসসি করলাম। আবার ওদিকে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইএসসিও দিলাম। আমি ম্যাট্রিকুলেশন এবং আইএসসি দুটোতেই স্ট্যান্ড করেছিলাম। মুঞ্জিগঞ্জে এসে আরো রাজনীতির সাথে যুক্ত হই। ’৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলাম। রাজনীতির পাশাপাশি তখন সাহিত্যপাঠও পুরোদমে চলছে। মোটা মোটা বই পড়ে ফেলতাম। এখানে একটা বইয়ের কথা উল্লেখই করতেই হয়, ‘সিডনি ওয়ে টু বিয়েট্রি’ দম্পতির লেখা অনেক মোটা প্রায় ৭০০/৮০০ পৃষ্ঠার বই। নাম হলো ‘সোভিয়েত কমিউনিউজম’। এটা পড়ে ফেলি। আরেকটা বই খুব প্রভাবিত করেছিলো, স্টোকেন কভারির লেখা ‘ইলিউসান এন্ড রিয়েলিজম’। কবিতার উদ্ভব, বিকাশ, কবিতার ইমেজ ইত্যাদি নিয়ে লেখা খুবই চমৎকার একটি বই। 

শারমিনুর নাহার: বলা যায়, বই পড়তে পড়তেই আপনি এই চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলেন? 
আহমদ রফিক: মার্ক্সবাদী চিন্তুা আসলে কোনো মেধার দান নয়, এটা পড়া এবং উপলব্ধির ফসল বলে আমি মনে করি। 

আহমদ রফিক

শারমিনুর নাহার: বইয়ের জগৎ এবং বাস্তবের জগতের মধ্যে বিশাল পার্থক্য। বইয়ে যা পড়তেন তা কি হুবহু মেলাতে চাইতেন? ধরেন আপনি ‘মা’ পড়ে বিপ্লবী রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হলেন। এখন বাস্তবে তো গোর্কির মায়ের সে সময়ের চিত্র আপনার সময়ে এসে পাবেন না...
আহমদ রফিক: আমাদের কাজের যে পরিকল্পনাগুলো তা যে খুব অবাস্তব তা নয় কিন্তু বাস্তবায়ন করা ছিল খুব কঠিন। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত আলাদা হয়ে যাওয়া কিন্তু কোনো যুদ্ধের মাধ্যমে নয়। এটা হয় আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তীকালে যেটাকে বলা হয়েছে ক্ষমতার হস্তান্তর। ব্রিটিশরা যাওয়ার সময় মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা দিয়ে যায়। যদিও এর আগে অনেক আন্দোলন, অনেক আত্মদান ছিল বিপ্লবীদের। শেষটা বিপ্লবের মাধ্যমে হয় নাই। পরাধীনতা থেকে মুক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে হয় নাই। তা হয়েছে সমঝোতার মধ্য দিয়ে, সংলাপ ও চুক্তির মাধ্যমে। আরেকটা বড় কথা যে, ৪৭ সালে দেশ-বিভাগের পর ৪৮ সালে যে স্লোগান তোলা হল, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’ এটা অত্যন্ত সত্য কথা ছিল। কিন্তু সময়োচিত ছিল না। মানুষ যেখানে বিদেশি শাসক চলে যাওয়াতে আনন্দ, উল্লাস করছে তা ভারতে কিংবা পাকিস্তানে- দুই জায়গাতেই। সেখানে এই স্লোগান কি সময়োচিত? রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসব পালিত হচ্ছে সেখানে আমি কয়েক মাসের মধ্যে বলে দিলাম স্বাধীনতা ভুয়া– এটা মানবে কেউ? কেউ মানেনি। বাস্তবায়নের কথা যেটা বললাম, বাস্তবায়ন করাটা খুব কঠিন। স্কুল থেকে আমি রাজনীতি করেছি। কৌটা নিয়ে লঞ্চে, স্ট্রিমারে চাঁদা তুলেছি, অনেক খেটেছি। আসলে পরিকল্পনা জনগণের চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য ছিল না।  

