দুপুর ০২:১৫ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

মিলনের বয়স আর বাড়বে না || ফরিদুর রেজা সাগর

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[আজ ৮ সেপ্টেম্বর কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের জন্মদিন। ১৯৫৫ সালের এ দিনে তিনি বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : নূরজাহান, অধিবাস, পরাধীনতা, কালাকাল, বাঁকা জল, নিরন্নের কাল, পরবাস, কালোঘোড়া ইত্যাদি। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার-সহ দেশ বিদেশে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।লিখেছেন দু’শতাধিক নাটক। এর মধ্যে কোন কাননের ফুল, বারো রকম মানুষ, রূপনগর বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়।]

 

ইমদাদুল হক মিলনের বয়স ষাট হতে চলেছে। নানা অনুষ্ঠান হবে। তাকে নিয়ে পত্রিকায় নানা লেখা বেরুবে। টেলিভিশনের পর্দায় মিলনের নাটকও থাকতে পারে। মিলন সম্পর্কে অনেক কথাবার্তা হবে। 
ষাট হলে কি একজন লেখকের ধারা পাল্টে যায়? ষাট হলে কি একজন মানুষের জীবন স্বভাব পাল্টে যায়? কথায় বলে শরীরের সঙ্গে মানুষের মনের কোনো যোগাযোগ নাই। মিলনের শরীর ষাট বছরের একজন মানুষের, কিন্তু মনটা কখনোই ষাট বছর মানুষের মতো নয়। 
মিলন সারাজীবনই তার বয়সের চেয়ে এগিয়ে ছিলো। 
শহীদুল্লাহ কায়সারের মত ক্ষমতাবান লেখকের ‘সংশপ্তক’ নতুন করে টেলিভিশনের পর্দায় উপস্থাপনের সাহস ছিলো ইমদাদুল হক মিলনের। তরুণ নাট্যকার তিনি। তারপরও সাহস করেছেন– সুহৃদ অগ্রজের কাহিনীকে টিভি পর্দায় সঠিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য। তবে এ ব্যাপারে  প্রখ্যাত নাট্য পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং রিয়াজউদ্দিন বাদশার ভুমিকা স্মরণ থাকা প্রযোজন। 
চ্যানেল আই যখন শুরু হয় তখন স্যাটেলাইট চ্যানেল সম্পর্কে অনেকের নেতিবাচক ধারণা ছিলো। ভবিষ্যত দেখতে পান বলেই ইমদাদুল হক মিলন তখন চ্যানেল আইয়ের প্রথমদিনের প্রথম নাটক রচনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এবং পরবর্তীতে বললেন, চ্যানেল আইয়ের প্রথম নাটক, চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন নাটকটি আমি পরিচালনা  করব– সে ক্ষেত্রে আমার কোনো আপত্তি নাই। 
আজকে বলতে দ্বিধা নেই এই নতুন পরিচালকের নাটকে তখন অনেক বড় শিল্পী অভিনয়ের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। আর ইমদাদুল হক মিলন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কণ্ঠশিল্পী শুভ্রদেবকে নাটকের প্রধান শিল্পী নির্বাচন করেন। 
নিজের বয়সের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন ইমদাদুল হক মিলন। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় রাস্তা তৈরির কাজ থেকে শুরু করে জার্মানীতে গিয়েও কাজ করেছেন। ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্য পেয়েছে বাস্তব অজ্ঞিতা থেকে লেখা এক শক্তিমান লেখকের রচনা।  

