বিকাল ০৫:৪৩ ; বুধবার ;  ১৬ অক্টোবর, ২০১৯  

জালাল আমাদের চোখ হয়ে ভেসে থাকে, আমরা হই কালের সাক্ষী!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল।।

সকালে ঘুম ভেঙ্গেই মনে হলো জালালের জন্য আমার খারাপ লাগছে! তাই তাকে নিয়েই দিনের শুরু। ডান-বাম না ভেবে দেখে এলাম আবু শাহেদ ইমনের ‘জালালের গল্প’। সেদিন প্রেক্ষাগৃহে বসে চোখের পলকে রূপোর জলে ভাসতে ভাসতে জালাল সময় থেকে সময়ান্তরে নিয়ে গেল, আর আমি মোহিত হলাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

এত এত ছবি হচ্ছে দেশে, কোনও দিনও এসব নিয়ে ভালমন্দ মন্তব্য করার আগ্রহ জন্মায়নি! আর আগ্রহ জন্মাবেই বা কেন? যে ধরনের ফর্মুলার ছবি বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, সে সবের চর্চা যদি এখনও হয়- তা নিয়ে কথা বলবার কিছুই থাকে না। আমরা বরং মৌনব্রত পালন করতে পারি, আর থাকতে পারি পাতাঝরার কাল- সবুজ সুদিনের অপেক্ষায়।

জালালের গল্পে’র অনেক দিক, কোন দিক থেকে শুরু করি। গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। দারুণ মৌলিক গল্প- এই ‘জালালের গল্প‘। পরিচালক আবু শাহেদ ইমন এতটাই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন যে, লেখক আবু শাহেদ একটু হলেও আড়ালে চলে গিয়েছেন! আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের মূল দুর্বলতাই হলো চিত্রনাট্যে। আবু শাহেদ রাজাধিরাজের মতো সেই দুর্বলতা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আমি নিজে একজন চিত্রনাট্যকার-পরিচালক হওয়ার কারণে বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি মুগ্ধ হয়েছি। কারণ ইমনের কাহিনী বিস্তারের প্রতিটি আঁকেবাঁকে একজন দক্ষ চিত্রনাট্যকারের গল্প ভ্রমণের গতিপথ ছিল।

গল্পের ধরন লিনিয়ার হওয়ার কারণে দর্শক সহসাই নিজে কাহিনীর একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। কারণ গল্পগুলো অজানা নয়, সেই মহাভারতের কর্ণের ভেসে আসার উপাখ্যান বা লক্ষ্মীন্দরকে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়ার মিথ বা গ্রাম বাংলায় প্রচলিত নানা অ্যাখানের ওপর সওয়ার হয়ে নতুন এক গল্প বয়ান করেছেন ইমন। তিনি  আমাদেরকে এই জানা গল্প গুলোকেই এমনভাবে আবারও দেখিয়েছেন যে, দেখার সময় অনুভূতি পাল্টে যায়, জীবন সম্পর্কে নতুন ধারণা জন্মায়।

‘জালালের গল্প’ কারিগর আবু শাহেদ ইমন

জলে ভাসতে ভাসতে জালাল আমাদেরকে একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্পে নিয়ে যায় অবলীলায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, জালালের গল্পে উপস্থিতির বিচারে জালাল নিজে ততটা উজ্জ্বল নয় এবং বোঝাই যায় গল্পকার বা পরিচালক ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। জালাল আমাদের চোখ হয়ে ভেসে থাকে, আমরা নীরবে হই কালের সাক্ষী!

এজন্যই বোধকরি কাহিনীর পুরোটাজুড়ে জালাল নিজে কোনও কিছুর নিয়ন্ত্রণ করে না। নদীর যেমন কোনও গন্তব্য নেই, জালালেরও নেই। সে ভাসতে থাকে আর জীবনের বিচিত্র দিকের সাক্ষী হতে থাকে। শেষ দৃশ্যে পিতৃভাবাপন্ন জালাল সাঁতার না জানা সত্ত্বেও পানিতে লাফিয়ে পড়ে বিলীন হয় নবজাতক জালালকে বাঁচানোর জন্য! প্রাপ্তবয়স্ক জালাল যেন নিজহাতে নিজের শৈশবকে নিরাপদ রাখতে প্রাণ দেয়। মুহূর্তেই সরল কাহিনীটা গভীরতম এক মেটাফোর এর জন্ম দেয়!