শারমিনুর নাহার: ওই সময়গুলো পার করে এসেছেন, এখন যখন ভাবেন কি মনে হয়? 
আহমদ রফিক: আমার তো মনে হয় এটা আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। বিভাগ পূর্বকাল থেকে এ পর্যন্ত এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে। যেমন: ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যূত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ; এই যে এতগুলো আন্দোলন এগুলোর কোনটাতেই কি নিম্নবিত্ত শ্রেণির ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়েছে? হয়নি, মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিতে নেমেছিল তার কি কিছু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই, সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের কৃষক, দিনমজুর যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তাতে কি তাদরে জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়েছে? ইতিহাসে এমন অনেক লেখা আছে। দৈনিক পত্রিকাতেও প্রায়ই আসে অমুক দিনমজুর মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আবার দিনমজুর হয়েছে। যেমন, আমি একজনের কথা জানি, গাইবান্ধার হেলাল উদ্দিন। আমি তাকে কিছু অর্থ সাহায্যও করেছিলাম। বিভিন্ন টিভি বা সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত এমন খবর আসে। তুমিও ভালোই জানো এসব। হেলাল উদ্দিন চালের গুদামের দিনমজুর। সে মুক্তিযুদ্ধ করে এসেছে। এখন ৬৭ বছর বয়সেও সে দুই মন ওজনের চালের বস্তা পিঠে নিয়ে চলে। তার পরিবর্তনটা কি হলো? আমরা যদি বলি, প্রতীকীভাবে স্বাধীনতার সুফল অমৃত। সে অমৃতের কণামাত্র তার ভাগে জোটেনি। অনেক খবরের কাগজ থেকে আমি এসব কাটিং করে রেখেছি। অনেক ফেরিওয়ালা, রিকশাওয়ালা, চায়ের দোকানদার যারা মুক্তিযোদ্ধা, এখনও এভাবেই জীবন চালাচ্ছে। এটা কি মুক্তির যুদ্ধ, মুক্তির অর্জন? কাজেই অর্জন যেটা হয়েছে তা অনেকাংশে ব্যর্থ অর্জন বলে আমি মনে করি। আর সমাজ পরিবর্তনের কথা যদি বলো, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন আমরা ২২-২৩ বছর বয়সে ছাত্রজীবনে দেখেছি। তখন আমরা বিপ্লবের স্বপ্ন, সমাজ পাল্টানোর স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু সেই সমাজ পরিবর্তন এখনো হয়নি। 
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যদি বলি, তিনি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে স্বদেশী গান লিখে মাতিয়ে গেলেন। ছয় মাসের মধ্যে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে গেলেন। তাঁর বন্ধুরা জগদীশ চন্দ্র বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী- এরা খুব কষ্ট পেয়ে বললেন, আপনি আমাদের এমনভাবে উৎসাহ দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে শেষপর্যন্ত নিজেই এর থেকে সরে গেলেন? তিনি বললেন, এটা তো শিক্ষিত সমাজের আন্দোলন হচ্ছে, যেটা চেয়েছিলাম এই আন্দোলন তা নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় গ্রাম আছে মধ্যযুগে আর শহর আছে আধুনিক যুগে। এ দুয়ের মধ্যে ব্যবধান অনেক। এজন্য আগে গ্রামের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। তাই তিনি স্বদেশী আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে গ্রামের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে লাগলেন। এরই ফলশ্রুতিতে শিলাইদহে, পতিসরে, শান্তিনিকেতনে- বিভিন্ন গ্রামের উন্নয়নে তাঁকে নিয়োজিত হতে দেখা যায়। এখানেও ব্যাপারটা এরকমই যা আমরা তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করেছি, কিছু পড়েছি, রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক ব্যাপার, আসলে শ্রেণি বৈষম্য, শোষণ এগুলো থেকেই গেছে। সমাজ গঠনে কাজ বা রাজনৈতিকভাবে আমার এই স্বপ্ন দেখলেও তা কখনওই শাসক শ্রেণি পরিবর্তনের ভূমিকা রাখেনি। আর রাজনীতির ক্ষমতা যাদের হাতে গিয়েছি তারা এটাকে বহনও করেনি, ধারণও করেনি। তাই একটি শেণি মধ্যবিত্ত, যারা শিক্ষিত হয়েছে অনেকেই আবার এলিট শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। 
’৭১ সালে যুদ্ধ আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। আমরা কিন্তু যুদ্ধ শুরু করিনি। আমরা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিই করতে চেয়েছিলাম ’৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা হতে দেয়নি। ফলে হলো ’৭১ সালে যারা সীমান্ত পার হয়ে চলে গেল, যাদের মধ্যে অনেক বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, চিকিৎসক, লেখক, সাহিত্যিক-সহ আরো অনেকেই ওপাড়ে চলে গেল। এর ফল হলো তারা একটি সুবিধাভোগীর শ্রেণিতে পরিণত হল। আর যুদ্ধটা করে গেল সাধারণ মানুষ। যাদের এখনো জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সুবিধাভোগী ঐ শ্রেণির হাতে যখন ক্ষমতা এলো তখন তারা নিম্ন শ্রেণির মানুষের স্বার্থ দেখলো না। শ্রেণি শ্রেণির স্বার্থ দেখবে এটাই নিয়ম। বলা যায় এটা এক প্রকারের অর্থনৈতিক নিয়ম। স্বাভাবিক কিন্তু সঠিক নয়। কারণ যুদ্ধটা ছিলো সবার। 

