রাত ১০:৫৩ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

মেঘের গল্প

প্রকাশিত:

নাজমুল আহসান।।

আমাদের স্কুলের দলটাকে যদি মান্না দে’র কফি হাউজের আড্ডা গানটার সঙ্গে তুলনা করি, খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। শুধু ক্যানসারে ভোগা অমলের অভাব। এছাড়া বাকি সব কিছুতে বেশ মিল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে সবাই। খাগড়াছড়িতে সবাই আর একসাথে হই না। তবে আমরা ৫-৬ জন মোটামুটি ঈদের সময় থাকি। হুট করে সিদ্ধান্ত হলো সাজেক যাবো। এক মুহুর্ত না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। অনেক আগে একবার গিয়েছিলাম বটে। কিন্তু সেসময়ের খুব একটা ভালো স্মৃতি নিউরনে নেই। তাছাড়া এখনকার মতো পর্যটন স্পট আর পিচঢালা রাস্তাও ছিল না তখন। তাই দ্বিতীয়বার না ভেবেই রাজী হয়ে গেলাম। বন্ধু প্রবীন সকাল আটটায় স্পটে পৌঁছতে বলায় আরেক বন্ধু রনিকে নিয়ে হাজির হলাম। আমাদের চান্দের গাড়ি রওনা হলো সকাল ১০টার দিকে। আকাশে তখনও মেঘের আনাগোনা। বৃষ্টিও পড়ছে টিপটিপ। যেকোনও মুহুর্তে ঝুম বৃষ্টি শুরু হতে পারে। ওদিকে কে যেন বললো, শুধু সাজেক নয়, যাবো পথের মাঝের হাজাছড়া ঝর্ণায়ও। তাই অতিরিক্ত টিশার্ট আর প্যান্ট নিয়ে নিলাম ভিজবো বলে। অবশেষে যাত্রা শুরুর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে উঠে পড়লাম চান্দের গাড়ির ছাদে। কিন্তু হিমশীতল বৃষ্টির ফোঁটা মাথার ওপরে যেন পাথরকণা হয়ে আঘাত করছিলো। আমার আবার বৃষ্টিতে ভেজার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে, বৃষ্টিতে ভিজেছি কিন্তু জ্বর আসেনি এমন ঘটনা খুবই কম। এখন বৃষ্টিতে ভিজলে সাজেক গিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করার পরিকল্পনা হুমকির মুখে পড়বে। তাই ছাদে চড়ার ইচ্ছায় ইস্তফা দিলাম।

হাজাছড়া ঝর্ণা 

কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম হাজাছড়া ঝর্ণায়। গাড়ি থেকে নেমে খালি পায়ে কর্দমাক্ত পাহাড়ি পথে হাঁটা শুরু হলো আমাদের। পাহাড়ি পথে হাঁটা অবশ্য খুব অস্বাভাবিক নয় আমার জন্য। ঝর্ণায় গিয়ে মনে পড়লো, ভেজার জন্য যে অতিরিক্ত জামাকাপড় কিনেছিলাম সেগুলো হারিয়ে ফেলেছি! বন্ধুরা সবাই তাই ঝর্ণায় ভিজলেও, আমি খুব সন্তর্পণে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলাম। কারণ ভেজা কাপড় নিয়ে এই আবহাওয়ায় সাজেক যাবার অভিজ্ঞতা খুব ভালো কিছু হতো না। ঝর্ণা বিলাস শেষে আবার চাঁন্দের গাড়ি অভিমুখে যাত্রা। গাড়িতে হালকা নাস্তা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু।