এই যে এই লেখার শুরুতে যেমন উচ্চারণ করছি, ইমদাদুল হক মিলন আমার বন্ধু। আমার মনে হয়, তিন যুগ আগে যদি এ লেখাটা লিখতাম তখনও লেখার শুরুতেই একথাই বলতাম, ইমদাদুল হক মিলন আমার বন্ধু।
আমি নিশ্চিত, এখন যেমন সে বলে, তিনযুগ আগে মিলনও বলতো, সাগর আমার কাছের বন্ধু।
অনেকের মনে হয়তো এ বিষয়টিতে বিস্ময়ের উদ্রেক হয়।
সাম্প্রতিক একটি টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে আমি আর মিলন বসেছিলাম। কথার শুরুতে মিলনকে আমি সৌজন্যতায় ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেছিলাম। আলোচনা চলছিল সেভাবেই।
অনুষ্ঠান চালাকালীন হঠাৎ মিলন দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলল, সাগর আমাকে ‘আপনি’ করে আলোচনা চালাচ্ছে। কিন্তু এ মানুষটি আমার দীর্ঘকালের বন্ধু। সুতরাং আমরা ব্যক্তিজীবনে পরস্পরকে ‘তুমি’ করে বলি। এ মুহূর্ত থেকে কথামালা ‘তুমি’ করে বললে সহজ হয়।
চ্যানেলটির কয়েক কোটি দর্শকের সামনে যখন মিলন এ উচ্চারণ করেছিল, তখন সব বাঙালির বুঝতে অসুবিধা হয়নি আমরা দুজনে অনেকদিনের বন্ধু!
প্রাসঙ্গিকভাবে বলি সত্তরের দশকে ঢাকা শহরে সংস্কৃতি অঙ্গনে বেড়ে ওঠা অনেক তরুণ-তরুণীরা আমরা পরস্পরের ভালো বন্ধু ছিলাম। 
মিলন থাকতো পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। সেখানে একজন সফল লেখক ছিলেন, যে আমাদেরই বন্ধু। সেই বন্ধুটি আমাদের সঙ্গে ঢাকার নানা পত্র-পত্রিকায় লিখে যাচ্ছিলেন। সম্ভবত তাঁকে দেখে মিলনের মনে হলো, ওই মানুষটি যদি ওরকম লেখালেখির জন্য আলাদা ‘সম্মান’ নিয়ে সবার বন্ধু হয়ে উঠতে পারে তবে আমি কেন নয়?
মিলন লিখতে শুরু করল।
তারপর থেকে আর তার কলম থামল না।
‘লেখক’ হিসেবে পরবর্তী সময়ে সে কত বড়মাপের হয়ে উঠল, জয় করে নিল পাঠকের মন, সেই ইতিহাস তাঁর ষাটতম জন্মদিনে অনেকেই লিখবেন। বলবেন। ব্যাখ্যায় বিস্তার ঘটাবেন। আমি সেই প্রসঙ্গেই যাব না।
শুধু ‘লেখক’ হয়ে ওঠার গল্পটা যে কী ভীষণ কঠিন, এবং লেখালেখিতেই কেবল থাকবার জন্য নিরন্তর কত ধরনের লেখা তাঁকে লিখে যেতে হয়েছে তা বন্ধু হিসেবে দেখেছি খুব কাছে থেকে!

আফজাল হোসেন, ফরিদুর রেজা সাগর ও ইমদাদুল হক মিলন

আমাদের দেশের বাংলাভাষায় লেখালেখি নিয়ে প্রসঙ্গ পূর্বক ব্যাখ্যা করতে গেলে মিলনকে এ জন্যেই আনতে হবে আলাদাভাবে।
শুধু লেখালেখি করে, লেখালেখিতে থেকেই একটা জীবন ধারণ ও চলমান রাখা যে কারো পক্ষে চ্যালেঞ্জ হতে পারে, সেই চ্যালেঞ্জ সাফল্যের চেহারা নিতে পারে ইমদাদুল হক মিলন প্রথম আমাদের বন্ধুদের মধ্যে তা প্রমাণ করেছে। এ উদাহরণ এদেশে বিরল সে কথাও বলতে পারি অকপটে।
এই কঠিন চ্যালেঞ্জ প্রমাণের জন্য মিলনকে নানারকম লেখা লিখতে দেখেছি।
নানারকম লেখা লিখতে যাওয়া মানে নানারকম সমালোচনা। মিলন সবসময় সেই সমালোচনা কাঁধে নিয়েছে। কাঁধে বহন করার সহ্য শক্তি নিয়ে অবিরত লিখেই গেছে। থামেনি একবেলার জন্য। আমার বন্ধুটি জানত, পৃথিবীতে একটা শ্রেণী আছেন, লিখে যাই। আরেকটা শ্রেণী শুধু সমালোচনা করে যায়।
তার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল, তাঁর কোন লেখাটা তাঁকে কোন জায়গায় পৌঁছে দেবে। এ পরিষ্কার চিন্তার মধ্যে কখনো কোনো জড়তা দেখতে পাইনি আমি।
মিলন নিজে থেকে একটা লেখা লিখে বলত, বন্ধু আমার এ লেখাটা তোমাদের পড়ার দরকার নেই। কারণ, লেখাটা উপার্জনের জন্য লিখতে হয়েছে।
আবার অন্য আরেকটা লেখা শেষ করে বলত, আমার এ লেখাটা পড়ো। ভালো লাগবে। ভালো না লাগলে বকা দিয়ো।
বন্ধুর সেইসব লেখা পড়ে আমরা গর্বিত হয়েছি।
বন্ধুবৎসল মিলন ছোটদের জন্য একটা উপন্যাস লেখে। ‘চিতা রহস্য’। ছোটদের জন্য অসামান্য সে রচনা। সেই বইটি উৎসর্গ করেছিল আমাদের সব কাছের বন্ধুদের। আমাদের মন আনন্দে ভরে যায় সেইদিন। আমিসহ ‘উৎসর্গ’ পাতায় নাম ছিল বন্ধু আফজাল হোসেন, আবদুর রহমান, আলীমুজ্জামান, খন্দকার আলমগীর, দিদারুল আলম আর শাহানা বেগম-এর।
এক পর্যায়ে এক সাপ্তাহিক পত্রিকায় মিলন ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করে ‘নূরজাহান’। আমরা বন্ধুরা প্রতি সপ্তাহে সেই ধারাবাহিকের লেখা পড়ি আর উদ্বেলিত হই।
আমরা তখন দৈনিক আজকের কাগজ বের করছি। সেখানে সত্যি নূরজাহান-এর একটা রিপোর্ট ছাপা হয়। সেই ঘটনাকে পটভূমি করে মিলনের কলম চলতে থাকে।
আমরা বন্ধুরা তখনই আলোচনা করছিলাম, এ উপন্যাস একসময় এদেশের সাহিত্যে বড় আকারের এক সম্মানের জায়গা কেড়ে নেবে। অতি সম্প্রতি কলকাতার সবচেয়ে বড় প্রকাশনা ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ থেকে এ বইটি বেরিয়েছে।
বন্ধু মিলন এখনও যেভাবে তাঁর লেখাকে ভালোবাসে, ভালোবাসে তাঁর নাট্য রচনাকে, ভালোবাসে তাঁর প্রফেশনকে সেটা নিশ্চয়ই অনেক তরুণের অনেুপ্রেরণা।
পাক্ষিক ‘আনন্দ আলো’র সম্পাদক রেজানুর রহমান বিশেষ সংখ্যা বের করবার পরিকল্পনার শুরুতে আমাকে প্রশ্ন করে ‘সাগর ভাই, যদি মিলন ভাইয়ের লেখা চাই তবে তাঁর জন্য কত বাজেট ধরব? কত দিতে হবে তাঁকে? উনি তো এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবেন না।’ আবার উপন্যাসটি ছাপা হয়ে বেরোবার পরে রেজানুর রহমান এসে বলে, ‘সাগর ভাই, অন্য কোনো লেখক তো ফোন করল না। শুধু আপনার বন্ধু ফোন করল, টাকাটা কবে দিচ্ছি সেটা জানতে।’
মিলনকে লেখার টাকা যথাযথভাবে এবং সময়মতো দিতে হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, আমার এ বন্ধুটি যে আপাদমস্তক লেখক হিসেবেই আছে। লিখে জীবন নির্বাহ করেছে। এখন একটি দৈনিক কাগজের সম্পাদক, লিখে যাচ্ছে সেখানে।
 লেখা লেখির এ পেশাতেই সে রয়েছে রক্তমাংসে অস্থিমজ্জায়।