শারমিনুর নাহার: সে সময়ে ক্ষমতায় তো ছিলো আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগের শ্রেণিচরিত্র তো তাই...
আহমদ রফিক: হ্যাঁ, এটা স্বাভাবিক কিন্তু এটা সঠিক নয়। আমিও বলি শ্রেণি রাজনীতির চরিত্র এটা কিন্তু এটা স্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পরে যা হয়েছে তা স্বাভাবিক কিন্তু সঠিক নয়। যারা সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতো তারা যুদ্ধটাকে প্রধান করে নিতে পারেনি আর তাদেরও রাজনৈতিক বিভ্রান্তি আছে, ভুল আছে। সে ভুলের কারণেই কিন্তু এটা হয়েছে বলে আমি মনে করি। ’৭০ সালের নির্বাচন তার প্রমাণ। কারণ সামাজিক পরিবর্তন বা সমাজতন্ত্র কায়েমের আগেই জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা সেটা পূরণ করতে হবে, সেটা লেনিন, স্ট্যালিনও বলেছেন। এটাকে প্রধান না করে সমাজতন্ত্রকে প্রধান করলো। যেজন্য গোটা জিনিসটাই হাত ছাড়া হয়ে গেল। 

শারমিনুর নাহার: আপনি এসব ভেবে কি হতাশ হন? 
আহমদ রফিক: হতাশা তো থাকবেই। তবে আমি মনে করি এই হতাশা থেকেই তরুণ প্রজন্ম আবার উত্থানের দিকে ধাবিত হবে। এখনকার অবস্থা দেখো, এই যে গণজাগরণ মঞ্চ, একটা চমৎকার সূচনা ছিল। কিন্তু পরিণতি কি হল? এরকমভাবেই এখন যে শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে, এর থেকে সহজে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। অনেক রক্ত ঝরাতে হবে, অনেক শ্রম দিতে হবে এবং অনেক সংগ্রাম করতে হবে। তো সেই সংগ্রামের পরিধি যে কতবড় তা বলা মুশকিল। 