সাপের মতো আঁকাবাঁকা পিচঢালা সরু সড়ক পেরিয়ে মাচালং ব্রিজে দাঁড়ালাম। এখানে দুই পাহাড়ি নদী মিলিত হয়েছে একসঙ্গে। গাড়ি থেকে নেমে ফটোসেশন শুরু হয়ে গেল যাত্রীদের। গাড়িকেও দেয়া হলো বিশ্রাম। প্রায় ৬০ ডিগ্রি ওপরে তাকালাম। সেখানে তখন আকাশ ছুঁয়েছে পর্বত। ঐ দূরত্বটুকু পেরুলেই অনায়াসে মেঘের নাগাল পাওয়া যাবে। কেউ একজন জানালো ওটাই নাকি আমাদের গন্তব্য - সাজেক ভ্যালি। ভাবলাম, চান্দের গাড়িতে চড়ে চাঁদে না যাওয়া যাক, অন্তত চাঁদের ধারেকাছে তো যাওয়া যাবে! কয়েকটা পাহাড় ডিঙালেই পৌঁছাবো সাজেক উপত্যকায় - এমন দূরত্ব থেকে শুনতে পেলাম এই পাহাড়ে পৌঁছতে হলে ডিঙাতে হবে আঁকাবাঁকা ৫ কিলোমিটার পথ! সরু এই সড়ক মাঝেমাঝে ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁক নিয়েছে! এরপর রকেটের মতো খাঁড়া হয়ে উপরে উঠতে শুরু করলো আমাদের চান্দের গাড়ি। ছাদে তখন আমাদের চিৎকার করে গান গাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। প্রত্যেকে মুগ্ধ সাজেকের উদার সৌন্দর্যে। নীরবে বুঁদ যখন আমরা, তখন দেখতে পেলাম বহু নিচে আমাদের পেরিয়ে আসা কালো সড়কের ছাপ। বুক ধুকধুক করে উঠলো এই ভেবে, আমরা এত উপরে!

চান্দের গাড়ির টায়ার এই উঁচু পথে চলতে তীব্র কর্কশ স্বরে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। দেখতে দেখতে উঠে গেলাম সাজেক উপত্যকায়। অভ্যর্থনা জানালো বিশাল উঁচু কয়েকটি বৃক্ষ আর সাজেক পর্যটন উন্নয়ন কমিটির প্রবেশদ্বার। আনুষ্ঠানিকতা শেষে পর্যটন স্পটের একেবারে শেষ মাথায় গেলাম। তখন প্রায় দুপুর। সাজেক ভ্যালিতে সবকিছুর দাম চড়া। তাই বুদ্ধি করে খাবার রেঁধে নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। পাহাড়ের খাদের পাশে নিচু অংশে কিছু কাঠের আসন। সেখানে বসেই প্রত্যেকের পেটের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া হলো। চারপাশ তখন কুয়াশাচ্ছন্ন। দ্বিধায় পড়ে গেলাম, এখন কি শীতকাল নাকি বর্ষা? নাকি চোখে ঝাপসা দেখছি? যদিও পরে বুঝতে পারলাম, এতক্ষণ ধরে যে মেঘ দেখছিলাম, সেসবই কুয়াশা হয়ে ধরা দিয়েছে চোখের সামনে। সঙ্গে আবার টিপটিপ বৃষ্টি। সারি সারি মেঘ, বৃষ্টি, শীত শীত ভাব, পার্কের মতো দোলনা, ভেজা পাথর, স্নিগ্ধ সবুজ পরিবেশ– সবই যে কী ভীষণ চমৎকার সেটা কেউ না দেখলে বোঝানো কঠিন। অবশ্য উপভোগের জন্য চমৎকার হলেও, ছবি তোলার জন্য মোটেই ভালো ছিল না আবহাওয়া। ছবি তোলার জন্য রৌদ্রোজ্জ্বল সাজেকই ফটোগ্রাফারদের পরম চাওয়া।
 