এবার আসা যাক পরিচালনা প্রসঙ্গে। পরিচালক প্রথম দৃশ্যেই দর্শককে বসিয়ে দিয়েছেন। এরপর থেকেই দর্শক মনে- কী হয়, কী হয় অনুভূতি। এ রকম সিরিয়াস একটা গল্পে খুবই মার্জিত হিউমার এতোটাই সহজাত মনে হয়েছে যে, এই ভেবে আশ্বস্ত হয়েছি- অবশেষে অহেতুক ভাঁড়ামি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো। গল্পের সঙ্গে মানানসই লোকেশন আর দিন এবং গোধূলির রহস্যময় আলো ধরে  কাজ করার কারণে গল্পটি অনেক বেশি সিনেম্যাটিক ইমেজের জন্ম দিয়েছে।

মূল গল্পে পৌঁছানোর জন্য পরিবেশ এবং পরিস্থিতির বিস্তার হয়েছে তুখোড় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচনেও পরিচালক অসম্ভব সততার পরিচয় দিয়েছেন। পর্দাজুড়ে সাধারণ মানুষ, অভিনেতা-অভিনেত্রীকে আলাদা কেউ মনে হয়নি। তার পরেও গল্পের অন্যান্য চরিত্র সাপেক্ষে তৌকীর আহমেদকে একটু হলেও বেমানান লেগেছে। অবশ্য ছবির অন্যান্য বিষয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে, এই সামান্য দুর্বলতা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

মোশাররফ করিমের অভিনয় নিয়ে কথা না বললেই নয়। চরিত্রের মাপে একজন অভিনয়শিল্পীর অভিনয় যে এই রকম দাপটের হতে পারে- সেটি আবারও প্রমাণ করেছেন জালাল নামধারী মোশাররফ করিম। নেতিবাচক চরিত্রে মোশাররফ করিম উজাড় করে দিয়েছেন নিজের পুরোটা। দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ার না হওয়া সত্ত্বেও মৌসুমী হামিদ এখানে ভালো অভিনয় করেছেন। প্রত্যাশারও বেশি। তার অভিনয় দেখে মনেই হয়নি তিনি ইতোমধ্যে নাচে-গানে তুলকালাম ধারার ২-৪টি কথিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেছেন।

জালালের গল্পে একবারের জন্যও মনে হয়নি, এই জায়গাটা পরিচালক অল্পের মধ্যে সেরে ফেলেছেন! দর্শককে তিনি সহজভাবে লম্বা একটা ভ্রমণের সঙ্গী করতে পেরেছেন। বুক চিতিয়ে সফল হয়েছেন পরিচালক, সে হলো বাংলা ছবিতে কোনও প্রকার গানের ব্যাবহার না করা। এই যে অনন্তকাল ধরে আমরা পাঁচটি গান এবং তিনটি মারপিট এর ফরমুলায় আটকে ছিলাম, তা থেকে অনেক বড় এক পরিত্রাণের নাম ‘জালালের গল্প’।

‘জালালের গল্প’ আমাকে এতটাই আশ্বস্ত করেছে যে, এর কোনও দুর্বলতা সেই অর্থে খুঁজে পাইনি। তথাপি আবহ সংগীত বড় বেশি কানে লেগেছে। চলচ্চিত্রের আবহসংগীত আর গানবাজনা এক বিষয় নয়। চলচ্চিত্রে নীরবতাও অনেক সময় গভীরতম আবহের জন্ম দেয়। সেই হিসাবে যেখানে সেখানে উচ্চকিত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কাহিনীর গতিপথে খানিক বিরক্তই ছড়িয়েছে বলা যায়। এই দুর্বলতার কথা এই কারণেই বলা, জালালের গল্প এতটাই দক্ষ উপস্থাপনার ছবি- যেখানে অতি সামান্য ত্রুটিও কানে বাধে।

‘জালালের গল্প’ দেখে আমার প্রথম অনুভূতি হলো- অবশেষে কেউ একজন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি বিশ্বাসযোগ্য গল্প বলতে পারল। নিজেদের ক্রমাগত অধঃপতনের কারণে আমি দর্শককে কখনওই সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার অনুরোধ করিনি। খুব ভালো লাগছে এই ভেবে যে, আমি এখন বুক চিতিয়ে সবাইকে বলতে পারছি- আপনারা হলে গিয়ে জালালের গল্প দেখুন, আমাদের ছবি দেখুন।

ট্রেলার:

লেখক: নাটক-চলচ্চিত্র নির্মাতা

/এমএম/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।