শারমিনুর নাহার ও আহমদ রফিক

শারমিনুর নাহার: রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আপনার আত্মার যোগাযোগ বলা যায়, এতখানি আত্মীকরণ করলেন কিভাবে? এখন তো তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তার প্রাসঙ্গিকতাকেই খুঁজে পায় না...
আহমদ রফিক: রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য এখনো প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বচিন্তা, বিশ্বশান্তি, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা, যুদ্ধবাদনীতির বিরোধীতা এইগুলোকে যদি আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাবি তবে সেগুলো আমাদের জন্য এখনো প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতো করে সমাজ পরিবর্তনের কথা, পল্লী উন্নয়নের কথা, সমবায়ের কথা আমরা বলতে পারিনি। আগেই বলেছি যে, ১৯০৫ সালে গ্রামের উন্নয়ন তথা গ্রামীণ কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য রবীন্দ্রনাথ ধার-দেনা করে কৃষি ব্যাংক করলেন। সেই ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা, যাকে এখন বলে মাইক্রো ক্রেডিট সিস্টেম। যার জন্য নোবেল পুরস্কার এলো গ্রামীণ ব্যাংকে। এই সূচনাটা তো ভদ্রলোক ১৯০৫ সালে করে গেছেন। কতটা দূরদর্শী, বিচক্ষণতা থাকলে একজন মানুষ এই চিন্তা করতে পারে। আবার সমবায় প্রথা, এটা তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পায়। এই মানুষটার কাছে আমাদের শিক্ষণীয় আছে না? সেটা সমাজ পরিবর্তনের কথা হোক বা অন্য যেকোনো পরিবর্তনের কথাই হোক না কেনো। তারপরেও অন্য আরেক একটা কথা বলি, যেটা নানন্দিক বা সাংস্কৃতিক দিক। রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া কি আমাদের চলে? রবীন্দ্রনাথের বিরোধীতা করি আবার রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠানে হল উপচে পড়ে। যে লোকটি বিরোধীতা করে সেও শুনতে যায়। গানের ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেছিলেন যে, বাঙালিকে আমার গান গাইতে হবে। বলেননি যে, গান শুনতে হবে। আবার তাঁর সাহিত্যকর্ম, কবিতা, প্রবন্ধ প্রভৃতি বিষয় আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক হিসেবে কাজ করে বলে আমি মনে করি। তপন রায়চৌধুরী বরিশালের লোক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, তিনি তার লেখায় বারবার বললেন, যা শুনে আমার ভালো লেগেছে। তিনিও বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হলে তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা শুধু নয়, তাঁর প্রবন্ধাবলিও পড়তে হবে। সেখানে কিন্তু মূল রবীন্দ্রনাথকে চেনা বা বোঝা যাবে।’ আরেকটা জায়গায় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ যেন ফুলের সুবাসের মতো ছড়িয়ে আছেন, তা হলো তাঁর চিঠিপত্রে। বিশেষ করে তাঁর ‘ছিন্নপত্রাবলি’তে। এ এক অন্য রবীন্দ্রনাথ। তাকে পাওয়া সহজ নয়। তাকে পেতে সাধনা করতে হয়।  

শারমিনুর নাহার: এখনকার তরুণদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার আছে কি?
আহমদ রফিক: সংস্কৃতি এবং রাজনীতি দুই অঙ্গনেই একমাত্র তরুণদের উপরই আমি ভরসা পাই। আমি আরো মনে করি, তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে রাজনীতির সুস্থতা এবং শুদ্ধতা নিয়ে। ছাত্র রাজনীতির বিরোধী নই কিন্তু তাই বলে ছাত্র রাজনীতির নামে গুন্ডামি, টেন্ডারবাজি, মাস্তানি, খুন, নির্যাতন চালাবে তা কোনভাবেই হতে পারে না। সুস্থ রাজনীতি করতে হবে। চিন্তাশীল, মননশীল তারুণ্যের মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে। গণজাগরণ মঞ্চ তার একটা উদাহরণ হতে পারে। ব্যক্তিস্বার্থকে পুঁজি না করে সবার স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ আমি অস্বীকারও করবো না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলব, আমি ব্যক্তিগত সীমিত সম্পদে বিশ্বাস করি। উনি রাশিয়া ভ্রমণে গিয়ে বলেছিলেন, তারা ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকার তুলে দিলো এটা ঠিক করলো না। কারণ মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটা আমার। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে কিন্তু তার একটা সীমারেখা টানা উচিত যে এর বাইরে যাবে না। অর্থাৎ লোভী হওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সম্পত্তি সীমিত আকারে থাকবে। আর তার মধ্য দিয়ে একটা বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আমরা যেমন পঞ্চাশের দশকে রাজনীতিটাকে প্রাধান্য দিয়েছিলাম তেমনি আজকের তরুণ সমাজগঠনে কাজ করবে- এটাই প্রত্যাশা।  

শারমিনুর নাহার: আমাদের সময় দেবার জন্য বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে অনেক ধন্যবাদ, আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। 
আহমদ রফিক: তোমাদেরও অনেক ধন্যবাদ।

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ ৯ সেপ্টেম্বর

 

   

 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।