ঠিক হলো খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে প্রথমেই কমলাক নামের পাহাড়ি এক গ্রামে যাবো। কমলাক চূড়ায় না উঠলে নাকি সাজেক ভ্রমণ বৃথা। পাহাড়ি কর্দমাক্ত পথে এগুলাম কমলাক চূড়ার দিকে। পাথুরে অংশে হেঁটে কাদার বিড়ম্বনা এড়ানো গেল। কিন্তু অনেকেই দেখলাম ফেরত আসছেন। কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, স্থানীয় অধিবাসীরা বলছে ‘ভিতর পার্টি’ এসেছে। তাই এখন ওদিকে যাওয়া যাবে না। ‘ভিতর পার্টি’ শব্দটার সঙ্গে আমরা অবশ্য পরিচিত। ওখানকার স্থানীয় লুসাই ও পাঙ্খোয়া নৃগোষ্ঠীর দোকানিদের মুখেই শুনলাম, ‘ভিতর পার্টি’কে চাঁদা দিতে হয় তাদের। একটা নিরাপত্তা স্থাপনার পাশে বসবাসকারী মানুষও যদি চাঁদাবাজির শিকার হয়, তাহলে অন্যদের অবস্থা কেমন – এসব ভাবতেই মনটা তিক্ত হয়ে উঠলো।

ছবি: লেখক

কমলাক যেতে না পেরে সাজেক উপত্যকার দিকেই মনোযোগ দিলাম সবাই। পাশের পাহাড়েই মেঘের স্তুপ দেখে অভিভূত হচ্ছি। ততক্ষণে অবশ্য আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে কুয়াশার মতো মেঘমালা। ছোট ছোট পর্যটন স্থাপনাগুলো বেশ চিন্তাভাবনা করে বানানো হয়েছে। রয়েছে ‘স্টোনস গার্ডেন’ বা পাথরের বাগান। এটিই বেশি ভালো লেগেছে আমার। মোটামুটি একটি পাথুরে এলাকাকে বন্য আঙ্গিক দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নিচের বুনো জঙ্গলের দিকে ফেরানো দোলনা আর আসনগুলো প্রশান্তি এনে দেয়। মনে হবে জীবনটা আরেকটু লম্বা হলে মন্দ হতো না! বিকেলে এখানে বসলে ‘সামার অব সিক্সটি নাইন’ গানটার একেবারে শেষের কয়েক সেকেন্ডব্যাপী গিটারের মূর্ছনা বুকে বাজবেই। এখানেই চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছা হবে বাকিটা সময়। আছে ‘অ্যাডভেঞ্চার র‍্যাঞ্চ।’ পাহাড়ি খাদের নিচে নামার ইচ্ছা যাদের, তারা এখানে যেতে পারেন। পাহাড়ের খাদ লাগোয়া সিঁড়ি দিয়ে নামা যাবে অনেক নিচে। আরও কাছে আসা যাবে বুনো প্রকৃতির। এছাড়া দূরের মনোমুগ্ধকর পাহাড়সারি দেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা তো আছেই। এক অবিশ্বাস্য স্নিগ্ধতায় মোড়ানো এই সাজেক। থাকার জন্য সেনাবাহিনীর দুটি আধুনিক রিসোর্ট আছে। সেখানে প্রতি কক্ষের ভাড়া প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকার মতো। এছাড়া থাকতে চাইলে খরুচে রিসোর্ট ছাড়াও স্থানীয়দের আবাসিক হোটেল আছে। সেখানে খাবার খরচও তুলনামূলক কম।

ভালোলাগার রেশ নিয়ে যখন ফিরছি, বন্ধু শুভ উস্কে দিলো, এ নিয়ে লিখতেই হবে! কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, রেশটুকু ঠিকঠাকভাবে প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছি। সাজেকের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে এমন শব্দ কিংবা সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারে এমন ফটোগ্রাফি আদৌ আছে কিনা জানা নেই। তবে দিনশেষে ফেরার বেলায় এক অদ্ভুত ছাপ লেগে ছিল মনের ভেতর। কিছুটা বেদনাময় সে অনুভূতির রঙ। হয়তো সাজেককে ফেলে আসার বেদনা। গাড়ির ছাদে বসে চিৎকার করে সব বন্ধুদের মিলিত গানের কোরাস যেন আরও করুণ করেছে সন্ধ্যাটাকে।

‘আরও কিছুক্ষণ কি রবে বন্ধু?
আরও কিছু কথা কি হবে?’

ছবি: ফারুখ আহমেদ

/এনএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।