বয়সের চেয়ে এগিয়ে আছে ইমদাদুল হক মিলন। সময়কে সঙ্গে নিয়ে পথ চলেন মিলন। জিনসের কাপড় পড়তে ভালোবাসেন। এই তরুণকে দেখে কারো চিন্তা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে– নুরজাহানের মতো বাংলা সাহিত্যের বড় মাপের এক উপন্যাস লেখক তিনি

আগেই বলেছি আমরা চ্যানেল আই যখন শুরু করি প্রথমদিনে মিলনের লেখা ও পরিচালনায় একটি নাটক প্রচার হয়। অসাধারণ ছিল সেই প্রযোজনা। প্রচুর পরিশ্রম করেছিল মিলন এবং নাটকটি দর্শক প্রশংসিত ছিলো।
সেই বহুল জনপ্রিয় নাটকটি প্রচারের পর মিলন আজ পর্যন্ত ঐ নাটকের জন্য আমাদের কাছে একটি টাকাও নেয়নি।
এখানেই একজন মানুষের চরিত্রের একটা বড় দিক স্পষ্ট হয়। এবং আমার মনে হয়, মিলনের মতো এমন চরিত্রের একজন সৃজনশীল নাট্যকার ও কথাশিল্পী আমার পরম বন্ধু!
 দেশের একজন অন্যতম সেরা পত্রিকার সম্পাদক আমাদের বন্ধু। এ দেশের অন্যতম সেরা একজন কথাশিল্পী আমাদের বন্ধু। এদেশের অন্যতম সেরা একজন বড় মাপের মানুষ আমাদের বন্ধু।
এ সম্মান মিলন আমাদের বন্ধুদের নানাভাবে, নানা সময়ে দিয়েছে।
বন্ধুত্বের সংজ্ঞাও যে গৎবাঁধা নয়, মিলন তা আমাদের বন্ধুদের মধ্যে পাল্টে দিয়েছে। এখনও এতো ব্যস্তজীবনের মধ্যে, হঠাৎ হঠাৎ মিলন এসে হাজির হয় এবং ফোন করে সবাইকে কাছে চায়। বলে বন্ধুরা, কোথায় তোমরা, আজ আসো। সবাই মিলে বিকেল থেকে জমিয়ে আড্ডা দেই। খুব মজা করি। চলে এসো সবাই।
বয়সের চেয়ে এগিয়ে আছে ইমদাদুল হক মিলন। সময়কে সঙ্গে নিয়ে পথ চলেন মিলন। জিনসের কাপড় পড়তে ভালবাসেন। এই তরুণকে দেখে কারো চিন্তা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে– নুরজাহানের মতো বাংলা সাহিত্যের বড় মাপের এক উপন্যাস লেখক তিনি। যারা ইমদাদুল হক মিলনকে নিয়ে তার ষাট বছরের অনুষ্ঠান করছেন, সবার কাছে আজ একটি অনুরোধ– মিলনের বয়স আর বাড়তে দেবেন না। তাহলে বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটির আমাদেরকে দেয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।